একটা বিক্ষুব্ধ সময় ছিলো তখন…শেখ মুজিবর রহমানরে সপরিবারে হত্যা করনের পর উল্লম্ফন ছিলো খুনী চক্রের, ছিলো মতাদর্শহীন একদল আবেগী সেনা কর্মকর্তার প্রতিরোধকামী হঠকারীতা…এরে অরাজকতা ছাড়া আর কিছু কি কওন যায়!
একটা জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের পর যুদ্ধবিক্ষুব্ধ দেশে যখন ব্যক্তিতান্ত্রিকতার চর্চা শুরু হয়, কেবল একজন নেতার ব্যক্তিত্য বেচাবিক্রীর পয়েন্টে দেশবাসীরে সঙহত করনের চেষ্টা শুরু হয় আওয়ামি স্টাইলে, দুর্ভিক্ষ আর দুষ্প্রাপ্যতারে তার ধারাবাহিকতায় দুরীকরণের চেষ্টা চলে, তখন স্বভাবজাত অনাস্থার প্রকাশ ঘটে সাধারন মানুষের চেতনায়। এর সাথে যুক্ত হয় ক্ষমতাকেন্দ্রীক আচরনের যথেচ্ছাচার…আমার আওয়ামি সমর্থক বাপও গল্প করেন শেখ কামাল কেমনে কইরা খেলার মাঠে পিস্তল বাইর করতো, সেই হিরোইজমের কাহিনী।
যদিও এই দেশের আপামর জনতার প্রকাশ্য অংশগ্রহণের মধ্য দিয়াই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হইছিলো…যদিও মুষ্টিমেয় পাক-হানাদারগো দোসর এই দেশের মুক্ত আন্দোলনের বিরোধীতা করছিলো দেশের অভ্যন্তর থেইকা…কিন্তু দেখা যায় আওয়ামি জান্তা এই দেশের মালিকানাবৎ আচরনে প্রকাশিত হয়…তার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক অংশগ্রহণ ছিলো যেই সকল রাজনৈতিক দলের তারা কেরম নিষ্প্রভতায় ভুগতে থাকা অসুখী জনপদে পরিণত হইতে শুরু করলো। সিপিবি হইলো আওয়ামি মুখাপেক্ষী, জাতীয় দল গেলো মিউজিয়ামের সংরক্ষানাগারে…কেবল ভাসানী সাহেব তখনো স্ফুলিঙ্গের মতোন জ্বলতেন আবার নিভতেন…
এমনই এক সময়ে এই দেশে তারুণ্যের শক্তি হিসাবে সংগঠিত হইলো জাসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে যেমন ছিলো আওয়ামি বিরোধীতা-তারুণ্যের জোশ কিম্বা সাম্যবাদের রোমাঞ্চকর স্বপ্ন, ঠিক তেমনি তাগো আদর্শবাদের দারিদ্রও ছিলো। আওয়ামি দূরাচারের কারনে জাসদ হইলো প্রতিবাদী শক্তি, মতামর্শিক দারিদ্র ঢাকা পইরা যাইতো প্রতিরোধ আর প্রতিশোধের আড়ালে। দেশের আর সকল প্রপঞ্চের মতোন জাসদেও খুব ধীরে হইলেও বিনির্মাণ হইতেছিলো…পালাবদল চলতেছিলো। যদিও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো এই অঞ্চলের সবচাইতে সংগঠিত বামপন্থী শক্তি…কিন্তু তাগো আওয়ামি তোষণ নীতি…মাঝে সাঝে হঠকারী কৌশলের কারনে যুক্তিবাদী অথচ পরিবর্তনকামী প্রতিবাদী তারুণ্যের কাছে তারা ক্রমশঃ অজনপ্রিয় হইতেছিলো। জাসদে যুক্ত হইতে শুরু করে দেশের স্বপ্নচারী মানুষেরা…যারা দেশের অথর্নীতিতে সুষম বন্টন প্রয়াসী, যারা প্রতিরোধে প্রতিশোধে বিশ্বাসী ছিলো।
