২৮ শে অক্টোবর ২০০৬ এ একটা ঘটনা ঘটে । লগি বৈঠা তথা লাঠি নিয়ে একদল লোক অন্য একটা দলের লোকের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করে । আপাত দৃষ্টিতে ঘটনাটা বিবেককে ধাক্কা দেয় ভীষণ । আমাকেও দেয় । বাংলাদেশে হত্যার ঘটনা , মানে একজনকে হত্যার ঘটনা , এমন কি কয়েক জন মিলে একজনকে হত্যার ঘটনা মোটেই নতুন কিছু নয় । রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশে জন্মের শুরু থেকে এরকম হত্যা প্রচুর হয়ে আসছে । কখনো , পূর্ব পাকিস্তান বনাম পশ্চিম পাকিস্তান, কখনো পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ , কখনো পাকিস্তানপ্রেমী রাজাকার বনাম দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী , কখনো সামরিক বাহিনী বনাম অসামরিক জনগণ , সামরিক ব্যারাকের রাজিনীতি বনাম অসামরিক পক্ষের রাজনীতি , আর পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ , বি এন পি, জাতীয় পার্টি , জামায়াত ইসলামী - নানা পক্ষ বিপক্ষের হত্যাকান্ড শুনে ও পড়ে আমরা অভ্যস্ত । নতুন করে ধাক্কা খাওয়ার বা বিবেকে নাড়া খাওয়ার সম্ভাবনা নাই তেমন। যদি না কেউ ধাক্কা খাওয়াতে উঠে পড়ে লাগে ।
জামায়াত শিবিরের বর্তমান কর্মকান্ডে এই ধাক্কা দেওয়ার একটা চেষ্টা আমরা গত তিন বছর ধরে শুনে আসছি । " এই নৃশংসতা , এই বর্বরতা , এই মায়ের বুক খালি করা" ইত্যাদি।অনেকেই বিরক্ত হয়ে লাথি দেওয়া শুরু করেছেন । আমিও দিয়েছি ২৮ এর রাতে । কিন্তু পরে আমার একটা কথা মনে হইলো । আমরা কি কোন কিছু বুঝতে ভুল করছি ?
মানে , সারা বিশ্বে ভিডিও প্রচার করে " আওয়ামী বর্বরতা" বলে প্রচার করলেও এইটা তো রাজনৈতিক হত্যার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ। তাই নয় কি? এতদিন তো জামায়াতের মুখে রাজনৈতিক হত্যার প্রতিবাদ বা বিচার চাওয়ার কোন নমুনা দেখিনি ! কতকিছুই তো তখন ভেবেছি! ভেবেছি , জামায়াত শিবির বাংলাদেশ জন্মের লগ্নে ১৯৭১ থেকেই তাদের ইসলামী ছাত্র সংঘ ( বর্তমানে নাম পালটে ছাত্র শিবির ) , রাজাকার, আল বদর, আল শামস , শান্তি কমিটি এর লোক জনের মাধ্যমে মীরজাফর এর মতন দেশের সাথে গাদ্দারি করে , কওমের সাথে বেঈমানি করে প্রায় ৩০ লাখ হত্যার সাথে জড়িত । তাই বিচার চায় না । ভেবেছি , এই জামাত শিবির রাজশাহী , চট্টগ্রামে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের ছাত্রদের হত্যার সাথে জড়িত । তাই রাজনৈতিক হত্যার প্রতিবাদ করে না, বিচার চায় না । এরা ১৯৭১ এ ২ লাখ ধর্ষনের সাথে জড়িত । তাই এই বাংলাদেশে প্রতিদিন যত ধর্ষন এর ঘটনা ঘটে , কত মুসলিম মা - বোন- কন্যা এই পাশবিকতার শিকার হয়ে হয় খুন হন বা আত্মহত্যা ( এইটাও এক রকম খুনই) করেন , তবু জামায়াত শিবির কখনো তার মুসলিম মা - বোনের ধর্ষনের বিচার চেয়ে রাজপথে মিছিল করে না । আমার চোখে পড়ে নাই আর কি ।
আজকে তাদের আমূল পরিবর্তন দেখে আমি লাফিয়ে উঠি । তারপর আতিপাতি করে খুঁজি , " জামায়াত কি মামলা করেছে ?" ওদের লেখায়, ওদের ভিডিওতে খুঁজি, পাই না!
