শ্রেণী বিভেদেও প্রেমের উপাখ্যান লইয়া এই উপ মহাদেশে একসময় বহুত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মিত হইছে...দর্শকেরা গোগ্রাসে গিলছে সেইসব চলচ্চিত্রের পরিনতি...পরাজয়ের পরাধীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের পরাকাষ্ঠায় বান্ধা উপমহাদেশীয় মনন, শোষিতের পক্ষেই হাততালি দিছে সবসময়...একলাইনে অনেক বড় কথা কইলাম মনে হইলেও, আসলেই এই অঞ্চলে বৈষম্যের বেড়া ভাইঙ্গা গইড়া উঠা সম্পর্কের জয়-জয়কার আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। আর তাই ঘুটে কুড়ানির মেয়ের প্রেমে পাগল হয় রাজপূত্রেরা...রাজকন্যার ভালোবাসা যায় খেটে খাওয়া বুদ্ধিমান কৃষকপূত্রের করকমলে...কিন্তু ধারে কাছের সময়ে সাহিত্যে বাস্তবতার নিরীখে(?) বৈষম্যের কোপানলে পইড়া এইরম সম্পর্কের গল্প প্রায় হুমকীর মুখে। বৈষম্যের গল্পে যেই সাধুবাদীতা আছে তারে ইগনোর করনটাই আরবানাইজেশন, এইরম কনসেপ্ট চালু আছে আমাগো শহুইরা মানসিকতার গল্প কাঠামোতে। পাশ্চাত্যের প্রভাবে পুঁজি সম্পর্কের ভিত্তিও হইয়া উঠে...ঠিক যেমন কইরা বিদ্যমান রাজনৈতিক সম্পর্ক গুলিও গইড়া উঠে বাস্তবতায়।
কিন্তু ইতিহাসে বঞ্চিত মানুষের যেই হাহাকার অন্তঃস্থলে রোপিত হয় ধারাবাহিক প্রতিদিনের ঘটনাক্রমে, শ্রেণীর বিভেদ ভাইঙ্গা তৈরী হওয়া সম্পর্ক য্যানো তার প্রতিবাদের ভাষা...আমি তাই অমিত আহমেদের গল্পগ্রন্থ পাঠের শুরুতেই মোহাবিষ্ট হই তার সাবলীল গল্প বুননে...উত্তরাধুনিক কালের গল্পকার হইয়া উঠনের সম্ভাবনা দেখি তার মধ্যে...ছদ্মবেশ নামের গল্পরে চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপান্তরের আকাঙ্খা তৈরী হইতে থাকে...
অমিতের গল্প ভাষায় অতিরঞ্জন খুঁজি...যেই অতিরঞ্জনটাই স্বাভাবিক এই ধরনের গল্পে...এইরম গল্পের নিরাসক্ত অনুবাদ কঠিন, লাগাম ধইরা রাইখা অলিখিত সামাজিক ভ্যাল্যুর বিপরীতে গল্প কওনের অভ্যাসে আমরা ততোটা অভ্যস্ত হইছি কি না তাতে আমার সন্দেহ ছিলো...আমার সন্দেহের শুষ্কতায় অমিত আহমেদ পানি ঢাইলা দ্যান...আমি আর্দ্র হই...এই আর্দ্রতায় আনন্দ আছে...
অমিত আহমেদের দ্বিতীয় গ্রন্থ বৃষ্টিদিন রৌদ্রসময় পাঠের প্রারম্ভেই আমি টের পাই একজন শক্তিশালী গল্পকার প্রবাসে গোপনে নিভৃতে তৈরী হইতেছেন...যার গল্প বলার ধরন একান্তই তার নিজস্ব, তার গল্প বলার বিষয়, তার গল্পে নিহিত গল্প একান্তই আমাগো...বাঙালি জাতির...প্রথম গল্প ছদ্মবেশ'এই আমি নিমজ্জিত হইয়া যাই...গল্পটারে টের পাই...কেবল দর্শন চর্চার বিকল্প মনে হয় না...গল্পের কাশেম চরিত্র কিংবা অক্ষয় অনল অথবা মাহফুজ তরফদার কেউই আমার কাছে অবোধ্য হয় না...চরিত্রগুলি লেখকের লেখনীতে চরিত্র হিসাবে সোজা হইয়া দাঁড়ায় মাঞ্জা শক্ত কইরা...তাগো গাল্পিক উপস্থিতি কেবল কোন বক্তব্য প্রদানের তরে না বরং তাগো জীবন কাহিনীরে লেখক বিশ্লেষণ করেন য্যান গল্পের মতোন...হয়তো এই গল্প লেখকের কল্পনা বিলাস, কিন্তু গল্পের পরতে পরতে আমি চরিত্রগুলিরে ছুঁইয়া দেখতে পারি, অনেক নিরাসক্ত বর্ণনা সত্ত্বেও...বিল্লুর মা তার ময়নাতে রূপান্তরিত হওয়ার আগেই আমার ভালোবাসায় সিক্ত হয়...
