somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... আর প্রস্থানোদ্যত নন, তিনি প্রস্থান করলেন
মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, ভালো না। কথা বলতে গেলে কেঁদে ফেলতেন। চলে যাচ্ছেন, জেনে গিয়েছিলেন তো!

সপ্তাহ তিনেক আগে Click This Link তাঁর সম্পর্কে গল্পের শেষ যেভাবে : প্রস্থানোদ্যত আমাদের কালের একজন নায়ক শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম।

গল্পটির সমাপ্তি হলো। এখন আর প্রস্থানোদ্যত নন, তিনি প্রস্থান করেছেন।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28771094 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28771094 2008-02-16 10:03:54
গল্পের শেষ যেভাবে : প্রস্থানোদ্যত আমাদের কালের একজন নায়ক
আপনি পড়েছিলেন কি না জানি না, আপনাদের দুই ভাইকে নিয়ে লেখা একটি গল্প ছাপা হয়েছিলো ১৯৭৮ সালে। তখন আপনারা দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডানের অধিনায়ক। ঘটনাটি ঐতিহাসিক, দুই সহোদর বড়ো দুই দলের অধিনায়কত্ব করছেন এমন ঘটনা বাংলাদেশ আর কখনো ঘটেনি। সে বছর মৌসুমের শুরুতে আপনারা দুই ভাই দুই বিপরীতমুখী ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৭৭-এর অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর অধিনায়ক আপনি বললেন, শিরোপা ধরে রাখবো। মোহামেডানের দলনেতা মঞ্জু ভাই জানালেন, শিরোপা আমরা নেবো। সে বছর মোহামেডান লীগ-চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো। আপনি পরাস্ত হলেও গর্ব করে বলতেই পারেন, সেই চ্যাম্পয়নশীপ আপনাদের পরিবারেই ছিলো!

আবাহনী-মোহামেডানের খেলার দিন ‘স্টেডিয়াম’ পত্রিকায় ওই গল্পটি ছাপা হয়। আপনার জানার কথা নয়, আজ জানাই, ‘সেই প্রতিশ্রুতি’ শিরোনামের গল্পটির রচয়িতা ছিলাম আমি

গল্পের কপি আমার কাছে নেই, পুরো গল্পটিও মনে নেই। আবছামতো যতোটুকু মনে পড়ে তা অনেকটা এইরকম : আজ আবাহনী-মোহামেডানের খেলা। দুই দলের অধিনায়ক নান্নু ও মঞ্জু একই বাড়ির বাসিন্দা – দুই সহোদর। সকালে নান্নুর ঘুম ভাঙে একটি স্বপ্ন দেখে, আজকের খেলা নিয়েই একটি স্বপ্নদৃশ্য। গোলমুখ থেকে বলটি হঠাৎ উধাও, যা শুধু স্বপ্নেই সম্ভব। দুই ভাই, তারা পরস্পরের শত্রুপক্ষ। আজ এই সকালে তাদের কারো মনে পড়ে অথবা পড়ে না, বাল্যকালে তারা জীবনভর একই দলে খেলবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো।

আপনার হয়তো মনে আছে, ‘স্টেডিয়াম’-এর মালিক-প্রকাশক আবাহনীতে আপনার সতীর্থ আরেক খেলোয়াড় টুটুল। নামে পাক্ষিক হলেও কাগজটি অনিয়মিত বের হয়। তবে বড়ো খেলার দিনে অবশ্যই একটি সংখ্যা বাজারে আসে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার দশেক কপি নিঃশেষ হয়ে যায় স্টেডিয়ামের বাইরে এবং গ্যালারিতে। এর সম্পাদক তখন আবদুর রহমান, গেট-আপ মেকাপ ও ইলাস্ট্রেশনে আফজাল হোসেন। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, ওই সময় আফজাল টিভিতে তার ‘আপনপ্রিয়’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে আপনাদের দুই ভাইকে উপস্থিত করেছিলো।

উয়ারি এলাকার সপ্তর্ষি মুদ্রায়ণে ‘স্টেডিয়াম’ কম্পোজ কাজ হয়, ছাপাখানাটি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের কর্মকর্তা নজরুল ভাইয়ের, পত্রিকার অফিস হিসেবে সেখানে একটি ঘরও তিনি ব্যবহার করতে দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে আড্ডা দিতে যাই সেখানে। এরকম এক আড্ডায় রহমান ও আফজাল অকস্মাৎ দাবি করে বসে, আবাহনী-মোহামেডানের খেলা উপলক্ষে পরিকল্পিত সংখ্যার জন্যে একটি গল্প লিখে দিতে হবে। কেন এই বুদ্ধি তাদের মাথায় এলো জানি না, ৮৩ সালে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই কাগজের আয়ুষ্কালে এর আগে বা পরে দ্বিতীয় কোনো গল্প আর ছাপা হয়নি। এই তথ্যটি সম্পর্কে আমি নিশ্চিত এইজন্যে যে, গোড়া থেকেই এই পত্রিকার সঙ্গে একটা সম্পর্ক আমার ছিলো, ৮০ থেকে ৮৩ পর্যন্ত ‘স্টেডিয়াম’-এর যে ক’টি সংখ্যা বেরিয়েছিলো তার সম্পাদনার দায়িত্ব ছিলো আমার।

নান্নু-মঞ্জু দুই ভাই দুই দলের অধিনায়ক, সেই খেলার দিনে গল্পের বিষয় হিসেবে এর চেয়ে ভালো আর কী হয়! খেলা দেখে আপনাদের চিনি, ব্যক্তিগত জীবন প্রায় কিছুই জানি না। দু’জনের পুরো নাম জানি – মনোয়ার হোসেন নান্নু ও শামসুল আলম মঞ্জু। আপনাদের পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি কিছুই জানা নেই। কিন্তু গল্পের জন্যে তথ্য খুব জরুরি নয়। যতোদূর মনে পড়ে, ওই অফিসে বসেই গল্পটি লেখা হয় এবং আফজাল তৎক্ষণাৎ ইলাস্ট্রেশনও করে ফেলে।

‘স্টেডিয়াম’ যথাসময়ে প্রকাশিত হলো, স্টেডিয়ামে খেলাও শুরু হলো। খেলার শুরুতে মাঝমাঠে রেফারি এ লাইনসম্যানদের সামনে নিজ নিজ দলের অধিনায়ক হিসেবে আপনারা দুই ভাই করমর্দন করছেন, এই মুহূর্তটি এখনো চোখে ভাসে। এই লেখাটির সঙ্গে দেওয়ার জন্যে সেই ছবির একটি কপি মঞ্জু ভাইয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা গেলো।

আমি জানি, আপনি ভোলেননি যে সেদিনের খেলা অসমাপ্ত ছিলো। আবাহনী-মোহামেডানের খেলায় চিরাচরিত গোলযোগ নয়, প্রবল বৃষ্টিতে খেলাটি অমীমাংসিত অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়। আমার লেখা গল্প-সম্বলিত পত্রিকার কপিগুলিও রক্ষা পায়নি অনুমান করি, বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়ে থাকবে। সেখানেই গল্প আটকে থাকতে পারতো, পরিত্যক্ত ও অসমাপ্ত খেলাটির মতো। প্রায় তিরিশ বছরের ব্যবধানে সেই গল্পের উপসংহার আমাকে লিখতে হবে তা কি জানতাম!

সারাজীবন একসঙ্গে এক দলের হয়ে খেলার প্রতিশ্রুতি আপনাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে বাল্যকালে হয়েছিলো কি না জানা নেই, লেখার জন্যে সেটি তৎক্ষণাৎ কল্পনা করে নিতে হয়েছিলো সেদিন। তেমন প্রতিশ্রুতির ঘটনা থাকলেও তাকে বালখিল্য বলে বিবেচনা করাই সঙ্গত। বাস্তবতা ছিলো এই যে, স্বাধীনতার পর আবাহনী ক্রীড়াচক্র গঠিত হলে মঞ্জু ভাই সেখানে অন্তর্ভুক্ত হন, আপনি তখন মোহামেডানে। ৭৪-এ আপনিও চলে এলেন আবাহনীতে। ঢাকা ফুটবল লীগে ১৯৭৪-এর একটিমাত্র বছর আপনারা এক দলের হয়ে খেলেছিলেন। জাতীয় দলে একসঙ্গে খেলা যদি হিসেবে ধরা না হয়, বাল্যকালে প্রতিশ্রুত হয়ে থাকলে তা বাস্তব হয়েছিলো এই একটি ফুটবল মৌসুমে।

১৯৭৫-এ দু’জনের পথ আলাদা হয়ে যায়, সে বছর মঞ্জু ভাই গেলেন মোহামেডানে, খেলোয়াড়ী জীবন তাঁর শেষ হলো ৮৫-তে। আর আপনি ৮২-তে অবসর নেওয়া পর্যন্ত থেকে যান আবাহনীতে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ফুটবলে একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাকিস্তান আমলে অন্য সবকিছুর মতো ফুটবলেও জাতীয় দলের হয়ে বাঙালির অংশগ্রহণ সীমিত ছিলো। ৭১-এ যুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ ভারতে অনেকগুলি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে স্বাধীনতার বার্তা তুলে ধরে এবং সেই অভিজ্ঞতা যে এক নতুন অনুভবের জন্ম দেয়, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ফুটবল নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠা এবং ইংল্যান্ড থেকে আসা আবাহনীর কোচ বিল হার্ট পত্তন করে দিলেন সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের ফুটবল-শৈলীর।

আবাহনীর জন্মের পর থেকে আমি তার সমর্থক। অবশ্য আমি সেই জাতের সমর্থক যার পক্ষে মোহামেডান গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিলো। সুতরাং দলানুগত্যের বাইরে থেকেও বলতে পারি, বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের শুরু আবাহনীর হাত ধরে। ক্রমশ অন্য দলগুলিও এই ধারা অনুসরণ করতে শুরু করে। ফুটবল তখন বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিলো, এই নবযাত্রায় তা আরো বেগবান হয়। আপনাদের প্রজন্মের ফুটবলাররা এর অনুঘটক ছিলেন, এ কথা কেউ অস্বীকার করবেন বরে মনে হয় না।

শুধু খেলার ধাঁচ নয়, সেই সময়ের খেলোয়াড়দের চেহারা ও পোশাক-আশাকও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাঁধসমান লম্বা চুল নিয়ে দ্রুতগামী অশ্বের মতো কেশর দুলিয়ে খেলোয়াড়দের ঢাকার মাঠ দাপিয়ে বেড়াতে এর আগে কে কবে দেখেছে! পৃথিবীর অন্যসব দেশে যেমন হয়, বাংলাদেশেও সালাউদ্দিন-নান্নুর মতো ঝাঁকড়া চুল রাখা এবং খেলোয়াড়দের ফ্যাশন অনুকরণ করার রীতি প্রচলিত হয়ে যায় তখন। ফুটবল ভদ্রলোকের খেলা নয় বলে সেই সময়ে সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণাও আপনারা ভাঙতে সক্ষম হলেন। খেলাপাগল মানুষ ও সমর্থকদের উন্মাদনা শুধু নয়, ফুটবল তখন এক ধরণের সামাজিক বিবর্তনের অনুঘটক হয়ে ওঠে। আমার পিতা খেলাধুলা বিষয়ে চরমতম উদাসীন মানুষ ছিলেন, তাঁকেও একসময় ফুটবল ও সালাউদ্দিনকে এক করে জানতে এবং মানতে হয়।

সংকীর্ণ রাজনীতি এবং ধারাবাহিক প্রশাসনিক ব্যর্থতায় আপনাদের হাতে শুরু হওয়া ফুটবলের উত্থান ও অগ্রযাত্রা আমরা অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হয়েছি, তা অন্য প্রসঙ্গ।

খেলোয়াড়ী জীবনে আপনি খেলেছেন মধ্যমাঠে গেমমেকার হিসেবে এবং রক্ষণভাগে লেফট ব্যাক ও স্টপার হিসেবে। মঞ্জু ভাই রাইটব্যাক খেলেছেন বরাবর। খেলোয়াড় হিসেবে আপনারা দুই ভাই নিজেদের পজিশনে তাঁদের সময়ের এবং সম্ভবত বাংলাদেশ ফুটবলে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। অথচ খেলার স্টাইল ও মাঠ-ব্যক্তিত্বের বিচারে দু’জন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। আপনি স্থিতি ও প্রশান্ত মেজাজের প্রতীক, আপনার খেলা ধীর অথচ ঋজু কবিতার মতো শিল্পসুষমামণ্ডিত, মনোহর। মঞ্জু ভাই আপনার ঠিক বিপরীতে। তাঁর মাঠ-ব্যক্তিত্ব ছিলো কিছুটা রূঢ়, তীক্ষ্ণমেজাজী ও পৌরুষদীপ্ত। মাথা-গরম ফুটবলার হিসেবে মঞ্জু ভাইয়ের এবং তার অব্যবহিত পরে টুটুলের খ্যাতি (নাকি কুখ্যাতি!) ছিলো। আগে অন্যদের কাছে শোনা ছিলো এবং এখন পরিচয় হওয়ার পর দেখছি, মাঠের মঞ্জুর সঙ্গে এই মঞ্জুকে একদমই মেলানো যায় না। টুটুলের বেলায়ও এই ঘটনা দেখেছি।

রাইটব্যাক যে আক্রমণাত্মক খেলা খেলতে পারে, রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ও আক্রমণে সহায়ক হতে পারে মঞ্জু ভাইয়ের খেলায় দেখে ঢাকার দর্শক তা প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিলো। এক অর্থে তা ছিলো এক ধরনের বিপ্লবাত্মক ঘটনা। মঞ্জু ভাই মোহামেডানে চলে গেলে আবাহনীতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন টুটুল, তিনিও মঞ্জু ভাইয়ের খেলার ধারাটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মনে পড়ছে, একবার একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে মঞ্জু ভাই বলেছিলেন, ৭৫ ও ৭৬-এ টুটুল যে খেলা খেলেছিলো তা ধরে রাখতে পারলে মঞ্জু নামে ঢাকার মাঠে কেউ যে কোনোদিন খেলেছিলো তা আর কেউ মনে রাখতো না। রূঢ় ও তীক্ষ্ণমেজাজী বলে পরিচিত মঞ্জু ভাই বলছেন এই কথা তাঁরই সমসাময়িক এবং একই পজিশনের খেলোয়াড় সম্পর্কে। বাংলাদেশে এই বিনয় খুব বেশি দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই।

১৯৭৪-র আইএফএ শীল্ড টুর্নামেন্টের কথা আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। আবাহনী গেছে কলকাতায় খেলতে। তখন টিভিতে খেলা দেখানোর চল হয়নি। বিটিভি ছিলো, কিন্তু কলকাতায় দূরদর্শন সম্ভবত চালুও হয়নি তখনো। রেডিওতে ধারাবর্ণনা শুনছিলাম, আবাহনী খেলছে কলকাতার অন্যতম সেরা দল ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। দুর্দান্ত খেলেছিলো আবাহনী এসদিন। একসময় আকাশবাণীর ধারাভাষ্যকারকে যা বলতে শুনলাম তার বক্তব্যটি এরকম: ‘ঝাঁকড়া চুলের দীর্ঘদেহী বাংলাদেশের ছেলেটি মাঝমাঠে কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, যেন এলাকাটি তার একান্ত নিজস্ব’।

ওই ধারাবর্ণনা আপনি শোনেননি, তখন আপনি মাঠে। ‘ঝাঁকড়া চুলের দীর্ঘদেহী ছেলেটি’ বলে যাকে বর্ণনা করা হচ্ছিলো, তার নাম নান্নু। তখন আপনি মাঝমাঠের খেলোয়াড়। হাঁটুতে আঘাতজনিত কারণে পরবর্তী বছরগুলিতে স্টপার হিসেবে খেলেছেন। মাঠে সবচেয়ে দ্রতগতির খেলোয়াড় আপনি ছিলেন না, তা আপনি নিজেও স্বীকার করবেন। আপনি খেলতেন নিজস্ব দক্ষতা, ফুটবলবোধ এবং বুদ্ধি ও সুবিবেচনা মেশানো এক অসাধারণ খেলা। দৃষ্টিনন্দন ছিলো আপনার পাসিং ও নিখুঁত হেডওয়ার্ক। হেড করে বলটি গোলমুখ থেকে সরিয়ে দেওয়াই একমাত্র কাজ নয়, বরং বলটিকে নিজ দলের খেলোয়াড়ের নাগালে পৌঁছে দিতে হবে, তা আপনার মতো করে আর কাউকে করতে ঢাকার মাঠ কখনো দেখেনি।

সবচেয়ে দর্শনীয় ছিলো আপনার স্লাইড ট্যাকল, স্টপারের সর্বশেষ অস্ত্র। খানিকটা জুয়ার মতো। রক্ষণভাগের শেষ খুঁটি স্টপার, যার পরাস্ত বা ব্যর্থ হওয়ার অর্থ বিপক্ষের আক্রমণের সামনে গোলরক্ষক সম্পূর্ণ একা ও অরক্ষতি। অথচ জুয়াটি খেলতেন আপনি খুব হিসেব করে, পেশাদার জুয়াড়ির দক্ষতায়। অধিকাংশ সময়ে আপনি জিতে এসেছেন অসাধারণ সময়জ্ঞানের কারণে। এই অস্ত্রটি আপনি ব্যবহার করতে জানতেন নিখুঁতভাবে। আপনাকে অনায়াসে বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও স্টাইলিশ স্টপার বলতে আমাদের একটুও ইতস্তত করতে হবে না।

এমনকি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিলেন আপনি। ৮২-তে খেলা থেকে অবসর নেওয়ার আগে আপনার শেষ খেলাটি গ্যালারিতে বসে দেখেছিলাম, মনে আছে খেলার শেষে সতীর্থ ও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আবেগময় বিদায় জ্ঞাপনের দৃশ্যটি। সারা স্টেডিয়ামের দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় অভিনন্দিত করেছিলো ঢাকার ফুটবলের রাজসিক খেলোয়াড়টিকে।

আজ আপনাকে লিখছি এই বিদায়ের প্রসঙ্গ নিয়েই। ডাক্তার জবাব দিয়েছে, আর কিছু করণীয় নেই – এর চেয়ে ভয়ংকর কোনো কথা আর হয় না। যার প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে তার জন্যে তো বটেই, তার আশেপাশের মানুষ, প্রিয়জন ও স্বজন-বন্ধুদের জন্যেও এক ভয়াবহ অসহায়তার অনুভব। আপনার জন্যে অচেনা, কোনোদিন না-দেখা অসংখ্য মানুষও কাতর হবে, অশ্রু বিসর্জন দেবে। আপনি তার কিছুই জানবেন না। জেনেই বা কী এসে যাবে!

