এইবার নির্বাচন নিয়া কোন বক্তব্য ছিলো না আমার, তেমন কোন আদর্শিক কারনে না, নির্বাচন বিষয়ে আমি কোনদিনই কোনরম ভবিষ্যত বানী দেওনের চেষ্টা করি না। সেই রাজনৈতিক উপলব্ধি তৈরী হওনের কালে এক অগ্রজ ছাত্রনেতা কইছিলেন ক্রিকেট খেলা আর নির্বাচন বিষয়ে প্রেডিকশান কখনোই খুব একটা বুদ্ধির পরিচয় দ্যায় না। এই দুইয়ের ক্ষেত্রেই অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনার অবকাশ থাকে। আমি তার উপদেশ আজো অক্ষরে অক্ষরে মাইনা চলার চেষ্টা করি।
গতো ১/১১'এর পর থেইকা তত্ত্বাবধানের ছদ্মাবরনে আসা শাসকেরা এই দেশের বিবিধ প্রকল্প-পরিকল্পণায় বিভিন্ন নকশা বানাইছে, যেই নকশার বিরুদ্ধে এই দেশের মানুষ অনেক অনুরক্ত হইছে, অনেক ক্ষোভে ফাইটা পরছে। এই বিভিন্ন নকশার ফাঁকে আর যাই হোক আর না হোক, একটা পরিবর্তন ঘটছে...সেইটা হইলো এই দেশের মানুষ দলকেন্দ্রীকতার বাইরে গিয়া ভাবতে শিখছে...আত্মবিশ্বাস নিয়া আত্মবিশ্বাস ফিরা পাইছে...তাদের উপলব্ধি তৈরী হইতে শুরু করছে, দুর্নীতি'র শৃঙ্খল কোন নিয়মের নিগড়ে বান্ধা নাই। সাধারন মানুষের অধিকার আছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানের! সাধারন মানুষ এককাট্টা হইলে সকল দুর্নীতি-সন্ত্রাসরে প্রতিরোধ সম্ভব!
চার দলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতা ছাড়ছে এই সেইদিন, তাগো দুর্নীতির দগদগে স্মৃতি মানুষের মন থেইকা মুইছা যায় নাই...তাগো সন্ত্রাস আর খবরদারীমূলক মোড়লগীরি চলছে পাড়া-মহল্লায়, আর তার শিকার সাধারন মানুষের হৃদয়ে আজো অবমাননা আর অপমানের বোধ বিরাজ করে...এইরম একটা পরিস্থিতিতে ১/১১ পরবর্তী সরকারের কথিত দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান নিয়া অনেকের অনেক প্রশ্ন তৈরী হওনের সম্ভাবনা থাকলেও চারদলীয় শাসনের প্রতি মানুষ বিতৃষ্ণ হইছে...আর অবশ্যম্ভাবী ভাবেই অনাচারের বিরুদ্ধে সুপ্ত থাকা বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত হইছে অন্তরালেই।
খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তৈরী হয়, তাইলে কি আওয়ামি নেতৃত্ত্বাধীন মহাজোট দুর্নীতির কাতারে আসে নাই কোন কালে!? মানুষের মনে কি আওয়ামি গণবিরোধী কোন চিত্র আঁকা হয় নাই? হইছে... নব্বই পরবর্তী সরকারগুলির একটা ধারাবাহিকতা সকলের অভিজ্ঞতায় আছে...ক্ষমতাসীন হওয়ার মধ্য দিয়া সকলেই যেনো জমিদার হইছে এই দেশের...৯১ থেইকা ৯৬ পর্যন্ত বিএনপি যা করছে আওয়ামি লীগ তার বাড়া ছিলো তার ৯৬ থেইকা ২০০১'এর শাসনামলে কিন্তু ২০০১'এর নির্বাচনে আওয়ামি পরাজয়ের পরেও বিএনপি আর তার জোট সহচর জামায়াতে ইসলামী কোনরম শিক্ষাগ্রহণ করে নাই। সকল অনিয়ম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে...উন্নয়নের নামে চলছে ঠিকাদারী ব্যবসা, বিকেন্দ্রীকরণের নামে চলছে দলীয় মোড়লগীরি...রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশে একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকের চাকরীও হয় নাই শেষ সময়ে আইসা।
১/১১'এর প্রেক্ষাপটে আওয়ামি লীগের অবস্থান সবসময়েই একটু ঝাপসা ছিলো...তারা এই পরিবর্তনের নিয়ামক হিসাবে নিজেগো দাবী করতেছিলো যার অর্থ তারা সমর্থন করছে এই জলপাই শাসকগো, আবার তাগো নেতাকর্মীরা যখন গ্রেফতার বরণ করছে তখন আওয়ামি লীগ আন্দোলনমূখী বক্তব্য দিছে...তত্ত্বাবধায়কগো আমলে যখন দ্রবমূল্য যা'তা রকম বাড়লো আওয়ামি লীগ তখন আবার রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পক্ষে দাঁড়াইয়া গেলো...পুরা সময়টাতেই আওয়ামি লীগের সিদ্ধান্তগ্রহণের দোলাচল ছিলো, দ্বিমূখীন ছিলো...উল্টাদিকে বিএনপি আর তার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট যেহেতু হালনাগাদ দুর্নীতিবাজ-সন্ত্রাসী, তারা ভীত হইয়া সরকার বিরোধী কথা কওয়া শুরু করলো বেশী-বেশী। এইসব কথায় সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি প্রচ্ছন্নভাবে আরেকটা জিনিষ ছিলো, বিএনপিভূক্ত দুর্নীতিবাজগো বাঁচানের তাগীদ...আর এই প্রচেষ্টাই মনে হয় চারদলরে প্রথম মানুষের থেইকা বিযুক্ত করে...
