আসাদ জোবায়ের
(সাপ্তাহিক ২০০০ এর চলতি সংখ্যায় প্রকাশিত)
প্রতিবছর শুষ্ক মওসুম এলেই লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি ঢাকাবাসী মুখোমুখি হয় তীব্র পানি সঙ্কটের। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, সরকার সেনাবাহিনী নামাতে বাধ্য হয়। এ বছরও এর কোনো ব্যতিক্রম আশা করতে পারছে না ঢাকাবাসী। লোডশেডিং, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়া, বুড়িগঙ্গার পানি
পরিশোধন করার অনুপযোগী হয়ে যাওয়াই মূলত পানি সঙ্কটের কারণ বলে জানা গেছে। এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পানি সঙ্কট থেকে ঢাকাকে রক্ষা করা যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
পানি ব্যবস্থাপনা
ঢাকা শহরে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের বাস। গত বছর শুষ্ক মওসুমে রাজধানীতে পানির চাহিদা ছিল প্রতিদিন ২শ ২০ থেকে ২শ ২৫ কোটি লিটার। পানির এই চাহিদা মেটানো হয় গভীর নলকূপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং শীতলক্ষ্যার পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করার মাধ্যমে। ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২শ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে তারা। আসছে গ্রীষ্মে পানির ঘাটতি ৫০ কোটি লিটারে গিয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নদীর পানি সরবরাহ
বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরের তুলনায় ঢাকা শহরের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে এর চারপাশের নদী। এসব নদীই হতে পারত ঢাকা শহরের পানির প্রধান উৎস। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ঢাকা শহরের মোট চাহিদার মাত্র ১৩ থেকে ১৫ ভাগ পানি নদী থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পানি অতিমাত্রায় দূষিত হওয়ায় তা পরিশোধনের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে শীতলক্ষ্যা থেকে পানি এনে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারে প্রতিদিন প্রায় ২২ কোটি লিটার পরিশোধন করা হয়। তবে এ শোধনাগার থেকে সরবরাহকৃত পানি দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় প্রতিদিনই ওয়াসার গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন বলে জানা গেছে। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই দাবি করে আসছে শীতলক্ষ্যার পানিতে কারখানার দূষিত পানি ও বিষাক্ত কেমিক্যাল এবং বর্জ্য মিশে অনেক আগেই দূষিত হয়ে গেছে। সায়েদাবাদে পানি পরিশোধন করার পর কিছুটা দুর্গন্ধ থাকলেও তা দূষিত না। জানা গেছে, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের দ্বিতীয় ফেজ নির্মাণ শুরু হয়েছে। এটি শেষ হবে ২০১৩ সাল নাগাদ। এ শোধনাগার থেকে আরো প্রায় ২২ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে।
ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন
পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা মাথায় নিয়েই ঢাকা শহরের মোট চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হয় গভীর নলকূপের সাহায্যে মাটির নিচ থেকে উঠিয়ে। সূত্র থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরে বর্তমানে ৫শ ৬৬টি পাম্প বসিয়ে পানি তুলছে ওয়াসা। এছাড়া বেশকিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সেক্টরে ছোট-বড় অনেক পাম্প বসানো আছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার পাম্প দিয়ে প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ পানি উঠানো হচ্ছে প্রায় ১শ ৮০ থেকে ১শ ৯০ কোটি লিটার।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশেই বৃষ্টির পানি সংগ্রহ (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং) সিস্টেম চালু হলেও বাংলাদেশে এর প্রচলন নেই। একমাত্র ঢাকা ওয়াসা ভবনের ছাদে এক সময় এ ব্যবস্থা চালু করা হলেও পরবর্তীকালে তা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
গ্রীষ্মে আসছে পানি সঙ্কট