তাইলে যে কথায় কথায় বলে , " জামায়াত শিবির যদি হত্যার সাথে জড়িত থাকে তো যান, আদালতে গিয়ে মামলা করেন। ব্লগে এসে লাশের রাজনীতি করেন কেন? একটা মানুশ মারা গেছে , তার লাশ নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করেন।" এই কথা কতবার যে পড়েছি এই ব্লগে । এইটা ত মাত্র একটা হত্যা । ৩০ লাখ মানুষ এর হত্যা নিয়ে যখন প্রতিবাদ চলে, তখনও সেই একই কথা শুনেছি । আমি আঁতিপাতি করে খুজি , তাহলে কি জামায়াত ২৮শে অক্টোবরের পরে ৩০ লাখ হত্যার বিচারও চাইছে ? ১ টা হত্যা অপরাধ হইলে ৩০ লাখ হত্যা নিশ্চয়ই অপরাধ? ১ জনের হত্যার প্রতিবাদের যদি ইন্টারনেট ভরে যায় ভিডিও প্রতিবাদে , তাহলে আমরা যখন ৩০ লাখ হত্যার প্রতিবাদ করবো , জামায়াত শিবির কি আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে ভিডিও আপলোড করবে ? কন্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করবে যারা জড়িত তাদের শাস্তি চাই?
জামায়াত শিবির নিজে যদি জড়িত নাই থাকে এই ৩০ লাখ হত্যা, ২ লাখ ধর্ষন , ১৫ই অগাস্টের হত্যা , জেলে চার নেতার হত্যা , জিয়া হত্যা , সামরিক বাহিনীর ক্যু জনিত হত্যা , জেএমবির নাম নিয়ে হত্যা , উদিচি ও রমনার হত্যা, নির্বাচনের পরে হিন্দু ধর্ষন -- এই রকম সকল অন্যায় জুলুম এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে নিশ্চয়ই ? এই সব জুলুমের প্রতিবাদ করে ভিডিও আপলোড করবে নিশ্চয়ই ? সারা বিশ্বের কাছে ১ জন হত্যা ও ৩০ লাখ হত্যা - সবটারই বিচার ও প্রতিকার চেয়ে আবেদন করবে নিশ্চয়ই ?
জামায়াত শিবির জড়িত ছিলো কি ছিলো না , এইটা নিয়ে ৭১ এর পরে জন্মানো যারা জামায়াত শিবির করেন, ইসলামী দল ভেবে ইসলামী শাসন কায়েমের জন্য দল করেন , তারা এইটুকু তো জানেন যে বিনা রক্তপাতে কোন যুদ্ধ হয় না? মোহাম্মদ (সাঃ) ও জীবনে অনেক যুদ্ধ করেছেন ও তাতে অনেক মুসলিম শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৭১ এর যুদ্ধেও এমন লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন । কে জড়িত ছিলো , সেইটা না জেনেও তো প্রতিবাদ করা যায় , যায় না? হত্যা যে হয়েছিল, এইটাত তো শিওর? আসেন তাহলে , সেই অজ্ঞাতনামা হত্যাকারীদেরই বিচার চাই ! আপনার তো কিছু হবে না । আপনি তো আর কাউকে হত্যা করেন নাই, তাই না?
এই পরিবর্তন যতদিন না দেখছি আমরা ততদিন লাত্থি খেতেই হবে । প্রতি বছর ২৮শে অক্টোবর লাথি চলবে । ৩০ লাখ হত্যা, ২ লাখ ধর্ষন , ১ কোটি উদবাস্তুর কান্নায় যাদের মনে ব্যথা লাগে না , তাদেরকে হঠাৎ ১ জনের হত্যা নিয়ে কানতে দেখলে আমরা তাদেরকে বিশ্বাস করতে পারি না । "সাপের মতন মনে হয়"। তাই, "সাপের উপযুক্ত শাস্তিই তাদের দেওয়া হয়।"
বাংলাদেশের ঘটে যাওয়া যুদ্ধাপরাধ ও সকল রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের , রাজনৈতিক ধর্ষন, লুট পাট এর প্রতিবাদ ও বিচার চাইতে গেলে আরেকটা কথা প্রায়ই শুনি । আগে কেন বিচার হয়নি? আগে কেন বিচার করেন নি ? আগে কেন চাননি ?