তত্ত্বাবধায়ক সামরিক শাসকগো নিয়া মানুষের ক্ষোভ বাড়লেও নির্বাচনের পরিচ্ছন্নতা নিয়া কোন সংশয় ছিলো না কোন...প্রতিরোধের ভাষা হিসাবে সাধারন মানুষ খুঁজতেছিলো ভোটের অধিকার...যেই কারনে জনমনে ভোটের তাগাদা ছিলো...নির্বাচন নিয়া ৎকন্ঠা ছিলো। আর তাই এই সরকার যখন নির্বাচনের ঘোষণা দিলো, তখন দ্রব্যমূল্য নিয়া ক্ষোভ চাপা পরলো অনেক খানি, তেলের দাম বিশ্ববাজারে অর্ধেক কমলেও এই সরকার সেই সুযোগে কমাইলো মোটে এক ষষ্ঠমাংশ, কিন্তু কোথাও কোন প্রতিবাদ শুনি নাই। নির্বাচনের ঘোরে আচ্ছন্ন হইলো একটা জাতি...
১/১১'এর পর যে কোন কারনেই হোক দুর্নীতিবাজগো বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়নের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীগো বিচারের দাবী লাইমলাইটে আসলো...আর এই দাবীরে নিরস্ত না কইরা তত্ত্বাবধায়করা বরং তারে জিয়াইয়াই রাখছে। তার যৌক্তিকতা নিয়া বক্তব্য ছিলো স্বয়ং আইন উপদেষ্টার। একটা জাতি যুদ্ধাপরাধীগো আইনি স্বীকৃতি দিয়া রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা দিতেছে গতো ৩৭ বছর ধইরা, এই গ্লানিবোধ ক্রমশঃ ছড়াইতে শুরু করলো তরুণ সমাজে। আমি পরিচিত অনেক তরুণের মধ্যেই দেখলাম, তারা বিএনপি সমর্থন করতেছে কিন্তু জামায়াত প্রশ্নে তাগো অবস্থান একেবারেই নেতিবাচক...এই পরিবর্তন একটা জাতির জন্য ইতিবাচকতার গুরুত্ববহন করে। জাতীয়তাবোধ এখনো আমাগো লেইগা প্রয়োজনীয় মর্তবা মনে করি আমি...যেই বোধ মুখাপেক্ষি নয়, যেই বোধে ম্যানিপ্যুলেশন নাই...
এইবার প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার জীবনের প্রথম ভোট দিতে যাওনের সুযোগ পাইছে...এই ৩০ শতাংশ ভোটারের সিদ্ধান্ত'ই নির্বাচনের ফলাফল উল্টাইবো-পাল্টাইবো সেইটা বুঝন যাইতেছিলো...এই তরুন-তরুনীগো কাছে ধর্মান্ধ মৌলবাদ আর যুদ্ধাপরাধীরা ক্রমশঃ অজনপ্রিয় হইতে থাকলো সেইটা বুঝতেছিলাম ভার্চ্যূয়াল পরিসরে...তয় বাকী অংশ সম্পর্কে আন্দাজটাই সম্বল। এইসব নতুন ভোটারগো কাছে দুর্নীতি-দুঃশাসন-সন্ত্রাস আর যুদ্ধাপরাধ পরিত্যাজ্য হইতেছিলো এইটা নিয়া আমি পরিচিতমহলে আলোচনাও শুরু করতেছিলাম...অনেক ইন্সপায়ারিং লাগতেছিলো দেশের নতুন প্রজন্মের উপলব্ধি থেইকা, apoliticalনিরাচনৈতিক একটা ঘূর্ণিস্রোত ক্রমশঃ বিলীয়মান, রাজনীতি মনস্ক হইয়া উঠনের ইঙ্গিত!