১৯৯৮ সালে একদিন পত্রিকায় পড়ে চমকে উঠলাম, কর্কটরোগে আক্রান্ত আপনি। এমনই এক রোগ যার নামই অস্তিত্বের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। তবু চিকিৎসায় সেরে উঠলেন আপনি। কিছুকাল পরে আবার ফিরে এলো রোগ। এইভাবে ক্যানসারের সঙ্গে এক ধরনের লড়াই চলছিলো আপনার প্রায় দশ বছর ধরে। এই লড়াইয়ের মাশুল এখন গুনছে আপনার শরীর। কিডনি অকেজো হয়েছে, ডায়ালিসিস চলছে, তার সঙ্গে আরো আনুষঙ্গিক জটিলতা। স্টপার আজ ক্লান্ত, তার স্লাইড ট্যাকল হয়তো এবার ব্যর্থ হতে চললো। আজ একটু আগে জানলাম, সম্প্রতি আপনার ছোটোখাটো স্ট্রোকও হয়ে গেছে বার চারেক। ডায়ালিসিস চলছে ক্রমাগত।

এইসব সময়ে বোঝা যায় আমাদের মনুষ্যজীবনের নশ্বরতা ও সীমাবদ্ধতা। মতি নন্দীর ‘স্টপার’ উপন্যাসের পরাক্রান্ত স্টপার মাঠে অপরাজেয় হলেও বাস্তব জীবনের রূঢ় আক্রমণের সামনে সে প্রতিরোধহীন। মাঠে প্রতিপক্ষের দুরন্ত স্ট্রাইকারকে রুখে দেওয়ার কৌশল আপনার জানা ছিলো, কিন্তু এই যে চলে যাওয়ার কথা উঠছে সেখানে আপনার – বস্তুত সব মানুষেরই – কিছুই করণীয় নেই। অনিবার্য জেনেও এর জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না।

এদিকে মঞ্জু ভাই কী করেন? তিনি নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা ৯২ থেকে। গত বছর তাঁর ডালাস শহরে চলে আসার কথা, বাড়ি কিনে স্ত্রী-পুত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন, নিজে থেকে গেছেন নিউ ইয়র্কে। বিষণ্ণ মুখে বললেন, কী করে আসি? কখন নান্নুর কী খবর আসে, ওখান থেকে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে যেতে পারবো। কখন যেতে হয়, কে জানে!

৭২-এ শোনা আকাশবাণীর ধারাভাষ্যকারের বাক্যটি মনে আসে – মাঝমাঠে ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটি কাউকে দাঁড়াতেই দিচ্ছে না। মহামহিম সেই অন্তিম হয়তো বাস্তব হয়ে মাঝমাঠের কর্তৃত্ব নিয়ে নিয়েছে, সেখানে যে সে কাউকে কখনো দাঁড়াতে দেয়নি। দেবে না।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28763768 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28763768 2008-01-24 12:10:16
‘ভাঙনের শব্দ শুনি’
সেলিম আল দীন চলে গেলেন, কোনো ঘোষণা না দিয়ে। ৫৮ বছর কি চলে যাওয়ার বয়স? আমাদের মতো কতো হেঁজিপেঁজি মানুষ পৃথিবীতে দীর্ঘকাল বেঁচে আছি, থাকবো। সময় না হতেই চলে যাবেন সেলিম আল দীনের মতো প্রতিভাবানরা। ঠিক সুবিচার মনে হয় না।

আজ আমার মন ভালো নেই। সকালে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও গেলাম না, ইচ্ছে করলো না। সাতসকালে ঢাকা থেকে ফোন এলো পীযূষ ও ফরীদির। তার আগেই বিডিনিউজ আমাকে খবর দিয়ে দিয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় আসাদকে ফোন করি, কানাডায় দিনু বিল্লাহকে, ন্যাশভিলে রেজাকে। কারো সঙ্গেই বেশিক্ষণ কথা বলা সম্ভব হয় না। নিকটজনের প্রয়াণে যেরকম হয়।

না, সেলিম ভাই আমার রক্তসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন না, ছিলেন আত্মার আত্মীয়। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ও খুব গভীরে যায়নি। অথচ আশ্চর্য এক বাঁধনে তিনি বেঁধে ফেলেছিলেন আমাকে এবং আমার মতো আরো অনেককে তাঁর রচনা, প্রতিভা এবং অসামান্য কর্মদক্ষতায়। আমাদের মুগ্ধ ও মোহিত করে রাখলেন অনেকদিন ধরে। এবং অতঃপর প্রস্থান করলেন।

১৯৭৩-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কেনা কয়েকটি বইয়ের মধ্যে ছিলো টিএসসি-র বুকস্টোর থেকে কেনা একটি পেপারব্যাক ‘সর্প বিষয়ক গল্প ও অন্যান্য’। রচয়িতা সেলিম আল দীন। তখন তিনি উঠতি নাট্যকার, স্বাধীনতার পরে ঢাকার নতুন ধারার নাটকের প্রধান পুরুষদের একজন। ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ ততোদিনে অভিনীত হয়ে গেছে, গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটছে। ঢাকা থিয়েটার গঠিত হলো, সূচনাপর্ব থেকে অন্তিম দিন পর্যন্ত সেখানে জড়িত ছিলেন তিনি।

সেলিম আল দীনের রচনা এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনার যে যুগলবন্দী তৈরি হলো ৭৩-এ, তা বাংলাদেশের নাটককে দিয়েছে অপরিমেয়। সেলিম আল দীনের রচনায় মঞ্চে এলো বাংলাদেশের প্রথম মিউজিক্যাল স্যাটায়ার ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘শকুন্তলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘বনপ্রাংশুল’, ‘চাকা’, ‘সাইফুল মুলক বদিউজ্জামাল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘নিমজ্জন’। ৭৭-এ বাংলাদেশের প্রথম পথনাটক ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’। টিভিতে ‘রক্তের আঙুরলতা’, ‘গ্রন্থিকগণ কহে’। এই তালিকা নিতান্তই অসম্পূর্ণ, যা তাঁর রচনার ব্যাপ্তি ধারণ করে না।

সেলিম আল দীনের নাট্যরচনার শুরু ছিলো পাশ্চাত্য ধাঁচে, কিছুটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ধরনের। অবিলম্বে তিনি নিজের পথ খুঁজে পেলেন দেশীয় ঐতিহ্য ও লোকজ ধারা এবং প্রাচ্য দর্শনে। তাঁর সব উল্লেখযোগ্য কাজ এই ধারার।

সাহিত্যরচনা তিনি শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে, বেশিদিন থাকেননি সেখানে। রসিকতা করে বলতেন, আমি তো ব্যর্থ কবি, তাই গদ্যরচনা করি।

তবে তাঁর কিছু নাটকে আশ্চর্য কাব্যময় কিছু পংক্তি আমরা পেয়েছি। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করি ‘শকুন্তলা’ নাটকের একটি সংলাপ : আমার প্রার্থনা চৈত্রের শিমুল তুলো – লক্ষ্যহীন কেবলই উড়ে যায়, স্পর্শ করে না!

ঠিক তার বিপরীতে মানুষের প্রতিদিনের মুখের ভাষার একটি নমুনা ‘কিত্তনখোলা’ থেকে : ডালিমনের গায়ের ঘাম, চুকা চুকা গন্ধ।

অনেক বড়ো ক্ষমতাবান লেখক ছাড়া এই বৈপরীত্য ধারণ করা সম্ভব নয়। পড়াশোনায় ছিলেন অক্লান্ত, আগ্রহ ছিলো তাঁর বিচিত্র বিষয়ে। সেলিম আল দীন কীরকম বিশুদ্ধতাপিয়াসী পরিশ্রমী লেখক ছিলেন তার পরিচয় দিতে এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে শকুন্তলা নাটকটি তিনি সতেরো-আঠারোবার লিখেছিলেন। লিখতে বসলে আহার-নিদ্রা ভুলে যেতেন, লিখতেন ঘোরগ্রস্তের মতো। এমন ঘটনাও আছে, একটা লেখা রাত তিনটায় শেষ করে ফরীদিকে ডেকে আনছেন পড়ে শোনাবেন বলে।

কবি রফিক আজাদ আজ পুত্রহারা হলেন। সেলিম আল দীনকে তিনি বলতেন বেটা, সেলিম ভাই তাঁকে বাপ ডাকতেন। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের বন্ধুত্বে আজ ছেদ পড়লো।

সেলিম ভাইকে আমি প্রথম দেখি ৭৪ বা ৭৫-এ টিএসসির দোতলায় ঢাকা থিয়েটারের রিহার্সালে। একদিকে নাটকের মহড়া চলছে, আর তিনি মেঝেতে বসে গভীর মনোযোগে কাগজপত্র ওল্টাচ্ছেন, পাণ্ডুলিপি সংশোধন করছেন। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। এরপর মগবাজারে আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়ে ঢাকা থিয়েটারের মহড়া হতো, সেখানেও প্রায় একই ভঙ্গিতে তাঁকে দেখতাম। বাচ্চু ভাইয়ের পুরানা পল্টনের বাসায়ও হুবহু এক ভঙ্গিতে তাঁকে দেখেছি। সেলিম ভাইকে ভাবলে মেঝেতে বসা তাঁর এই ছবিটিই আমার মনে আসে।

একটু আগে ঢাকা থেকে আমার আরেক বন্ধু আলমগীর ফোন করে বলে, আজ আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে দোস্ত। সেলিম ভাই আমাদের কী ভালোবাসতেন, সেই মানুষ আজ নেই।

ঢাকায় তখন রাত একটা, বান্ধবহীন আলমগীর একা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে সেলিম ভাইয়ের জন্যে মন খারাপ করে। সেলিম ভাই আমাদের চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড়ো ছিলেন। হয়তো তাঁর এই প্রস্থান (নাটকীয় বলতে লোভ হয়, প্রস্থান শব্দটি নাটকে অপরিহার্য শব্দ) আমাদের ক্রমাসন্ন পরিণতির কথা ভাবায়। মনে হয় ভাঙনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আমাদের কালের নায়করা কেউ কেউ প্রস্থান করেছেন, অনেকে প্রস্থানোদ্যত। মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা রাইসুল ইসলাম আসাদ প্রায় পঙ্গু অবস্থা কাটিয়ে নতুন করে হাঁটা শিখছে, ফরীদি হাঁপানি-নিউমোনিয়ার প্রকোপ সামলে হাসপাতাল থেকে সদ্য ফিরেছে, ফুটবলার নান্নুকে ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছে। আমরা সবাই আসছি কিছু আগে বা পরে।

বিদায়, সেলিম ভাই। একজন অনুরাগীর অভিবাদন নিন।

জানুয়ারি ১৪, ২০০৮]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28761702 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28761702 2008-01-17 12:14:31
পড়ো অথবা পরো
ধরা যাক ছেলেটির নাম অরূপ । তাদের বাড়িতে গ্রাম থেকে এসেছেন এক বয়স্ক আত্মীয়। তার নাম জুবায়ের। জুবায়েরের কীর্তিকলাপে আর ক্রমাগত বকর বকরের ঠেলায় অরূপ ভয়াবহ রকমের বিরক্ত। কিন্তু কিছু করার নেই, মুরুব্বিকে অসম্মান করা যায় না। এই অবস্থায় নিম্নরূপ সংলাপ বিনিময় হচ্ছে:

জুবায়ের: তুমি কী পরো (পড়ো অর্থে)?
অরূপ: জ্বি এই লুঙ্গি পরি, প্যান্ট পরি, পাজামা পরি...
জুবায়ের: না না তুমি কোথায় পরো (পড়ো)?
অরূপ: এই নাভির দুই ইঞ্চি নিচে।
জুবায়ের: তুমি নামাজ পরো (পড়ো) না?
অরূপ: জ্বি না, টাইট হয়!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28755329 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28755329 2007-12-31 11:30:55
হাবিব, বন্ধু আমার চিত্রকর কাজী হাসান হাবিব অকালে প্রয়াত হন ১৯৮৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ওই দিনই ছিলো তাঁর চল্লিশতম জন্মদিন। এই রচনাটি তাঁকে স্মরণ করে লেখা ২০০৩-এ, তাঁর মৃত্যুর ১৫ বছর পর। প্রথম আলো-তে ছাপা হয়েছিলো।

১.[/sb

একটি ছবির নাম আপনি দিয়েছিলেন ‘উইদিন, উইদাউট’। আপনার প্রথম একক প্রদর্শনীর প্রস্তুতির সময় ছবিটির উপযুক্ত বাংলা নামের জন্যে দু’জনে অনেক সময় ব্যয় করেছিলাম মনে আছে। তখন একমাত্র বিবেচনা ছিলো বাংলা নামটিতে যেন ইংরেজির কাব্যিক দ্যোতনা অক্ষুণ্ণ থাকে। এখন ‘উইদিন, উইদাউট’-এর সঠিক মানে জানি - উইদাউট অবস্থার মধ্যে পতিত না হলে উইদিন-কে ভালো জানা হয় না। আপনি চলে যাওয়ার পর পনেরো বছর ধরে জানছি। শেষ সময়ে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, কথাও না। বিদায় দেওয়া-নেওয়া হয়নি। ভাবি, কী করে পারলেন! আমি পরবাসী হওয়ার পর মাত্র একবার ফোনে কথা হয়েছিলো। ফোন তুলে বললেন, এরকম তো কথা ছিলো না! সেই বাক্যটিই এখন আপনাকে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ফোনে কি আর আপনাকে পাওয়া যাবে? তাহলে, কাকে আর বলি!

আপনাকে নিয়ে লেখা আমার জন্যে সহজ নয়, আপনি বুঝবেন। আপনি কি বুঝেছিলেন, আপনার শেষ দিনগুলোতে আমি ঢাকায় উপস্থিত ছিলাম না? কেউ সেই সময়ে আপনাকে জানিয়েছিলো, আমি ঢাকায়। সিরাজকে, সারোয়ারকে বলেছিলেন যাচাই করতে। আপনার চলে যাওয়া তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, অথচ আমি ঢাকায় উপস্থিত থেকেও আপনার কাছে যাইনি - জানি না কার মাথায় এই নিষ্ঠুর রসিকতা করার বুদ্ধি এসেছিলো। আমি যে তখন সত্যিই ঢাকায় নেই, আপনি বিশ্বাস করেছিলেন কি না কোনোদিন জানা হবে না। আপনার শেষ দিনগুলোর আবাস মহানগর ক্লিনিকে ফোন করে হীরু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। হীরু ভাই, ডাক্তার, কোনো ভরসা দেননি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি জানালেন, সে অবস্থাও আর নেই!

প্রায় অনন্তকালের দূরত্বে বসে তখন নিজেকে কীরকম অসহায়, নিষ্ফল এবং করুণ মনে হয়েছিলো, কোনোদিন লিখতে পারিনি। আপনার শরীরে ক্যানসার পাওয়া গেলো অক্টোবরে, ৮৮-র বন্যায় সারাদেশ তখন ডুবে আছে। আপনাকে বম্বেতে পাঠানো হয়েছিলো, ফিরে এলেন। এতো কিছু ঘটে গেলো দু’মাস সময় ধরে, আমি তার কিছুই জানতে পারিনি। ডিসেম্বরের আঠারোতে ঢাকায় ছোটো বোনের কাছে ফোন করে জানলাম। তৎক্ষণাৎ ফোন করি মহানগরে। আঠারোর পরে তেইশে আবার ফোন করে জেনেছি কোনো উন্নতি নেই, সময় ফুরিয়ে আসছে। হীরু ভাইকে বলেছি, এখান থেকে আমার কিছু করার থাকলে জানান।

অর্থহীন কথা, খুবই বোকা বোকা। যা নির্ধারিত হয়ে আছে, আমি তা বদলানোর কে! ফোন রেখে দিলে এক ধরনের আতঙ্ক আমাকে পেয়ে বসে। স্ত্রীকে বলি, হাবিব এই পঁচিশ তারিখেই যাবে, আমি জানি। ডিসেম্বরের পঁচিশে ওর জন্মদিন। ওকে যদি কিছুমাত্র চিনে থাকি, আমি জানি ওই দিনটিই সে ঠিক করে রেখেছে চলে যাওয়ার জন্যে!

মৃত্যুশীতল সেই ডিসেম্বরের চব্বিশ গেলো, পঁচিশ-ছাব্বিশ-সাতাশ গেলো। ঢাকায় কাউকে ফোন করার সাহস হয় না। জেনে গেছি, কী শুনবো! শুনতে চাইনি। অথবা চেয়েছি যতোটা দেরিতে জানা যায়। নিজের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও পরাস্ত হয়ে ঢাকায় ফোন করেছিলাম ৮৯-এর জানুয়ারির প্রথম দিনে। যাচাই করে নেওয়া, আর কিছু নয়। আপনি গেলেন সেই পঁচিশেই, আপনার জন্মদিনে।

এখন এই ডিসেম্বরে আপনার বয়স হতে পারতো পঞ্চান্ন। অথচ আপনি আটকে থাকলেন চল্লিশে। রাসুল গামজাতভ নামের সোভিয়েত কবির একটি কবিতা সম্ভবত আপনিই পড়িয়েছিলেন। কবি স্মরণ করছেন, বাল্যকালে তিনি তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ ভাইয়ের সমান কিছুতেই হতে পারছেন না বলে দুঃখিত ও হতাশ। ভাই যুদ্ধে গিয়ে আর ফেরে না, কোনোদিন ফিরবে না। বিষণœ কবি এখন সেই ভাইয়ের চেয়েও বয়সে বড়ো, অথচ এই বোধ তাঁকে কোনো পরিতৃপ্তি দেয় না! হাবিব, আপনি বয়সে বড়ো ছিলেন। তখন। এখন আর নয়। আমি আপনার চেয়ে বয়সে বড়ো হয়ে উঠবো, কোনোদিন ভেবেছি! পঞ্চাশের এপারে-ওপারে থাকা আমাদের মনে হতেই পারে, এই বিষণœ বয়স আপনাকে চিনতে হলো না। আপনার তারুণ্যের ছবিটিই চিরকালের হয়ে থাক বরং।

পনেরো বছরেও আপনাকে নিয়ে পনেরোটা অক্ষর লেখা হয়নি আমার। ছেঁড়া টুকরো টুকরো কোনো কথা, কোনো ঘটনা মনে এলে সামলাতে শিখে নিয়েছি এতোদিনে। কিন্তু লিখতে বসলে যে আস্ত ছবিটা এসে সামনে হাজির হবে, তার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমি কোথায় পাবো?

