আগের লেখাগুলো পড়তে চাইলে-
স্বপ্ন...১
স্বপ্ন...২
স্বপ্ন...৩
স্বপ্ন...৪
স্বপ্ন...৫
স্বপ্ন...৬
স্বপ্ন...৭
স্বপ্ন...৮
স্বপ্ন...নয়
স্বপ্ন...শেষ পর্ব
আজ ১৫ই মার্চ। সারা দিন হাল্কা মেজাজে অফিস চলেছে। আকাশ সব কাজ গুছিয়ে আনছে। ও ছুটিতে থাকাকালীন সময়ে হীরা অর কাজ গুলো দেখবে। বিকাল ৪’টার দিকে অফিসে আকাশের বাবা’র ফোন এলো। জানা গেল, দাদীর শরীরটা একটু বেশীই খারাপ। অফিসে সবার থেকে বিদায় নিয়ে আকাশ ছুটি করলো।
...অফিস থেকে ফিরেই দেখা গেল আজ বাড়িতে অনেক মেহমান। ভীড় ঠেলে এগোতেই মা’কে দেখা গেল। মা’কে দেখে আকাশ তার কাছে যেতেই তিনি আব্দারের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে এই তোর আসা হলো? আকাশ ভেবে পায়না আজকের দিনের বিশেষত্ব কোথায়! সে মনে মনে শুধালো -বিষয়টা কি? সে কোন উত্তর না পেয়ে ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে এগুলো। দরজা ঠেলে আকাশ রুমে ঢুকলো। কিন্তু, এ কি কান্ড! ওর রুমটা ফুলে ফুলে সাজানো। মিষ্টি একটা গন্ধ মৌ মৌ করছে। এসব ছাপিয়েও একটি বিষয় তাকে অস্থির করে তুললো- একজন বধূ বেশে তার বিছানায় বসে আছে। ...অবিশ্বাস্য ! আকাশ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। অফিস ফেরৎ আকাশ দেখে কাকতালীয় ভাবে তার স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিল। হায়, প্রকৃতি আমাদের নিয়ে কত খেলাই না খেলে !
...তাকে চমকে দিয়ে নীলিমা বললো, আমাকে একটু পানি দাও না প্লীজ। সম্বিত ফিরে পেয়ে টেবিলে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢাললো। নীলিমাকে সাবধানে পানির গ্লাসটা দিল সে। পানি খেয়ে পানির গ্লাসটা ওর হাতে দিয়ে নীলিমা বললো, ‘আকাশ, আমার প্রচন্ড নার্ভাস লাগছে। আব্বু বললো, তোমার দাদুর শরীর খুব খারাপ। দাদুর ইচ্ছা উনি হাসপাতালে যাবার আগে আমাদের বিয়েটা দেখে যেতে চান। এরপর সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজই বিয়ে পড়ানো হবে। কিছুক্ষনের মধ্যে কাজী সাহেব চলে আসবেন। ব্যাপারটার আকস্মিকতা আমি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি।‘
- হুম্ম। তারপর আকাশ জিজ্ঞেস করলো, 'আমার বাবা কই জানো? '
নীলিমা মাথা নেড়ে জানালো- সে জানে না।
বেরিয়ে যাবার আগে আকাশ ওকে বললো, ‘তুমি রিল্যাক্সড্ হয়ে বসো। আমি দেখি কাউকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।‘
বাবাকে পাওয়া গেল দাদীর ঘরে। মা’ও আছেন ওখানে।
আকাশকে দেখে দাদীর মুখে হাল্কা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। ও কাছে যেয়ে দাদীর কাছে বসলো। দাদী ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি দাদু ভাই, পাগরি পড়বা না?’
