এখন বিকাল ৫’টা বাজে। আকাশ অফিস থেকে বাড়ী ফিরছে।
আজ দাদী’র আসার কথা। ওনার শরীরটা ক’দিন ধরে ভাল যাচ্ছে না। আকাশের বিয়ে’র কথা চলছে -জানতে পেরেই তিনি একদম অস্থির হয়ে উঠলেন ঢাকা আসবার জন্য। দাদীকে আনবার জন্য সকালে একটা মাইক্রোবাস পাঠানো হয়েছিল টাঙ্গাইলে।
আকাশ বাড়ীতে ঢুকেই বুঝতে পারে, পুরা বাড়ীতে একদম উৎসবের আমেজ চলে এসেছে। বসার ঘরে রীতিমত আসর জমেছে। দাদীকে দেখে আকাশ কাছে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করলো।
-হুম্ম মাথা উঁচু করে।
( সালাম করার সময় মাথা নীচু রাখলে দাদী খুব রেগে যান।)
-তা বেশ। বেশ। আমদের আকাশে’র তো দেখি সত্যি বিয়ের ফুল ফুটেছে। কিন্তু দাদু ভাই আমায় ছাড়া সব্বাই বিবি সাহেবকে দেখে ফেলেছো। এখন ভাই আমাকে আমার বোনটাকে একটু দেখাবি না?
একটানে অনেক ক্ষন কথা বলায় ওনার কাশি শুরু হয়ে গেল। আজকাল তার হাঁপানীটাও বেড়েছে।
আকাশের বাবা বললেন, ‘মা আপনি অস্থির হবেন না। আপনার নাত বৌ’কে দেখানোর ব্যবস্থা আমি করব’।'
আকাশ কাপড় ছাড়ার কথা বলে নিজের রুমে চলে আসলো। সমস্ত ব্যাপারটা তার জানা, তবুও অস্বস্তিবোধটা কাটেনি পুরাপুরি। এ যে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায় ! সহজ হতে সময় লাগছে।
রাতে খাবার টেবিলে জানা গেল, কাল ঐ বাড়ী থেকে মুরুব্বীরা আসবেন দিনক্ষন পাকাপাকি করবার জন্য। দাদী এসে সবার মধ্যে দারুন একটা গতি এনে দিয়েছেন।
খাওয়া শেষে বাবা আকাশ’কে ডেকে নিয়ে বারান্দায় গেলেন। তাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। তিনি বললেন, তোমার দাদুর শরীরটা বেশী ভাল না। ডাক্তার বলেছেন নড়াচড়া কম করতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা ! চলে আসলেন এতটা পথ। ইদানীং এমন ছেলেমানুষী করেন যে বড় মায়া লাগে। আমাকে এসেই কয়েকবার বলে ফেলেছেন যে, ‘ সীমা রে। আমার বুঝি ডাক এসে যাবে। তোর বাবা কে দেখলাম সেদিন। আকাশে’র বিয়েটা একটু জলদি করে দিয়ে ফেলো বাবা।‘
আকাশ কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়লো।
মানুষ কেমন করে যে বুড়িয়ে যায় ? আশ্চর্য ! এখনও চোখে ভাসে ঐ দিনের ঘটনাটা-
...ম্যাচ নিয়ে দুষ্টামি করার জন্য দাদী কঞ্চি হাতে ওর পিছে পিছে দৌঁড়িয়েছিলেন এক তালা দোতালা’র সিড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে...। পরে এক সময় ক্লান্ত হয়ে গেলে চেচিঁয়ে বলেছিলেন, ‘কি বাসায় আসা লাগবে না? আইসো তখন...।’
আহ! এইতো সেদিনের কথা মনে হয়।
-হুম্ম। দীর্ঘশ্বাস বেরুলো বাপ-বেটা’র প্রায় এক সাথেই।
পরের দিন আকাশের বাসায় সব মুরুব্বীরা বসলেন। ভেন্যু গুলো সবাই তাদের বাসার কাছে ধারেই পছন্দ করলেন । এছাড়া কাবিন সংক্রান্ত আরও কিছু গম্ভীর কথাবার্তা চললো। তাদের প্রানবন্ত আলোচনার সারাংশ হচ্ছে অনেকটা এ রকম - মেয়ের হলুদ আর ছেলের হলুদ ২৩ আর ২৪ মার্চঃ রাওয়া ক্লাব, বিয়ে ২৬ মার্চঃ ফ্যালকন হল আর বৌভাত ২৮ মার্চঃ সেনাকুঞ্জ । সবই আল্লাহর ভরসায়।
