somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

না বলে চলে যাওয়া এক প্রিয় মানুষের কথা-১

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কিছু কিছু মানুষ চলে যাবার পরেও চলে যেতে অনেক সময় নেয়। কিছু কিছু মানুষ আবার আরেকটু বেশি ত্যাদোড় টাইপের। নিজে চলে গেলেও ছায়াটুকু কখন যেন পেছনে ফেলে যায়।বাস্তবতার কড়া রোদে পুড়েও পুরোপুরি তা' মুছে যায়না।সময় অসময়ে, রাতে বিরাতে মনের দরজায় এসে খট খট করে শুধু।বয়স কতইবা হল। সবে মাত্র একুশের নৌকায় পা ডুবিয়ে বসে আছি। এমন বয়সে চলে যাওয়া মানুষের চেয়ে কাছে আসা মানুষের মুখচ্ছবিতেই পুরো বুক ভরে থাকার কথা। কিন্তু জীবনের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সবকিছু ব্যাকরণের নিয়ম মেনে চলার কথা ভাবা তো মহা বোকামি (আমি পোলাডা যদিও বহুত বোকাই আছি)।

যাই হোক... যার কথা বলতে চাচ্ছিলাম।সেই ত্যাদোড় মানুষটার নাম জাহিদ রেজা।ফজলুল হক হাউসের ৩২তম ব্যাচ এর জাহিদ রেজা ভাই। যে অমন করে কাউকে না বলেই হঠাৎ আসর থেকে উঠে চলে গেল, কিন্তু সাথে করে তার স্মৃতি গুলো নিয়ে গেলনা।নিতে চাইলেই বা কি,খুব বুঝি ছেড়ে দিতাম। কাছের কোন মানুষের কাছ থেকে এতটুকু না বলে নেয়া যেতেই পারে। না হলে আর কাছের মানুষ কিসের।

তার সাথে প্রথম যেভাবে পরিচয়। ৩ জুন,১৯৯৯। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে আমার প্রথম দিনের কথা। মাত্র ক্লাস সেভেন এর মাসুম বাচ্চা। ক্যাডেট কলেজের ডান হাত,বাম হাত কিছুই চিনিনা। একটেল "ইজি লোড" এর ইউনুস টাইপ অবস্থা আর কি। প্রথম দিনেই ক্লাস এইটের ফাহিম ভাই আমার জান মালের সব দায়িত্ব বুঝে নিলেন। ক্যাডেট কলেজীয় পরিভাষায় আজ থেকে উনিই আমার গাইড। কলেজের অফিসিয়াল রুল আর সিনিয়রদের আনঅফিসিয়াল (এবং মোস্ট ইম্পর্টেন্ট) রুল শেখানোই হল গাইডদের পবিত্র দায়িত্ব।ফাহিম ভাই যে এই বিষয়ে অতি দায়িত্বশীল তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলো না।রিসেপশন এর ঝামেলা শেষ হবার পর ব্যাগ সহ হাউসে পৌছানোর আগেই প্রথম রুলটা তার কল্যাণে শেখা হয়ে গেল।

"সবার উপরে সিনিয়র সত্য,তাহার উপরে নাই।সিনিয়র কখনো মিথ্যা বলেন না।"

আমি শুনে মনে মনে আশ্চর্য হই।এখানকার সিনিয়ররা এত ভালো যে কেউই মিথ্যা বলেনা।অবশ্য এই মিথ্যা না বলা যে কোন অর্থে বোঝানো হয়েছে তা' বুঝতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি।
মুখে শুধু বলি-"জ্বী আচ্ছা।"
রুমে নিজের জায়গায় আসার পর ফাহিম ভাই নিজেই লকারে কাপড় চোপড় গুছিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন যে সেগুলো কোন প্যাটার্নে রাখতে হবে।এর ফাকে ফাকে খুচরো নিয়ম কানুন শেখানোর ক্লাস ঠিকই চলছে।
ফাহিম ভাই হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
"বাস্তবে কোনদিন বাঘ দেখসো? একেবারে সামনা সামনি?"
- "জ্বী দেখসি।একেবারে সামনা সামনি।তবে আমাদের দুইজনের মাঝখানে লোহার গরাদ ছিল,মানে চিড়িয়াখানায় দেখসি আর কি।"
- "ধূর মিয়া...মশকরা করো? সিনিয়রদের সাথে কখনো জোক করবানা।"- আরেকটা আন অফিসিয়াল রুল শেখা হয়ে গেল।
ফাহিম ভাই এরপর ভিলেইন মার্কা একটা হাসি দিয়ে বললেন- "দেখবা,দেখবা...টাইগার হাউসে যখন আসছো একেবারে খাঁচা ছাড়া বাঘই দেখবা।" ফজলুল হক হাউসের হাউস প্রতীক আবার বাঘ কীনা।
এরপর জরুরী কোন গোপন কথা বলার ভংগিতে আমার দিকে আরেকটু ঝুকে এসে ফাহিম ভাই বললেন-"শোন,এই হাউসে যতদিন জুনিয়র হিসবে আছো দুই জনের নাম আর ক্যাডেট নং কখনো ভুলবানা।একটা হইলো জাহিদ রেজা,ক্যাডেট নং-১৭৫১।আরেকটা হইলো...(থাক আজকে শুধু জাহিদ রেজা ভাইএর কথা।আরেক দিন আরেকজনের টা নিয়ে লিখবো)।"
"বুঝলা,এরা খাচা ছাড়া বাঘের চেয়েও ডেঞ্জারাস।" বলা শেষ করে এই অবোধ জুনিয়রটাকে ফাহিম ভাই আরেকটা ক্রূর হাসি উপহার দিলেন।বিনিময়ে আমি কেবল কোন মতে ঢোক টা গিলতে পারলাম। মনে মনে ভাবি খালি ক্যাডেট লাইফ ক্যান,জীবনে যত লাইফ আসে সব লাইফেই মনে রাখুম। খালি আল্লাহ জানি আমারে ওই ব্যাঘ্র শাবক দুইজনের হাত থাইকা বাঁচায়া রাখে।

