তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি তিনি আস্তে আস্তে বাগানের পথ ধরে এগিয়ে আসছেন। ঘামে ভেজা খালি গায়ের অবাধ্য পেশীগুলো বিকেলের রোদ পড়ে চিক চিক করছিলো। অমন চমৎকার একটা শরীর গঠনের আশায় অনেক ক্লাসমেটই গেমস এর পর রুমে এসে নিয়মিত ব্যায়াম করতো।তাদের বেশির ভাগই আমার মত শেষ মেষ "হ্যাংলা পাতলা গ্রুপ" ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসতে পারেনি। কয়েকজন অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারোরই আর 'জাহিদ রেজা' হয়ে ওঠা হয়নি।
আরেকটু কাছে আসতেই ম্যাডামও তাকে দেখতে পেলেন।অমন অবস্থায় দেখতে পেয়ে অপ্রতিভ ভাব লুকাতে ম্যাডাম হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন- "জাহিদ রেজা,কেমন আছো?" কোন উত্তর এলোনা। তখনো সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একেবারে ম্যাডাম বরাবর। ধীরে ধীরে ম্যাডামের সামনে এসে থামলেন। দুজনের মাঝখানে কেবল পাতাবাহারের গার্ডেন ফেন্স। তখনো কারো মুখে কোন কথা নেই। আমরাও নিশ্চুপ দর্শক। কৌতূহল আস্তে আস্তে বাড়ছে। এর পর জাহিদ রেজা ভাই যা করলেন আমরা এতটা আশা করিনি। ম্যাডামও যে এমন কিছুর কথা ভাবেননি সেটা বাজি ধরে বলতে পারি। হাতের পাশেই ছিল পপি ফুলের গাছ। একটানে একটা ফুল ছিড়ে বাড়িয়ে ধরলেন ম্যাডামের দিকে। দুচোখের সব মুগ্ধতা মুখে ফুটিয়ে বললেন- "ম্যাডাম,আপনাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে!!" ব্যাপারটাকে মোটামুটি ভয়ংকরই বলা যায়।ক্যাডেট কলেজের মত জায়গায় তো বটেই। কিন্তু ফুল বাড়ানো হাতের আহবান এড়ানো কি আর এত সোজা কথা। ম্যাডামও সেই কঠিন কাজটি করতে পারেননি। ক্ষনিকের জন্য অপ্রস্তুত ভাব সামলে হাত বাড়িয়ে ফুল নিয়ে কোনমতে কেবল বলতে পেরেছিলেন-"থ্যাংক্স!!"
আমি তখনো হা করে দাঁড়িয়ে। পুরো দৃশ্য গোগ্রাসে গিলছি। শেষ বিকেলের রোমান্টিক আলোয় দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বারের মত ম্যাডামের ফর্সা মুখটাতে লজ্জা জমে ওঠার দৃশ্য উপভোগ করছি। হৃদপিন্ডটা এবারো লাফাচ্ছিল।তবে ভয়ে নয়। হঠাৎ করে দানা বেঁধে ওঠা মধুর উত্তেজনায়। আর কিছুটা বোধহয় হিংসায়। ঐ মুহূর্তটার জন্য আমার বড় বেশি 'জাহিদ রেজা' হতে ইচ্ছে করছিল।
এরপরেও নানা কারনে নানা সময়ে জাহিদ রেজা ভাইএর সংস্পর্শে এসেছি। কারণে অকারণে বকা খেয়েছি। মাইরও খাইসি। কিন্তু প্রথম বারের মত তেমন করে আর ভয় লাগেনি। ততদিনে ভীতিকর চেহারা ছাপিয়ে তাকে স্নেহ প্রবণ এক সিনিয়র হিসেবেও আবিস্কার করা শুরু করেছি। প্রথম দিকে কোন কারণে বকা দিলে বা মাইর খাইলে রাগ লাগতো,মন খারাপও হত।পরে অবশ্য সে নিজেই ডেকে মাঝে মাঝে বোঝাতো। "ভাই আমার উপরে রাগ করিস না। জানিসইতো মাঝে মাঝে আমার মাথা টাথার কোন ঠিক থাকেনা।" রাগগুলো কোথায় যেন চলে যেত তখন।
মানুষটা হাউসকে অসম্ভব ভালোবাসতো। ভালবাসতো হাউসে থাকা এই আমাদেরকে। কলেজ ছেড়ে চলে যাবার দিন জাহিদ রেজা ভাইএর মত অমন করে আর কাউকে কোনদিন কাঁদতে দেখিনি। বিশাল বুকটাতে মুখ গুজে সেদিন আমিও তার শার্ট ভিজিয়েছিলাম। কলেজ থেকে বেরোবার পর প্রথম পিকনিকটাতে তিনি এসেছিলেন হাউস কালার ব্লু ভেস্ট পরে। কোথায় পেলেন জিজ্ঞেস করতে জানা গেল যাবার আগে সেটা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই আগের মতই ছোট ছোট করে ছাটা চুল। হাসিখুশি,প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক মানুষ। আমাকে দেখতে পেয়ে অনেক দূর থেকে কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন- "কিরে,কেমন আছিস?" হৃদপিন্ডটা সেদিন লাফায়নি।ভালবাসার গভীরতা বুঝতে পেরে দিঘীর জলের মত শান্ত হয়ে গিয়েছিল।