গল্পটারে কয়েক লাইনে ভাবনের একটা চেষ্টা চালানো যাক...একজন অপ্রাতিষ্ঠানিক কবি-লেখক অক্ষয় অনল বাসে রাজশাহী যাওনের টাইমে পাশের সিটের যাতী হিসাবে পায় আবুল কাশেমরে। আবুল কাশেম দাবী করে তার জীবন কাহানী দেবদাসের চাইতেও আকর্ষক। শুরুতে শুনতে রাজী না হইলেও পরে কাশেম সাহেবের প্রেম কাহানিতে নিমগ্ন হয় অক্ষয়। সৎ মা'র অত্যাচারে অতিষ্ঠ কাশেম মেসে থাকনের টাইমে বস্তিবাসী বিল্লুর মা'র প্রেমে পড়ে, তাগো প্রেমের পরিনতি হয় ময়নার গর্ভধারণ। অক্ষয় অনল এই গল্পে কোন আগ্রহ পায় না কারন এই গল্পরে তার মধ্যবিত্ত মানসিকতার রিপিটেড প্রকাশ'ই মনে হয় কারন কাশেম তারে জানায় এই খবর শুননের পর সে পালাইছিলো। গল্পের একটা দ্বিতীয় অংশ শুরু হয় এরপর...এই অংশ অক্ষয় অনলের বানানো, নাকি কাশেমের জীবনের সত্য পরিনতি এই সংশয় আমার মাথায় থাকলেও আমি দ্বিতীয় অংশেই গল্পটারে খুঁইজা পাই...আট বচ্ছর পর, অক্ষয় অনল তখন মাহফুজ তরফদার, তার লগে আবার দেখা কাশেম সাহেবের...কাশেম সাহেব তারে বাড়িতে নিয়া যায় চা খাওয়াইতে সেইখানে গিয়া মাহফুজ দেখে কাশেম সাহেব তারে মিথ্যা বলছিলো...ময়নারেই আসলে সে বিয়া করছিলো...বিল্লুরে সে পূত্র হিসাবে স্বীকৃতি দিছে...আরেক কন্যা নিয়া তারা নিজের ঢাকা শহর থেইকা দূরে রাজশাহী শহরে সুখেই আছে...
মেদহীন এইরম একটা গল্পের উপন্যাস হওনের সম্ভাবনা থাকে কি না আমার সেই চিন্তাও হয় এই গল্প পাঠের পর...উত্তম পুরুষের লেখনী হইলেও অমিত আহমেদের লেখনীর নিস্পৃহ ঢঙ ছাপাইয়াও আমরা টের পাই একজন রাগী তরুনের আইকন...যেই চরিত্র প্রতিনিধিত্ব করে তাবৎ এই সময়ের তরুনরে...কাশেম সাহেব একটা সময় পর্যন্ত যে কোন ছা-পোষা কেরানীর প্রতিনিধি থেইকা গল্পের প্রোটাগনিস্ট হ'ন...আর ময়না সেতো সেই বাঙালি ঘুটেকুড়ানীর কন্যা যে আসলে রাজ্য জয়ের নিয়তি নিয়া আসে...
অমিত আহমেদের বৃষ্টিদিন রৌদ্রসময় পড়নের পর আমি আসলেই এতোটা মোহিত হইয়া পড়ছি, যে তার রিভিউ লিখনের তাগীদ অনুভব করি...লিখতে লিখতে লেখার আয়তন নিয়া ভীত হইয়া পরি...আর তাই ভাবলাম এই লেখারে ধারাবাহিক পর্বে লিখবো...আজকের পর্ব শেষ করনের আগে তাই ধন্যবাদ জানাইয়া রাখতে চাই নজমুল আলবাবরে গোছানো একটা পাবলিকেশনের লেইগা...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

