বিসিএস হল একটা জগাখিচুরী পরীক্ষা। এই পরীক্ষার প্রীলিতে (যেহেতু আপাতত সেটাই একমাত্র সাফল্য তাই এর থেকে বেশি বলতে পারবনা) যা আসে সেটার সিলেবাস ব্যাপক। তবে এমন কোনকিছুই আসবেনা যা আপনি বুঝবেননা বা এর আগে পড়েননি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। মাইলসের শাফিন মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলে আকাশে চেয়ে দেখত তারার মেলা জোছনার খেলা (এরকম একটা গান আছে) আমি মকর রাশির জাতক আমার মধ্যে রোমান্টিজম কম। তাই মনে হল ব্লগে প্রিলীর গল্পটাই লিখি। এখানে আগেই বলে রাখি এটা খালি একটা ব্লগ পোস্ট দিচ্ছি। কাউকে উপদেশমালা বা এরকম কিছুনা। সেরকম যোগ্যতাও আমার নেই। আর বিসিএস প্রিলী আমার ধারনা শিক্ষা জীবনে সবাই একবার করে টিকে।
বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার থেকে বেশি ঝামেলা হল এর প্রসিডিউর। ফর্ম কেনা একটা ঝামেলা। সেই ফর্ম পূরন করা আরেকটা ঝামেলা। সেই ফর্ম জমা দেওয়া যুদ্ধ জয়ের মত ব্যাপার। টিপু সুলতানের হাতি বাহিনীর সাহায্য ছাড়া এই ফর্ম জমা দেওয়া অত্যন্ত দুরহ কাজ। সেই কাজ সম্পাদন করতে হলে আক্ষরিক অর্থেই আপনাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষার কাজটাই করতে হবে। লাইনে দাড়াবেন। কেউ একজন আপনাকে পিছন থেকে বল দিবে। সেই বলে সামনের দিকে আপনার সরণ হবে। অবশেষে ৫-৬ ঘন্টা লাইনে থাকার পর ফর্মটা হয়ত জমা দিতে পারবেন।
এবারে সরাসরি পরীক্ষার দিনে চলে যাই। যেহেতু আমি সাইন্সের ছেলে তাই আমাকে পড়তে হবে বাংলা আর আজকের বিশ্ব। এরকমই নিয়ম। বিসিএস টিকতে হলে আজকের বিশ্ব খুব জরুরী। কোরআন খতম না দিলে যেমন মুসলমান হিসেবে সঠিক পরিচয়টা ফুটে উঠেনা আজকের বিশ্ব না পড়লে বিসিএস পরীক্ষার্থী হওয়া যায়না। তা আজকের বিশ্ব জিনিসটা কেউ যদি একবার হাতে নেয় তার পরে তাকে বলতে হবে, আমারে বিষ দাও। এর থেকে বাংলাদেশ সচিবালয়ের টেলিফোনের ডিরেক্টরী পড়া সহজ হতে পারে। তাই এর থেকে কারেন্ট এফেয়ার্স পড়া অনেক সহজ মনে হল। সেটাকে সম্বল করেই পরীক্ষা হলে গেলাম। সিট পড়েছে তেজগাও কলেজে। ৩৭০০ জনের সিট সেখানে একটি মাত্র কাগজে সিটপ্লান দেওয়া। কি কষ্ট হয়েছে বলে বুঝাতে পারবনা। সিট দেখতে গিয়ে হাজার মানুষের রোষানলে পড়লাম। হাত উঠায় রোল নম্বর দেখতে গিয়ে হাতের বাড়ি খেয়ে ২ জন পড়ে গেল। ওমর ফারুক অঙ্গুলি হেলনে বিশ্ব শাসন করতেন আমি কনুই হেলনে আজকের বিশ্ব টাইপ লোকজনকে খেপিয়ে দিলাম। চুপচাপ এক কোনায় এসে কারেন্ট এফেয়ার্স দেখতে লাগলাম। তখন নিরাশার বিপরীতে এক রুপবতি তরুনি এসে জিজ্ঞেস করল আচ্চা ভাইয়া, মোহামেডান লিটেরারী সোসাইটি কে বানিয়েছিলেন? পড়লাম ফাপরে। এইডা কি নওয়াব আব্দুল লতিফ বানাইছে না সৈয়দ আমীর আলী!! পরীক্ষা হলে ভুল করা যাইতে পারে কিন্তু রপবতী তরুনীর কাছে ভুল করা যায়না। তবে তাকে কি জবাব দিছিলাম মনে নাই।
রুমে ঢুকলাম। আমার রোলের শেষের দুই অক্ষর ৮৬। কি আজব ব্যাপার!! ৮৪ পর্যন্ত রোল আছে আর নাই!! বেকুব হয়ে গেলাম? ডাইনে বায়ে যেদিকেই তাকাই আমার রোলের সিট নাই!! আমার বেগতিক অবস্থায় দুই একজন সাহায্য করতে এগিয়ে আসল। একজন সরাসরি বলল, আপনি জিকসেস না?? তার জবাব শুনে আমি নিজেও হা হয়ে গেলাম!! সম্বিত ফিরে পেয়ে বললাম ভাই আমার সিট পাইতেছিনা। পুরা রুম মিলে আমার সিট খুঁজে পেল। তা ৮৪ এর আরেক মাথায়। কোন লজিকে, কোন এনালাইটিক এবিলিটি বা মানসিক দক্ষতাতেও যদি এই রুমের ছবি দিয়ে বলে আমার সিট কই? তার আগের ৮৪ দেখে জীবনেও কেউ বুঝবেনা ৮৬ সেখানে হতে পারে। মনে আছে আমার এক খালাতো বোনের বাসা মোহাম্মদপুর বাঁশবাড়ি। বাড়ির ঠিকানা ১১৯/১ জাতীয় কিছু। আমি ১১৯/২ খুঁজে পেয়ে খুশি হইছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম ১১৯/১ কোথায়?? কি আজব ব্যাপার। ১১৯/২ এর লোক জানেনা ১১৯/১ কোথায়!!