২.

সেই সময় আমরা কিছু কাণ্ডজ্ঞানহীন ছিলাম। বিশ শতক ফুরিয়ে যেতে তখনো বাইশ-তেইশ বছর বাকি। আমরা বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলের ২১৭ নম্বরে নিয়মিত সান্ধ্য আড্ডায় হাজিরা দিতে আসা কয়েকজন। জহুরুল হক হলের ৩৬৪ থেকে আসে ফিরোজ সারোয়ার। নারিন্দার ২৪/১ বেগমগঞ্জ লেন থেকে সিরাজুল ইসলাম। গেণ্ডারিয়ার ৪ রজনী চৌধুরী রোডের ইমদাদুল হক মিলন। সূর্যসেনে ২১৭-র বাসিন্দা আমি। অনিয়মিত আসে বুলবুল চৌধুরী, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়। সুকান্ত অবশ্য তখন পাশ করা ডাক্তার, বিবাহিত এবং গৃহী। তবু তার সংসারবুদ্ধি খুব আঁটোসাঁটো ছিলো বলে মনে হয় না। পাশ দিলেই চাকরি করতে হবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই বলে সিরাজ তড়িৎ প্রকৌশলের বিদ্যা নিয়ে ঠিকাদারী করে। মিলনও তখন ফুলটাইম ঠিকাদার, জগন্নাথ কলেজে পার্টটাইম ছাত্র। বুলবুল একটি পত্রিকায় কাজ করে। ফুলটাইম ছাত্রের ঝাণ্ডাওয়ালা শুধু সারোয়ার ও আমি - আসলে কাজীর গরু, খাতায় থাকলেও গোয়ালে নেই।

সেই দুরন্ত অস্থির সময়ে বাংলাদেশ চলেছে এক বিষম অনিশ্চিত ঘোরের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, ক্যু, সামরিক শাসনের জগদ্দল, রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মহোৎসব। ত্বরিৎ অর্থোপার্জন ও ভাগ্যগঠনের সুযোগ নাগালের খুব দূরে নয়। সেদিকে মনোযোগ আমাদের ছিলো না। সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোই ছত্রখান হয়ে আছে, আমাদের সামান্য সামর্থ্য এসবের বিপরীতে দাঁড়ায় কী করে! যৌবন পরাজয় স্বীকার করতে জানে না, পাশ কাটাতে চায় বড়োজোর। আমরা পলায়ন করতে চেয়েছি, শিল্প-সাহিত্যের স্বেচ্ছাচারিতার ভেতরে আশ্রয় খুঁজেছি।

এই কাণ্ডজ্ঞানহীনদের দলে হাবিবের শামিল হওয়ার কোনো কারণ ছিলে না। তার ছিলো স্ত্রী-পুত্রসহ সংসার, একটি স্থির রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কিছু অপ্রত্যক্ষ (সেই সময়ে) তৎপরতা, তথ্য দফতরে সরকারি চাকরির পাশাপাশি দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক রোববারে খণ্ডকালীন কাজ। বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকায় কাইয়ুম চৌধুরী-পরবর্তীকালে হাবিব ছিলো সফলতম, সে ব্যস্ততাও কম নয়। ছবি আঁকার সময়ও তার আলাদা করা ছিলো। কলাবাগানের টিনের চালওয়ালা দুই কামরার বাসায় শয়নকক্ষের সঙ্গে লাগোয়া উত্তরের বারান্দায় খাবার টেবিল। অন্যটি বসার ঘর এবং সেখানেই হাবিবের কাজের জায়গা। চারদিকে বইপত্র, সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ছবি, রং-তুলি, সাদা ক্যানভাস। সংসারের সকল কর্মের শেষে আঁকতে বসতো সে গভীর রাতে। দু’তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সুযোগই ছিলো না। উজ্জ্বল রোদ তার রাতজাগা চোখ সহ্য করতে পারতো না, ভুরু কুঁচকে আলো সামাল দিতো সে।

এই হাবিব কী করে যে ২১৭-র (এই নামটিই আমাদের মধ্যে চালু ছিলো) আড্ডায় নিয়মিত আসতো, জানি না। তবে রাত ন’টার পরে ওকে ধরে রাখা যেতো না, তখন তাকে বাড়ি ফিরতেই হবে। আন্দোলন জারি রাখা বলে রাজনীতিতে একটা কথা চালু ছিলো তখন। হাবিব চলে গেলে আমরা বাকি চারজন আড্ডা জারি রাখতাম। সারোয়ার বলতে গেলে ২১৭-র দ্বিতীয় স্থায়ী বাসিন্দা ততোদিনে, কোনো কোনো রাতে সিরাজ-মিলনেরও আর পুরনো ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছে করতো না।

এই আড্ডায় সিরাজ ‘হরিণের দুধ’ নামে একটি কিশোর উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা শোনায় একদিন। কথা বলতে বলতে হাবিব বলপয়েন্টে নিউজপ্রিন্টের ওপরে বইয়ের প্রচ্ছদের একটি স্কেচ করে ফেলে। উপন্যাসটি সিরাজের লেখা হয়নি। স্কেচটি থেকে যায় আমার কাছে। বহু বছর।

আরেক সন্ধ্যায় ষাট-পঁয়ষট্টি বছর বয়সে আমরা কে কোথায় কী করবো, এই প্রসঙ্গ জরুরি হয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ হাবিব আমাদের প্রত্যেকের প্রৌঢ় বয়সের একটি করে স্কেচ করে ফেলে। আমারটিতে দেখা যাচ্ছে, আলোয়ান গায়ে দেওয়া একটি ভগ্ন মুখে সুদৃশ্য গোঁফ, বিস্তৃত কপালে বিস্তর বলিরেখা। নিচে লেখা, ভবিষ্যতের মু. জু.। অন্যরা ভবিষ্যতের ছবিটি রেখেছিলো কি না জানি না, আমারটা ছিলো। হাবিবের অন্তর্ধানের (মৃত্যু শব্দটি খুব কঠিন, আর হাবিবের বেলায় তা আমার বিশ্বাসের বাইরে। এখনো। চোখে দেখিনি যে!) পরে ঢাকায় গিয়ে স্কেচ দুটি জ্যোৎস্না ভাবীর কাছে গচ্ছিত রেখে আসি। নিউজপ্রিন্টের তৈরি লেখার একটি খাতা ছিলো হাবিবের, কোনো পত্রিকার ডামি হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছিলো, অনুমান করি। তার লেখা একটি অসমাপ্ত গল্প ছিলো খাতায়। বলেছিলো, গল্পটা আর আমার লেখা হবে না। খাতাটা আপনার কাছেই থাক, আপনি লিখে ভরাবেন। এই খাতাটিও জ্যোৎস্না ভাবীর সংগ্রহে দিয়ে এসেছি। এগুলো তাঁর কাছে অমূল্য!

৩.

বসন্তকালের এক সন্ধ্যায় হাবিবের সঙ্গে শাহবাগ হয়ে রমনার দিকে হাঁটছি। সিদ্ধেশ্বরী বা মালিবাগ কোথাও যাওয়ার কথা। শর্টকাট করার জন্যে টেনিস কমপ্লেক্স-এর পাশ দিয়ে রমনা পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়ি, পুরনো গণভবনের দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবো। পার্কের আলো-অন্ধকারের ভেতরে দু’জনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে টের পাই, আমরা চক্কর খেয়ে যাচ্ছি একই জায়গায়। গণভবনের গেট শুধু নয়, কোনো গেটই চোখে পড়ছে না, ক্রমাগত হেঁটে চলেছি। শেষ পর্যন্ত পার্কের বাইরে এসে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারিনি আমরা ঠিক কোথায়। রাস্তা, আশেপাশের বাড়িঘর সব অচেনা লাগে। দু’জনেই বিভ্রান্ত - কিছুই চিনতে পারি না! কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। পরে দু’জনে প্রায় একই সঙ্গে বুঝে ফেলি, আমরা গণভবনের উল্টোদিকের গেটে দাঁড়ানো!

এই রহস্যের কিনারা করা যায়নি। ভুলে-ধরা বলে একটা কথা শোনা ছিলো। আমাদের তাই হয়েছিলো? একই সঙ্গে? মানা যায়নি, এসব সংস্কারে আমাদের বিশ্বাস নেই।

আরেক দিনের ঘটনা। ১৯৮০ সালের। একটি লাল হোন্ডা ১১০-এ সওয়ার হয়ে তখন ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়াই। হাবিবকে নিয়ে ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে গোল্ডেন গেট-এ ঢুকেছি সন্ধ্যার খানিক পরে। ঘণ্টাদুয়েক পরে বেরিয়ে দেখি, তুমুল বৃষ্টি। ভেতরে বসে টের পাওয়া যায়নি। বৃষ্টি থামারও কোনো লক্ষণ নেই। ওই তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে আমরা দু’জনে মোটর সাইকেলে চেপে বসি। রাস্তায় নেমে টের পাই, কাজটা ঠিক হয়নি। বৃষ্টিতে সামনে পাঁচ হাত দূরের জিনিসও ভালো করে দেখা যায় না। দু’জনেই যার যার ঘরে অক্ষত ফিরেছিলাম সে রাতে।

এখন পেছনে তাকিয়ে ঘটনা দুটিকে আশ্চর্য প্রতীকী বলে মনে হয়। আমরা সত্যিই তখন খানিকটা দিকভ্রাšত, উদভ্রান্ত ছিলাম। বাইরের যাবতীয় প্রতিকূলতা ও বিপদসংকুলতার ভেতরে ছিলো আমাদের অনিশ্চিত যাত্রা।

৪.

১৯৭৫-এ একটি গল্প ডাকে পাঠিয়েছিলাম দৈনিক সংবাদ-এর রবিবাসরীয় পাতায় (তখনো রোববার ছুটির দিন)। বছর দুয়েক আগে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় এসেছি পড়তে। সম্পাদকের সামনে যাওয়ার সাহস তখনো হয়ে ওঠেনি। এক বা দুই সপ্তাহের মাথায় লেখাটি ছাপা হয়ে যায়। ঢাকার কোনো কাগজে আমার প্রথম গল্প। সচিত্রীকরণ দেখে মুগ্ধ আমি। জানা যায়, আঁকার কাজটি কাজী হাসান হাবিবের। নামে চিনি, বইয়ের প্রচ্ছদের কাজ করে হাবিব তখনই যথেষ্ট খ্যাতিমান। এক শনিবার বিকেলে হাসান হাফিজ আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় বংশালের সংবাদ অফিসে। হাবিবের সঙ্গে পরিচয় হয়। সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাতের সঙ্গেও।

হাসনাত ভাইয়ের উদার প্রশ্রয়ে অবিলম্বে প্রতি শনিবার বিকেলে সংবাদ অফিসে আমাদের আড্ডা শুরু হয়। পাশের দোকান থেকে চা-ডালপুরি আসে। অধূমপায়ী হাসনাত ভাই সেই ঘরে পাঁচজন বিষম ধূমপায়ীকে কেমন করে সহ্য করতেন জানি না। সেখানে একমাত্র কাজের কাজী হাসান হাবিব। আমরা উল্টোদিকে বসে তার কাজ দেখি। তার তুলিতে ছবি, একেকটা অবয়ব ফুটে উঠতে দেখি। হয়তো আমাদেরই কারো লেখার ইলাস্ট্রেশন হচ্ছে। গল্পের ভেতর থেকে তুলে আনা কোনো দৃশ্য। আঁকিয়ের নিজস্ব ব্যাখ্যায় সে দৃশ্য নতুন অর্থ পেয়ে যাচ্ছে। তখনই প্রথম বুঝি, লেখক এবং চিত্রকরের দেখার চোখ আলাদা। সিরাজ একদিন বলেছিলো হাবিবকে, আমরা লেখালেখি যা করার চেষ্টা করি, তার সবটা আপনি বোঝেন। আমরা আপনার ছবি বুঝি না কেন? এই ব্যবধানটা ঘুচিয়ে ফেলা দরকার না?

হাবিব বলেছিলো, অবশ্যই। চেষ্টা করলেই সম্ভব।

সিরাজ-মিলন-সারোয়ারের কথা জানি না, আমি নিজে ছবি বুঝতে খুবই ব্যর্থ হয়েছিলাম। আমারই অক্ষমতা।

শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমকে মেলানোর চেষ্টা ছিলো হাবিবের। প্রিন্ট গ্রাফিকস নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিলো, কিছু কিছূ করেওছিলো। তার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ছিলো ছবি এবং কবিতাকে মেলানোর চেষ্টা।

হাবিবের জীবদ্দশায় কম্পিউটার যন্ত্রটি বাংলাদেশে জনপ্রিয় বা সহজলভ্য হয়নি। এই মাধ্যমটিকে পেলে হাবিব বাংলাদেশের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পকে আরো অনেক দিতে পারতো, সন্দেহ নেই।

৫.

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে মতিঝিল কলোনীর এক বাসায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে বাস করেছিলাম মাস ছয়েক। হাবিবের পরোক্ষ যোগাযোগে ঘটেছিলো সেটা। পরের ঠিকানা বেইলি রোডে। নতুন তৈরি বেইলি ডাম্প কলোনির একটি বাসা বরাদ্দ হয়েছিলো হাবিবের দুলাভাই তাজুল ভাইয়ের নামে। কলোনির সেই ছোট্টো দুই কামরার বাসা তাঁর জন্যে অনুপযুক্ত বলে সে বাসায় উঠবেন-কি-উঠবেন না করছেন। হাবিবের সুপারিশে সেই বাসায় আমার থাকার ব্যবস্থা হয়। কয়েকমাস পরে তাজুল ভাই ওই বাসায় উঠে আসার সিদ্ধান্ত নিলে আমার পরবর্তী বাসস্থান হয় কলাবাগানে - হাবিবের বাসার দুশো গজের মধ্যে। হাবিব ২৯ উত্তর ধানমণ্ডি, আমি ৫০/ক। সাল ১৯৮০।

তখন মধ্যরাতের পরে ঢাকায় কারফিউ জারি ছিলো, জনগণনন্দিত সরকারের ‘নিরাপত্তা হই’ উপহার! পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক, যে তখনো সংসারী নয়, নিরাপত্তা তার কী কাজে লাগবে! তার চাই ইচ্ছেমতো চলাফেরার অধিকার। মধ্যরাতের পর বাইরে থাকা খুব জরুরি, এমন নয়। কিন্তু ইচ্ছে হলেও বেরোনো যাবে না, এই বোধের মধ্যেই তো শ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা!

রাত বারোটার মধ্যে কলাবাগান এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়ি। নিজের ঘরে ফেরার আগে হাবিবের ঘরে আড্ডা। কলাবাগানের ছোটো গলিতে কারফিউ না মানলেও চলে। হাবিব তখন ক্যানভাসের সামনে বসছে। কথা বলতে বলতে রং মেশাচ্ছে, সেই রং ক্যানভাসে উঠে আসছে। ফুটে উঠছে বিষণ্ণ নারীমূর্তি, একটি খোলা জানালা, ছুটন্ত শিশু, উদার নীল আকাশের এক কোণে খুব চেনা একটি চাঁদ। চাঁদ বিষয়ে হাবিবের বিশেষ দুর্বলতা ছিলো। স্ত্রীর নাম জ্যোৎস্না বলেই কি? ঠাট্টাও হতো এই নিয়ে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, গোঁফের তলায় মিটিমিটি হাসতো সে।

আঁকতে বসে গান শোনার অভ্যাস হাবিবের। সব ধরনের গানেরই কান ছিলো তার। ইংরেজি গানের ভেতরে সে-ই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো। বাংলা গানে অভ্যস্ত কানে ইংরেজি গানকে অর্থহীন চিৎকার মনে হতে পারে, আমারও হতো। অভ্যস্ত করে তোলার জন্যে সে আমাকে একে একে শুনতে দিয়েছিলো কারপেনটারস, ক্লিফ রিচার্ডস, বীটলস। ভ্যান গখকে নিয়ে ডন ম্যাকলীনের ‘ভিনসেন্ট’ (স্টারি স্টারি নাইট), পিংক ফ্লয়েডের ‘ডার্কসাইড অব দ্য মুন’, সায়মন অ্যান্ড গারফাংকেল-এর ‘ব্রীজ ওভার ট্রাবলড ওয়াটার’ বা ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ প্রথম শুনেছিলাম হাবিবের ছবি আঁকার ঘরে। বীটলস-এর ‘লুসি ইন দ্য স্কাই উইথ ডায়মন্ডস’ সম্পর্কে তার মন্তব্য: একেবারে বিশুদ্ধ পরাবাস্তবতা, কয়েক লাইনের একটিমাত্র গানের ভেতরেই যে কতো ছবি! এই পনেরো বছর পরেও ভুল হয়ে যায় আমার, কোনো একটি গান ভালো লাগলে মনে হয়, হাবিবকে যদি শোনাতে পারতাম!

