আমার জন্মের সময়কার কথা- ঝড়ো বাদলের সময়। চারদিকে শনশন বাতাসের তীব্রতা, আর আমার মায়ের কষ্ট যন্ত্রণা এবং সেই সাথে অসংখ্য দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে এই পৃথিবীতে যখন আসলাম, তখন চারদিকে আনন্দের কল্লোল ধ্বনি বইতে লাগলো। কিন্তু সেই সুখ বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
জন্মের দুইদিনের মাথায় মেঘলা বাদলের ঝড়ো বাতাসে আমার ঠান্ডা লেগে গেলো। রীতিমত কঠিন ঠান্ডা। তখনকার সময়ে ময়মনসিংহ থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে একটি অজপাড়া গাঁয়ে একটি কুইনান নির্ভরশীলহীন ভালো ডাক্তার পাওয়া দূরহ ব্যাপার ছিলো। আমার মা ছিলো নানী বাড়ীর বড় আদরের মেয়ে-বোন। তাই ছোট মামা বজ্রবৃষ্টি, চৌদ্দ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা হেঁটে ময়মনসিংহ থেকে ডাক্তার নিয়ে আসলো।
নিউমোনিয়া। ডাক্তার ওষুধ দিয়ে গেলো, চিন্তা করতে নিষেধ করে গেলো। কিন্তু প্রকৃতি যেন আমাকে কেড়ে নেওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে গেলো। রাক্ষসের মতো যেন উন্মাদ হয়ে গেলো আমাকে গিলে খাবার। তাইতো প্রতিদিন ঝড়ো বাতাসের সাথে বজ্রবৃষ্টির একটা পাল্টাপাল্টি খেলা চলতে লাগলো। আমার অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে ডাক্তার এসে দুইবার দেখে গেলো।
৪২ দিনের দিন আমার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। ছোট মামা ময়মনসিংহ ছুটল। বড় মামা যে কিনা গ্রাম্য ডাক্তার সবসময় আমার পাশে বসে রইলো। মায়ের চোখের পানিতে যেন এই ধরনীর পানি লজ্জা পেলো। তাইতো একটু রোদের আভা ছড়িয়ে গেলো। কিন্তু সেই আভা বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একটা মৃত্যুটান দিয়ে আমি নিথর হয়ে পড়ে রইলাম। সবার আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে গেলো। বড়মামা গলার তাবিজগুলো খুলে ফেললো।
কিন্তু আমার মা বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। সাথে সাথেই জায়নামাজে বসে পড়লো। চিৎকার করে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসা করলো হে আল্লাহ আমি না আমার সন্তানকে ভিক্ষা চেয়েছিলাম, তুমাকে না কথা দিয়েছিলাম আমার সন্তানকে আমি সঠিকভাবে মানুষ করবো। হে আল্লাহ তুমি আমার একটা ছেলেকে কেড়ে নিয়েছ, এখন এই সন্তানটাকেও কেড়ে নিলে। এখন আমি কি নিয়ে বাঁচব? হয় তুমি আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও, না হয় আমাকেও নিয়ে নাও। ধীরে কন্ঠ নিস্তেজ হয়ে গেলো মার। আল্লাহর কাছে কাকুতি নিয়ে বললো আল্লাহ আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও আমি তুমার নামে মহিষ কোরবানী দিব। আম্মা খুব কাঁদতে লাগলো।
সেই সময় আমি হঠাৎ করে একটি হেসকি দিই। এইদিকে ছোটমামাও ডাক্তার নিয়ে এসে পড়লো। আমিও আমার মার কাছে, পরিবার-পরিজনদের কাছে, আপনাদের কাছে ফিরে আসলাম।
এই লিখাটি যখন লিখছি বারবার চোখ জাপসা হয়ে আসছে। মার কথা খুব মনে পড়ছে। মাকে জীবনের চেয়েও অনেক বেশী ভালোবাসি। মামার বাড়ীর ঝণ কখনো শোধ করতে পারবোনা। শুধু তাদের সপ্ন পূরণের জন্যই আমার এই পথচলা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

