৪.২
সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ টানছিলো বিজু। রানু বলে, কী ভাবছেন?
আজ কার মুখ দেখে সকাল হয়েছিলো তাই মনে করার চেষ্টা করছি।
কেন?
আমার সঙ্গে হঠাৎ তোমার কথা বলার দরকার পড়লো বলে। ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক না? এতোদিন তো উল্টোটাই হয়ে এসেছে।
সবদিন একরকম না-ও হতে পারে। সময়ে কতোকিছু পাল্টে যায়!
কিন্তু সবকিছুর আগে একটা জিনিস পাল্টানো দরকার।
কী?
বাংলা গল্প-উপন্যাসে আপনি থেকে তুমিতে নামতেই বিশ-পঁচিশ পাতা খরচ হয়ে যায়। কী অপচয়, কোনো মানে হয়!
ইঙ্গিত না বোঝার কোনো কারণ ছিলো না। রানু বলে, অচেনা কাউকে চট করে তুমি করে বলা যায়?
অচেনা মানুষের সঙ্গে কেউ ব্রিটিশ কাউন্সিলের নির্জন লনে বসে না।
তোমার সঙ্গে তর্কে পারবো না।
এই সহজ জিনিসটাতেই এতো সময় লেগে গেলো!
বিজুর অনুমান মিলে যাচ্ছে। শর্তহীন সমর্পণ। রানুর কথা বলার ধরণই বলে দিচ্ছিলো, অনুমানের জন্যে আর অবশিষ্ট ছিলো না কিছু। কথা বলতে বলতে বিজু ভেতরে ভেতরে নিজের সঙ্গে লড়াই করে যায় - অপমানের প্রতিশোধ, না ক্ষমা?
কী হয়, যদি সে এখন রানুকে ফিরিয়ে দেয়? বলে, রানু, তোমাকে আর চাই না আমার। একসময় ভেবেছিলাম, তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না। এখন দেখছি, সেটা ভুল ধারণা। কী হয় তাহলে, রানুর প্রতিক্রিয়া কী হবে? খুব আহত হবে সে? দুঃখিত হবে?
বিজুও হয়েছিলো একসময়, তখন কার কী এসে গেছে? কিন্তু এই নারীকে সে জয় করতে চেয়েছিলো, সে এখন নিজে থেকে এসেছে তার কাছে। ইচ্ছে করলেই এখন স্পর্শ করা যায় তাকে। জিতে যাওয়ার লোভ কার না হয়? প্রতিশোধ? কীসের প্রতিশোধ?
সারাটা দিন একসঙ্গে কাটে। যাই যাই করেও রানুর বাসায় ফেরা হচ্ছিলো না, কথা যে শেষ হতে চায় না। শেষ বিকেলের দিকে একরকম জোর করে রিকশা ডেকে উঠে পড়ে রানু, আর দেরি হলে বাসায় অনেক কৈফিয়ত দিতে হবে।
রিকশা চলতে শুরু করার আগেই বিজুও উঠে বসেছে রানুর পাশে। রানু বলে, আরে এটা কী হচ্ছে?
একটু এগিয়ে দিই তোমাকে।
আমি একাই বেশ যেতে পারবো, রোজই যাচ্ছি। তোমাকে এগিয়ে দিতে হবে না।
বিজু রিকশাওয়ালাকে বলে, তুমি চলো তো।
রিকশা চলতে শুরু করলে রানু বলে, কেউ দেখে ফেললে?
দেখলে দেখবে, পাবলিক নু্যইস্যান্স তো কিছু করছি না!
চেনা কেউ দেখে বাসায় বলে দিলে আমাকেই ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হবে।
এতো ভাবলে চলে নাকি! সবার তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, সারাক্ষণ চোখ রাখছে রানুর সঙ্গে কে যাচ্ছে তাই দেখতে!
একটু চুপ করে থেকে রানু বলে, আচ্ছা, তুমি এরকম ছেলেমানুষি করো কেন?
ছেলেরা ছেলেমানুষি করবে না তো কে করবে?
একটুও কি সিরিয়াস হতে জানো না তুমি?
না। বড়ো হলে হবো।
তার মানে এখনো বড়ো হওনি?
এখনো না। জানো, একটা গানে আছে - 'উওম্যান, আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড / দ্য লিটল চাইল্ড ইনসাইড অব আ ম্যান'। পুরুষমানুষের ভেতরে বাস করা ছোট্টো শিশুটিকে বোঝার চেষ্টা করো হে নারী।
রানু যাবে টিকাটুলি, স্টেডিয়ামের কাছে এসে কোনোমতে ঠেলেঠুলে বিজুকে নামিয়ে দেয় সে। অনিচ্ছায় নেমে দাঁড়ায় বিজু। রানু মিষ্টি করে হেসে বলে, কাল দেখা হবে।
হতেই হবে।
বিজু এই সময়ে এখন কোথায় যায়, কী করে? বাসায় ফিরতে একদম ইচ্ছে করছে না। আজকের দিনটা অন্যরকম, উদযাপন করা দরকার একা একাই।
স্টেডিয়ামের গেটের সামনে ঝালনুন দেওয়া কাটা আমড়া কেনে। অনির্দিষ্টভাবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমড়া খায় সে, টকঝাল মিলিয়ে অদ্ভুত মজাদার জিনিস।
হঠাৎ মনে পড়ে, ক্লাসে যাওয়ার জন্যে যে নোটবই হাতে ছিলো, সেটা এখন নেই। রানুর ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিলো, ওর সঙ্গেই চলে গেছে। আপনমনে হাসে বিজু।
বিকেলের রোদ মরে গেছে, সন্ধ্যা নামছে। সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে লাগলো সে। 'আর কি কখনো কবে, এমন সন্ধ্যা হবে...'

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