প্রতিবছরের মতো এ বছরও গ্রীষ্মে ঢাকা শহরে ব্যাপক পানি সঙ্কট দেখা দিতে পারে। ঢাকা ওয়াসা সূত্র থেকে জানা গেছে, এ সময় প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি লিটার পানি ঘাটতি হবে। এই পানি ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসাবে ওয়াসা বরাবরই লোডশেডিংকে দায়ী করে আসছে। এ বছর এ লোডশেডিং আরো বাড়তে পারে বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে। এ সময় বিদ্যুৎ ঘাটতি হতে পারে ২ হাজার মেগাওয়াট। সম্প্রতি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ বছর বোরো মওসুমে গ্রামাঞ্চলে রাতে নিরবচ্ছিন্ন ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। গত বছর সরবরাহ করা হয়েছিল ছয় ঘণ্টা। এ সময় বিদ্যুৎ শহরাঞ্চলে কম দিয়ে গ্রামে সরবরাহ করা হবে। এতে করে ঢাকায় লোডশেডিং গত বছরের চেয়ে এ বছর আরো বাড়তে পারে। ফলে ওয়াসার পানি সঙ্কটও বাড়বে সেই অনুপাতেই। তবে ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, গভীর নলকূপগুলোতে বিদ্যুতের ডুয়েল কানেকশন নেয়া হচ্ছে। এতে লোডশেডিং হলেও বিকল্প সংযোগ থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে মেশিন চালানো যাবে।
নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর
প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি ঢাকা শহরের মাটির নিচ থেকে তোলা হলেও মাটিতে পানি প্রবেশ করছে খুবই সামান্য। নগরীর সর্বত্র কংক্রিটে ঢাকা থাকায় বৃষ্টির পানি বা ব্যবহৃত পানি খুব সামান্য অংশই মাটির ভেতরে প্রবেশ করছে। এর ফলে প্রতিদিন ফাঁকা হচ্ছে মাটির নিচের স্তর। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বঙ্গোপসাগরের পানির গড় উচ্চতার তুলনায় এরই মধ্যে ১শ ৪০ থেকে ১শ ৬০ ফুট নিচে নেমে গেছে। আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ ফাঁকা জায়গা লবণাক্ত পানিতে ভরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে ঢাকা শহরে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি এবং সুপেয় পানির অভাবে শহরের জনজীবনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ুদ্র সেচ তথ্য সার্ভিস ইউনিটের প্রধান প্রকৌশলী ইফতেখার আলম জানান, ভূগর্ভ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে তা বৃষ্টি ও বন্যার মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে না বলেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে ওয়াসার কমপক্ষে ১শটি পাম্প বন্ধ হয়ে যাবে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায়। এ জন্য এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে বিপর্যয় দেখা দেবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির নিচের স্তর ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছর ১ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার করে দেবে যাচ্ছে ঢাকা শহর? এর ফলে যে কোনো দিন বড় ধরনের ভূমিধসের মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ঢাকা ওয়াসার এমডি যা বললেন
আসছে শুষ্ক মওসুমে ঢাকা শহরের পানি সঙ্কট মোকাবেলায় ঢাকা ওয়াসার পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, যেসব এলাকায় শুষ্ক মওসুমে সমস্যা বেশি হয় সেসব এলাকার তালিকা করা হচ্ছে। যেখানে গভীর নলকূপে সমস্যা আছে সেগুলো মেরামত অথবা নতুন নলকূপ বসানো হচ্ছে। পানির বণ্টন যেন সুষ্ঠু হয়, পানির চাপ যেন ঠিক থাকে সে জন্য আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করব।
লোডশেডিং মোকাবেলার জন্য সব ডিপ টিউবওয়েলে ডুয়েল সংযোগ নেয়ার
কাজ চলছে। আশা করি, আগামী গ্রীষ্ম আসার আগেই ৪৮ থেকে ৫০টি ডিপ টিউবওয়েলে বিদ্যুতের ডুয়েল সংযোগ আমরা নিতে পারব।
দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট মোকাবেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাটির নিচের পানির ব্যবহার কমিয়ে মাটির উপরের পানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যেই সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের দ্বিতীয় ফেজের কাজ চলছে। সেখানে তৃতীয় আরেকটি ফেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া কেরানীগঞ্জে ও খিলক্ষেতে আরো দুটি পানি শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পগুলো আগামী ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সমাপ্ত হলে মাটির উপরিভাগের পানির ব্যবহার ৭০ ভাগে উন্নতি করা যাবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা রেইন হার্ভেস্টিংয়ের ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার এমডি বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার ও মাটির নিচে রিচার্জ করার জন্য ইতিমধ্যেই আমরা একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছি। প্রকল্পটি সফল হলে ঢাকা শহরের এ রকম আরো প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা রেইন হার্ভেস্টিং পদ্ধতিতে পানি সঙ্কট অনেকাংশে কমাতে পারব।’
আমার আরো রিপোর্ট দেখুন এখানে
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



