somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পতিতা - ২য় পর্ব

১৮ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ৩:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

( এই গল্পটার প্রথম পর্বটা মুছে ফেলেছি অথবা ড্রাফট করা আছে । ভুলে গেছি । ক্ষমা চাওয়ার মুড নেই কারন জানি কিছু অপরাধ আমি নিজেও ক্ষমা করি না । আর গালি আছে , পড়ার আগেই সাবধান)

ঘুরে দাঁড়াতে ঠিক ১০ মিলি সেকেন্ড নেয় মেয়েটা , হাতে উদ্যত সার্জিকাল ছুরি । এত রাতে তার নিজের হাসপাতালে নিজের ওয়ার্ডে কোন অসুস্থ হারামজাদার হাতে সে নিজেকে তছনছ হতে দেবে না । কিছুতেই না । উত্তেজনায় বুক নামে ওঠে হাপরের মত । এক পা একটু পিছিয়ে পুরো শরীরে পাকানো স্প্রিং এর মত শক্তি খেলে যায় ; চিতাবাঘিনীর পশুত্ব ভর করেছে মিষ্টি মেয়েটার ভেতরে । স্কার্ফের ভিতরে মাথা , গলা , বুক , পিঠ ভিজে যেতে থাকে ঘামে ।

এক এক করে সেকেন্ড গুলো পার হয় । রিয়া অপেক্ষা করছে যেই আক্রমনের সেইটা আসে না । সেকেন্ড থেকে মিনিট , কই? এতক্ষণে রিয়ার খেয়াল হয় ছেলেটা কাছেও আসেনি , ছুরি দেখে ভয়ে সরেও যায়নি । আগের জায়গাতেই ,বিছানায় বসে থর থর করে কাঁপছে । ঠোঁটের ফাকে শব্দ গুলো অনেক বেশি অস্পষ্ট । রিয়া খুব সাবধানে একটু পিছিয়ে কান পাতে । ক্রোধ আর ভয়ের এড্রেনালিনের প্রভাব থিতিয়ে এলে নিজের শ্বাসের শব্দ ভেদ করে ভেসে আসে এক অপার্থিব আশংকা ।

"আই এম স্কেয়ার্ড । প্লিজ ডোন্ট লিভ মি। প্লিজ । প্লিজ । প্লিজ । আই ডোন্ট ওয়ানা ডায় । একটু থাকো আমার কাছে । কেউ থাকে না । না আব্বু ।না আম্মু । না ইমা । কেউ থাকেনি। তুমি একটু থাকো না । আমার ভয় লাগছে । এই ঘরটা এত অন্ধকার কেন ? কফিন এর মত লাগে । "

পরের অংশটুকু হারিয়ে যায় একটা কোমল অথচ তীব্র ফোঁপানির তলায় । রিয়ার শরীরের পাক গুলো খসে যেতে থাকে দ্রুত । একটু আগেই যাকে মনে হচ্ছিলো নোংরা , ঘাতক শিকারী , এখন তার চোখে জল দেখে রিয়া একটু থতমত খেয়ে যায় । কাঁদে কেন? এই বয়সের ছেলেরা কাঁদে নাকি ! কি ধরনের গাড়ল এইটা । এই যে আব্বু ওকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে একটা লুইচ্চার সাথে , সে কি কেঁদেছে একদিনও ?

জামির কথা মনে পড়তেই ওর গা গুলিয়ে বমি আসে । একটু আগের পাশবিক শক্তির প্রভাব সরে গিয়ে হঠাৎই যেন হাটু দুটো দুর্বল লাগতে থাকে । প্রফের পড়া পড়তে গিয়ে ওর সারাদিন খাওয়া হয় নাই , মনে পড়ে । মাথার ভিতর ঝিম ঝিম করছে কেন , ধুর ! রিয়া ছেলেটার উপর থেকে চোখ সরায় না । এক পা এক পা করে পিছিয়ে গিয়ে খাবার রাখার লোহার টেবিলের উপর বসে পড়ে । বুকের ভেতর এখনো কেমন যেন করছে । জামিকে কি ওর বিয়ে করতেই হবে ? মুক্তি নাই ? পীর বংশের ছেলে বাইরে পড়তে গিয়ে কি কি ফান করে এসেছে , এই কথা রিয়া জানলেও বাড়ির কাউকে সে বিশ্বাস করাবে কি করে ?

সারা সন্ধ্যার কুরে কুরে খাওয়া চিন্তা গুলো আবার গ্রাস করার আগেই রিয়া জোর করে নিজেকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে । বুকের তলার ব্যথাটাকে আমল না দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ছেলেটাকে ডাকে রিয়া । জিজ্ঞেস করে ,কি হয়েছে তার , এমন কাঁদছে কেন ? কোন জবাব আসে না । রিয়া চোখ ঘুরিয়ে ঘরটাকে খেয়াল করার চেষ্টা করে । ঢাকা মেডিকেলের কেবিন । দেয়ালে মাছের মরা চোখের মত সাদাটে দেয়াল ঘেষে ময়লা আসবাব । বিছানা বালিশ থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গলিত লাশের গন্ধ ভেসে আসে আর বাতাসটাকে মনে করিয়ে দেয় - মুক্তি নাই । এখান থেকে কেউ ফেরে না, ফিরবে না । মাকড়শার জাল আর ধুলি ধুসরিত জানালার বাইরে একটা আকাশ আছে কিনা , কেউ কি বলতে পারে ?