আকাশ হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে একটু হাসলো। দাদী আকাশের মুখে হাত বুলিয়ে ওর হাতে চুমু খেলেন। আকাশের খুব ভেতরে কোথাও একটা মোচড় খেয়ে উঠলো। ওর চিবুক বেয়ে চোখের পানিটা টপ করে নীচে পড়ে যাবার আগেই ও রুম থেকে বের হয়ে এল।
নিজের রুমে যেয়ে তৈরী হয়ে নিল ও।
খবর এলো কাজী সাহেব এসেছে।
রোবটের মত বাড়ীময় ঘুরছে অনেক মানুষ।
নিয়ম অনুযায়ী বিয়ে পড়ানো হলো।
সদ্য বিবাহিত বর-কনে কে দাদীর রুমে নেওয়া হলো। ওরা দাদীর কাছে যেয়ে ওনার পা ছুঁয়ে সালাম করলো। আকাশ দেখলো দারুন এক প্রশান্তি দাদীর চোখে মুখে। এই প্রিয় বৃদ্ধাকে এতটুকু শান্তি দিতে পারায়, আকাশ মনে মনে সবাইকে ধন্যবাদ দিল ।
ওদেরকে পাশে বসতে বললেন- বাবা। তারপর, নীলিমার হাতে একটা খাম দিলেন তিনি।
খামের উপরে কাঁপা হাতে লেখা-
‘চোখে চোখ
হাতে হাত
অন্তরে অন্তর
জনম জনম।‘
আকাশ খামটা খুললো। দেখা গেল, কক্সবাজার এ যাওয়ার জন্য দু'জনের ফুল প্যাকেজ প্রোগ্রাম। বাস ছাড়বে আজ রাতে কলাবাগান থেকে।
নিয়মিত আকাশের বাবা ফলমূল- এটা ওটা কিনতে হলে বাড়তি হাতখরচের জন্য কিছু টাকা পাঠাতেন। ঐ টাকা আর নিজের জমানো টাকা মিলিয়ে তিনি তার নাতির জন্য সুন্দর একটি উপহার বেছে নিয়েছেন। আকাশের জন্য পৃথিবীতে এর থেকে উপযুক্ত উপহার আর কি হতে পারে...?
আকাশ পরম শ্রদ্ধায় দাদীর কপালে একটা চুমু খেল।
নীলিমাও তাকে অনুসরন করলো।
আমাদের কাছের মানুষ গুলো এমন নিঃস্বার্থ ভাবে দিনের পর দিন আমাদেরকে পরম মায়ার জালে আবদ্ধ করে রাখেন। আর তাই হঠাৎ তাদের হারাবার ভয়ে আমারা বড্ড বিচলিত হয়ে পড়ি।
সবচেয়ে বিধ্বস্ত লাগছে আকাশের বাবাকে।
মাথার উপর থেকে ছায়া সরে যাবার ভাবী যন্ত্রনায় কাতর তিনি। ক্ষনে ক্ষনে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন তিনি। হাসান সাহেব ওনার সাথে সাথে আছেন সব সময়।
ঐ দিকে আকাশের মা কিঞ্চিৎ রান্নার আয়োজন করেছিলেন। এরপর বাড়ীতে আগত মেহমানদের আপ্যায়ন করা হলো।
সময় ঘনিয়ে এলো, বাস ছাড়বার।
আকাশ একবার বাবাকে প্রশ্ন করেছিল যে, এসময়ে না গেলে হয়না ? উত্তরে তিনি তার মা’র এই ইচ্ছার কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন।
তাই সময় হলে দাদী, দুই বাবা মা আর আত্মীয় স্বজনদের থেকে বিদায় নিয়ে ওরা বাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ওরা বের হওয়ার সাথে সাথে আকাশের বাবা হাসপাতালে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স আসতে বললেন।
হাসপাতালে স্পেশাল কেবিনে শুয়ে আকাশের দাদী একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন। তাই দেখে সবাই আশান্বিত হলেন।
কিন্তু ,এ সময় ডাক্তার সবাইকে বাইরে চলে যেতে বললেন।
সবাই বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে ডাক্তার আকাশের বাবাকে থাকতে বললেন।
-জ্বী, ডাক্তার সাহেব?
-আপনি আপনার মা’র কাছে থাকুন।
সীমান্ত চৌধুরী তার মা’র মাথার কাছে বসলেন। নাকে মুখে নল ঢুকানো আছে কয়েকটি। মনিটর স্ক্রীনে হার্টবিটের সাথে সাথে লাইন গুলো থেকে থেকে উঠা নামা করছে।
উনি ঘড়ি দেখলেন - ১০টা ২৮ বাজে।
কিছুক্ষনের মধ্যে হয়তো বা আকাশ'দের বাসটা ছেড়ে দিবে।
এমন সময় সাগরিকা চৌধুরী কেবিনে ঢুকলেন। তিনি এসে আকাশের বাবার পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, ওদের বাসটা বুঝি এখনই ছাড়বে।
উত্তরে- আকাশের বাবা একটু মাথা নাড়লেন।
এরপর দুজনই এক পলকে আকাশের দাদীর দিকে চেয়ে রইলেন।
খানিক বাদে আকাশের বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
‘ সাগর আমার চশমাটা কই?’
আকাশের মা দেখলেন, উনি চশমা পড়েই আছেন। বোধকরি, ওনার চোখদুটি ঝাপসা হয়ে গেছে!
তিনি পরম উষ্ণতায় আকাশের বাবা'র হাত দুটি শক্ত করে ধরে, বিছানার পাশে ঠাঁই দঁড়িয়ে রইলেন...।।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


