ব্লগের আমি ব্লগের তুমি ব্লগ দিয়ে যায় চেনা

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১

২৯ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১০:৫১

শেয়ার করুন:                   Facebook

১.১

ফ্লাইট পৌঁছেছিলো সময়মতোই, প্লেনের দরজায় প্লাস্টিক-হাসি নিয়ে দাঁড়ানো বিমান-সুন্দরী বলে, হ্যাভ আ নাইস ডে। জবাবে পরিষ্কার বাংলায় তুমিও বলে বেরিয়ে আসে বিজু। জানে প্লাস্টিকবালা তার জবাব শোনার জন্যে অপেক্ষা করে নেই, বিজু কিছু বললো কি বললো না তা নিয়ে মাথাও ঘামাবে না সে। শুধু বিজু কেন, কারো জবাবই সে শুনবে না, তার মুখস্থ হ্যাভ আ নাইস ডে-র জবাব সে চায়ই না। প্লেন ল্যান্ড করার পর যাত্রীরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে হাস্যমুখে তাকে ওই এক বাক্যের সম্ভাষণ আউড়ে যেতে হবে এক নাগাড়ে। মাথাপিছু একবার। চাকরি।

ব্যাগেজের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় অনেকক্ষণ। সত্যি হয়তো অনেকক্ষণ নয়, কিন্তু ভ্রমণের ক্লান্তি আর অবসাদ অনেক সময় সেরকম ধারণা দিয়ে থাকে বটে। যেমন এখন। হাতের কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে বিজু, সাড়ে সাতটা। এখনো ঈস্ট কোস্টের সময় দেখাচ্ছে। কাঁটা ঘুরিয়ে সাড়ে ছ'টা করে দেয়। স্থানীয় সময়। বাংলাদেশে এখন সকাল সাড়ে ছ'টা, ঠিক বারো ঘণ্টার পার্থক্য।

মনে মনে ঢাকার সঙ্গে এই সময় অনুবাদের অভ্যাস তার আজও যায়নি। বারো বছর পরেও। সময় অনুবাদ করেও মন থেমে থাকে না। দেখে মা সকালের চা নিয়ে বারান্দায় বসেছে, কাজের লোকজনের তদারকি করছে। মগবাজারের মোড়ে ক্যাফে তাজ-এর সামনের চুলায় আগুন দেওয়া হয়েছে, বিশাল তাওয়ার ওপরে পরোটা। দূরপাল্লার বাসগুলো রওনা হচ্ছে। রমনায় বয়স্ক মানুষদের হাঁটাহাঁটি। শহর জেগে উঠেছে আরেকটি দিনের জন্যে। মনে মনে এইসব দেখা বিজুর নিজস্ব বিনোদন।

আজকের বিমানযাত্রায় অবশ্য ক্লান্ত-অবসন্ন হওয়ার কথা নয়। ফ্লাইটের সময় খুব দীর্ঘ ছিলো না, ঘণ্টাতিনেক। বিমানভ্রমণের জন্যে দু'তিন ঘণ্টার ফ্লাইটই আদর্শ। ঢাকা-কক্সজার বা ঢাকা-কলকাতার বিমানযাত্রা অসহনীয় রকমের বিরক্তিকর লাগে বিজুর, প্লেনে উঠে জুতমতো বসতে না বসতেই ল্যান্ডিং-এর ঘোষণা।

এখান থেকে ঢাকায় যাতায়াত আরেক মেরুর অভিজ্ঞতা, সে অনন্তযাত্রা আর শেষ হয় না, শেষ হবে এমন ভরসাও একসময় ক্ষীয়মাণ হয়ে আসতে থাকে। প্লেনের ভেতরে একঘেয়ে গোঁ গোঁ শব্দ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মেঘদলের ভেতর দিয়ে উড়ে যাওয়ার খেলা, সেই অপরূপ সুন্দর দৃশ্যও অপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তিকর ঠেকে। স্থবির-অনড় সৌন্দর্যও একসময় একঘেয়ে মনে হয়, চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মুখের ভেতরে এক ধরনের তেতো স্বাদ স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়, কোনো খাবারই মুখে রোচে না - সব খাবারের স্বাদ-গন্ধ একই রকমের লাগে। বসে থাকতে থাকতে হাত-পা অবশ হয়। শরীরের বাঁধনগুলো আলগা হয়ে যায় বলে মনে হয়। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। বিজু প্লেনে একদম ঘুমাতে পারে না। একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেই চমকে জেগে ওঠে, ঘুমাতে না পারার কষ্টে শরীর নির্যাতিত হতে থাকে।