১৯৮২-র এক সকালে হাবিব মলিন মুখে আমার বাসায় আসে। বিকেলে আর্ট কলেজে তার প্রথম একক প্রদর্শনীর উদ্বোধন। একটি বিষয়ে তার উদ্বেগের কথা আমার জানা ছিলো। প্রদর্শনীর পুস্তিকা ছাপার দায়িত্ব ছিলো যাঁর ওপর, সেই ভদ্রলোককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গতরাত পর্যন্ত পুস্তিকা দূরে থাক, কাজটা আদৌ হয়েছে বা হচ্ছে কি না তা-ও জানা যায়নি।

আমার বিছানায় বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলে সে। ব্যাপারটা আকস্মিক, হাবিবকে এমন বিপন্ন দেখতে আমরা কেউ অভ্যস্ত নই। প্রজ্ঞা ও স্থিরতার জন্যে আমরা বরাবর তার শরণাপন্ন হই। সেই হাবিবকে এখন আমি কী বলি! আমার ধারণা হয়, পুস্তিকা সম্ভবত আদৌ তৈরি হয়নি। একজন চিত্রকরের জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনীর আবেগ-উত্তেজনা অনুমান করা যায়। কোনো কথা বলার সাহস হয় না। কিন্তু ঘটনা আমার অনুমানকে পরাস্ত করে। হাবিব খামের ভেতর থেকে একটি পুস্তিকা বের করে। তার প্রদর্শনীর। শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়ে এলেও গণ্ডগোল সেখানেই। ছবির রং সব ওলটপালট হয়ে গেছে, মূল ছবির সঙ্গে কোনো মিল নেই। জীবনের প্রথম প্রদর্শনী নিয়ে এরকম ঘটলে যে কারো মাথা খারাপ হয়ে যাবে। ছবির প্রদর্শনীর পুস্তিকায় ছবির রংগুলোই লোপাট হয়ে গেলে তার চেয়ে অর্থহীন আর কী হয়! হাবিব স্বগতোক্তির মতো বলে, এই জিনিস কারো হাতে দেওয়া যায়!

প্রথমটি শেষ হওয়ার পরপরই হাবিব ছবি আঁকতে শুরু করে পরের প্রদর্শনীর জন্যে। বিষয় নির্বাচনটি অভিনব - বাংলাদেশের প্রধান কবিদের একটি করে কবিতার ছবি। ইলাস্ট্রেশনকে শিল্পবোদ্ধারা সচরাচর কমার্শিয়াল বা শস্তা কাজ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। হাবিবের চেষ্টা ছিলো, সেই ইলাস্ট্রেশনকে শিল্পের স্তরে তুলে আনা। এই কাজগুলি তার সেই চেষ্টার ফসল, এক ধরনের প্রতিবাদ। প্রায় তিন বছর ধরে ছবিগুলো এঁকেছিলো সে। ছবির গুণাগুণ বিচারের সাধ্য আমার ছিলো না, কিন্তু রাতের পর রাত তার সৎ ও সযত্ন পরিশ্রমের সাক্ষী আমি।

৬.

হাবিব চলে গেলো, সেই শীতকালেই আকস্মিকভাবে কাজী টুলুর সঙ্গে দেখা। টুলু হাবিবের ছোটো ভাই, আমেরিকাবাসী সে আমারও আগে থেকে। হাবিবের শেষ দিনগুলোর ভিডিও কেউ করেছিলো, সেটি দেখায় টুলু। চমকে উঠি, এ হাবিবকে আমি চিনি না! শীর্ণকায় ছিলো সে বরাবর, কিন্তু সুস্বাস্থ্যের দ্যুতি ছিলো তার শরীরে। ভিডিওতে কঙ্কালপ্রায় হাড়সর্বস্ব একটি মানুষকে দেখি, মাথাভরা কোঁকড়া চুল ঝরে গিয়ে যা অবশিষ্ট আছে তা হয়তো আঙুলে গোনা যায়। ক্লান্ত, অবসাদমাখা চোখ। নিজের কথাগুলো আপনমনে বলে গেলো হাবিব। বললো নিজের জীবনদর্শনের কথা, বোধ ও শিল্পবিশ্বাসের কথা। সব কথা নিশ্চয়ই বলা হয়নি। সেগুলো আর কোনোদিন জানা হবে না।

কবি রফিক আজাদ আমাকে একদিন বলেছিলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে বেশিরভাগ মানুষই কাতর হয়ে পড়ে, নিজের সারাজীবনের বিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে হলেও হয়তো কিঞ্চিৎ ধর্মমুখী হয়ে পড়ে। হাবিব আপস করেনি, পরাজয় স্বীকারের কোনো চিহ্নই ছিলো না। তার বিশ্বাসের ভিত অনেক বেশি শক্ত ছিলো, শেকড় ছিলো অনেক গভীরে। অসাধারণ, সাহসী বীরের মতো মাথা উঁচু করেই গেছে সে!

৭.

হাবিব, আপনাকে নিয়ে গুছিয়ে কিছু লেখা আসলে অসম্ভব আমার পক্ষে। কতো যে টুকরো কথা, টুকরো ছবি মনে আসে! কোনটা ছাড়ি, কোনটা লিখি!

অনন্ত তখন বছর পাঁচেকের। এক সন্ধ্যায় সে আপনার কোলে বসে বলেছিলো, ক্যাডবেরি কাকু (ওর জন্মদিনে কী দেবো ভেবে না পেয়ে এক বাক্স্র ক্যাডবেরি কিনে দেওয়ার সুবাদে আমার ওই নামকরণ হয়েছিলো), আমার বাবা সবার চেয়ে বড়ো! অনন্তর কথা শুনে আপনি খুব হেসেছিলেন, তাতে তৃপ্তি ও অহংকার ছিলো। আমি বলেছিলাম, ছেলে যদি পঁচিশ বছর বয়সেও এই কথা বলে তাহলেই আপনি জিতে গেলেন। হায়, অনন্তর পঁচিশ বছর হওয়া পর্যন্ত তো আপনি অপেক্ষা করলেন না!

দেশান্তরী হবো, গোছগাছের সময় আপনার দ্বিতীয় প্রদর্শনীর পুস্তিকার একটি কপি সঙ্গে নিয়েছিলাম। কেন, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। সেটি এখনো আমার পড়ার টেবিলে আছে। প্রকাশ্যে নয়, যদি নষ্ট হয়ে যায়! কিন্তু বই ও কাগজপত্রের মধ্যেই আছে, আমি চোখ বন্ধ করে হাত বাড়ালেও ঠিক পেয়ে যাবো। তার সঙ্গে আছে বিচিত্রা থেকে কেটে রাখা শাহরিয়ার কবিরের লেখা ‘কাজী হাসান হাবিবের ইচ্ছামৃত্যু’ শিরোনামের লেখাটি। আছে একটি কার্ড। আপনার অসুস্থতার খবর পেয়ে কিনেছিলাম। পাঠানো হয়নি, সেজন্যে কোনো দুঃখবোধ নেই কিন্তু। কার্ড পৌঁছাতে যা সময় লাগতো তার আগেই আপনার ঠিকানা বদলের সময় হয়ে গিয়েছিলো, সে ঠিকানা ডাক বিভাগের অধিগম্য নয়। আপনাকে খুব মনে পড়লে এগুলো বের করে দেখি। অসংখ্যবার পড়া, তবু শাহরিয়ার কবিরের লেখাটি পড়তে গেলে আজও চোখ ভিজে যায়।

এখন সিরাজ-মিলন-সারোয়ারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। অনুপস্থিত হাবিবের কথা উঠলে অজান্তে কখনো চুপ হয়ে যাই আমরা। এই তো সেদিনও সারোয়ারের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম, আপনার কথা বলতে গিয়ে সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলো পিতৃহীন শিশুর মতো। এই পনেরো বছর পরেও! আপনি জিতে গেছেন, আপনার জন্যে ঈর্ষা তাই খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া!

আমার আমেরিকাযাত্রার দিন এয়ারপোর্টে বলেছিলেন, যাচ্ছেন কিন্তু ফিরে আসার জন্যে। কথা দিয়েছিলাম, ফিরবো। সতেরো বছর হয়ে গেছে, আমার কি ফেরার সময় হলো, হাবিব? আপনাকে দেওয়া প্রতিশ্র“তির কথা আর কেউ জানে না। আপনিও আর মনে করিয়ে দেবেন না। ফিরবো তবে কার কাছে? কাকে বলবো, কথা রেখেছি?

ডিসেম্বর ২০০৩

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28753758 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28753758 2007-12-25 12:23:06
একটি উপন্যাসের কিছু অংশ : বিজয় দিবসের স্মরণ
পুরো লেখাটি পিডিএফ হিসেবে নিচের এই লিংকে পাবেন:

Click This Link

* * * * * * * * * * * * * * * * * *

মুনির ভাই একাত্তরের এক দুপুরে ঢাকা শহরে জোনাকি সিনেমার পাশের একটি ব্যাংক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ করতেও টাকার প্রয়োজন হয়। ঢাকা শহরে ঢুকে পড়া গেরিলাদের বাসস্থানের জন্যে ভাবতে হয়নি - নিজেদের বাড়িঘর ছিলোই - আরো অনেক ঘরের দরজা তাদের জন্যে উন্মুক্ত, আহার্যও সমস্যা নয়। কিন্তু তারপরেও টাকার দরকার যাতায়াত, যোগাযোগ, সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্যে। সুতরাং পাকিস্তানীদের ব্যাংক লুট করার সিদ্ধান্ত। এই ঘটনা ঢাকা শহরের মানুষকে সেদিন অনেক সাহস দিয়েছিলো, অপদস্থ বোধ করেছিলো দখলদাররা।

প্রকাশ্য দিবালোকে এই দুঃসাহসী অভিযানটিতে মুনির ভাইয়ের সঙ্গী আসাদ, রাজী, ফিরোজ আর ফেরদৌস। নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় অভিযান। স্বাধীনতার পর একশো মুক্তিযোদ্ধার বৃত্তান্ত নিয়ে একটি বই বেরিয়েছিলো, তাতে মুনির ভাই অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অগ্রবর্তী। পরিচয় ছিলো তখন, ঘনিষ্ঠতা হয়নি। বছর চারেক আগে তিনি এই শহরে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। একদিন আমার সঙ্গে যাচ্ছেন, তাঁর চুল কাটানো দরকার।

আজকের দিনটা আপনার মনে আছে, মুনির ভাই?

প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধাকে কিছু বিভ্রান্ত দেখায়। জিজ্ঞেস করেন, ক্যান কী দিন আজ?

আজ ডিসেম্বরের ষোলো তারিখ। ক্যামনে ভুললেন?

চুপ করে থাকেন ভূতপূর্ব মুক্তিযোদ্ধা, বজ্রাহতের মতো স্থির। আমার, হয়তো তাঁরও, তখন স্মরণে আসে, প্রায় তিরিশ বছর আগে এইরকম একটি দিনে চুল কাটানোর কথা আমাদের মনেও আসেনি। আমাদের তখন কাঁধ পর্যন্ত নামানো চুল, দীর্ঘদিন না-কামানো গালে দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে দুই চোখে ক্লান্তি, অথচ মুখে যুদ্ধজয়ের উল্লাসময় দীপ্তি। সেই উৎসবে শ্রান্তি তখন অবান্তর। হাতের অস্ত্রটি আকাশের দিকে তুলে ধরা, ভঙ্গিটি যেন এই কথা রাষ্ট্র করে দিতে চায়, আমরা অসাধ্য সাধন করেছি, আকাশও আর আজ আমাদের কাছে অজেয় ও সুদূর নয়। সেদিন আমাদের পোশাক মলিন ও অবিন্যস্ত, কাদামাটিতে মাখামাখি জুতা, কারো কারো খালি পা, নখ কাটা হয় না কতোদিন, অস্নাত এবং নির্ঘুম, শেষ আহার কখন হয়েছে মনেও নেই। বিজয়ীর যৌবন এইসব তুচ্ছ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার সময় পায় না, বরং তাকে অপ্রয়োজনীয় ও বাহুল্য জ্ঞান করে।

মুনির ভাই আমার দিকে তাকান না, সামনে সরাসরি রাস্তায় তাঁর চোখ নিবদ্ধ। কয়েক মুহূর্ত পরে তাঁর গালে অশ্রু গড়িয়ে নামতে দেখি। সারাপথ দু’জনে আর কোনো কথা বলি না।

পরে একদিন মুনির ভাই বলেছিলেন, আমার ক্যান জানি আর কিছুই মনে পড়ে না। ভুল হয়া যায়, আগরতলা যাওয়ার সময় এক রিকশাওয়ালা তার বাড়িতে একরাত আমারে লুকায়া রাখছিলো। তাদের একখান মোটে মুরগি, ডিম বেচলে ঘরে কিছু পয়সা আসে। আমি জানতে পারি নাই, তারা সেই মুরগি জবাই কইরা আমারে ভাত খাইতে দিছিলো। রিকশাওয়ালার বউ কয়, মুক্তিগো লাইগা কলিজাডা খুইলা দিতে পারি। আপনে চিন্তা কইরেন না ভাইজান, দ্যাশ স্বাধীন হইলে ম্যালা মুরগি হইবো আমার!

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যান মুনির ভাই। আমি বলি না, বলার মুখ নেই, ওই রিকশাওয়ালার ঘরে ম্যালা মুরগি হয়নি, আমরা জানি। স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমরা পারবো। সাম্যবাদী একটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা আমরা চেয়েছিলাম। সেখানে মানুষের ধর্মপরিচয় অপ্রাসঙ্গিক - ধর্ম হবে মানুষের ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়, রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক থাকবে, যেমন থাকে সকল আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্রে। রাষ্ট্রের পরিচালকরা সকল মানুষের কল্যাণ করবেন, মানুষকে নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার দেবেন, আহার-পরিধেয়-আশ্রয়-বিদ্যাচর্চা-স্বাস্থ্যের সংস্থান নিশ্চিত করবেন।

আমরা পারিনি, করা হয়নি কিছুই, আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি। এমনও মনে হতে পারে, দেশই আমাদের ছেড়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রের পালকরা আজ আর আমাদের ভাষায় কথা বলেন না, সে ভাষা তাঁরা বিস্মৃত হতে প্রবলভাবে ইচ্ছুক বলে মনে হয়।

দেশান্তরী, তবু দেশটি আমার বড়ো ভালোবাসার ধন। আমার দেশের সামান্যতম কোনো সাফল্যে আমার গর্ব হয়, চোখ আর্দ্র হয়। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নবাগত ও অখ্যাত বাংলাদেশ দুর্দান্ত পাকিস্তানীদের হারিয়ে দিয়েছে জেনে একলা ঘরে আমি প্রাণভরে কাঁদি। একুশে ফ্রেব্রুয়ারিকে জাতিসঙ্ঘ সারা পৃথিবীর মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দিলে অহংকারে মাটিতে আমার পা পড়ে না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28752075 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28752075 2007-12-17 00:20:52
‌‌‌প্রলয়ের একরাত্রি : 'ঘুমো বাছা ঘুমো রে / সাগর দিলো চুমো রে...'
এই নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং উপলক্ষ করে যখন সারা দেশ জেগে উঠেছে, তখন এসেছিলো এক মরণ ছোবল। এই ভূখণ্ডের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সমগ্র সমুদ্র-উপকূলে হারিকেন ও প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে মাত্র এক রাতে কয়েক লক্ষ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ঘরবাড়ি, গবাদি পশু কিছুই রক্ষা পায়নি। তারিখ ১২ নভেম্বর। ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশিত হতেও সময় লেগেছিলো। যখন জানা গেলো যে মৃত মানুষের সংখ্যা বারো লক্ষ (মতান্তরে দশ লক্ষ), তখন পৃথিবী থমকে যাওয়ার অনুভূতি হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রকৃতির আঘাত যখন আচমকা আসে তখন মানুষ সত্যিই অসহায়। কিছু সতর্কতা হয়তো সম্ভব, তাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছু কমে। কিন্তু ১২ নভেম্বরের ওই দুর্যোগের আভাস খুব সামান্যই জানা গিয়েছিলো। পরে প্রকাশিত হলো এই অবিশ্বাস্য তথ্য যে এই ঝড় সম্পর্কে তথ্য থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার তা আমলে নেয়নি, যথাসময়ে সতর্কতাও আসেনি। ঝড়ের পূর্বাভাস ছিলো, তার ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুমাত্র আভাসও ছিলো না। ফলে এই অঞ্চলের মানুষ যারা এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেচে থাকে তারা এই পূর্বাভাস নিয়ে আলাদা করে মাথা ঘামায়নি। অনিবার্য ফল হিসেবে কয়েক লক্ষ মানুষ নেই হয়ে গেলো একরাত্রির ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে। এই সেদিনের হারিকেন কাটরিনার তুলনায় সে দুর্যোগ কিছুমাত্র খাটো ছিলো না।

এই বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরেও পাকিস্তানী শাসকদের ত‌‌‌‌ৎপরতা খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি, তা ত্রাণে, না সহানুভূতিতে। আরো একবার বোঝা গিয়েছিলো পূর্ব বাংলা ঠিক পাকিস্তান নয়।

আমাদের বাড়িতে তখন দৈনিক পূর্বদেশ রাখা হতো। এই কাগজটি এই দুর্যোগের অসাধারণ কাভারেজ করেছিলো মনে আছে। বিশাল ব্যানার হেডিং করেছিলো : ‘কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো’ এবং সেদিন কাগজের প্রথম পাতার মাস্টহেড নামিয়ে দেয় একেবারে তলায়। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এই ঘটনা আমার জানামতে ওই একবারই ঘটেছিলো।

তখন কেন্দ্রীয় সরকারে ছয়জন বাঙালি মন্ত্রী ছিলেন। একদিন প্রথম পাতায় পাশাপাশি তাঁদের ছোটো ছবি ছাপা হলো, তার নিচে জনসভায় বক্তৃতারত ভাসানীর বিশাল ছবি, তাঁর উদ্যত তর্জনী ওই ছবিগুলোকে নির্দেশ করছে। সঙ্গে হেডিং : ‘ওরা কেউ আসেনি’।

মনে পড়ে গেলো এইসব কথা। আসলে ভোলা তো হয় না। এই কাগজগুলি আমাদের বাড়িতে এখনো সযত্নে রক্ষিত আছে। হাজার হাজার মাইলের ব্যবধানে না থাকলে এগুলি স্ক্যান করে তুলে দেওয়া যেতো। তা তো আর হওয়ার নয়, পরবাস যাপনের মাশুল।