সেদিনই তার মুখে শুনলাম পড়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছেন। সাথে সাথেই মনে পড়লো সেই জেন (zane) নামের স্বর্ণকেশী অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটার কথা। জাহিদ রেজা ভাইএর পেন ফ্রেন্ড। তার লকারে স্কচ টেপ দিয়ে বড় সড় একটা ছবিও লাগানো ছিল। কখনো তার রুমে গেলে আড় চোখে ঐ ছবি দেখতে কখনো ভুল হতোনা। সাগর নীল চোখ দুটোতে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখ রাখতে গিয়ে কতবার যে ধরা খাইসি তার ইয়ত্তা নেই। হাউস অফিস থেকে এয়ার মেইলের মন ভোলানো খাম যেদিন তার হাতে এনে দিতাম বিনিময়ে সবসময়ই কিছু না কিছু দিতেন। বেশির ভাগ সময়ই পেয়েছি চকলেট। অস্ট্রেলিয়ায় গেলে নিশ্চয়ই সেই স্বর্ণকেশীর সাথে দেখা হবে।হয়তোবা অপেরা হাউসের সন্ধ্যা আলোয় প্রথম বারের মত একে অপরকে চিনে নেবে দুজন। কে জানে সেদিন হয়তোবা জেন আপুর মুখটা পারভীন ম্যাডামের চেয়েও আরো অনেক বেশি লাল হয়ে উঠবে। এইসব আকাশ কুসুম ভাবি আর মনে মনে হাসি। কিন্তু কথাগুলো আর মুখফুটে বলা হয়না।কী আজিব... এখনো ভয় লাগছে বলতে!! অথচ এমন হবার কোন কারণই নেই। কিছু কিছু মানুষকে বোধহয় ভয় পেতেও ভালো লাগে।
জাহিদ রেজা ভাই অস্ট্রেলিয়া চলে গেলেন। মাঝে মাঝে শুধু এর ওর কাছে টুকরো টুকরো খবর শুনতাম। শেষবার যখন দেশে এসেছিলেন তখন আমরা ক্লাস ইলেভেন এ। কলেজেও এসেছিলেন এনুয়াল এথলেটিক্স এর সময়। তাকে দেখে অবাক না হয়ে পারিনা। চার বছরের ব্যাবধানে ক্লাস সেভেনের সেই ছোট ছোট ছেলেগুলো একটু একটু করে অনেক বদলে গেছে। আমাদের দেখে নতুন আসা ক্লাস সেভেন এর পোলাপানগুলাই আজ ভয়ে কাচুমাচু হয়। ভারিক্কী ঢং এ পুরো কলেজ দাপড়ে বেড়াই। অথচ তিনি একটুও বদলাননি। আমাদের নতুন সময়েও পুরোনো সেই জাহিদ রেজা ভাই।আগের মতোই জোশিলা আর ছটফটে। আমাকে দেখে এবারো চিনতে ভুল করেননি। হাসিমুখে সেই একই প্রশ্ন-"কিরে,কেমন আছিস?"
দেখতে দেখতে এক সময় আমাদের কলেজ লাইফও শেষ হয়ে এলো। ঘুরতে ঘুরতে শেষমেষ আই ইউ টি তে এসে জুটলাম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। ফার্স্ট সেমিস্টারের মাঝামাঝি কোন এক দিনের কথা। আই ইউ টি তে পড়া কলেজের এক সিনিয়রের মুখে প্রথম শুনলাম কথাটা। জাহিদ রেজা ভাই সিডনীতে কার এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন। শুনে হৃদপিন্ডটা লাফায়নি। মনে হলো কিছুক্ষনের জন্য স্থির হয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের গা বেয়ে জড়িয়ে ওঠা রাস্তা থেকে অনেক নিচে খাদে ছিটকে পড়েছিলো গাড়িটা। জাহিদ রেজা ভাই নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। অমন বিশাল আকারের মানুষটার শরীর নাকি এত বেশি পুড়ে গিয়েছিল যে লাশ দেখে সনাক্ত করা যায়নি। সব শুনে বুঝতেই পারিনি চোখদুটো কখন ঝাপসা হয়ে এসেছে। টুকরো টুকরো কত শত স্মৃতি ঠেলে ঠুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বুক ছিড়ে। খুব বেশি করে মনে পড়ছিল আন্তঃ হাউস প্রতিযোগিতায় তার একক অভিনয়টুকুর কথা। ডঃ ফস্টাস হয়ে লুসিফারের কাছে দু হাত জোড় করে জীবন প্রার্থনা করছিলেন চোখ ভরা আকুতি নিয়ে। অমন চমৎকার অভিনয় দেখে সেদিন চোখ ভিজে উঠেছিলো ডঃ ফস্টাস এর অসহায়ত্বের কথা ভেবে। কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়লো আজও। গাড়ির মধ্যে জীবন্ত দগ্ধ হতে হতে হয়তো সেদিনও আকুতি জানিয়েছিলেন অসহায় ডঃ ফস্টাস এর মত। লুসিফার নয়,বিধাতার কাছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। ছয় ফুটী শরীরটা পুড়তে লাগলো ততক্ষণ।যতক্ষন পর্যন্ত তাকে 'জাহিদ রেজা' বলে আর না চেনা যায়।
বড় অসময়ে চলে গেলেন তিনি।
হৃদপিন্ডটা মাঝে মাঝে আজো লাফিয়ে ওঠে বিশুদ্ধ আবেগে। জাহিদ রেজা ভাইএর কথা ভেবে। অবচেতন মন এখনো নিরর্থক অপেক্ষায় থাকে। কাঁধে পরিচিত সেই হাতের ভর অনুভবের আশায়। পিছন ফিরে তাকালেই যেন পুরোনো দিনের উষ্ণতায় বলে উঠবেন- "কিরে,কেমন আছিস??"
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