রিয়া আরেক বার নিজেকে শক্ত করে ।কি সব হাবিজাবি ভাবছে । ভালো করে দেখে ছেলেটাকে । কত বয়স হবে ? ১৯ কি ২০ । এই আধো আলো ছায়াতেও বোঝা যাচ্ছে গায়ের দুধে হলুদ রঙ । হাত বাড়িয়ে আলোটা জ্বালে রিয়া । বিছানার উপরে গুটি সুঁটি মেরে লিকলিকে শরীরটাকে যেন আরো ছোট করে ফেলেছে । ছেলেটা বয়সের তুলনায় প্রচন্ড শুকনা । পুরানো বিস্কিট রঙের টি শার্ট আর ছাই রঙা পাজামা পরে আরো বাচ্চা বাচ্চা লাগছে ।

"এই ছেলে , কি নাম তোমার ?"
একটু আগেই , অন্ধকারে যাকে মনে হচ্ছিলো "পুরুষ শুয়োর" , তার এই হেন "শিশু" অবয়ব দেখে রিয়ার কন্ঠে মুহূর্তে প্রভুত্ব ভর করে । ছেলেটা এবারও জবাব দেয় না । মুখ তুলে তাকায় শুধু । টকটকে ফর্সা গাল আর নাকের ডগাটা লালচে হয়ে আছে । নাক দিয়ে সিন্নি গড়াচ্ছে ।কান্নার গমকে ফুলের ঝাড়ুর মত লম্বা লম্বা পাপড়ি গুলো গালের সাথে জড়িয়ে মড়িয়ে একটা কান্ড হচ্ছে বার বার । রিয়া হা করে তাকিয়ে থাকে । এই ময়লা নোংরা কেবিন , পাশের পায়খানা থেকে ভেসে আসা তীব্র পুঁতিময় গন্ধ , গায়ের কোকড়া মোকড়া শার্ট ,নিতান্ত বিরক্তিকর কান্নাকাটি ছাপিয়ে একটা স্বর্গীয় সুন্দর মুখ ওর দিকে অসহায় তাকিয়ে । এত সুন্দর ! ছেলেটাকে এখানে নয় , কোন রুপকথার রাজপুত্র হিসেবে বেশি মানাত । এইখানে এমন নিষ্পাপ পাগল করা সুন্দর বড় বেশি বেমানান ।

রিয়া ঘাড় কাত করে দেখে হিমকে । চৌধুরী হিমেল সামদানী । এই বিরাট ভারিক্কি নামটা এই পিচকি রাজপুত্রের ? পেশেন্ট ফাইলটা ঘাটতে গিয়ে রিয়া ফিক করে হেসে ফেলে ।ওর হাসি মুখ দেখে মনে হয় ছেলেটার একটু সাহস হয় । ফিস ফিস করে আরেক বার ওকে ২০০ বার বলে ফেলা কথাটাই বলে আবার ," তুমি আমার সাথে একটু থাকবে ? আমার খুব ভয় লাগছে । " রিয়া বেশ অবাক হয় ।

"তুমি কি অন্ধকারকে ভয় পাও ? " ছেলেটা আবার শুয়ে পড়ে বিছানায় । ক্লান্ত , পরিশ্রান্ত ,চোয়াল ভাঙা গাল গুলোর উপরে ভীষন তীব্র আর সুন্দর টানা টানা চোখ দুটো বুজে আসে । রিয়া চমকে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায় , "কি হলো ?"

"খারাপ লাগছে । আই এম সো ড্যাম টায়ার্ড দিজ ডেস ।সো টায়ার্ড । " আস্তে মিলিয়ে যায় ছেলেটার কন্ঠ । এলো মেলো ভাবে বুকটা উঠা নামা করে । শার্টের উপর তেল,ঝোলের দাগ। এক জঙলা চুল ঝপাত করে মুখটাকে ঢেকে নেয় অমাবস্যার মেঘের মত । এতক্ষনে রিয়ার খেয়াল হয় , ছেলেটা ফর্সা নয় ,ওর শরীরে কোন রক্ত নেই মনে হয় , সেই রকম ফ্যাকাশে । মায়ের পেটে যেমন , সেই রকম দ হয়ে শুয়ে থাকা লিকলিকে ছেলেটাকে দেখে মায়াই হয় ।কি হয়েছে এর? ফাইলটা আবার খুলে পড়তে শুরু করে রিয়া । দ্বিতীয় পাতায় লেখা কথা গুলোর জন্য ও মোটেই তৈরী ছিলো না । একটুও না ।
৩৪টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×