somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফতোয়া ১৯ - প্রসঙ্গ - তালাক সংক্রান্ত হাদীস

২০ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রশ্ন : তালাক সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আলেমরা এবং ফকীহরা রসূল (স.)-এর নিম্নোক্ত হাদীসের ওপর নির্ভর করেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল জিনিস হচ্ছে তালাক। কতিপয় আলেমে হাদীস এই হাদীসকে যঈফ বলে অভিহিত করেন। আপনার জানামতে অন্য এমন কোনো দলিল কি রয়েছে যাতে তালাকের অপছন্দনীয় হওয়ার উল্লেখ রয়েছে?

উত্তর : আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি নিম্নোক্ত শিরোনামের অধীনে দেয়ার চেষ্টা করবো। ১. এই হাদীসের সহীহ হওয়ার প্রমাণ। ২. কোরআন হাদীসের সেই উদ্ধৃতি যার দ্বারা তালাককে অপছন্দনীয় বলা হয়েছে। ৩. শরীয়তের নীতিমালায় এই অপছন্দনীয় হওয়ার সমর্থন।

১. আবু দাউদ ইবনে মাজা এবং হাকেম এই হাদীসকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রসূল (স.) এ রকম বলেছেন। ইমাম বায়হাকী এই হাদীসকে মুরসাল বলেছেন। অর্থাৎ এই হাদীসের সনদে সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর উল্লেখ নেই। ইবনে জাওযি এই হাদীসের একজন রাবী ওবায়দুল্লাহ ইবনে ওলীদ আল ওছাফিকে যঈফ বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইমাম সুয়ুতী এই হাদীসকে সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।

উপরোক্ত ওলামায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে আমি মনে করি যে, এই হাদীস যদি সহীহ মর্যাদাসম্পন্ন নাও হয় তবে হাসান শ্রেণীর মর্যাদার চেয়ে কিছুতেই কম নয়। যারা এই হাদীসের বর্ণনার কোনো কোনো দিককে যঈফ বলেছেন, তারা বলেন একই জিনিস একই সময়ে হালাল এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এই দুই রকম হতে পারে কি ভাবে?

কোনো কোনো আলেম এ কথার জবাবে বলেছেন, হালালের একটি রকম এমনও রয়েছে, যা আল্লাহর দৃষ্টিতে মাকরূহ। ইমাম খাতাবি বলেন, তালাকের মধ্যে মাকরূহের কিছু নেই বরং মাকরূহ সেই উপাদানে রয়েছে যেসব উপাদানের কারণে তালাক দেয়া হয়। কেউ কেউ এই ব্যাখ্যা করেছেন যে, তালাক এমনিতে হালাল কিন্তু এর মধ্যে মাকরূহ হচ্ছে সেটা যা কিনা তালাকের পরিণামে দেখা দেয়।

২. কোরআনে হাদীসে এ রকম সাক্ষ্য বিদ্যমান রয়েছে যা দ্বারা তালাকের অপছন্দ হওয়া প্রমাণিত হয়। কোরআনে স্বামীদের তাকিদ দেয়া হয়েছে তারা যেন নিজেদের অপছন্দ করা স্ত্রীদের তালাক না দেয় বরং তাদের সাথে যেন মানিয়ে চলার চেষ্টা করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'তোমরা যদি তাদের পছন্দ নাও করো তবুও তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো, এমনও তো হতে পারে যে, যা তোমরা পছন্দ করো না, তার মধ্যেই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্যে অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রেখে দিয়েছেন।' (সূরা আন নেসা, আয়াত ১৯)

অবাধ্য স্ত্রীদের বিষয়ে কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'তবে যদি তারা (এমনিই) অনুগত হয়ে যায়, তাহলে (খামাখা কষ্ট দেয়ার) জন্যে অজুহাত খুঁজে বেড়িয়ো না।' (সূরা আন নেসা, আয়াত ৩৪)

চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে, অবাধ্য স্ত্রীদের সাথে যখন বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আনুগত্য পরায়ণ এবং পূন্যশীল স্ত্রীদের ওপর তালাকের যুলুম কিভাবে চাপিয়ে দেয়া যাবে?

আল্লামা ইকবাল ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, তালাক আসলে নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র প্রয়োজনের সময়ে এর অনুমতি দেয়া হয়েছে। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ইবলিস তার আসন সমুদ্রে স্থাপন করে, তারপর চারিদিকে নিজের অনুসারীদের পাঠায়। যে শয়তান সবচেয়ে বেশী অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে সে ইবলিসের অধিক নৈকট্য লাভ করে। নিজের কাজের বিবরণ দিয়ে সে ইবলিসকে জানায় যে, আমি তাদের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছি, তারপর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি। এ কথা শোনার পর ইবলিস তার সেই অনুসারীকে কাছে ডাকে এবং তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ একটি শয়তারী কাজ এবং অপছন্দনীয় কাজ।^

আল্লাহ তায়ালা জাদু বিদ্যার নিন্দা করে বলেন,
'তারা তাদের কাছ থেকে এমন কিছু বিদ্যা শিখে নিয়েছিলো, যা দিয়ে এরা স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের সৃষ্টি করতো।' (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১০২)

অন্য একটি হাদীসে রসূল (স.) বলেন, যেসব মহিলা খোলা (তালাক) করায় তারা মোনাফেক।'^^

অন্য একটি হাদীসের মর্মকথা হচ্ছে, যে মহিলা কোনো কারণ ব্যতীত নিজের স্বামীর কাছে তালাক দাবী করেছে তার জন্যে জান্নাতের সুগন্ধি হারাম।

এসব যুক্তির আলোকে বলা যায় যে, তালাক প্রকৃতই একটি অপছন্দনীয় কাজ।

৩. বিখ্যাত ফেকাহর কেতাব হেদায়ায় তালাকের প্রসংগে বলা হয়েছে যে, তালাক এমন বিবাহকে শেষ করে দেয় যে বিবাহের মাধ্যমে দুনিয়ার এবং দ্বীনের কল্যাণ নির্ভর করে।

তালাক সম্পর্কে হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীদের অভিমত আলমুগনী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, তালাক স্বামী স্ত্রী দু'জনের জন্যেই ক্ষতিকর এবং কষ্টদায়ক। অকারণে তালাক দেয়া হারাম।

হানাফী মাযহাবের অনুসারী ইবনে আবেদীন বলেছেন, অকারণে তালাক দেয়ার মধ্যে কোনো ফায়দা নেই বরং অকারণে তালাক দেয়া নির্বুদ্ধিতা এবং বোকামীর পরিচয় প্রকাশ করে। এ রকম তালাক শরীয়তে নিষিদ্ধ।

এ সকল যুক্তি প্রমাণের আলোকে এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, তালাক প্রকৃতই একটি অপছন্দনীয় কাজ। আল্লাহর কাছে তালাক অপছন্দনীয় হালাল বলে আপনি প্রশ্নে যে কথা উল্লেখ করেছেন, সেই হাদীস একটি সহীহ হাদীস।^^^


তথ্যসূত্রঃ
^ ফতোয়া ইবনে তাইমিয়া। ৩৩তম খন্ড, পৃষ্ঠা ৮১
^^ সুনানে তিরমিযীর বর্ণনা।
^^^ সুনানে তিরমিযীর বর্ণনা।



*** জবাব দিয়েছেন শায়খ ইউসুফ আল কারদাওয়ী ***
*** অনুবাদ করেছেনঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ ***
৯৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×