শেখ মুজিবর রহমানরে স্বপরিবারে হত্যা করনের পর এই দেশের রাজনৈতিক গতিপথ হঠাৎ কইরা তার সকল চরিত্র হারাইলো…গন্তব্যহীনতায় পরলো সকল অভিলাস। বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ হয়তো গইড়া উঠছে…কিন্তু উদ্দেশ্যহীনতার কোন লক্ষ্য অর্জন থাকে না…খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে গইড়া উঠা স্বল্পকালীন বিদ্রোহের কারণ নিয়া যেই কারনে আজো সাধারন মানুষ সংশয়ী থাকে…
এই সময়টারে কেবল গুটিকয় মানুষ উপলব্ধ করতে পারছিলেন…তারমধ্যেই ছিলেন কর্নেল তাহের। যে পরাজিত হইতে শিখে নাই কোনদিন! যার কাছে পরাজয়ের চাইতে মৃত্যু শ্রেয় ছিলো…রাষ্ট্রীয় যেই দূরাচারের চর্চা শুরু হইছিলো মুক্তিযুদ্ধের পর…বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক যেই চর্চা শুরু হইছিলো এই দেশে, তার ছায়া এই দেশের অসংগঠিত সামরিক বাহিনীতেও ছিলো। সাধারন সেনা সদস্যগো কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় এই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার কাছে আর্জি ছিলো দেশের এই পরিস্থিতি থেইকা সবাইরে যাতে মুক্ত করা হয়…কারন কর্নেল আবু তাহেরের স্বপ্ন নিয়া কারো সংশয় ছিলো না…তার দৃঢ়চেতা মনোভাব নিয়া কারো সন্দেহ ছিলো না…দেশের প্রতি তার ভালোবাসার কাঠামো নিয়া কেউ সন্দিহান ছিলো না।
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে অপরিনামদর্শী খালেদ মোশাররফের বিদ্রোহের অবসান ঘটলো আর মুক্তি পাইলো মেজর জিয়া…আপাদমস্তক বিপ্লবী হওনের স্বপ্ন লালন করা মানুষেরো ভুল হয়…মেজর জিয়ারে মুক্ত করনের পর কর্নেল তাহের বিশ্বাস রাখছিলেন তার প্রাক্তন সহকর্মী’র উপর…কিন্তু সেই সময়ের বিদ্রোহী প্রান্তরে যে ষড়যন্ত্রের-লোভের ক্যান্সার ছড়াইতেছিলো তার চারপাশে ভালো মানুষ তাহের সেইটা আন্দাজ করতে পারেন নাই। আর তাই অপরিনামদর্শী খালেদ মোশাররফের মতোন তারেও অপরিনামদর্শীতার অপবাদ তারেও নিতে হইতে পারে সেইটা তিনি ভাবতেও পারেন নাই…ক্ষমতার লোভ যে মুক্তির কৃতজ্ঞতাবোধের চাইতে বড় হইতে পারে সেই কন্সপিরেসীমূলক বোধের কথা ভাবেনও নাই কর্নেল তাহের…
আর তাই খেসারত দিতে হয় ইতিহাসরেই। খেসারত দ্যায় এই জনগোষ্ঠী। কর্নেল তাহেরের মহাপ্রয়ান হয় ফাসী কাষ্ঠে…ইতিহাস তাই বরণ কইরা নিতে বাধ্য হয় বিকৃতিরে…বিকৃত ইতিহাস নির্ভর একটা জাতিরে পথ দেখাইতে যতোদিন না আর কোন বিপ্লবী আসে, ততোদিন খেসারত দিবো আমরা…সাধারন মানুষ!
যদিও স্বপ্ন দেখি নিঃশঙ্ক চিত্তেই…তার চাইতে বড় সম্পদতো আর নাই!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