পূর্বদেশ-এ দিনের পর দিন ওই দুর্যোগে নিহত মানুষের, গবাদি পশুর পড়ে থাকা লাশের ছবি ছাপা হয়েছে। একদা কোলাহলময়, এখন বিরান সব জনপদের ছবি দেখে মন ভারি হয়ে ওঠে। একদিন এরকম কিছু ছবির সঙ্গে রফিকুল হক লিখলেন একটি অবিস্মরণীয় ছড়া :

ছেলে ঘুমলো বুড়ো ঘুমলো ভোলাদ্বীপের চরে
জেগে থাকা মানুষগুলো মাতম শুধু করে
ঘুমো বাছা ঘুমো রে
সাগর দিলো চুমো রে
খিদে ফুরোলো জ্বালা জুড়লো কান্না কেন ছি
বাংলাদেশের মানুষ বুকে পাষাণ বেধেছি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28744924 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28744924 2007-11-12 12:55:29
হিরোশিমার সেই অ্যাটম বোমারু মারা গেলো
আমেরিকান বিমান বাহিনীর সদস্য হিসেবে পল টিবেট তখন আদেশ পালন করেছিলো মাত্র - এইভাবে হয়তো ঘটনাটিকে দেখা চলে। কিন্তু এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে একদিনের জন্যেও কিছুমাত্র অনুতাপ-পরিতাপ তার হয়নি। অথচ তার জবানিতেই জানা যাচ্ছে ধ্বংসের পরিধি কী বিশাল ছিলো। তাকে ব্রিফিং দেওয়া হয়েছিলো এই মর্মে যে, এই বোমাটি বিস্ফোরিত হবে ২০ হাজার টন ডিনামাইটের ধ্বংসক্ষমতা নিয়ে।

পল জানাচ্ছে, "দান্তে সেদিন আমাদের বিমানে থাকলে আতংকিত হতেন। কয়েক মিনিট আগেও সকালের উজ্জ্বল রোদে যে শহরটি দেখিছলাম তা এখন অতি কদর্য একটি দৃশ্যে পরিণত হয়ে গেছে। আগুন আর ধোঁয়ায় আর কিছু দেখা যায় না। সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।"

এতোবড়ো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে গেছে জেনেও পল বলেছিলো, সেই রাতে সে খুব ভালো ঘুমিয়েছিলো। ঘটনার পর আরো ৬২ বছর বেঁচে ছিলো সে, তার কখনো অনুতাপ হয়নি।

খবরের কাগজ এবং আলোচনা-প্রতিবাদের শিরোনামে থাকা আমাদের দেশের কোনো কোনো টিবেট-শাবককে কি মনে পড়ে যায় না? এক হিসেবে পল টিবেট এদের পিতৃস্থানীয় তো বটেই!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28741972 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28741972 2007-11-02 10:37:21
১৯৭১ সালে কিছু হয়েছিলো নাকি?
ঠিক কথা। যুদ্ধ হলে তবে না যুদ্ধাপরাধী থাকার কথা ওঠে। এ দেশে যুদ্ধ কবে হয়েছিলো? অর্বাচীনদের জানিয়ে দাও, আমাদের স্বাধীনতা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলো।

এইসব ভাবতে ভাবতে কী কী আর মনে পড়ে না তার একটা তালিকা করা গেলো:

১. ওই বছর এ দেশে মৃত্যুহার অতি উচ্চ হয়ে পড়েছিলো বলে কেউ কেউ দাবি করে। কারণ হিসেবে বলা হয় নির্বচার হত্যা। বিষয় অমীমাংসিত।

২. ওই বছর সারা দেশ জুড়ে একটা গণভ্রমণের প্রবণতা দেখা গিয়েছিলো। বাড়িঘর ছেড়ে মানুষ বনেজঙ্গলে যায় উৎসব করতে। মিলিটারির কথা বলে বাচ্চাদের কান্না থামানোর এক চমকপ্রদ উপায় এই সময়ে উদ্ভাবিত হয়েছিলো, যা আজও মাঝে মাঝে কার্যকর।

৩. জানা যায়, এক কোটি লোক পাশের দেশে যায় পিকনিক করতে। এতো বিশাল আকারের দীর্ঘস্থায়ী পিকনিক পৃথিবীর ইতিহাসেই কম হয়েছে বলে জানা যায়।

৪. একদল বেয়াড়া অবাধ্য বালক ও যুবক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার অভিনয় করেছিলো তখন।

৫. আমার বাল্যকালের বন্ধু সাইফুল, বাদশা ও আলতাফ আলীকে কেন কে জানে আর কোনোদিন খুঁজে পেলাম না। ছটফটে দুলালের দুটি চোখই কী এক অলৌকিক উপায়ে নেই হয়ে গেলো।

৬. সুদর্শন মাসুদ ও আরেক বন্ধুর ছোটো ভাই স্কুলে-পড়া বালক টিটুর নামের আগে শহীদ লেখা ফ্যাশন হয়ে গেলো।

৭. বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম নামকরণের মানে কী? সে না হয় ছিলো এক প্রতিশ্রুতিবান ফুটবলার, না হয় ৭১-এর মাঝামাঝি থেকে আর কখনো তাকে কোথাও দেখা যায়নি। তার নামে স্টেডিয়াম?

আরো অনেক অনেক কথা মনে পড়েনি। সময় পেলে পরে লেখা যাবে। ইচ্ছে হলে আপনিও কিছু যোগ করে দিতে পারেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28739913 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28739913 2007-10-26 09:28:19
বৃদ্ধা বিহারি : তানভীর মোকাম্মেল-এর কবিতা
বৃদ্ধা বিহারি / তানভীর মোকাম্মেল

(ভারত বিভাগের ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে)

লিখেন সাম্বাদিক সাব আমি বিহারি

পাটনা জেলায় ক্ষেতি ছিল হামাদের
আব্বাজান রেলওয়ের গুমটিগার্ড
সোয়ামিও রেলে লাইনম্যান
হামাদের চমন পুড়ে নতুন পতাকা হলো
যখন এলাম প্রথম পাকিস্তান মালগাড়িতে দিন গুজরান
আজও কানে বাজে শান্টিং ইঞ্জিন
এ কলোনি ও কলোনি
কেটে গেলো জিন্দেগির দিন;

তারপর কী ঘটল মুলুকে বাঙাল
সেবারে পুড়েছিল ঘর এবারে কপাল
স্বামী শান্তাহারে খুন হলো মেয়ে-জামাই ময়মনসিংয়ে
দিনাজপুরে ছেলেকে ডেকে নিল মিটিং বলে
৩৬ বছর পার হলো সে মিটিং আজও শেষ হলো না!

লিখেন এনজিও আপা আমি বিহারি

মেজ ছেলে অনেক তকলিপ করে পালিয়েছে পাকিস্তান
আরেক মেয়েও করাচি রঙ্গি টাউন
বাইশ বছর ওদের সুরত দেখি না
আর ছোট ছেলেটা গুল্লু
ভিসার অপেক্ষায়
দারু খায় আর কী কী যেন খায় জোয়ান ছেলেরা
ক্যাম্পে তো আসমান নেই ফেরেশতারা তাই দেখতে পান না!

লিখেন বিদেশি স্যার আমি বিহারি

কিতনা জেনারেল আয়া গ্যায়া
লেকিন ম্যায় আজ ভী ইন্তেজার মে হুঁ
কব যায়েঙ্গে পাকিস্তান
ইয়া কবরিস্থান!
চোখে হামার ছানি এখন ভালো দেখি না
শুধু ইয়াদ হয় পাটনায় আমাদের ক্ষেতির কথা

আর ভালো লাগে ঝরঝর বর্ষা বাংলার
যেন তা সমান আমার কান্নার আর
রাতের খোয়াব দেখি পাকিস্তানের পাহাড়

লেকিন আপসোস খোদাকা এতনা বড়া দুনিয়ায়
কোনো মুলুকেই মাকান নেই হামার;

ইয়ে সাম্বাদিক সাব, ইয়ে এনজিও আপা, ইয়ে বিদেশি স্যার
আপা জারা জিন্নাহ সাব সে পুঁছিয়ে না
মেরা ওয়াতান কিধার?

জি, লিখ লিজিয়ে ... ম্যায় বিহারি হুঁ!

----------------------------
১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৭
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28735566 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28735566 2007-10-05 09:16:23
প্রথম আলো যা হারালো
কিন্তু এই ঘটনায়, বিশেষ করে প্রথম আলোর ভূমিকায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো মুক্তচিন্তার ধারাটি।

ঘটনা এতোই তুচ্ছ যে প্রথম আলোর সবরকম যুক্তি ছিলো এই নন-ইস্যুর বিপক্ষে দাঁড়ানোর। অভিযুক্ত কার্টুন-গল্পটি যে একটি নির্মল শিশুতোষ পরিহাস তা একজন শিশুও বুঝবে। মোল্লারা বোঝে না তা নয়, কিন্তু তারা তো অজুহাতের সন্ধানেই আছে। স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে প্রথম আলো বলতে পারতো, তথাকথিত আহত ধর্মানুভূতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, তা নেহাতই মোল্লা ও নির্বোধদের কষ্টকল্পিত।

উল্টে নতজানু হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে প্রথম আলো মুক্তচিন্তার পাঠকদের অপমান করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সামর্থ্যকেও অস্বীকার করেছে। পাঠকপ্রিয়তা এবং অন্যসব কানেকশন - যে কোনো বিচারেই প্রথম আলো এখন মোল্লাদের নাগালের বাইরে। যতোই বন্ধ করার দাবি করুক, প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই বলেই মনে হয়।

আর প্রথম আলোর এই ভূমিকায় সৎ ও সাহসী লেখক-সাংবাদিকরা হয়তো একটি ভরসার জায়গা হারালেন। হোক আরিফ ফ্রীল্যান্সার, তার পাশে দাঁড়ানো কাগজটির নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পরবর্তীতে তার সম্পর্কে সতর্ক হওয়া বা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ঘরের ভেতরেই রাখা উচিত ছিলো। সুমন্ত আসলামের চাকুরিচ্যুতি বিষয়েও একই কথা। যে প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব কর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদের বাঘের মুখে ছেড়ে দিয়ে আসে, তাদের বর্তমান বা ভবিষ্যত কর্মীদের (সামগ্রিকভাবে সব সংবাদপত্রকর্মীই এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান) ভরসার জায়গা আর কোথায় থাকে?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28732994 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28732994 2007-09-23 10:30:40
এ জগতে হায় সেই বেশি চায়
পুরো সংবাদটি পড়তে চাইলে এখানে - নামের কাঙাল সাইফুর Click This Link

ঠিক তার বিপরীতে আছে মফস্বল এলাকার কিছু দরিদ্র শিক্ষকের কথা যাঁরা নিজে উপোসী থেকেও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন, বই-খাতা কিনে দিয়েছেন। পড়তে পড়তে আমার চোখ ভিজে যায়। এই মানুষগুলি কিছুই চান না, শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের বিকশিত করতে পারে এই তাঁদের একমাত্র চাওয়া। আজকের দিনের এই রূপকথা - অদম্য মেধাবীদের বরেণ্য শিক্ষকেরা Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28731282 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28731282 2007-09-15 09:46:45
'এখন এসব বোলো না' (দেশে সবকিছু স্বাভাবিক!)
দেশছাড়া হওয়ার পর দীর্ঘকাল তার সঙ্গে যোগাযোগ খুব ক্ষীণ ছিলো। গত কয়েক বছর অনিয়মিত যোগাযোগ হয় ইমেল বা ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং-এ। প্রচুর পড়ুয়া মেয়ে সে ছোটোবেলা থেকে। ওদের পরিবারে এরকমই হ্ওয়ার কথা।

আমার লেখা এখানে-ওখানে পড়লে তার মতামত জানায়। তার আগ্রহের কারণে ব্লগে প্রকাশিত আমার কিছু কিছু লেখার লিংক ওকে পাঠাই। অনলাইনে কোথাও কোনো ভালো লেখা পেলে তা-ও তার সঙ্গে শেয়ার করি। আগ্রহ নিয়ে পড়ে সে। মতামত দেয়। তার নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনার শরিক করে সে আমাকে। সেসব বিষয়ে আমার মত জানতে চায়। বয়সের বিস্তর ফারাক সত্ত্বেও বন্ধুর মতো কথা হয়।

গত পরশু তারাপদ রায়ের মৃত্যুসংক্রান্ত আমার দুটি ব্লগের লিংক পাঠাই তাকে, তখন সে অফলাইনে। কবির মৃত্যুসংবাদ তাকে পাঠানো আমার জরুরি মনে হয়। সে নিজেও একজন কবির কন্যা, যদিও তার জন্মের পরের বছর কিছু বুঝতে শেখার আগেই সে পিতাকে হারিয়েছে। পিতার কোনো স্মৃতিই তার নেই।

গতকাল তাকে অনলাইন দেখে মেসেজ পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করি, লিংক দুটো পেয়েছিলে?

তার ত্বরিৎ উত্তরে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। থমকে যেতে হয়। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে লিখেছে, এখন এসব কথা বোলো না।

বুঝে যাই সে কোনসব কথার ইঙ্গিত করছে।

পত্রিকায় পড়ছি দেশে সব স্বাভাবিক। কারফিউ তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিনে ছাত্র ও সাংবাদিক পেটানো, শিক্ষক আটক (বা আরো অনেককিছু যা কাগজে আসেনি বলে সন্দেহ করা চলে) এইসব ঘটনায় যে আতংকের বোধ সৃষ্টি হয়েছে, তা তুলে নেবে কে?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28728284 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28728284 2007-08-28 18:11:20
দারিদ্র্য রেখা : তারাপদ রায়ের সেই বিখ্যাত কবিতাটি তারাপদ রায়


আমি নিতান্ত গরীব ছিলাম, খুবই গরীব।
আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না,
আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না।
অসীম দয়ার শরীর আপনার,
আপনি এসে আমাকে বললেন,
না, গরীব কথাটা খুব খারাপ,
ওতে মানুষের মর্যাদা হানি হয়,
তুমি আসলে দরিদ্র।

অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমার কষ্টের দিন,
আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আর শেষ হয় না,
আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম।
হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন,
দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম,
দরিদ্র শব্দটিও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব।

দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিন রাত্রি,
গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে,
শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে,
বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে,
আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম।
আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই,
আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন,
তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না,
তুমি নিঃস্ব হবে কেন,
তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে,
তুমি বঞ্চিত, তুমি চিরবঞ্চিত।

আমার বঞ্চনার অবসান নেই,
বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে,
উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে,
কঙ্কালসার আমার বেঁচে থাকা।
কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি,
এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন,
জাগো, জাগো সর্বহারা।

তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই,
ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি,
আমার বুকের পাঁজর হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে,
আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে
আমি তাল মেলাতে পারছি না।

ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে,
আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান,
আরো চৌকস হয়েছেন।
এবার আপনি একটি ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে এসেছেন,
সেখানে চকখড়ি দিয়ে যতœ করে
একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন।
এবার বড় পরিশ্রম হয়েছে আপনার,
কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন,
এই যে রেখা দেখছো, এর নিচে,
অনেক নিচে তুমি রয়েছো।

চমৎকার!
আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ!
আমার গরীবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার নিঃস্বতার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার সর্বহারাত্বের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আর সবশেষে ওই ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ওই উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।

কিন্তু,
ক্রমশ,
আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার ওপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে।
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727893 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727893 2007-08-26 12:31:42
চলে গেলেন কবি তারাপদ রায়
মাত্র গতরাতে তারাপদ রায়ের একটি কবিতা পড়ছিলাম "দেশ"-এর ২ অগাস্ট, ২০০৭ সংখ্যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খবর এলো, কবি আর নেই, চলে গেছেন।

শক্তি-সুনীলদের সমসাময়িক তারাপদ রায় পঞ্চাশ-ষাট দশকের প্রভাবশালী সাহিত্যের কাগজ "কৃত্তিবাস"-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন শুরু থেকে। এমনই সেই সম্পৃক্তি যে একমাত্র পুত্রের নামও রেখেছেন কৃত্তিবাস।

তাঁর একটি বইয়ের নাম "কোথায় চলেছেন, তারাপদবাবু?" তাই তো, কোথায় চললেন কবি?

আমার কাছে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলির একটি মনে হয় "দারিদ্র্যরেখা" নামের কবিতাটি। আশির দশকের শুরুর দিকে "দেশ" পত্রিকায় বেরিয়েছিলো। তখনো ঢাকায় জেরক্স খুব সহজলভ্য ছিলো না। মনে আছে, এই কবিতাটির অন্তত পঞ্চাশটি জেরক্স কপি বন্ধু ও পরিচিতদের মধ্যে বিতরণ করেছিলাম।

যদি সংগ্রহ করতে পারি, এখানে তুলে দেবো।

কে ভুলবে "আনন্দমেলা"-য় তাঁর "ডোডো-তাতাই পালাকাহিনী"? "দেশ"-এর পাতায় ধারাবাহিক রম্য "কাণ্ডজ্ঞান", "জ্ঞানগম্যি", "বিদ্যাবুদ্ধি" ইত্যাদি?

