পর্যবেক্ষক
সরকার, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- তিন শক্তিই এ মুহূর্তে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে সক্রিয়। সরকার চাইছে সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বিঘেœ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। আর আওয়ামী লীগের লক্ষ্য আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়া। অন্যদিকে বিএনপির লক্ষ্য আপাতত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মুক্তি। জোট গঠন বা নির্বাচন প্রস্তুতি বিএনপির কাছে এখন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ (সেকেন্ডারি) বিষয় হলেও সরকারবিরোধী ভূমিকায় মূলত তারাই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। পর্যবেক্ষকদের মতে, ত্রিমুখী এ শক্তির তৎপরতার আবর্তেই এ মুহূর্তে দেশের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। বিরাজ করছে টালমাটাল বা অস্থির পরিস্থিতি। সে সঙ্গে চলছে চূড়ান্ত দরকষাকষিও।
আবার এরশাদের সঙ্গে সম্ভাব্য মেরুকরণ নিয়ে ছোট দলগুলোর মধ্যেও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামায়াতকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে সোচ্চার রয়েছে কয়েকটি সংগঠন। সরকারবিরোধী ভূমিকায় জামায়াতও তৎপরতা চালাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির পদ নিয়েও দেশে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ থাকবেন কি না- এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
সূত্র জানায়, সরকার আসন্ন উপজেলা এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছে। জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সম্মত হলেও আগে উপজেলা নির্বাচন এবং জরুরি অবস্থায় তা অনুষ্ঠানে আপত্তি আছে আওয়ামী লীগের। সরকার এ ব্যাপারে দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি বিদেশে শেখ হাসিনার সঙ্গেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরাও এ ব্যাপারে তৎপর বলে জানা গেছে।
সূত্রের দাবি, এ বিষয়ে লন্ডনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী দুই-এক ব্যক্তির আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া জাতীয় পার্টির নেতারাও লন্ডনে শেখ হাসিনাকে এ ব্যাপারে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন। এসব আলোচনায় এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তবে জাতীয় বা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো ঘোষণা দেননি। লন্ডন থেকে ফিরে এয়ারপার্টে এরশাদ মহাজোটে থাকার ঘোষণা দিলেও আওয়ামী লীগে এ নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মতিয়া চৌধুরীসহ কয়েকজন নেতা বলেছেন, লন্ডনের বিষয় নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম নেতারা এ ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
তবে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান শুক্রবার বার্তা সংস্থা বিডিনিউজকে জানান, আমরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করার কথা ভাবছি।
বিকল্পধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীও শুক্রবার দলের এক সমাবেশে বলেন, তারাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটে থাকবেন।
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল হওয়া সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠিত হয়। ১৪ দলের বাইরে জাতীয় পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ তাতে যোগ দেয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা হলেও এখনো ঘূর্ণিপাকের আবর্তে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের রাজনীতি। কারণ এরশাদ সরকারের সময় ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে দলের মধ্যে নানামুখী মূল্যায়ন আছে। বিএনপি-জামায়াত জোট এরই মধ্যে ওই নির্বাচন উদ্ধৃত করে প্রপাগান্ডা শুরু করেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হান্নান শাহ গতকাল বলেন, ১৯৮৬ সালের মতো একদলীয় নির্বাচনে যারা যাবেন, তারা জাতীয় বেইমান হবেন। ফলে নির্বাচনে কেবল জয়লাভই নয়Ñ দলের ভাবমূর্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। বিশেষ করে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নির্বাচনের ফল বা এর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি আওয়ামী লীসহসহ নানা মহলে আগাম আলোচনা হচ্ছে। ফলে শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থার মধ্যে তারা উপজেলা বা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সূত্র জানায়, নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়ার সম্ভাবনা ভাবিয়ে তুলছে সরকারকেও। ফলে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার সব রকমের তৎপরতা চলছে। কিন্তু বিষয়টি আটকে আছে তারেকের মুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে। তারেকের মুক্তি না হলে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা সহসা হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের বিকল্প ভাবনা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ-জাপাসহ অন্যান্য বাম জোটের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে চাপের মুখে পড়বে বিএনপি। ফলে একপর্যায়ে নির্বাচনে যেতে বিএনপি রাজিও হতে পারে বলে সরকারের ধারণা। কিন্তু বিএনপি তথা খালেদা জিয়ার সঙ্গে এখনো সমঝোতায় আসতে পারেনি সরকার।
খালেদা জিয়া চাইছেন, আগে তারেকের মুক্তি। কিন্তু সরকার আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার পক্ষে। কারাগারে আটক বিএনপি নেতারও রাজনৈতিক কারণে আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে মতামত দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের মতে, দলের চেয়ারপারসন মুক্ত হলে দল শক্তিশালী হবে। তখন তারেকের মুক্তির ব্যাপারে দরকষাকষি করা সহজ হবে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়া কী করবেনÑ তার ওপরই ঝুলে আছে জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ তথা সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকটিও। এ পরিস্থিতিতে কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। কারণ খালেদার বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগ দিতে পারছে না তারা। সব মিলিয়ে সরকার ও রাজনীতিতে খুব অস্থিরতা চলছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