ব্যাগেজ সংগ্রহের নির্দিষ্ট জায়গায় ক্যারুসেল এখনো নড়াচড়া শুরু করেনি, সুতরাং এখন দাঁড়িয়ে থাকো। বিরক্তিকর। গন্তব্যে পৌঁছে ব্যাগেজের জন্যে অপেক্ষা এক যন্ত্রণা। ফ্লাইটের জন্যে বসে থাকা যায় - ওয়েটিং এরিয়ায় খবরের কাগজের পাতায় সময় কাটে, এক কাপ কফি কিনে নিয়ে ওভারহেড টিভিতে সিএনএন দেখা যায়।

তিন বছর আগের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকাকে বদলে দিয়েছে, পরিণত করেছে সিজোফ্রেনিক এক জনগোষ্ঠীতে। সবকিছুতে এখন সন্ত্রাসের আতংক। পুকুরের পানিতে নিরীহ সাদা রঙের কিছু দেখলেই সন্দেহ সেটা অ্যানথ্রাক্স। সারা পৃথিবীকে তারা এই অজুহাতে বদলে দিতে চায়। একে ধরো, ওকে মারো, তাকে হটাও - এইসব চলছে সেই থেকে।

এই আতংকের চেহারা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান এয়ারপোর্টে। সিকিউরিটি চেকিং-এর সময় শুধু পরনের প্যান্ট আর জামাটা খুলতে হয় না। পায়ের জুতা, কোমরের বেল্ট খোলো, সেলফোন, সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, খুচরো পয়সা, চাবির গোছা বের করে সিকিউরিটির বাস্কেটে দাও। তারপর মেটাল ডিটেক্টর লাগানো দরজার ভেতর দিয়ে হাঁটো। পিক আওয়াজ হলো তো ফিরে গিয়ে ভালো করে দেখো শরীরের কোথাও ধাতব আর কিছু আছে কি না। ব্যাগের মধ্যে ছুরি-কাঁচি জাতীয় কিছু নেওয়া যাবে না, যতো ছোটোই হোক। ওগুলোই নাকি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র। কী আশ্চর্য! 'হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র, আমি জমা দিইনি'! কে লিখেছিলো? নির্মলেন্দু গুণই তো।

নতুন নিয়মকানুন জারি হওয়ার কালে বিজুর মনে হয়েছিলো, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ভল্যুমগুলো নিষিদ্ধ করার কথা কারো মনে পড়েনি কেন? ছোটোখাটো ছুরি-টুরির চেয়ে ওগুলোর ক্ষতি করার ক্ষমতা বেশি ছাড়া কম নয়।

কাচের দেয়ালের বাইরে তাকিয়ে দেখা যায়, শরতের রোদ মরে এসেছে। প্লেন নামার সময় ঘোষণা শুনেছিলো, স্থানীয় তাপমাত্রা পঁয়ষট্টি ডিগ্রী ফারেনহাইট। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও আজকাল মেট্রিক পদ্ধতি চালু হয়ে গেছে, অথচ এদেশে যে কেন পুরোপুরি চালু হলো না, কে জানে! অদ্ভুত এক জবরজং হয়ে আছে - টাকাপয়সার হিসেবে দশমিক, পাশাপাশি চালু আছে দূরত্বসূচক ফুট-গজ-মাইল, ওজনের বেলায় আউন্স-পাউন্ড। ওষুধপত্রে মিলিগ্রাম। গ্যাস স্টেশনে যাও, সেখানে আবার গ্যালনের হিসেব। দোকানে কোকাকোলার বিশ আউন্সের বোতলের পাশে দু'লিটারের বোতলের নির্বিরোধ সহাবস্থান। আমেরিকার সাধারণ মানুষদের, যাদের সবার নামই নাকি জো ব্লো, আইকিউ-এর দৌড় নিয়ে অনেক মজার গল্প চালু আছে, সেটাই হয়তো এই জগাখিচুড়ি অবস্থাটা স্থায়ী করে রেখেছে। সেলসিয়াস বা মিটার শুনলে তারা হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে - এগুলো খায়, না মাথায় মাখে? আরো একটা কারণ আছে বলে বিজুর মনে হয় - বিখ্যাত মার্কিন কবির আই হ্যাভ মাইলস টু গো-র শুদ্ধতা রক্ষাও তো দরকার। কিলোমিটারস টু গো বলা যাবে? বললে হাস্যকর শোনাবে না!