গতোকাল ভোট দিতে যাই নাই, কিন্তু সন্ধ্যা থেইকা বইসা অপেক্ষা করতেছিলাম নির্বাচনী ফলাফলের, রাত নয়টার দিকে এক বন্ধু পিরোজপুর থেইকা ফোন কইরা জানাইলো তাগো ঐখানে জামায়াতের সাঈদি ৩০ কেন্দ্রের ফলাফলে প্রায় ১৫/১৬ হাজার ভোটে পিছাইয়া আছে। আধাঘন্টা মধ্যেই পাবনার আরেক বন্ধু বার্তা পাঠাইলো মুঠোফোনে "নিজামী হারতেছে...শুনলাম সোবহান মাওলানাও"। এইবার একটু নইড়া চইড়া বইলাম...খবর নিলাম ফরিদপুরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল পন্থী এক বন্ধু এখন ম্যাজিস্ট্রেট সেইখানে, জানাইলো মুজাহিদ ঐখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই নাই। চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাবনত হইলাম!
পরের গল্প অনেক বিরক্তিকর
আমি নিশ্চিত এই নির্বাচনে জিতলো জনগণ...তারা যেই চেতনা'রে সমুন্নত দেখতে চায় সেইখানে দুঃশাসনে-দৃর্নীতির-সাম্প্রদায়িকতার-স্বার্থান্বেষীগো কোন স্থান নাই। জনগণ তাই প্রত্যাখ্যান করছে বিএনপি-জামায়াত জোটরে। এইবারের প্রথম ভোটাররা এরশাদের বিরুদ্ধে জনতার আন্দোলনরে দেখে নাই, আওয়ামি দুঃশাসনও তাগো কাছে অনেক পরিচিত না। বিএনপির সাম্প্রতিকতা তাগো কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধাপরাধীগো গাড়িতে দেশের পতাকা উত্তোলন তাগো কাছে অপমানের সামিল। এইসব প্রতিবাদের বিস্ফোরণ তাগো চোখে নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে। এই স্বপ্নের বাস্তবায়নে প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতা আর দুর্নীতির অবসান...
তরুণ প্রজন্ম নির্ভর করছে আওয়ামি নেতৃত্ত্বাধীন মহাজোটের উপর...আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেইকা জানি এই সিদ্ধান্ত নিয়া হাজারটা প্রশ্ন তুলন যায়...নিকট অতীতেও তারা প্রথামতো ক্ষমতালেহী হইয়া দুর্বিষহ করছে সাধারন মানুষের জীবন। এইবার যদিও তাগো দিনবদলের সনদ প্রচারণা আছে, প্রতিশ্রুতি আছে আকাশসম...এই প্রতিশ্রুতির এক তৃতীয়াংশ যদি মেয়াদকালে পূরণ করতে পারে তাইলেই তাগো পরিবর্তনসূচীত হইছে বইলা ধইরা নিতে হইবো...
আমি নিজে যদিও আশাবাদী না এক্কেরেই...কিন্তু তবুও জনগণের নির্ভরতারে শ্রদ্ধার চোখেই দেখতে চাই। দেখতে চাই যুদ্ধাপরাধীগো বিচার কতোটা গুরুত্বপূর্ণ হয় আওয়ামি সরকারের কাছে...নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়া জনগণ তাগো এইবার যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আইন করনের দায়িত্ব দিছে...এই দায়িত্বের অবহেলায় আমিও অপমানিত বোধ করুম নিশ্চিত! রাজনীতি থেইকা ধর্মের সুবিধাবাদিত্ব দূর করতে হইবো! সংবিধানে সকল জাতিসত্ত্বার অধিকার নিশ্চিত করতে হইবো!
সরকার গঠন কইরা তার এক্সিকিউশনে যাওনের কয় দিন পর আমাগো দাবী পূরণ করতে হইবো, বিষয়টারে এইভাবে এখনি দেখতে চাই না...তয় খুব শীঘ্রই নিশ্চিত আমরা বুঝতে পারুম আওয়ামি লীগের পক্ষে কদ্দূর যাওনটা সম্ভব...
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়া আমি স্বপ্ন দেখি, এই স্বপ্নে শেখ মুজিব কিম্বা মেজর জিয়া নাই..এই স্বপ্ন জনতার আত্মবিশ্বাস! এই আত্মবিশ্বাসেই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হইছে, যার বিরুদ্ধে সংগঠিত চক্রান্ত রুখতেই এইবারের নির্বাচনী ফলাফল...আওয়ামি লীগের পরিকল্পিত ঔদাসিন্য দেখা দিলে...জনগণ আবারো উৎখাত করবো জনতার শত্রুরে!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