এম্নিতেই সবে মাত্র প্রথম দিন। আসার আগে বন্ধু বান্ধব,আত্বীয় স্বজন এর কাছ থেকে কত ভয়াবহ কথা শুনে এসেছি ক্যাডেট কলেজ নিয়ে।তার মধ্যে আবার এক দিন যেতে না যেতেই এরকম খাঁচা ছাড়া ব্যাঘ্র শাবকের সাথে পরিচয়।নিজেকে কেমন জানি মাতৃহীন হরিণের বাচ্চার মত লাগছিল।অনাগত দিনগুলোর কথা ভেবে দিনের বেলাতেই আমার রাতের ঘুম হারাম হওয়া নিশ্চিত হয়ে গেল।

জাহিদ রেজা ভাইএর সাথে প্রথম সামনা সামনি দেখার সৌভাগ্য হতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলোনা।কয়েকদিন পরের কথা।বিকেলে হাউসের সামনের পথ ধরে কয়েক জন ক্লাসমেট সহ ক্যান্টিনে যাচ্ছিলাম।হঠাৎ কেউ একজন ফিস ফিসিয়ে বললো-"দেখ দেখ...পোর্চে তাকিয়ে দেখ।" কথা শুনে লুক ডাউন অবস্থা থেকে সামনে হাউস পোর্চে তাকিয়ে দেখি দশাসই সাইজের এক সিনিয়র,ছয় ফুট লম্বা তো হবেই,শুধু একটা শর্টস পরে বডি বিল্ডিং করছে। সবজান্তা ইরাদ সাথে সাথে বলে উঠে-"তোরা কেউ এই সিনিয়রটাকে চিনিস?"আমরা এক জন আরেক জনের দিকে শুধু মুখ চাওয়া চাওয়ি করি।কেউই চেনেনা।
"আরে এইটাই হইল জাহিদ রেজা ভাই।" বলে ইরাদ এর সবজান্তা টাইপের হাসি। জাহিদ রেজা ভাইরে চেনার জন্যে এই বছরের নোবেলটা তারেই দেয়া হইতেসে এমন একটা ভাব।
মনে মনে ভাবি- হুম্‌ম...ইনিই তাহলে জাহিদ রেজা ভাই।যার কথায় ক্লাশ সেভেন আর ক্লাস নাইন এক ঘাটে জল খায়।(ক্যাডেট কলেজে ক্লাস সেভেন-নাইনের মধ্যেকার রিলেশন বাঘ মহিষের চেয়েও ডেঞ্জারাস।অবশ্য মাইর গুলা সব সময় নাদান ক্লাস সেভেন এর কপালেই জোটে।কিন্তু রুমে ফিরে এসে মাসুম বাচ্চাগুলা ক্লাস নাইনের উদ্দেশ্যে যে গালি অমৃত বর্ষণ করে তা' শোনার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য কারো হলে মাইর খাওয়াকেই বরং অনেকে স্বস্তিকর ভাবতে পারেন।)
যাইহোক...কয়েকদিন পরেই আরো ভাল ভাবে মোলাকাত ঘটল।আদনান দোতলায় জাহিদ রেজা ভাইএর রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল।হঠাৎ ভিতর থেকে বাঁজখাই কন্ঠের ডাক-
"অই ক্লাস সেভেন,এইদিকে আয়।" ক্লাস সেভেনে কারো কোন নাম থাকেনা এমন একটা অবস্থা।সবচেয়ে বড় পরিচয় যে ক্লাস সেভেনে পড়ি।সবাই একই সাথে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা। ফাই ফরমায়েশ খাটতে খাটতেই দিন গুজরান করতে হয়।
গায়ের স্লীপিং শার্টটা খুলে আদনানের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন-
- "নিচের বোতামটা ছিড়ে গেসে।যা,সেলাই করে নিয়ে আয়।"
- "জ্বী,আমাকে আরেক সিনিয়র কাজ দিসেন।" ভয়ে ভয়ে আদনানের উত্তর
কিছুক্ষন কট মট করে তাকিয়ে থেকে জাহিদ রেজা ভাই বললেন
- "আচ্ছা তুই যা,আরেকটারে পাঠা।"
নিচতলায় এসে আদনান আমাদের ক্লাসমেট একজনের পর একজনকে অনুরোধ করতে লাগলো যাবার জন্য।কিন্তু কারো নাম নির্দিষ্ট না করে বলায় কেউই যেতে চাচ্ছেনা।কে আর শখ করে মরতে চায়।সবাই খালি বলে-আমারে ক্যান,অমুকরে বল।ওর তো কোন কাম নাই। এরকম অমুক তমুক করতে করতে সময় যে বেশ গড়িয়ে গেছে সেদিকে কেউ খেয়াল করিনি।

ফলাফলটা বোঝা গেল একটু পরেই...

(বাকী অংশ পরের পর্বে।আজকের জন্য বহুত লিখা ফালাইসি।হে হে)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:৫৪
৯টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×