আপনারা যেমন বলেন না , " ১৯৭১ এ তো জন্মই হয়নি , তাহলে রাজাকার হইলো কি করে? " । সেই রকম আমরাও , মানে আমার প্রজন্মও ১৯৭১ এর পরে জন্মেছে । তাই এতদিন বিচার করার জন্য বড় হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম । ছোটবেলাতেও মনে মনে চেয়েছি, মুখে বলেছি তবে কাজে করে দেখানোর জন্য যেই ভোটটা দেওয়া লাগে , ওইটার জন্য ১৮ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যেই আইনটা লাগে , সেইটা শিখতে পড়ালেখা করতে হয়েছে । যেই টাকাটা লাগে সেই টাকা যোগাড়ে উপার্জনক্ষম হতে হয়েছে । এই জন্য সময় লেগেছে । এখন সময় হয়েছে , ভোট-শিক্ষা-টাকার যোগাড় হয়েছে , এইবার মামলা সহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে ।
আপনি যেহেতু রাজাকার না , আসেন , এই বিচার ও শাস্তির কাজে আপনিও সামিল হোন। আল্লাহ বলেছেন জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, এই লড়াই এ সামিল হোন।
আরেকটা কথা প্রায়ই শুনি , ওমুকে ক্ষমতায় ছিলো , তমুকে বিচার করতে পারতো , করে নাই কেন? আমাদের আগের প্রজন্ম অর্থাৎ যেই প্রজন্মে আমাদের সকলের বাপ মা , আত্মীয় মুরুব্বিরা আছেন , তাদের প্রতি একটা রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা আমাদের মনে তৈরী করার একটা চেষ্টা চলে ।
এইটার উত্তর হলো, দুনিয়াতে সকল প্রজন্মের একটা দায়িত্ব থাকে । ১৯৪৭ সালের প্রজন্ম যারা তরুণ ছিলো , তাদের বাপ মা বৃটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটা শক্ত জমিন তৈরী করে দিয়েছিলো । তার উপরে ভিত্তি করে ছেলেমেয়েরা স্বাধীনতা এনেছিলো । পাকিস্তান হয়েছিলো । বৃটিশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে লেগেছিলো ২০০ বছর । তারপর সেই অন্যায় যখন পশ্চিম পাকিস্তান নিজে করা শুরু করলো , সেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে লেগেছে ২৩ বছর । যুদ্ধ করেছে ১৯৪৭ এ যারা তরুন ছিলেন তাদের ছেলে মেয়েরা , মানে আমাদের বাপ মা । আর তারপর সেই একই রকম অন্যায় যখন করতেই থাকলো নামে বাংলাদেশী আসলে পাকিপ্রেমী কিংবা দেশবিরোধী কুলাঙ্গার এর দল , তখন এর বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে লেগেছে ৩৮ বছর । এদেশের এক একটা প্রজন্ম এক একটা বড় কাজ করেছে । একটা প্রজন্মের পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব না । প্রতিটা দেশপ্রেমিকের একটাই স্বপ্ন । একটা দেশ যেখানে প্রতিটা নাগরিক একই রকম সুযোগ ও সুবিধা নিয়ে খেয়ে পরে , নিজের বাড়িতে , সুস্থ অবস্থায় একটা শান্তিময় জীবন কাটিয়ে যেতে পারবে ।
সেইটার প্রথম ধাপ - বিদেশী শত্রু তাড়িয়ে স্বাধীনতা অর্জন । এইটা আমাদের দেশপ্রেমিক বাপ মায়ের প্রজন্ম করে গেছে ।
দ্বিতীয় ধাপ - দেশের ভিতর থেকে দেশ ও রাষ্ট্রবিরোধী শত্রু গুলোকে তাড়ানো
এইটা আমাদের প্রজন্মের কাজ । সেই কাজ আমরা হাতে নিয়েছি ।
তৃতীয় ধাপ - একটা বাই দা পিপল, ফর দা পিপল, অফ দা পিপল রাষ্ট্রযন্ত্র , শাসন ও বিচার ব্যবস্থা , শিক্ষা-উপার্জন-সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করা । এইটা আমাদের ছেলেমেয়েরা করবে।
শেষে আবারো ২৮শে অক্টোবর । ২৫শে মার্চ ১৯৭১ থেকে শুরু করে আজকে পর্যন্ত অনেক অনেক দেশপ্রেমিক বাংগালী হত্যা হয়েছে । ধর্ষন হয়েছে । লুটপাট হয়েছে। এতদিন আমরা ছোট ছিলাম । পালটা মারতে পারিনি । আমাদের বাবা মা তো ৭১ এই মেরেছে । ভেবেছিলো, এ দেশীয় শত্রু যে কয়টা বেঁচে গেছে, তারা মনে হয় পালিয়ে যাবে, নয়ত তওবা করে ভালো হয়ে যাবে । আমাদের বাপ মায়ের ভুল ভেঙেছে । আমরাও বড় হয়েছি । এখন পালটা মাইর শুরু হতে যাচ্ছে আবার । এতদিন পড়ে পড়ে মার খেয়েছি, বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রতিবাদ করেছি, আর ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়েছি। ২৮শে অক্টোবর আসলেই কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা না । বৃটিশ আমলে ১টা /২ টা করেই বৃটিশ সাপ মারা শুরু হয়েছিলো । ২৬শে মার্চ ১৯৭১ থেকে ১টা/২টা করেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর এদেশীয় রাজাকার সাপ মারা শুরু হয়েছিলো । ২৮শে অক্টোবর ২০০৬ থেকে ১টা জামায়াত শিবির সাপ মারা শুরু হইলো । সব সাপ কি আর একবারে মারা যায়? ১টা দিয়ে শুরু হইলো মাত্র ।
এইটা হুমকি না । এইটা প্রতিজ্ঞা ।
ইটস নট এ থ্রেট , ইট ইজ এ প্রমিস !
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