আকাশের মা’র হাতে এখনও দু’সপ্তাহ রয়েছে। তবে তা একমাত্র ছেলের বিয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। আর তাই, তিনি কালবিলম্ব না করে পর দিন হতেই তার বান্ধবীকে নিয়ে সাঁড়াশি অভিযানে নেমে পড়লেন। তার বৌ মা’র জন্য সব আন্কমন আর সুন্দর জিনিষ গুলো তার চাই। ভেবেছিলেন কত ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দেবেন। এখন যে অবস্থা ! যাই হোক, তাই বলে তিনি দমে যাওয়ার মানুষ নন।
...পাঁচ দিনেই হৈ চৈ-বাসা-বাজার-শপিং মল ঘোরাঘুরি করে মোটামুটি তিনি সব কাজ গুছিয়ে ফেললেন। ঐ দিকে কার্ড ছাপানো আর দাওয়াতের ভার পড়লো আকাশ আর ওর বাবার। নিঁখুত টীম ওয়ার্কে সব কাজ পরিমিত ভাবে এগিয়ে চললো।
আকাশের একুশ দিনের ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। আগামী কাল ব্যাচেলর হিসেবে তার শেষ অফিস। এই খুশীতে হাল্কা একটা ব্যাচেলর পার্টিরও আয়োজন করা হবে।
অফিসের হীরা ভাইয়ের মতে, বিয়ের আগে আগে এই সময়টাই নাকি জীবনের সবচেয়ে মধুর! তাই কোন রাতই অপচয় করা ঠিক নয়। এই মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েই হয়তো রাতে খাওয়ার পর আকাশ নীলিমাকে ফোন করলো। টুকটাক আলাপ গড়ালো। এক পর্যায়ে নীলিমা আকাশকে একটা কবিতা শোনাতে বললো। তখন একটা শর্ত দেয়া হলো এই মর্মে যে নীলিমা যদি গান শোনায় তবে আকাশ কবিতা শোনাবে। প্রেমের জোয়ারে ভাসমান দুই বান্দাই চুক্তি পত্রে সাগ্রহে স্বাক্ষর করে দিল।
নীলিমা রবীন্দ্র সঙ্গীত করলো একটা। অপূর্ব দরদ ওর গলায়। আর আজ তা যেন পূর্নিমার জোয়ারে একেবারে ফুলে ফেঁপে রাতের নিস্তব্ধতাকে বিমূর্ত করে তুললো। গানটাও আকাশের প্রিয় গান গুলোর একটি-
‘আমারও পরাণ যাহা চায়-
তুমি তাই তুমি তাই গো।
আমারও পরাণ যাহা চায়-
তোমা ছাড়া আর এ জগতে
মোর কেহ নাই কিছু নাই গো
আমারও পরাণ যাহা চায়...।‘
আকাশ মন্ত্রমুগ্ধের শুনছিলো নীলিমার গান। শেষ হলে ছোট্ট করে খালি বললো- ‘অসাধারন'’।
-শুধু বাহবা দিলে পার পাওয়া যাবে না মশাই। কবিতা কই?
এত সুন্দর গান শোনার পর আর কোন কথা চলেনা। তাই আকাশ গুড বয়ের মত তার পছন্দের একটা কবিতা শুরু করলো। সৈয়দ শামসুল হকে’র ‘পরাণের গহীন ভিতর’ এর একটি কবিতা-
‘ সে কোন বাটিতে কও দিয়া এমন চুমুক-
নীল হয়া গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শ্রীল অবশ,
অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি কখনো সারুক।
আমার জানতে সাধ, ছিল কোন পাতার সে রস?
সে পাতা কি পানের পাতা মানুষের হিয়ার আকার?
নাকি সে আমের পাতা বড় কচি ঠোঁটের মতন?
অথবা বটের পাতা অবিকল মুখের গড়ন?
তুঁতের পাতা কি তয়, বিষ নিম, নাকি ধুতুরার/।
কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাস সীমানায়
আদাড় বাদার দিয়া অতিধোর গহীন ভিতরে,
কত না গাছের পাতা কতবার দিয়াছি জিহ্বায়,
এমন তো পড়ে নাই পানি এই পরানে, শিকড়ে।
তয় কি অচিন বৃক্ষ তুমি সেই ভূবনে আমার,
আমারে দিয়াছো ব্যাধি, নিরাময় অসম্ভব যার? ‘
আকাশের আবেগ জড়ানো ভরাট কন্ঠে কবিতাটা যেন প্রান পেয়ে গিয়েছিল।
আবৃতি শেষ হলে নীলিমা শুধু বললো- ‘চমৎকার'’।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


