আমি খুব সাধারন এক জন ব্যক্তি । একজন মানুষ লিখলাম না , কারন মানুষ হওয়ার জন্য যেই সব গুণাগুণ ( হ্যাঁ , অগুণ থাকাটাও জরুরী) আজকাল দরকার পড়ে , আমি তার বেশির ভাগই অর্জন করতে পারি নাই । নিজের ক্ষতি হবে জেনেও সত্যি কথা বলে ফেলি এবং যথা জায়গায় স্নেহ জাতীয় পদার্থ এখনো লাগাতে পারি না । আবার , আমি এমনই আবাল গোঁয়ার , লাইন ম্যানকে ঘুষ দেব না বলে মাসের পর মাস ডেড টেলিফোন নিয়ে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকি । ঠিকই ধরেছেন , শ্রেনীবিন্যাসে আমি হয়ত বুদ্ধিমানের কাতারে কোন কালেই পড়তে পারবো না । তাই আমার দেখার চোখ গুলোও খুব সাধারন, শিশুসুলভ বটে !
সেই শিশু চোখে দেখা দু' একটা কথা আপনাদের সাথে ভাগ করে নেই ।
আপনারা কেউ কি গাড়ির ড্রাইভার নিয়ে কাজ করেছেন কখনো ? ড্রাইভার রাখা হলো । তারপর থেকে শুরু হলো যন্ত্রনা , তেল চুরির । বেতন বাড়িয়ে , খাবার দিয়ে , খাবারের টাকা দিয়ে , বোনাস ভাতা কোন ভাবেই ঠেকানো যায় না । চুরি সে করবেই । আমার বন্ধুর অভিজ্ঞতা বেশ জটিল । নানান রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চুরি , ফাঁকিবাজি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে পরে ড্রাইভারকে বাসায় রাখা হলো । খাওয়া , থাকা সব খরচ দিয়ে । দেখা গেলো দুই দিন পর তার তিন জোড়া জুতা , দিনে ৫ বার গোসল করা লাগে , দুই তিনবার কাপড় বদলানো লাগে , সকাল -দুপুর , দুপুর - বিকাল , সন্ধ্যা -রাত -- তিনবার ঘুমিয়ে সে হয়রান থাকে এবং তারপর তার হাতে খুব ব্যথা করে । কেন? না মানে , স্টিয়ারিং ডানে আর বামে ঘুরাতে হাত কাজ করে তো , তাই তার মাসলে ব্যথা করে । একদিন নামায পড়তে গিয়ে এক পিচকিকে ধরে নিয়ে আসলো তার নিজের ফাই ফরমাশ খাটার জন্য । যখন জিজ্ঞেস করা হলো ,তোমার রান্না , কাপড় ধোয়া , ঘর পরিষ্কার সবই যখন কাজের লোক করে দেয় , কি ফাই ফরমাশ খাটা দরকার ? উত্তরটা শুনুন , " এই মোড়ের দোকান থেকে এটা ওটা (সিগারেট) এনে দিলো , হাত পা ব্যথা করলে টিপে দিলো , মানে ড্রাইভিং তো অনেক কষ্টের কাজ।"
সেই বড় লাটকে বিদায় করে রাখা হলো এক বুড়ো ড্রাইভারকে , ছেলে মেয়ে সব যে যার মত সেটেল্ড , সুতরাং চুরি করা লাগবে না , এই ভেবে ।বলা হলো , "দরকার হলেই টাকা চেয়ে নিবে কিন্তু তেল চুরি করবে না "। হা হতিশ্মি ! (বানানটা বোধ হয় ভুল হলো) সে বলে , "স্যার ,কিছু মনে করবেন না , চুরি আমি করবোই । আপনি ডাবল বেতন দিলেও করবোই , এইটা আমাদের পেশাগত নীতি । মান ইজ্জতের ব্যাপার ।ড্রাইভার তেল চুরি করতে না পারলে রাতে ঘুম হবে না ।" ডেল্টা হাসপাতালে একবার ধরা পড়লো , সুঁই গরম করে কভার ফুটো করে সেই ফুটো দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাইলেজ বেশি দেখানো আর চুরির ঘটনা। মাশাল্লাহ!
ড্রাইভার নিয়ে আরো অনেক গল্প পাওয়া যাবে । পরের গল্প গুলো যারা ঢাকায় একলা থাকেন (পুরুষ) অথবা নারীকুল বুঝবেন । কাজের লোকের চুরি । কেউ জিনিস পত্র মারবে , কেউ তেল সাবান কাপড় । সুযোগ পেলে গয়না গাটি । কিন্তু , যেই একটা জিনিস প্রতিটা বুয়া চুরি করবেই করবে ,তা হলো খাবার । হয় রান্না করা খাবার হঠাৎ অর্ধেক হয়ে যাবে নয়ত এক কেজি বিড়াল খুঁজে পাওয়া যাবে না । আঁচলের খুটে কিংবা তলপেটে আলু, পটল ,পিয়াজ রসুন অথবা ময়লার প্যাকেটে করে মাছ মাংস --- এই এত বছরে কত কাহিনী যে দেখলাম , কত রকম চুরি যে ধরলাম - ইয়ত্তা নাই । যতই তাকে বলি , চাইলেই পাবা , চুরি কোরো না।কিংবা বাক্স ভরে ভরে খাবার দিয়ে দেই ছেলে , মেয়ে , এমন কি স্বামীর জন্যও । লাভ নেই । চুরি করবেই ।
৪০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে , শেষ পর্যন্ত আমার এক আত্মীয় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হয়েছেন ঃ চুরির ব্যাপারে -- ড্রাইভার , কাজের লোক আর দারোয়ান - এই তিন শ্রেনীকে কোন দিনই সংশোধন বা কন্ট্রোল করা সম্ভব না । খারাপ লাগে , কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার কারনে মেনে নিতে বাধ্য হই এমন উক্তি । অধুনা , এই তিন শ্রেনীর সাথে রাজনীতিবিদের শ্রেনীটা যোগ করে দিতে চাই । আপনারা রাজি?