সেট পড়েছে ১ নম্বর সেট। বাংলা ২০টার মধ্যে পারি ৫-৬ টা। তার আগেই আমার পাশের লোক ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেইল শুরু কএর দিয়েছে। সে নাকি অঙ্ক পারেনা বাংলা পারে। বলে রাখি কথা বলার খুব ভাল সুযোগ নেই। মোটামুটি কড়া গার্ড। আমি বাংলা ৫-৬ টা দিয়ে ইংলিশে গেলাম। এভাবে আগাতে থাকলাম। যা পারলাম দিলাম। সমস্যা হল অঙ্কে। রম্বসের কর্নের দৈর্ঘ্য এতই সুন্দর করে ৬ ও ৪ দেওয়া যে তা দেখা মাত্র গুন করে দিয়ে ক্ষেত্রফলের উত্তর দিলাম ২৪। কেমন যেন একটু খটকা লাগল। বর্গক্ষেত্র এর বাহু এ হলে কর্ন রুট টু এ। কাজেই কর্ন গুন করে অর্ধেক করলে ক্ষেত্রফল হবে। রম্বসেও তাই হওয়ার কথা। এর মাঝে একটা অঙ্ক আসছে তিনজন একটা কাজ ১৫,৬,১০ দিনে করতে পারে একত্রে কয়দিনে করতে পারবে?? অপশন গুলা সেইরকম- ১৫,১৮,২১ আর ৭। সব থেকে স্লো যে কাজ করে সেই করে ১৫ দিনে আর তিনজন মিলায় নাকি করবে ১৫,১৮ আর ২১ দিনে। প্রশ্নে বিরাট ভুল। আফসুস।
এবার আবার বাংলাতে আসলাম। এর মাঝে আমার পাশের জন অঙ্ক করে ফেলেছে আমারগুলা দেখে। এবার তার বাংলা দেখানোর পালা। কিন্তু তিনি যখন সমাসের প্রশ্নে উত্তর বললেন সুপসুপা সমাস না সুপথাই সমাস তখনি আমার ছোট বেলায় আম্মার উপদেশ মনে পড়ল। নিজে যা পার দাও। আমিও সেই ভাবে বুঝলাম যা দিতে হবে আমাকেই। এর উপর ভরসা করা যাবেনা। সমাস তো পারিনা। বানান শুদ্ধ কোনটা এটা দিলাম নিশীথিনী। অনেকটা ছোট বেলায় অবু দশ, বিশ, তিরিশ গুনে যেভাবে সেভাবে দিলাম। এখানে আমার এক বন্ধুর এক মজার কাহিনী আছে। আমার বন্ধুর সামনে যে মেয়ে বসেছিল তার পরনে যে ফতুয়া ছিল ফতুয়ায় লেখা নিশীথিনী নিশীথিনী নিশীথিনী নিশীথিনী নিশীথিনী । দেওয়াল নামক দোকানের ফতুয়ার ডিজাইন এরকম। বন্ধু মেয়েটাকে দেখেই সঠিকটা দাগিয়ে দিল। তবে মেয়ে কিন্তু আবার ঘুরে নাকি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিল এটার বানান কি। বন্ধু কি আর বলতে পারে- আপা আপনার ফতুয়াতে লেখা আছে।
রেলপথ থেকে খুলনার দুরত্ব জানিনা। কার্ল মাক্স কোন দেশে মৃত্যুবরন করেছে জানিনা। আফঘানিস্তানের শেষ বাদশাহ কে ছিল তাও জানিনা। তবে যা জানি তা দিয়ে দেখলাম ভালই হয়। তবে আমার পাশের লোক আমাকে বলল তার বাড়ি নাকি খুলনা। তাই দাগাইলাম ৪২০ কিলোমিটার। পরে জানতে পারি ভুল দাগিয়েছি। মায়ের উপদেশ শুনতে হয়। গাড়ি চলেনা, চলেনা, চলেনা রে গাড়ি চলেনা- এই গানটি যদি বাপ্পা মজুমদার অথবা সঞ্জীবদা লিখত তাহলে কখনো এটা বিসিএস এ আসতনা- এরকম মনে করে শাহ আব্দুল করিম দিলাম (এটা আসলে পরীক্ষায় উত্তর দেওয়ার জন্য এমন চিন্তা)।
৩১ তম বিসিএস এর প্রিলীর রেজাল্ট দিয়েছে। ১,৬৫,০০০ এর মধ্যে ১০,২১৪ জনকে নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে এক ভাগ্যবান আমি। তবে এটা খুবই নগন্য সাফল্য। অনেকদিন ব্লগ লিখিনা এত রাতে ঘুম আসছেনা তাই এটা লিখলাম। না লিখলেও চলত।
* একটা জিনিস লিখতে ভুলে গেছি। এবার বিসিএসে এসেছিল এলওসি - সীমানা কোথায় অবস্থিত? এটা পারার একমাত্র কারন এটা নিয়ে একটা সিনেমা ছিল। হিন্দি সিনেমা। অনেক গুলা নায়ক নায়িকা ছিল।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০১১ রাত ১০:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


