১.
ধর্ম আসলেই কি আফিম? ধর্ম কি আসলেই নিপীড়িতের একমাত্র আশ্রয়? ধর্ম কি আসলেই অজানা ভয়ের একটা না চেনা প্রতিক্রিয়া? ধর্ম পালনের প্রশ্নটা আসলে কি? অনুশাসনের মার্কিংয়ে ভয়? পরকালে ফ্রিতে পাওয়া সুখ হারাইয়া যাওনের ভয়? আমি জানি না কারণ ধর্মের গল্পে আমার বিশ্বাস নাই...ধর্মের পরকাল ভীতির চাইতে আমি মানুষের ক্ষমতায় আস্থা রাখতে আগ্রহী...
২.
ধর্ম নিরপেক্ষ মানে আসলে কি? একজন ব্যক্তি কি ধর্ম নিরপেক্ষ হয়? আমি অনেকরেই বলবার চেষ্টা করছি একজন ব্যক্তির আসলে ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়াটা অসম্ভব...একজন ব্যক্তি কোন ধর্ম ধারণ কইরা অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটাইতে পারেন, একজন ব্যক্তি সর্ব ধর্মের সমন্বয়ের কথা ভাবতে পারেন, একজন ব্যক্তি ধর্ম হীন হইতে পারেন...কিন্তু ব্যক্তির ধর্ম নিরপেক্ষতার মর্তবাটা আমি বুঝি না। একই প্রসঙ্গ যদি আসে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ হওনের প্রশ্নে...হ্যা, একটা রাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষ হইতে, সে পারে মানুষের প্রয়োজনে নির্বাহী নীতিমালা পরিচালনা করতে, সে পারে ধর্মরে কোনরম পৃষ্ঠপোষকতা না কইরা চলতে, সে পারে সকল ধর্মরে সমানভাবে-সমান বিবেচনায় দেখতে।
৩.
ধর্মীয় রাষ্ট্র মানে কি? রাষ্ট্রের ধর্মভিত্তিক অনুশাসন মানে কি? সোজা কথায় আমি যা বুঝি, কোন বিশেষ ধর্মের অনুশাসনরে কোন দেশের নির্বাহী আর আইন-বিচার বিভাগের একমাত্র পথ বানাইয়া ফেলনের স্বপ্ন। আমি বিজ্ঞানের পরিবর্তনের নিয়মে আস্থাশীল...আমি মনে করি শ্রেণীকরনের প্রক্রিয়া থেইকা মুক্তিই অর্থনৈতিক বৈষম্য থেইকা মুক্তির প্রধান উপায়...পরম সত্য বইলা আসলে কিছু নাই...সত্য সকল সময়েই পরিবর্তনের সম্ভাবণা নিয়াই বিরাজ করে।
৪.
১৯৭১-এ বাঙালীর মুক্তির আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম একটা বড় রোল প্লে করছিলো...এই অনুভূতি নিয়া অতীতে আমি বহুত জায়গায় গেছি...অনেকেই কনভিন্সড হইছে, অনেকই ব্যাজার। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন যাগো ছিলো...যারা বিশ্বাস করে ধর্মভিত্তিক শাসনের নীতিমালাই পরকালের নিশ্চয়তায় একমাত্র পথ...তারা আসলেই তা চাইছিলো। আর যেই কারনে দেশের যেই সংখ্যালঘু অংশ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করছিলো, তারমধ্যে ধর্মভিত্তিক অংশটাই শক্তিশালী ছিলো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতায় তখন আরেকটা অংশও ছিলো, তৎকালীন চীনপন্থী কম্যুনিস্ট দলগুলি, যারা বিশ্বাস করতো এই দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম আসলে ভারত আর রাশিয়ার সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করলেও এই অংশ রাজাকার বাহিনীর সাথে কখনো মার্চ করে নাই। তাগো মূল শত্রু ছিলো মুজিব বাহিনী...মাঝে মাঝে পাকি বাহিনীর বিরুদ্ধেও তারা বিভিন্ন অপারেশনে গেছে...
৫.
রাজাকার বাহিনী ছিলো সুনির্দিষ্ট অর্গানোগ্রামআলা একটা সংগঠন, জামায়াতে ইসলামী রেযাকার বাহিনীর লগে কাগজে কলমে না থাকলেও তাগো নিয়মিত বাহিনী আর কর্মীরা রেযাকারগো পরিপূর্ণ সহযোগিতা দিছে এইটাও সত্য বইলাই জানে সকলে। তয় ধর্মভিত্তিক দলগুলি আজকের জমানায় আইসা যতো শক্তিশালী হইছে, তখন কিন্তু এতো শক্তিশালীও আছিলো না। তখনো ওয়াহাবীরা এতো মোড়লগীরি করনের সুযোগ পায় নাই।
৬.
ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসের নজীর এই দেশে প্রথম শুরু হয় স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৪'এ পাবনায় রফিকুল ইসলাম বকুল(প্রাক্তন আওয়ামি আর বিএনপি নেতা)'এর মন্দির ভাঙনের কর্মসূচী দিয়া। আওয়ামিগো একটা অংশ তখনই ধর্মনিরপেক্ষতার বাইরে গিয়া মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের পার্ট গাইতেছিলো। শেখ মুজিব নিজেও সাচ্চা মুসলমানই ছিলেন...যেই কারনে একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ তৎকালেই ওআইসি'র সদস্য হইয়া যায়। আর যেইটা ঘটে তা হইলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেইকা দেশ একটু একটু কইরা দূরে সরনের প্রক্রিয়ায় যায়।
৭.
৮০'র দশকেও ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলি এতো শক্তিশালী ছিলো না। জামায়াত নিজেই তখনো ইমার্জিং। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ছাত্র সংগঠন প্রতিপক্ষের সহযোগিতায় বাইড়া উঠতেছে। রাজশাহীতে ছাত্র মৈত্রীর জনপ্রিয়তারে দমাইতে ছাত্র দল শিবিররে সামনে আনে, আর চট্টগ্রামে জাসদ/বাসদের জনপ্রিয়তায় টালমাটাল হইয়া ছাত্রলীগ সকল শক্তি দিয়া শিবিরের স্থায়িত্বের দায়িত্ব নিছিলো। কিন্তু ৯০ পরবর্তী কালে হঠাৎই কোত্থেইকা জানি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলি ক্ষমতায়িত হইতে শুরু করে। বিশ্ব পরিস্থিতি সহায়ক ছিলো, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনরোষ, এইসব কিছু মিলাইয়াই এরা সহজে মানুষের কাছাকাছি চইলা আইতে শুরু করলো।
৮.
৯০'এ সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর থেইকাই এই দেশের বামপন্থী দলগুলি, বিশেষ কইরা দেশের সবচেয়ে সংগঠিত সিপিবি ভাঙতে শুরু করে। আওয়ামি লীগ তখন তাগো দলীয় মূলনীতিরে সংশোধন করে...এই অবস্থায় মুসলমানেরা কি করবো? তারা আরো মুসলমান হয়, প্রত্যেক মুসলমানই তাগো পোটেনশিয়ালিটি মাফিক জঙ্গীবাদী হওনের সম্ভাবনার দিকে আরো ধাবিত হয়।
৯.
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা যে কয় তারে রাজাকার বইলা ধইরা নেওয়া ...ধর্মনিরপেক্ষ না হইলেই রাজাকারী মতাদর্শ...অর্থনৈতিক বন্টনে সমাজতন্ত্রী না হইলেই আল-বদর...
বাঙালী জাতীয়তাবাদের বাইরে ভাবলে রাষ্ট্রদ্রোহী...এইরম ভাবতে পারলে ভালোই শান্তি পাইতাম...কিন্তু আসলে যারা একসময় মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজী রাখছেন তাদের অনেকেই আজ এইসব থেইকা শতহস্ত দূরে। তারাও পুঁজিবাদের এই করালগ্রাসে হারাইয়া গেছে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের জোয়ারে।
১০.
এখন ব্লগার কৌশিকরে বলি, গালি যদি এই চেতনার বিরোধীগো দেওন লাগে তাইলে সবাইরেই দেওন লাগে। রাজাকার বাহিনী-আলবদর-আল শামস নামের চিহ্নিতগো কোন ক্ষমা নাই সেইটা মানি। কিন্তু এই প্রজন্মের যেই প্রতিনিধি এখনো খালি পারিপার্শিক প্রভাবে এইরম ভাবে তারে আমি ক্যাটেগোরাইজ করি কেমনে সে রাজাকার!? তার বিশ্বাস ভুল কইতে পারি, তারে যুক্তির বেড়াজালে ফালাইতে পারি...কিন্তু যে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানে না তারে আমি অপরাধী কই কি কইরা! সঠিক ইতিহাস কি আমরা আদৌ লিখছি? আওয়ামি ইতিহাস-বিএনপি ইতিহাস-জামায়াতী ইতিহাসের ল্যাবিরিন্থে পইরা যাওয়া জাতি আসলে কেমনে তার ইতিহাস পূণর্পঠন করে?
বি:দ্র:
এই পোস্ট কিন্তু রাজাকারদের অপরাধমুক্তির পোস্ট না। এই পোস্টে আমি নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কীত ধারণারে পূনর্বিবেচনা করনের ব্যাপারটা নিয়া ভাবছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