তাঁর জন্মস্থান ও আদি নিবাস ছিলো টাঙ্গাইলে। ৪৭-এ দেশভাগের পর কলকাতা। কিন্তু তাঁর গদ্যে-পদ্যে সর্বত্র টাঙ্গাইল ঘুরেফিরে এসেছে আজীবন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একাধিকবার এসেছেন পিতৃভূমিতে। এমনকি, সর্বশেষ কবিতা যেটি পড়ছিলাম গতরাতে সেখানেও নাম উল্লেখ না থাকলেও টাঙ্গাইলের কথাই লিখেছেন বলে অনুমান করা যায়।

কবিতাটি এখানে তুলে দিই।

************************************
পুরনো শহরতলিতে // তারাপদ রায়

আবার ফিরে এলাম,
আর একটু খোঁজ নিয়ে এলেই ভাল হত।

বাড়ির সামনের দিকে
একটা কয়লার দোকান ছিল
কাঠ, কয়লা, কেরোসিন - খুচরো কেনা বেচা,
কেউ চিনতে পারল না

দু'জন রাস্তার লোক বলল,
'এদিকে কোনো কয়লার দোকান নেই
গলির এপারে রাধানাথ দত্তের গ্যাসের দোকান
সেখানে খোঁজখবর নিয়ে দেখুন।'
মনে আছে কয়লার দোকানের পিছনে ছিল বড় উঠোন,
কয়েকটা আম কাঁঠাল গাছ, ভাঙা বারান্দা, ঘর দোর।
এখন তো কিছুই নেই,
শুধু একটা নেমপ্লেট, 'নাগরিক'।
চারতলা বাড়ি, ষোলটা ফ্ল্যাট,
এরই মধ্যে কোনওটায় আমি ফিরে এসেছি।
কিন্তু কয়তলায়, কাদের ফ্ল্যাট?
স্বর্গীয় রূপকবাবুর পদবিটা যেন কী ছিল,
তাঁদের নতুন বাসাবাড়িতে এখন কে থাকে -
কোনও খোঁজখবর রাখি না,
শুধু মনে আছে তাঁর ভাইঝি টুলটুলি।
না। সেই বাড়িটা জগৎসংসারে আর নেই,
টুলটুলিকে কেউ চেনে না।
পুরনো শহরতলির নতুন পাড়ায় বোকার মতো ঘুরি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727842 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727842 2007-08-26 09:10:46
২০০৭-এ পুনরায় মঞ্চস্থ, ৭৫-এর অগাস্টের তৃতীয় সপ্তাহে অভিনীত নাটকের একটি দৃশ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একজন এই সৈনিক! ...

... রিকশাওয়ালা সৈনিকের সামনে রিকশা থামিয়ে নিজের সীটে বসে ছিলো। আরোহী যুবকের মতো তারও চোখে জিজ্ঞাসা, রাস্তার মাঝখানে থামতে বলা হলো কেন হঠাৎ? সৈনিকপুরুষ আচমকা তার পিতার বয়সী প্রৌঢ় রিকশাওয়ালার গালে সজোরে চড় বসিয়ে দেয়। রিকশাওয়ালা ঘুরে পড়ে যায় রাস্তায়। যুবক নিজের অজান্তে রিকশা থেকে নেমে এসে মুখোমুখি হয় সৈনিকের। চোখে চোখ ফেলে জিজ্ঞেস করে, অরে মারলেন ক্যান? কী দোষ করছিলো সে?

আপনে চুপ থাকেন তো মিয়া! নবাবের বাচ্চা রিকশা থামাইয়া সীটের উপরে বইসা থাকে!

বোঝা গেলো। প্রভুদের প্রতিনিধি সেপাইয়ের সামনে রিকশাওয়ালার সীটে বসে থাকাটা শক্ত ধরনের বেয়াদবি হয়েছিলো। যুবক এবার জিজ্ঞেস করে, কিন্তু থামতে বললেন ক্যান তা তো বুঝলাম না!

থামাইছি আপনের জন্যে। আপনের লম্বা চুলগুলি কাইটা ফেলতে হবে।

মানে?

ওঃ, আবার মানে জিগায়। আপনেরে তো বাংলায়ই বললাম, লম্বা চুলগুলি কাটতে হবে। ...

... চুলের দৈর্ঘ্য কমিয়ে ফেললেও মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল রাখে সে এখনো। একেবারে ছোটো ছোটো করে কদমছাঁট দেওয়া তার কোনোকালে পছন্দ ছিলো না। ...

... নিজেকে সুন্দর লাগুক, কোন মানুষ তা না চায়? ... কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা চুলগুলি তার ব্যক্তিত্বের অংশ, যেমন তার চোখ, মুখমণ্ডল, পোশাক, তার হাঁটাচলা এবং বাকভঙ্গি। এইসব মিলিয়ে সে অন্য সবার চেয়ে আলাদা একজন কেউ। সৈনিকদের সে সুযোগ অবশ্য নেই - কদমছাঁট চুল তাদের সবার, প্রত্যেককে একই ইউনিফর্ম ও বুট পরতে হয়, একই ছাঁচে তাদের হাঁটা বা ছোটা, বিশেষ ভঙ্গি ও স্বরে তাদের কথা বলা - সম্মিলিতভাবে তারা একটি একক ব্যক্তিত্বের ছবি। অন্যদের থেকে একটু আলাদা হতে গেলেই শৃঙ্খলাভঙ্গ, শাস্তির ভয়।

সামরিক শাসকরা ও তাদের বাধ্য-অনুগত সৈনিকরা ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীকগুলোকে অনুমোদন দিতে প্রস্তুত নয়। প্রত্যেকটি মানুষকে এক ছাঁচে, নিজেদের সম্মিলিত একক ব্যত্তিত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখতে ইচ্ছুক তারা। ব্লাডি সিভিলিয়ানদের তারা নিচু জাতের প্রাণী, যেন মনুষ্যপদবাচ্য নয়, বলে মনে করে এবং তাদের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ হাতছাড়া করতে তারা অনীহ। তোমার চুল কতোটা লম্বা হতে পারবে তা-ও আমরা নির্দিষ্ট করে দেবো। তোমার ওপর আমাদের সর্বময় কর্তৃত্ব, আমরা তোমার আহার-বিহারসহ সবকিছুর মালিক। মনে থাকে যেন, তুমি আমাদের আজ্ঞাবহ মাত্র।

যুবক প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করে, আমার চুলে কী দোষ করলো? আমি আমার নিজের মতন থাকি, কারো সাতে-পাঁচে নাই।

তীক্ষ্ণ স্বরে সৈনিক বলে, ওইসব কিছু বুঝি না, ওইদিকে গিয়া বাবরিডা কাইটা নিয়া তারপর যেখানে যাইতেছিলেন যান। বেশি প্যাচাল পাড়লে খবর আছে।

সৈনিকের নির্দেশ করা আঙুল অনুসরণ করে যুবক দেখতে পায়, রাস্তার পাশে একটি দেয়াল ঘেঁষে সারি দিয়ে অনেকগুলো উঁচু কাঠের টুল বসানো। প্রত্যেকটির ওপরে মাথা নিচু করা একেকজন মানুষ বসা এবং পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষৌরকাররা মানুষগুলোর চুল ছাঁটে একাগ্রমনে। টুলে বসা মানুষগুলোর মুখভঙ্গি এখান থেকে বোঝা যায় না, বুকের কাছে মাথা নামিয়ে রাখাও একটি কারণ বটে, কিন্তু যুবক জানে, বাধ্য হয়ে এইভাবে অন্যের কাছে নিজের মাথাটি জমা দেওয়ার অপমান তাদের সবার চোখেমুখে লেগে আছে।

শেষ চেষ্টা হিসেবে যুবক জানায়, সে একটি জরুরি কাজে যাচ্ছে, দেরিও হয়ে গেছে। তা সম্পন্ন করে চুল ছাঁটানোর কাজটি সে নিজেই সেরে নেবে।

আচমকা আরেক সৈনিকপুরুষ, একজন অফিসার, আবির্ভূত হয়। রাস্তার একপাশে অপেক্ষমাণ সাঁজোয়া গাড়ির ভেতরে সম্ভবত এতোক্ষণ বসে ছিলো। কর্কশ স্বরে সে জিজ্ঞাসা করে, প্রবলেমটা কি?

অধঃস্তন সৈনিকটি জানায় যে, বড়োই বেয়াড়া এই যুবক।

অফিসার শ্রেণীর সৈনিকপুরুষের মুখ থেকে একটিমাত্র শব্দ - তা স্বর্গনিসৃত কোনো শব্দ বলে ভ্রম হয় না - নির্গত হয়, বাঞ্চোৎ!

এই মোক্ষম শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সে যুবকের মাথাভরা ঝাঁকড়া চুল মুঠো করে ধরে টেনে নিয়ে যায় রাস্তার পাশে। ধাক্কা দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেয় দেয়াল ঘেঁষে চুল ছাঁটানোর জায়গাটির দিকে। অপ্রস্তুত ছিলো যুবক এই চকিত আক্রমণের জন্যে, কোনোমতে রাস্তার ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়া থেকে সে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অপমানবোধে চোখমুখ জ্বালা করে ওঠা থেকে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে সে জানে না। তার কান-মাথা-মুখমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তা শুধুমাত্র এই সূর্যতপ্ত দুপুরের তীব্র উত্তাপের কারণে নয়। দুই চোখ তীব্র ঘৃণার আগুনে জ্বলতে থাকে, হাত নিশপিশ করে, কিছু একটা তাকে করতে হবে, কিন্তু কী করা যেতে পারে তা সে ভেবে স্থির করতে পারে না। রাষ্ট্রশক্তির সশস্ত্র প্রতিনিধির সামনে তার কিছুই করার ক্ষমতা নেই, এই বোধ তাকে আরো ক্রুদ্ধ করে। শিকারীর জালে আটকা পড়া বাঘের তবু গর্জন ও আস্ফালন করার ক্ষমতা থাকে, যুবকের তা-ও নেই। এই অসহায়ত্বের অনিবার্য অনুভব ক্রমশ বিস্তারলাভ করলে ক্রোধের সঙ্গে সঙ্গে নিরুপায় হতাশাবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে দেয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727319 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727319 2007-08-23 11:10:24
পুলিশ তুমি যতোই মারো, তোমার বেতন দুইশো বারো
"সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল কৃষি প্রশিক্ষণ ইনসটিটিউটের সামনে গেলে পুলিশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে লাঠিপেটা করে। এ সময় তেজগাঁও অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মশিউর রহমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, "চাষার বাচ্চারা, তোরাও আন্দোলনে নেমেছিস, সামনে এগুলে তোদের হাড়গোড় এক করে ফেলা হবে।"

আমাদের সামনে পুলিশের যে মূর্তি বা ভাবমূর্তি, তার সঙ্গে পুলিশ অফিসারের এই আস্ফালন খুবই মানানসই। অনুমান করি এই সংলাপটির আগে এবং পরে আরো কিছু বাছাই করা শব্দ পরিবেশিত হয়েছিলো, সংবাদপত্র প্রকাশের আগে তা পরিশোধিত হয়েছে।

গত দুইদিনে ঢাকাসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং আরো অন্যত্র পুলিশ অবতীর্ণ হয়েছিলো সেনাবাহিনী বা সেনাসমর্থিত সরকারের লাঠিয়াল হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবে তাদের ভূমিকা অবশ্য তাই হওয়ার কথা।

এটা প্রশ্ন করি। "ঠোলা" শব্দটি কোত্থেকে এলো? রাজশেখর বসুর চলন্তিকা এবং বাংলা একাডেমির অভিধানে এই শব্দ নেই। না থাক, "ঠোলা" বললে আমরা পুলিশকেই বুঝি। স্কুলের নিচু ক্লাসে পড়ার সময় শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। আমাদের শহরে স্থানীয় ভাষার বিশেষ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিটি যুক্ত করে বলা হতো ঠোল্লা। ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো দেশে পুলিশকে "কপ" বলা হয়, যদিও "ঠোলা"-র মতো অতোটা তুচ্ছার্থে নয়। আমাদের দেশে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলনের কালে দলনকারী পুলিশদের নিয়ে একটি শ্লোগান ছিলো "পুলিশ তুমি যতোই মারো, তোমার বেতন দুইশো বারো"।

একাত্তরে রাজারবাগ প্রতিরোধ যুদ্ধের পরে পুলিশের কোনো সুকীর্তি খুঁজতে গেলে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হবে। বাল্যকাল থেকে দেখে আসছি, পুলিশরা প্রায়শই খবরের কাগজের শিরোনাম হয়ে আসে এবং তা সদর্থে নয়। তাদের কীর্তিকাহিনীর অন্ত নেই। সরকারের বিরোধী পক্ষ এবং আন্দোলনরত ছাত্রদের যথেচ্ছ ঠ্যাঙানো তাদের নিয়মিত কর্মের অন্তর্গত, যেন তা প্রেসক্রিপশনের ওষুধ - দিনে তিনবার আহারের পরে সেব্য। শক্তিবর্ধক টনিক সেবনের মতো মাঝেমধ্যে সাংবাদিক-পীড়ন। শামসুননাহার হল-কাণ্ড থেকে শুরু করে কানসাট-কাণ্ড ও ক্রিকেটমাঠ-কাণ্ড রীতিমতো ব্যতিক্রমী, এমনকি অমর কীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। এতোসব ঘটনা নিয়মিত ঘটানোর পটুত্ব দেখে মনে হয়, এরা কি আমাদের দেশের মানুষ, আমাদেরই মতো হাত দিয়ে ভাত খায়?

পুলিশকে সর্বপ্রকার অপরাধীদের অর্থাৎ সমাজের কালো দিক নিয়ে কাজ করতে হয়। পুলিশের কাছে মানুষ যায় দুঃসংবাদ নিয়ে। ‘চাকরিতে আমার প্রমোশন হয়েছে’ এই ধরনের সুসংবাদ নিয়ে মিষ্টির ভাণ্ডসহ কেউ থানায় যায় না, যায় বিপদগ্রস্ত ও বিপন্ন হয়ে। পেশাটি দুরূহ বটে। দুই দিকে দুই ধরনের মানুষ - একপাশে বিপন্নরা, অন্যদিকে অপরাধজগত। বিশাল স্নায়বিক চাপের কারণে তাদের পক্ষে আর দশজনের মতো আচরণ করা কঠিন। কিন্তু নিরীহ মানুষকে পীড়ন করার সুযোগও তাদের নেই। দুর্বৃত্তদের অপকর্ম থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা ও নিরাপত্তা দেওয়ার শর্তেই তারা পুলিশ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত।

অথচ বাস্তবে বাংলাদেশে আমরা যা পাচ্ছি তাকে অনেকে পোশাকধারীদের সংগঠিত সন্ত্রাস বলেন। এমনও বলতে শুনি, বাংলাদেশে সবচেয়ে সংগঠিত দুর্বৃত্ত বাহিনীর নাম পুলিশ। বিপদগ্রস্ত হয়ে কেউ আর আজ পুলিশের কাছে নালিশ জানাতে যেতে সাহস করে না, যদি না তার পকেটভর্তি টাকা অথবা নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালীর সমর্থন থাকে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনযাপনকে দুরূহতর ও বিপন্ন করা এখন পুলিশের দায়িত্ব, এমন মনে করার হাজারটা কারণ আছে। কীসের দায়িত্ব, কীসের কর্তব্য ও ন্যায়বোধ, ঘাটে ঘাটে তারা টাকা চায়, টাকায় সন্তুষ্ট না হলে তাদের দিয়ে কোনো কাজই করানো সম্ভব নয়, আমরা সবাই জানি। টাকার জোর না থাকলে অতি সৎ ও নিরীহ মানুষকেও তারা বিপদগ্রস্ত করতে যে পারঙ্গম, তা-ও বাস্তব। হয়তো আক্ষরিক অর্থে দুইশো বারো পুলিশের বেতন নয়, কিন্তু তার পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, অন্যায়ভাবে অর্জিত না হলে কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে টাকার পাহাড় বানিয়ে ফেলা সম্ভব হতো না। ‘দুইশো বারো’ এখন হয়তো হয়েছে ‘লক্ষ বারো’, যদিও তা বেতনের অংক নয়, তাকে অর্জিতও বলা যায় না। লুণ্ঠন হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।

আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরে বসবাসের অভিজ্ঞতায় জানি, সেসব দেশে সাধারণভাবে পুলিশের ওপর মানুষ ভরসা রাখে। সত্য বটে, সেখানেও পুলিশ অমানবিক ও ন্যায়বর্জিত আচরণ করে। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস-এ রডনি কিং-কে নির্মমভাবে পেটানো বা নিউ অরলীয়েন্স শহরে বৃদ্ধ এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষককে বিনা কারণে প্রকাশ্যে নির্যাতন করার মতো ঘটনা তারাও ঘটায়। কাটরিনা-বিপর্যয়ের পর নিউ অরলীয়েন্স-এ মানুষের পরিত্যক্ত বাড়িঘর লুটপাটে পুলিশের জড়িত থাকাও প্রমাণিত। তারপরেও স্বীকার করতেই হবে, এগুলি ব্যতিক্রম, প্রতিদিনের ঘটনা নয়। বিপন্ন ও বিপদগ্রস্ত নাগরিক প্রথমে পুলিশের কথাই ভাবে সম্ভাব্য রক্ষক হিসেবে।

মনুষ্যসমাজের পক্ষে, তা যে দেশেই হোক না কেন, সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও সুবিচারসম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সভ্য দেশে নালিশ নিয়ে পুলিশের কাছে গেলে অভিযোগটি শোনা বা লিপিবদ্ধ করা হবে না, তা অসম্ভব। পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে ভাবতে হবে না আমি কোন প্রভাবশালীকে চিনি বা আমার পরিচয় কি অথবা কতো টাকায় আমি উদ্ধার পাবো। সেখানে পুলিশের সহায়তা পাওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকে। বাংলাদেশে সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না।

মনে আছে, ঢাকায় একদিন সস্ত্রীক রিকশায় উঠেছি। কী কথায় পুলিশের ঘুষ খাওয়ার কথা উঠলে আমি বলি, পুলিশ তো বাঘমার্কা সিকিও ঘুষ নেয় (বাঘমার্কা সিকি তখন খুবই চালু মুদ্রা, এখন বোধহয় তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট ও জাদুঘর ছাড়া কোথাও পাওয়া যাবে না)। আমার স্ত্রীর কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। অগত্যা সাক্ষী মানতে হয় রিকশাচালককে। তার বয়ান : ‘সিকি কি কন স্যার, আমার কাছে কমলার একখান কোয়া ঘুষ নিছে পুলিশ। ট্যাকা দিই নাই বইলা লগে একখান থাপ্পড় অবশ্য দিছিলো।’