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১ ;
প্রকাশ করা হয়েছে: উপন্যাস  বিভাগে ।

 

  • ১৬ টি মন্তব্য
  • ৩৯০ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৬ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১০:৫৮
comment by: আরশাদ রহমান বলেছেন: জুবায়ের ভাই, পড়লাম! পরের পর্বের অপেক্ষায়.....
২. ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১১:৪৯
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: গুড স্টার্ট জুবায়ের মামা।
৩. ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১১:৫০
comment by: ধুসর গোধূলি বলেছেন: নেক্সট পর্ব বস্!
৪. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:০০
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: ধন্যবাদ আরশাদ, সুমন ও ধূসর গোধূলি।
৫. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:০২
comment by: অরূপ বলেছেন: আপনার লেখা পড়েছি । এটাও পড়লাম। প্রাঞ্জল।
৬. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:১৮
comment by: ধুসর গোধূলি বলেছেন:
জুবায়ের ভাইয়ের লেখা "যাই" নামক অসাধারণ একটা গল্প আছে !@@!520917 -র "দখিনা দুয়ার"-এ।

অসাধারণ লেগেছে আমার কাছে। ঐটার জন্যও ৫ দিলাম (কিন্তু এইখানে একজনের একই জায়গায় ৫ দেয়ার নিয়ম নাই)। (মন খারাপ, লগে মেজাজও)
৭. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:০৯
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: ধূসর গোধূলি, হাজারদুয়ারীর গল্পটির জন্যে বিনা পয়সার বিজ্ঞাপন। মন্দ না।
অরূপ, আপনার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।
৮. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৩:৪৩
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: শুরু করে দিলাম,মন্তব্য করে বিরক্ত করছি না আশা করি।
৯. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ৯:৩৮
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: ফারহান দাউদ, মন্তব্যে বিরক্ত হবো? পাগল নাকি? ভালোমন্দ যা মনে আসবে সব বলবেন, শুনতে চাই।
১০. ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৯:৫৬
comment by: হাসান মোরশেদ বলেছেন: উপন্যাস যেহেতু বর্ননা বাহুল্য মনে হচ্ছেনা এখনো ।
চলুক ।
১১. ০২ রা মে, ২০০৭ দুপুর ১:৪০
comment by: এস এম মাহবুব মুর্শেদ বলেছেন: বস দারুন লাগছে। একেবারে নিজের কথাগুলো মনে হচ্ছে। চালিয়ে যান।
১২. ০২ রা মে, ২০০৭ দুপুর ২:৪৫
comment by: শাহেনশাহ বলেছেন: বেশ....চলুক!
১৩. ০৩ রা মে, ২০০৭ সকাল ৭:৩২
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: পড়া শুরু করলাম!
১৪. ১৮ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:২৩
comment by: প্রজাপতি বলেছেন: আপনার লেখার অনেক প্রশংসা শুনেছি। ব্লগে উপন্যাস একদম নতুন একটা প্রয়াস, এবং অবশ্যই সাহসী। পড়া শুরু করলাম। দেরীতে শুরু করে ভালো হলো যে টানা পড়তে পারব। লিখতে থাকুন। বেস্ট অফ লাক।
১৫. ১৮ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:৩১
comment by: মুহম্মদ জুবায়ের বলেছেন: প্রজাপতি, শোনা কথা বিশ্বাস করতে নেই। :-)

আজ এই একটু আগে এই লেখার শেষ কিস্তি পোস্ট করেছি। কাকতালীয় হোক বা ইচ্ছাকৃত, বিলম্বে ক্ষতি কিছু হয়নি। শামিল হওয়ার জন্যে ধন্যবাদ।
১৬. ২১ শে মে, ২০০৮ ভোর ৬:৩২
comment by: রাশেদ বলেছেন: ভাল্লাগছে।

 



 

comment by:
এখানটা শূন্যই থাক
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৩৯৬১৮