আজ শুক্রবার। ক্যালেন্ডারে মার্চের প্রথম সপ্তাহ চলছে। ঝকঝকে একটা সকাল। ছুটির দিনের আয়েশী প্রাতঃরাশ শেষে, বারান্দায় বসে আকাশ খবরের কাগজ দেখছিলো। অধিকাংশ খবরই মনটা খারাপ করে দেয়। চারিদিকে অপরাধ, নৈরাজ্য, হতাশা, নিরাশা আর অজস্র লোক দেখানো কারবার।
আসলে সঠিক জায়গায় সঠিক লোক সঠিক সময়ে থাকে না বলেই আমাদের আজ এই অবস্থা। আর দিন দিন এ অবস্থা আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে...। মনের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর।
এমন সময় টেলিফোনটা বেজে উঠলো। আকাশ রুমে এসে রিসিভার টা তুললো~
-হ্যালো, আস্সালামালাইকুম। আকাশ বলছি।
-ওলাইকুমুস্সালাম। আপনি আকাশ হলে আমি বাতাস বলছি। আরে মশাই ! আকাশ -বাতাস-পাহাড়... এগুলো কারো নাম হয় নাকি ?-
(এই সুরটি আকাশের চেনা) ন্নাহ...। না মানে - আমার নাম আকাশ, আর বন্ধুরা ভালবেসে ডাকে আক্কাস।
-(নীলিমা হেসে দিলো) বেশ বেশ। তো আক্কাস সাহেব কি করছিলেন? অসময়ে বিরক্ত করলাম না কি?
- হুম্ম। বিরক্ত নয় বরং আমাকে তুমি করেছো মুক্ত। খবরের কাগজে দেশের হাহাকারে বিপর্যস্ত হয়েছিলাম। ভাবছিলাম আমি দেশের জন্য কি করেছি বা আমার কি কিছুই করার নাই !
- স্বাধীনতার মাসে এই জাতীয় বক্তৃতা গুলো নিরর্থক আঙ্গিকে ফাঁপা বুলির মত বারবার শোনা যায় বড় বড় মানুষদের মুখে। তবে এখন আপনার কাছে শুনে ভাল লাগলো। আমরা, মানে এ প্রজন্ম যদি সত্যি সজাগ হই আর নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হই-সেদিন দূরে নয় যে আমরা ভালো কিছুর স্বপ্ন দেখা শুরু করতে পারবো।
- আমার মনের কথা গুলোই যেন তোমার কন্ঠে বেজে উঠলো। আর, শুনতেও ভাল লাগলো। তবে ব্যাপারটা বলা যতটুকু সহজ; বাস্তবে তা পরিনত করা ততোধিক দুরুহ। আমরা যে ভাবে অরাজকতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পরেছি, এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রত্যেককে আগে নিজকেই শুধরে নিতে হবে। ভাল মন নিয়ে ভাল কিছুর চেষ্টা করলে -অবশ্যই ভাল ফল আসবে।
-হুম্ম। চমৎকার বলেছেন - প্রত্যেককে আগে নিজকেই শুধরে নিতে হবে। মনে মনে তাই প্রার্থনা করি যাতে আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দেন।
- ইনশাআল্লাহ।
-আচ্ছা, ভাল কথা। খবরের কাগজে আর কোন খবর ছিলনা?
- যেমন?
-বিনোদন কিংবা ছুটির দিনে ঘুরে আসুন...এই টাইপের আর কি!
-(এইবার আকাশ হেসে দিলো) হ্যাঁ। আজ ছুটির দিনে অফিস বন্ধ থাকবে। নিউমার্কেট-বনানী-গুলশান খোলা থাকবে। চিড়িয়াখানা-শিশুপার্ক-বোটানিকাল গার্ডেন জমজমাট থাকবে। সব খাবার রেস্টুরেন্টগুলো প্লেট সাজিয়ে কাস্টমারের জন্য অপেক্ষা করবে...ইত্যাদি ইত্যাদি।
-ভাল। আর কিছু?
-হুম্ম। বেশ ক’টি নতুন সিনেমা শুভমুক্তি পাচ্ছে। ...‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকটি আবারো মঞ্চস্থ হবে বেইলী রোডে...
-(আকাশের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) ঠিক আছে ঠিক আছে। আপনি অনেক খবর দিলেন। এবারে আমি আপনাকে আবহাওয়ার খবরটা দেই। আজ আকাশ সাহেবের মনটা খারাপ। তাই তাকে কোথাও বেরিয়ে আসার জন্য বলা হচ্ছে। এতে করে তার মনে যে মেঘ দানা বেঁধেছে, তা সরে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
-খবর শেষ করছি। শেষ করবার আগে বিশেষ বিশেষ খবর গুলো আরেকবার জানিয়ে দিচ্ছি-দুপুরে খাওয়া হবে সুপার স্টার এ / বিকালে আশুলিয়া / সন্ধ্যায় নাটক -কোর্ট মার্শাল/ রাতে শিক কাবাব আর নান রুটি।...আমদের পরবর্তী কার্যক্রম ঠিক সাড়ে বারটায় তোমার বাসার সামনে।
-(একটু হেসে নিয়ে) আচ্ছা, দেরী করোনা যেন।
-(সম্বোধন পরিবর্তন টা আপনা থেকেই হয়ে গেল-আর দুজনেই সমান প্রশ্রয় দিলো)
--জো হুকুম , লিমা ম্যাডাম।
-হুম্ম। এখন তবে ছেড়ে দিই - আক্কাস সাহেব?
-ঠিক আছে। নীল রঙ এর আজ বুঝি আবার সৌভাগ্য হবে!
-হয়তো বা। তাই বলে তুমি কিন্তু আবার ভর দুপুরে কাল রং এর ভাগ্য খারাপ করোনা। সাদা টাইপের কিছু পড়লে হয়তো ভাল হবে।
- হুম্ম। দেখি। রাখি তাহলে?
- হ্যাঁ। আমিও রাখছি। আল্লাহ হাফেয।
- আল্লাহ হাফেয।
...রিসিভারটা রেখে আকাশ আরও কিছুক্ষন ফোনটির দিকে চেয়ে থাকলো। আকাশ টের পেল, ধীরে ধীরে সে যেন মানবের নিশ্চিত পরিনতির দিকে গড়িয়ে চলছে। আর দু'পাশেই যথেষ্ট আস্থা থাকায় পরিনামটা বেশ সহজাত ভঙ্গীতেই এগোচ্ছে...।
একেকটা সময় আসে-আমরা নীরব দর্শকের মত তাকিয়ে থাকি আর প্রকৃতি আমাদের নিয়ে অবিরাম খেলে চলে। বোধকরি আকাশ আর নীলিমাকে নিয়ে - প্রকৃতি এবার খেলায় মেতেছে। দুর্বল মানুষ তার নিয়তির ঠুম্রী তালে নাচতে থাকে। দুঃখ -কষ্টে ভরা জীবনে - ক্ষনিকের ভাল লাগা কিংবা রঙ্গীন স্বপ্নরা যদি কদাচিৎ উঁকি মারে; সেই জোয়ারে গা ভাসালে ক্ষতি কি ? বরং, সেতো অতীব সাধারন এবং চিরন্তনও বটে!
আকাশ গুনগুনিয়ে উঠলো-
আজ মন চেয়েছে -
আমি হারিয়ে যাবো,
হারিয়ে যাবো আজই তোমার সাথে...।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


