ছোট বেলায়, একদম ছোটবেলায়, যেদিন জানতে পেরেছিলাম, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেদিন থেকে অনেকবার তার কাছে গল্প শুনতে চেয়েছি যুদ্ধের। আমার কাছে আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা সিনেমার সুপারম্যানের চাইতে কোন অংশে কম ছিলেননা। বেশিরভাগ সময় কেমন যেন আনমনা হয়ে যেতেন বাবা। মনমেজাজ খুব ভাল থাকলে হঠাৎ হঠাৎ কোন একদিন দুয়েকটা গল্প বলতেন। ততদিনে যুদ্ধের উপর দুয়েকটা বাংলা সিনেমা দেখা হয়েছে আমার। সময়টা ১৯৯০ এর দিকের। সিনেমার দর্শকের অবস্থান থেকে নিজের বাবার কাছ থেকে শোনা অভিজ্ঞতা কল্পনার সাথে মিশিয়ে ভাবতাম, আমি যেন সে সময় উপস্থিত, সাই সাই করে গুলি করে সব পাকিস্থানি আর রাজাকারদের শেষ করে দিচ্ছি...এইসব হাবিজাবি।
সময়টা ভাল ছিলনা। এখন বুঝতে পারি এইদেশে মুক্তিযুদ্ধের মত একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে সাবধানে কথা বলতে হয়। এখানে দানবকে মানুষ আর মানুষকে মহামানব বানানোর খেলা চলে। অনেকের অনেক স্বার্থ এখন এর সাথে। মুক্তিযুদ্ধের কিছু ঘটনা উল্লেখ থাকার কারনে সেন্সর বোর্ড এখানে ছবি আটকে দিতে পারে অনায়াসেই।
শ্রদ্ধেয় ডঃ জাফর ইকবাল স্যার একবার লিখেছিলেন, অনেক বছর পর এদেশের একজন শিশু কিশোর যদি জানতে চায় মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সে কি জানবে? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর নাটক, সিনেমা বা কিশোর সাহিত্যের মত জিনিসগুলো পড়ে সে কি ধারণা করবে একটি জাতির কষ্ট, শোক আর গৌরবের এই মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে? আমার ধারণা, তার কাছে মুক্তিযুদ্ধ হবে সুপারম্যান সিরিজের কার্টুনের মত, মুক্তিযোদ্ধারা হবে সুপারম্যান, পাকিস্তানি হানাদাররা হবে ভিলেন, রাজাকাররা হবে গোপাল ভাড়ের মতন (বাংলা সিনেমায় প্রায় সবসময় হাস্যকরভাবে রাজাকারদের দেখানো হয়)। সুপারম্যানের জয় দেখে শান্তিপূর্ন মনে ঘুমাতে যাবে সে। এবং ভুলেও যাবে এর কথা। সুপারম্যানের কাহিনী টিভিতেই ভাল লাগে, বাস্তব জীবনে নয়।
সে যদি আরেকটু সচেতন হয়, যদি সে ইন্টারনেটে 'বিশেষ বিশেষ ‘জিনিস'’ না খুজে বরং বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, ব্লগ পড়ে ধারনা করার চেষ্টা করে, তবে আমি নিশ্চিত সে কনফিউজড হবে। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের এমনভাবে রঙ করা হয়েছে যে অনেকেই এটাকে জীবনের অন্যান্য রঙ্গিন জিনিশের মতই ডিজুস রঙের দুনিয়ায় হারিয়ে ফেলবে।
মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেতে তাকে তাই সত্যিকারের আতেল হতে হবে। দেশি বিদেশি বইপত্র খুজে বের করে পেতে হবে, পড়তে হবে, এ নিয়ে ব্লগে ব্লগে লেখা পড়তে হবে, রাজাকার আর তাদের ছানা পোনাদের সাথে লড়াই করতে হবে, তবেই হয়ত সে লাল নীল রঙের মুক্তিযোদ্ধার বাইরে অন্য রঙের মুক্তিযোদ্ধাও দেখতে পারবে। নিজের গৌরব আর অগৌরবের দিকটুকু তবেই দেখবে সে।
লেখাটি লেখার ইচ্ছে অনেকদিনের। বন্ধু মেহরাবের এই লেখটি পড়ে ইচ্ছেটুকু এত বেড়ে গেল, যে তা কিভাবে জানি ব্লগে চলে আসলো!!
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০০৯ দুপুর ১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