এখন একটা আয়াত নাযিল হইলে হয়ত এই রকম হইতো , "ইহুদী এবং বাঙ্গালী রাজনীতিবিদরা হইলো অভিশপ্ত জাতি । ইহাদের সংশোধন সম্ভব না । "
২০০৫ সাল । আমার পা আর কোন দিন ভালো হবে না বলে দিয়ে আমাদের অর্ধ পথিক ( অরথোপেডিক) রা খালাস । ভগ্ন মনে ফেরত গেছি সাভারের এক গ্রামে (আধা গ্রাম আধা শহর) যেখানে আমার কোর্সের অংশ হিসেবে প্রতিদিন যেতে হয় । কোন রকমে হুইল চেয়ারে , ক্রাচে ভর দিয়ে ঠেকার কাজ চালাই । ওষুধ খেতে ৩০ মিনিট দেরী হলে যেই ব্যথা শুরু হয় মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাবো । কাছে ধারে চিকিৎসা বলতে বাজারের ওষুধের দোকান কিংবা বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বাজারে কোন ডাক্তার নেই , ওষুধের অশিক্ষিত কিংবা পশু চিকিৎসায় ট্রেনিং প্রাপ্ত দোকানদারই ডাক্তার । ( ঠিকই তো , ৯০% ওষুধের ক্রেতা হলো গার্মেন্টের শ্রমিক , ওরা আবার মানুষ নাকি?)
জন স্বাস্থ্য নিয়ে পড়ালেখা করি । প্রতিদিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তালাবন্ধ কয়েক রুমের লাল ইটের বাড়িটাকে দেখি । এইটার নাম আমরা দিয়েছিলাম "ভুতুরে বাড়ি" । (দা ঘোস্ট হাউস ) । পুরো ছয় মাসে একদিনও ডাক্তার সাহেব বা সাহেবান আসেন নাই । ফোর্থ ক্লাস কর্মচারী কমপ্লেক্সের পিছনে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। সরকারী বরাদ্দের ওষুধ গ্রামের লোকের কাছে "ডাক্তার হিসেবে" বিক্রি করেন। সাথে কবিরাজি ও টোটকা চিকিৎসাতেও তিনি পারদর্শী । বাতাস লাগার কারনেই আমি পঙ্গু হয়ে গেছি , এক বুড়ি মা বললেন যিনি এসেছেন নাতির "বাতাস লাগা " সারাতে সুতা পড়া ও তাবিজ নিতে । আমার তরুন কলিগ পরে জানালেন , প্রয়োজনে তরুন , অবিবাহিত যুবকদের মালিশও এই জনপ্রিয় ডাক্তার সরবরাহ করেন । ( একই অঙ্গে এত রুপ ?!!!!) পোস্টিং এর এম বি বি এস এই সব দেখবেন না , কারন মাসের পর মাস কামাই করে ঢাকার প্রাইভেট চালাতে চোরের সাক্ষী গাঁটকাটাকে তো তার দরকার । তা ,দুই দলেরই সাহস আছে বলতে হবে , কারন তারা রাজনীতি দ্বারা সংরক্ষিত ।
কত দুরের গল্প এটা ? আশুলিয়া থেকে ২০ মিনিট , ঢাকা থেকে ৪০ ।
বাংলাদেশ সরকারের হেলথ সেক্টরাল প্রোগ্রাম ( এইচ এস পি) আর এইচ এন এস পি , কোটি কোটি কোটি ডলারের খেলা । আমাদের রাজনীতিবিদেরা "বিদেশ যেতে হবে না'র" দোহাই পেড়ে আমাদের মাথার উপর এই ঋণের বোঝা বসিয়ে দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে ।
বিদেশে যেতে হবে না বলেই ঢাকায় বিদেশী হাসপাতাল আর দেশী পাঁচ তারকা হাসপাতাল গুলো হাজার হাজার ,লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করছে । প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ গুলা ছাত্রের মাংস কেটে বেতন , ফি নিচ্ছে ।
তাহলে বেঈমান , বেজন্মা , রক্তচোষা রাজনীতিবিদ গুলার চিকিৎসা একটাও দেশে সম্ভব না কেন? এত গুলি ডাক্তার , এত হাসপাতাল , এত সব " আমার দেশের সোনার ছেলেরা " আছে কি সব দেশের সোনা চুষতে ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