কিশোর বয়সীদের জন্যে লেখা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাস পড়েছিলাম, সেখানে বয়স্কা এক মহিলা ডাক ছেড়ে বলছেন, ‘এখন কী হবে রে, বাড়িতে পুলিশ পড়েছে, ডাকাতদের খবর দে কেউ!’
বাংলাদেশে পরিস্থিতি খানিকটা সেরকমই বটে। পুলিশের চেয়ে পেশাদার দুর্র্বৃত্তরা অনেক সহনীয়। হাটে-মাঠে-ঘাটে-বনেজঙ্গলে-জলেস্থলে সর্বত্র চাঁদাবাজদের উপদ্রব মানুষ সহ্য করে হয়তো খানিকটা এরকম যুক্তিতেই। ঘুষখোর হিসেবে পুলিশের সুনাম ও দক্ষতা যুগ-যুগান্তরের। মিছিলে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ (ইদানিং গরম পানি ছিটানো এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপ - এই দুই বস্তু আগে ছিলো না) এবং গুলিবর্ষণেও তাদের উৎসাহ ও দক্ষতা প্রশ্নাতীত। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জোচ্চোর, প্রতারক, ধর্ষক, ডাকাত, ছিনতাইকারী, উৎপীড়নকারী, নারীনির্যাতক, অপহরণকারী এইসব গুণপনার পরিচয়।

এ কথাও মানতে হবে, পুলিশ বাহিনীতে এখনো সৎ ও হৃদয়বান মানুষ আছেন। থাকতেই হবে, না থাকা সম্ভব নয়। আমি নিজে দেখেছি একজন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে প্রতিদিন বাজারের টাকার হিসেব করতে হয়, মাছ-মাংসের বিলাসিতা সপ্তাহে এক-আধদিন। ভদ্রলোক রাজশাহীতে কর্মরত ছিলেন আশির দশকের মাঝামাঝি। দুঃখের বিষয়, এই ধরনের মানুষরা আজ বিরল প্রজাতিভুক্ত। তবে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যে যাননি, সেটিই হয়তো আশার কথা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727058 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28727058 2007-08-22 10:44:30
তাদের নখ-দাঁত এখন প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নরম পালকে ঢেকে রাখা সামরিক নখ-দাঁত এখন প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। আগেও কমবেশি শোনা যাচ্ছিলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটির পর তা আর লুকিয়ে ফেলা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

কী ঘটনা ঘটেছিলো? পত্রপত্রিকার বিবরণে যা জানা যাচ্ছে তা এইরকম : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিভাগের মধ্যে ফুটবল খেলা চলছিলো। কয়েক সেনাসদস্যের খেলা দেখা বিঘ্নিত হচ্ছিলো এক ছাত্রের খোলা ছাতার কারণে। সুতরাং গালাগালি এবং প্রতিবাদ করলে ছাত্রটিকে সম্মিলিত প্রহার। ষাধারণ ছাত্ররা প্রতিবাদ করতে গেলে পুলিশের বেধড়ক মারে শতাধিক আহত।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে খেলায় সেনাসদস্যদের উপস্থিত থাকার কী দরকার পড়েছিলো? তারা যখন ক্যান্টনমেন্টে খেলাধূলা করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউকে সেখানে যেতে দেওয়া হবে? হবে না, কারণ সেটা তাদের তালুক। সেই যুক্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ছাত্রদের তালুক হবে না কেন? মানা গেলো, খেলা দেখতে এসেছে। তা মাস্তানিটা কেন? দেখতে অসুবিধা হচ্ছিলো, একটু সরে বসলেই হতো। অনুমান করি, গ্যালারি উপচে-পড়া দর্শক সেই খেলায় ছিলো না। তাহলে? আসলে শুধু ক্যান্টনমেন্ট নয়, পুরো বাংলাদেশকে তারা নিজেদের তালুক ভেবে বসে আছে এবং সকল শ্রেণীর মানুষকে তারা দাসানুদাস মনে করছে।

গত আট মাস ধরে একটা নতুন শব্দ শুনে আসছিলাম। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার "সেনাসমর্থিত"। এই শব্দের সঙ্গে আমাদের আগে পরিচয় ঘটেনি। যদিও বাংলাদেশের ভাগ্যে সেনাশাসক বা সেনাসমর্থিত সরকারই বেশিরভাগ সময় ছিলো এই রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পরে এখন দেখার বিষয় কখন তা বিশুদ্ধ সেনা সরকারে পরিণত হয়।

যখন বোধবুদ্ধি হয়েছে তখন আইয়ুবের সামরিক শাসন। তারপর ইয়াহিয়া। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাড়ে তিন বছর সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় ছিলো না। জীবনে সেই প্রথম অসামরিক শাসন পেলাম। তার কিছু সময় রক্ষীবাহিনীর দাপট ছিলো, কিন্তু তাদের শাসন করার ক্ষমতা ছিলো না।

ফল যা হয়েছে, সেনাশাসনকে কোনোকালে মানতে পারিনি। এখনো না। অথচ আমার দুর্ভাগা দেশ বারবারই সামরিক বুটের তলায় কাতরায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিক্ষোভ কোনো আন্দোলনে রূপ নেবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। মহাজনরা বলেছেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না। এই বিশ্ববিদ্যালয় রুখে দাঁড়ালে সারা বাংলাদেশ জাগ্রত হয়। সেই শক্তির সামনে কোনো মহাপ্রতাপশালী টিকে গেছে, এমন উদাহরণ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ছাত্র হিসেবে লাঞ্ছিত ছাত্রদের জন্যে আমি আজ কয়েক ফোঁটা চোখের পানি বিসর্জন দিতে পারবো। এর চেয়ে বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। তাদের শরীরে পুলিশের লাঠির যে আঘাত, তা তো আসলে আমার মাথায়ই এসে লাগে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726853 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726853 2007-08-21 10:02:28
শহীদ কাদরীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠানো নিয়ে যতো কাণ্ড
আগেই বলেছি, উদ্যোগটা নেওয়া শহীদ ভাইকে না জানিয়ে। জানালে কিছুতেই সম্মতি পাওয়া যেতো না। ব্লগারুদের শুভকামনাসূচক বার্তাগুলি জমা হওয়ার পর নীরা ভাবীকে লিংকসহ ইমেল করে জানালাম, সর্বশেষ ধাপটিতে তাঁর সহায়তা ছাড়া ষড়যন্ত্র সফল হবে না। ইমেলের উত্তরের জন্যে একদিন অপেক্ষা করার পর ফোন করে জানলাম, ইমেল তিনি দেখেননি। ওই ইমেল ঠিকানাটি তাঁর কর্মক্ষেত্রের এবং তিনি এখন ছুটিতে।

বাসার ইমেল ঠিকানায় পাঠাতে বললেন। ষড়যন্ত্রের অংশীদার হতে এবং ইমেল পাওয়ার আগ পর্যন্ত শহীদ ভাইকে কিছুই না জানাতে তিনি সানন্দে সম্মত। পাঠালাম ইমেল। রাতে ফোন করে নীরা ভাবী জানালেন, বাসার কমপিউটারে কীসব ঝামেলা হচ্ছে। বললেন, আদনান সৈয়দ নামে একটি ছেলে তাঁদের কাছাকাছি থাকে এবং তার কাছে ইমেলটি ফরোয়ার্ড করলে তিনি পেয়ে যাবেন। তথাস্তু বলে ইমেল পাঠানো গেলো আদনান সৈয়দকে। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, ইমেলের প্রাপ্তিস্বীকারও পাওয়া গেলো। আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছি নীরা ভাবী বাকি ঘটনা জানাবেন বলে। সে ফোন আর আসে না।

রোববার দুপুরে কাহিনী জানা গেলো, আদনানের মাথায় অন্য আইডিয়া ছিলো। সে নিউ ইয়র্কে প্রথম আলো বন্ধুসভার একজন এবং তাদের পক্ষ থেকে গত শনিবার শহীদ কাদরীর জন্মদিনের অনুষ্ঠান করা হয়েছিলো। অনিচ্ছা এবং শারীরিক অসুবিধা সত্ত্বেও এই ছেলেদের অনুরোধ শহীদ ভাই ফেলতে পারেননি। সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চে নীরা ভাবী ও শহীদ ভাইসহ সবাইকে চমকে দিয়ে আদনান ব্লগারুদের শুভেচ্ছাবার্তাগুলি পাঠ করে ইতিবৃত্তসহ।

শহীদ ভাই জন্মদিন নিয়ে উচ্ছ্বসিত কখনোই নন, পালন করা নিয়েও নয়। তবে আমাদের ব্লগারুদের শুভকামনাগুলি তাঁকে কিছু উৎফুল্ল করেছিলো, নীরা ভাবীর সাক্ষ্য থেকে জানা গেলো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726819 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726819 2007-08-20 23:42:42
শামসুর রাহমানের কবিতা : কখনো আমার মাকে সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়ে
আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না আজ মনেই পড়ে না।

যখন শরীরে তার বসন্তের সম্ভার আসেনি,
যখন ছিলেন তিনি ঝড়ে আম-কুড়িয়ে বেড়ানো
বয়সের কাছাকাছি হয়তো তখনো কোনো গান
লতিয়ে ওঠেনি মীড়ে মীড়ে দুপুরে সন্ধ্যায়,
পাছে গুরুজনদের কানে যায়। এবং স্বামীর
সংসারেও এসেও মা আমার সারাক্ষণ
ছিলেন নিশ্চুপ বড়ো, বড়ো বেশি নেপথ্যচারিণী। যতদূর
জানা আছে, টপ্পা কি খেয়াল তাঁকে করেনি দখল
কোনোদিন। মাছ কোটা কিংবা হলুদ বাটার ফাঁকে
অথবা বিকেলবেলা নিকিয়ে উঠোন
ধুয়ে মুছে বাসন-কোসন
সেলাইয়ের কলে ঝুঁকে, আলনায় ঝুলিয়ে কাপড়,
ছেঁড়া শার্টে রিফু কর্মে মেতে
আমাকে খেলার মাঠে পাঠিয়ে আদরে
অবসরে চুল বাঁধবার ছলে কোনো গান গেয়েছেন কি না
এতকাল কাছাকাছি আছি তবু জানতে পারিনি।

যেন তিনি সব গান দুঃখ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে
রেখেছেন বন্ধ ক'রে আজীবন, কালেভদ্রে সুর নয়, শুধু
ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে!

===================

গতকাল এই কবিতাটি পড়ে শামসুর রাহমানকে চেনার কথা লিখেছিলাম। অনেকে কবিতাটি পোস্ট করতে বলেছিলেন। আমার কাছে না থাকায় সম্ভব হয়নি। সংগ্রহ করে পোস্ট করলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726376 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726376 2007-08-17 20:44:53
যে কবিতায় প্রথম শামসুর রাহমানকে চিনলাম তখনো স্কুলের সীমানা পার হইনি। ছোটো জেলা শহরের ছেলে আমি। রেলস্টেশনের স্টলটি বাদ দিলে শহরে একমাত্র সংবাদপত্র ও পত্রিকার এজেন্ট থানা রোডের ফজলুর রহমান। মূলত রেডিও-ট্রানজিসটর বিক্রি ও মেরামতের দোকান, একপাশে সরু ক্ষুদ্র পরিসরের একটি ঘরে পত্র-পত্রিকা। তখনো বগুড়া শহরে একটি বা দুটিমাত্র টিভি, দোকানে টিভি ওঠেনি। ষাট দশকের শেষদিকের কথা।

সেই দোকানে একদিন হঠাৎ একটি নতুন পত্রিকা ঝুলে আছে দেখা গেলো। নাম "ললনা"। নামই বলে দিচ্ছে মেয়েদের কাগজ। ঢাকার সেগুনবাগিচা থেকে প্রকাশিত। পত্রিকা চালাচ্ছেন সব পুরুষরা। শাহাদত চৌধুরী, শাহরিয়ার কবিররা জড়িত ছিলেন সেই কাগজের সঙ্গে। এর আগে মেয়েদের জন্যে একমাত্র কাগজ ছিলো "বেগম"। বেগম-এর সঙ্গে ললনা-র পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। আকারে-প্রকারে ললনা অনেক আধুনিক, বেগম গৃহিনী মহিলাদের, ললনা তরুণীদের পত্রিকা। নামে ললনা হলেও শুধু মেয়েদের কাগজ ছিলো না। বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো কাগজটি। সম্ভবত যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যায়, পরে আর কখনো প্রকাশিত হয়নি।

ললনা-র এক সংখ্যায় প্রচ্ছদে সুন্দর হস্তাক্ষরে একটি পুরো কবিতা ছাপা হলো। হস্তাক্ষরটি শিল্পী হাশেম খানের। কবিতার নাম "]কখনো আমার মাকে"। রচয়িতার নাম শামসুর রাহমান। তাঁকে নামে চিনতাম। "বিধ্বস্ত নীলিমা নামে তাঁর একটি কবিতার বইও বাড়িতে দেখছি, পড়িনি।

প্রচ্ছদে পুরো কবিতা, তা-ও আবার হাতে লেখা, বিষয়টি সবচেয়ে অভিনব মনে হলো, এর আগে কখনো দেখিনি। প্রথম পংক্তি "কখনো আমার মাকে গান গাইতে শুনিনি" কবিকে মুহূর্তে আপন মানুষ বানিয়ে দিলো। এমন ঘরোয়া জিনিস নিয়ে সহজ করে লেখা যায় কবিতা! আধুনিক কবিতা বলতে যা বোঝায়, মফস্বলের মধ্যবিত্ত পরিবারে তা খুব একটা ঢোকেনি তখনো। শামসুর রাহমান নামের এক কবি সেই বেড়াটি ভেঙে দিলেন।

"কখনো আমার মাকে গান গাইতে শুনিনি" মনে পড়লে এখনো রোমাঞ্চ হয়। সেই প্রথমবারের মতো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726295 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28726295 2007-08-17 06:23:03
শহীদ কাদরীর কবিতা : হন্তারকদের প্রতি বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোনো উপমায় তদের গ্রেপ্তার করা যাবে না
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের কথাও হয়েছিলো,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলা মানুষ
এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনোদিন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725850 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725850 2007-08-15 09:14:12
কবি শহীদ কাদরীর জন্মদিন আজ
পরবাসে দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থ এই কবি। ব্লগভুবনের বাসিন্দাদের শুভকামনা হয়তো তাঁর রোগ-যন্ত্রণার উপশম ঘটাবে না। তবু আমরা তাঁর পাঠকরা তাঁকে ভুলে যাইনি, এইটকু জানানো যেতেই পারে।

আপনাদের শুভকামনা কবিকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি আমি নিতে পারি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725681 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725681 2007-08-14 12:31:54
হুমায়ুন আজাদ যেখানে জিতে গেছেন
বৈপরীত্যে ভরা মানুষের জীবন। হুমায়ুন আজাদের জীবনও তার ব্যতিক্রম ছিলো না। প্রশংসা করে লিখলেন "শামসুর রাহমান : নিঃসঙ্গ শেরপা" নামের বইটি, সেই শামসুর রাহমানের নামে এখানে ওখানে কুৎসা গেয়েছেন তিনি নিজে। মতামত প্রকাশে কিছুটা চমক সৃষ্টির ঝোঁকও তাঁর ছিলো বলে মনে হয়, যা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না।

আমাদের দেশে নির্ভয়ে সত্যউচ্চারণ করার মতো সাহসী বুদ্ধিজীবীরা ভয়াবহ রকমের সংখ্যালঘু। অল্প সময়ের ব্যবধানে আহমদ শরীফ ও আহমদ ছফার মৃত্যুর পর মনে হয়েছিলো, এখন? শাসক, সমাজের মোড়ল ও ধর্মান্ধদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্যি কথাটি বলার মতো হাতে রইলেন এক হুমায়ুন আজাদ। তাঁকেও যেতে হলো। পূর্বোক্ত দু’জনকে হুমকি-ধামকি প্রচুর দেওয়া হয়েছিলো, প্রাণসংশয় হয় এমন শারীরিক আক্রমণের মুখে তাঁদের পড়তে হয়নি। হুমায়ুন আজাদকে হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যুর জন্যে সেই আক্রমণকে হয়তো প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা চলে না, কিন্তু পরোক্ষে তা অস্বীকার করা অসম্ভব বলেই মনে হয়।

আর সব মানুষের মতো তিনিও দোষেগুণে মানুষ ছিলেন। ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁকে তেমন কিছু একটা কখনোই মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে নিজের বক্তব্যটিকে যেনতেন প্রকারে প্রচার করার জন্যে কিছু সম্ভব-অসম্ভব ঘটনা ও দ্বন্দ্বের অবতারণার দিকেই তাঁর ঝোঁক বেশি ছিলো। হুমায়ুন আজাদের ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণাকর্ম নিয়ে আমি আদার ব্যাপারীও নই। কবি হিসেবে কতোখানি সফল-অসফল তা নিয়েও আমার মতামত দেওয়া সাজে না। তবে আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলনে পক্ষপাতমূলক নির্বাচন তাঁর সুনাম বাড়ায়নি, বরং তাঁর বিবেচনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী মানুষ ছিলেন তিনি। সেই আত্মবিশ্বাস, বিশেষ করে নিজের মৌলিক রচনাগুলি সম্পর্কে তাঁর ধারণা অনেকটাই বাস্তবতাবিবর্জিত মনে করা যায়। বাংলা ভাষায় লিখিত একমাত্র তাঁরই রচিত কিছু কবিতা ও গদ্য বিশ্বমানে পৌঁছাতে পেরেছে, এরকম বালখিল্য দাবিও তিনি একাধিকবার করেছেন।


২.

হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আমার ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে কয়েকবার ছাড়া তাঁকে চাক্ষুষ দেখিওনি আর কোথাও। যদিও তাঁর "লাল নীল দীপাবলী" বইটি বিষয়ে আলোচনা লিখেছিলাম ১৯৭৭-এ। আমার ছোটো বোনের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন তিনি। সে তাঁর ভক্ত হিসেবে আমাকে ৯২ সালে পাঠিয়েছিলো "প্রবচনগুচ্ছ"। ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে "আমার অবিশ্বাস" তার স্যারকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিলো আমার নামে। সে বই আমার হাতে আসার কয়েকদিন আগেই বইমেলা থেকে বেরিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন খবর পেয়েছি। বইটি পৌঁছালে হুমায়ুন আজাদের স্বাক্ষরের নিচে তারিখ দেখে চমকে উঠতে হয়। ওই তারিখেই তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন।

পরিচিত এক ভদ্রমহিলা "আমার অবিশ্বাস" পড়তে নিয়েছিলেন। বইটি তাঁকে পড়তে দেওয়া যায় কি না, এই নিয়ে কিছু দ্বিধায় ছিলাম। এই বইয়ে হুমায়ুন আজাদ সকল ধর্মবিশ্বাসের প্রতি প্রবল অনাস্থা জানিয়েছেন, মানুষের ধর্মবিশ্বাসগুলির অযৌক্তিকতা ও অসারত্ব সবিস্তারে বলেছেন তীক্ষ্ণ যুক্তি দিয়ে। আমার দ্বিধা ছিলো সেই কারণেই। ভদ্রমহিলা বড়ো হয়েছেন ধর্মপরায়ণ পরিবারে, ছোটোবেলা থেকে ধর্মবিশ্বাস ও আচরণে নিষ্ঠ। এখন ধর্মাচরণে অনিয়মিত হলেও ভদ্রমহিলার বিশ্বাসটি অক্ষত ও অটুট। তাঁর বিশ্বাস আহত হোক তা আমি চাইনি। একরকম জোর করেই তিনি বইটি নিয়ে গেলেন।

পড়া হয়ে গেলে বইটি ফেরত দিয়ে মহিলা অপ্রত্যাশিতভাবে একটি আশ্চর্য মন্তব্য করলেন। গ্রন্থে উপস্থাপিত তথ্য ও যুক্তি সম্পর্কে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, একমাত্র আমার অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছু দিয়ে তো আমি হুমায়ুন আজাদের যুক্তিগুলি অস্বীকার করতে পারছি না!

হুমায়ুন আজাদ জিতে গেছেন ঠিক এখানেই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725452 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725452 2007-08-13 09:26:07
লোপার গন্তব্য ও তার সঙ্গে না-হওয়া বোঝাপড়া
সাল ১৯৯১। মে মাসের তীব্র গরমে সিঙ্গাপুর এসেছি। স্ত্রী-কন্যা তখনো ডালাসে, এখানে বাড়িঘর ঠিক হলে আসতে বলবো। দু’দিন আগে বউ ফোনে বললো, ছেলেকে নিয়ে লোপা ঢাকা রওনা হচ্ছে আগামীকাল। সিঙ্গাপুরে ওর যাত্রাবিরতি নয় ঘণ্টার। ছোটো বাচ্চাকে নিয়ে সারারাত এয়ারপোর্টে বেচারির খুব কষ্ট হবে। তোমার অসুবিধা না হলে যেয়ো।

ভালো হতো যদি ওকে বাসায় এনে রাতটা তার ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া যেতো। সকালে উঠে দিব্যি ঢাকার ফ্লাইট ধরতে পারতো। কিন্তু আমি তখনকার মতো আছি আরো তিনজন বাঙালির সঙ্গে একটি দুই কামরার বাসায়। দু’জন ব্যাচেলর, শেষজন আমার মতোই সাময়িক পরিবারছাড়া। আমি ঘুমাই বসার ঘরের সোফায়।

লোপার সঙ্গে খুব সামান্য পরিচয়। এমনিতে চিনি, আর সবাই যেমন চেনে। ডালাস শহরে বাঙালিদের অনুষ্ঠানে নাচের জন্যে তার ডাক পড়ে। বুলবুল ললিতকলার ছাত্রী লোপা, শুনেছি তার মা বাংলাদেশের নামী নৃত্যশিল্পী।

সামনাসামনি দেখা এবং আলাপ এক বন্ধুর বাড়িতে। লোপার সঙ্গে কয়েকমাস বয়সী ছেলে। তার বর হুমায়ুন আসতে পারেনি। ছিপছিপে লম্বামতো লোপা দেখতে-শুনতে সাধারণ, আর দশজনের থেকে আলাদা করে চোখে পড়বে না। চোখ দুটি ছাড়া। আয়ত শব্দটি বোধহয় এই ধরনের চোখের বর্ণনায় ব্যবহার করা হয়। তার চোখে এক ধরনের বিষণœতাও স্পষ্ট। আমার বউয়ের সঙ্গে তার আগেই কোথাও আলাপ হয়েছে। অবশ্য মেয়েরা প্রথম আলাপেই এমনভাবে কথা বলতে থাকে যেন কতোদিনের চেনা। লোপার সঙ্গে সেদিন আমার মামুলি দু’একটা কথার বেশি হয়নি। মাস দুই আগের ঘটনা সেটা।

এতো অল্প পরিচয়ে এয়ারপোর্টে বসে রাতভর ওর সঙ্গে কী কথা বলবো? কিছু মানুষ আছে, তাদের কথা শুরু করার জন্যে কোনো প্রসঙ্গ দরকার হয় না। কেউ কেউ কথা থামাতে জানে না। আমার সমস্যা কথা শুরু করা নিয়ে, শুরু করার আগেই থেমে থেমে যেতে চায়।

আচমকা মুশকিল আসানের একটা উপায় মাথায় আসে। মারুফ ভাই আর রাভী ভাবী ভালো করে চেনেন লোপাকে। বন্ধুস্থানীয় এই দম্পতি মেয়ে মনিকাসহ ডালাসে ছিলেন। মারুফ ভাই আইবিএম-এ কাজ করেন, ডালাস থেকে তাঁকে সিঙ্গাপুরে বদলি করা হয়েছে কিছুদিন আগে। তাঁদের বাসায় দিব্যি ছেলেকে নিয়ে রাতটা থাকতে পারে লোপা। মারুফ ভাই আর রাভি ভাবী এক কথায় রাজি। এমনকী, সকালে এয়ারপোর্টে ওদের পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও মারুফ ভাই নিয়ে ফেলেছেন নিজে থেকে। শুধু ওদের নামিয়ে দিতে হবে মারুফ ভাইয়ের বাসায়। লোপা অবশ্য এই ব্যবস্থার কথা জানে না, বলার সময় পাওয়া যায়নি।

এয়ারপোর্টে দোকানপাটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ, লাউঞ্জে ভিড় তেমন নেই। লোপার ফ্লাইট অবতরণের ঘোষণা শুনি। তাড়াহুড়োর কিছু নেই, কাস্টমস-ইমিগ্রেশন সেরে বেরোতে আরো কিছু সময় লাগবে। লোপার কি মার্কিন পাসপোর্ট? জানা নেই। না হলেও অসুবিধা হবে না, তখনো সবুজ পাসপোর্টে অন-অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যায় সিঙ্গাপুরে। অনায়াসে বেরিয়ে আসতে পারবে।

টিকেটধারী যাত্রীদের এলাকা পুরোটা কাচের দেয়ালে ঘেরা। রিসিভ করতে আসা জনগণের এলাকা থেকে ভেতরে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়। ব্যাগেজ এলাকায় যাত্রীদের ভিড় জমছে, একে একে তারা বেরিয়ে আসতেও শুরু করেছে। লোপার অবশ্য ব্যাগেজ সংগ্রহ করার ঝামেলা নেই, সেগুলো ঢাকা পর্যন্ত বুক করা থাকবে। ইমিগ্রেশনের কাউন্টার পার হয়ে ছেলে কোলে করে সোজা বেরিয়ে আসতে পারবে। আমেরিকায় শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ পরা কাউকে ক্কচিত দেখতে পাওয়া যায়, এখানে তা অতো বিরল নয়। এ দেশে অনেক ভারতীয় এবং বাঙালির বাস। তার ওপরে সিঙ্গাপুর তো এখন আবার বাড়ির কাছের আরশিনগর। ভারতীয় পোশাক পরা কোনো মহিলাকে দেখলে চোখ অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে উঠছে। আচমকা মনে হয়, লোপাকে চিনতে পারবো তো! অথবা লোপা আমাকে! সামনাসামনি দেখা তো মাত্র একবার। অবশ্য বিষণ্ণ ও আয়ত চোখ দুটো তার সঙ্গে থাকবে, তাহলে আর ভুল হয় কী করে?

কিন্তু কোথায় লোপা? সব যাত্রী বেরিয়ে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাগেজের ঘুরন্ত ক্যারুসেল থেমে গেছে, অপেক্ষমাণ কাউকে আর দেখা যাচ্ছে না সেখানে। রিসিভ করতে আসা মানুষজনও নেই হয়ে এসেছে প্রায়। কোনো কারণে যাত্রা বাতিল করেছে? জানার উপায় নেই। হঠাৎ মনে পড়ে, এয়ারপোর্টের ট্রানজিটে যাত্রীদের বিশ্রামের জন্যে রুম ভাড়া পাওয়া যায় শুনেছিলাম। লোপা সেখানে ঢুকে পড়লো নাকি? তা-ও বা জানা যাবে কী করে? নাকি ইমিগ্রেশনে কোনো ঝামেলা? তাহলে বেরোতে পারবে না, ট্রানজিটে বসে থাকতে হবে। এখন আমি করি কী?

ওদিকে মারুফ ভাইরা জেগে অপেক্ষা করছেন। আরো খানিক অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। খানিক পরে প্লেনের পাইলট-ক্রুরাও বেরিয়ে এলে মনে হয়, আর অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না। এখন বারোটা চল্লিশ। পাবলিক ফোন থেকে মারুফ ভাইয়ের নাম্বার ডায়াল করি। সংক্ষেপে পরিস্থিতি জানাই। আনুমানিক সিদ্ধান্তে আসা হয়, কোনো কারণে লোপা আসা বাতিল করেছে অথবা ফ্লাইট বদলেছে।

ফোন রেখেও কিছুক্ষণ পায়চারি করি। যদি হঠাৎ উদয় হয় লোপা!

বাসায় ফিরে দেখি দুটো বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। কাপড় পাল্টে শুয়ে পড়ি। রাত্রিজাগরণের ক্লান্তি নয়, বিফলতার অবসাদ। নিজের কোনো হাত নেই, তবু শূন্য হাতে ফিরে আসা। লোপার সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা এমন নয় যে, খুব দুশ্চিন্তা হওয়া আমার উচিত। কথা দিয়েছিলাম, এয়ারপোর্টে যাবো। গিয়েছি। অপেক্ষাও করেছি যতোটা করা সম্ভব। তার দেখা না পাওয়া গেলে আমার আর কী করার ছিলো?

টেলিফোনের কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙে। চোখ তুলে অন্ধকারে দেখি, ডিজিটাল টেবিল ঘড়িতে চারটা দশ। হাত বাড়িয়ে ফোন তুলি, হ্যালো।

আমি লোপা বলছি এয়ারপোর্ট থেকে।

আশ্চর্য তো! বলি, কোথায় ছিলেন আপনি?

লোপা বলে, ভুল আমারই হয়েছে। ট্রানজিটে একজন বললো, এখানে রাতের জন্যে রুম ভাড়া পাওয়া যেতে পারে। ভাবলাম, তাহলে আর আপনাকে কষ্ট দিতে হয় না। কিন্তু রুম পাওয়া গেলো না। বেরিয়ে আসতে দেরি হয়েছে সেজন্যেই।

একটু রাগ হয় আমার। রুম পেয়ে গেলে আমি জানতেও পারতাম না। যেমন এসেছি, তেমনি ফিরে আসতে হতো। আমাকে এয়ারপোর্টে যেতে বলে এটা করার কোনো মানে হয়? সঙ্গে সঙ্গে আবার বুঝতে পারি, মারুফ ভাইয়ের বাসায় যে থাকার ব্যবস্থাটিও তার জানা ছিলো না। ছোট্টো ছেলেটিকে নিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার আশায় রুমের খোঁজ করে সে ভুল কিছু করেনি।

কৈফিয়ত-পর্ব শেষ হলে লোপা খানিকটা সঙ্কুচিত গলায় বলে, এখন একটু আসতে পারবেন? আরো ঘণ্টাচারেক বাকি আমার ফ্লাইটের। ছেলেকে নিয়ে একদম নড়াচড়া করতে পারছি না। বাথরুমে যাবো তারও উপায় নেই।

আমি এক্ষুণি বেরোচ্ছি। আসতে যতোটা সময় লাগে আর কী।

বাসার সামনের রাস্তায় সারাদিন ট্যাক্সি পাওয়া যায়, এখন এই সময়ে আশা করা যায় না। মিনিট তিনেক হেঁটে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। চব্বিশ-ঘণ্টা-খোলা একটা দোকান থেকে নিই বিস্কুট, চিপস আর দুই বোতল পানি। এয়ারপোর্টে এইসময় খাবার-টাবার কিছু পাওয়া যাবে না। হাতে যা সময় আছে, মারুফ ভাইয়ের বাসায় যাওয়ারও প্রশ্ন নেই। খাবারগুলো যদি কাজে লাগে।

এয়ারপোর্টে লোকজন বড়ো একটা নেই। কিছু যাত্রী ব্যাগের ওপর মাথা দিয়ে বেঞ্চে ঘুমিয়ে আছে। কেউ কেউ বসে ঢুলছে। এয়ারপোর্টের কর্মীরা ঝাড়ু– দেওয়া, মোছামুছির কাজে ব্যস্ত। কিন্তু লোপা কোথায়? এ মাথা থেকে ও মাথা দুই চক্কর দিয়েও তাকে কোথাও চোখে পড়ে না। গেলো কোথায়? একটু আগেই না ফোন করে আসতে বললো! সে বাইরে আছে বলছিলো।

আরেক দফা হতাশ। এখন আর দ্রুত হাঁটছি না। ধীরেসুস্থে পায়চারির ভঙ্গিতে হাঁটি, সজাগ সতর্ক চোখে চারদিক দেখি। হাঁটাহাঁটি আর দেখাই সার, ফলাফল শূন্য। আচ্ছা, কী ঘটতে পারে? সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো ভাবার চেষ্টা করি। বাইরের লাউঞ্জের সঙ্গে ট্রানজিট এলাকাকে হয়তো গুলিয়ে ফেলেছে লোপা। ভেতরে বসে ভাবছে, আমি ওর কাছে পৌঁছে যাবো। অতোটা নির্বোধ হলে একা বাচ্চা নিয়ে কি এতো দূরের যাত্রায় সাহস করার কথা!

এমনও হতে পারে, সিঙ্গাপুরে পরিচিত অন্য কাউকে লোপা ফোন করেছে এবং আমি আসার আগেই তার সঙ্গে চলে গেছে। আমি আসছি জেনেও না জানিয়ে চলে যাওয়ার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন সে? ঢাকায় হলে ছিনতাই বা অপহরণের মতো একটা সম্ভাবনার কথা ভাবা যেতো। এ দেশে তা অবান্তর, প্রায় অসম্ভব। এখানে রাত দুটোর সময়ও মেয়েরা একা দিব্যি নিশ্চিন্তে হেঁটে বাড়ি ফেরে, এই নিশ্চিন্তি আমেরিকাতেও সুলভ নয়।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ে। যা হয় হোক, আমার কী ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। ফোনে লোপার গলা খানিকটা অসহায় শোনাচ্ছিলো। সাহায্য প্রার্থনার ভঙ্গিটিও ছিলো নিরুপায়ের। কিন্তু গেলো কোথায় সে? তার হলো কী? ট্রানজিটেই লোপা বসে আছে বলে ধারণা হয়। এয়ারপোর্টের কোনো কর্মীকে অবস্থাটা বুঝিয়ে বলে কি একটা খোঁজ করানো যায়? তেমন কাউকে চোখে পড়ে না।

ভারতীয় দেখতে একজনকে পোশাক-আশাকে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির লোক বলে ধারণা হয়। তাকে বলি, আমার পরিচিতি এক ভদ্রমহিলা আমাকে ফোন করে আসতে বলেছেন। বাইরে তাঁকে কোথাও দেখছি না, আমার ধারণা উনি ট্রানজিটে বসে আছেন। একটু খোঁজ কি করা যায়?

লোকটা বলে, তাতে লাভ কী? থাকলেও এখন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে কেউ নেই, মহিলা বাইরে আসতে পারবেন না। তোমারও ভেতরে যাওয়া সম্ভব নয়।

উনি ভেতরে আছেন, এটুকু জানতে পারলেই চলবে।

ভদ্রমহিলা দেখতে কেমন একটু বিবরণ দিলে চেষ্টা করে দেখতে পারি। নাম কী?

নাম লোপা কবির। হালকা-পাতলা, চোখ দুটো বড়ো বড়ো। সঙ্গে সাত-আট মাস বয়সী বাচ্চা।

বিবরণ শুনে লোকটা বলে, ভেতরে এরকম চেহারার একজনকে বাচ্চা কোলে বসে থাকতে দেখেছি বলে মনে পড়ছে। ঠিক আছে, আমি দেখছি।

আধঘণ্টা পরে ফিরে এসে লোকটা দুঃখিত মুখে জানায়, কোথাও খুঁজে পেলাম না। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, তুমি যেরকম বর্ণনা দিয়েছো রাত দুটোর দিকে সেরকম একজনকে আমি দেখেছি বাচ্চা কোলে। ট্রানজিটে বসে ছিলো। এখন নেই!

হতাশ গলায় বলতে হয়, কী আর করা! আমার জন্যে কষ্টটুকু করার জন্যে ধন্যবাদ।

ক্লান্ত লাগে খুব। একটা খালি চেয়ারে বসি। এখন কী করি? আদৌ করণীয় কিছু আছে?

একসময় দেখি যাত্রীরা বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে গেছে চেক-ইন করার জন্যে। বাইরে তাকিয়ে একটি ঝকঝকে সকাল দেখি। সূর্য উঠি-উঠি। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের চেক-ইন কাউন্টারের কাছে দাঁড়াই। আমার খুব বিশ্বাস হচ্ছে, লোপা পরিচিত অন্য কারো বাসায় ছিলো রাতে। এখন তাকে আসতেই হবে ঢাকার ফ্লাইট ধরার জন্যে। এতোকিছুর পরে শেষ না দেখে ফেরা যায় না। সারিবদ্ধ যাত্রীদের দেখি। আশেপাশে তাকাই। নতুন যাত্রীরা এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে ঢুকছে দেখি। লোপাকে কোথাও দেখি না। উৎকণ্ঠা-ক্লান্তি-বিরক্তি-হতাশা মিলিয়ে এমন অদ্ভুত অবস্থায় জীবনে কখনো পড়েছি বলে মনে পড়ে না।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ঢাকাগামী ফ্লাইট ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা শুনি। প্রতিটা যাত্রী আমার চোখের সামনে দিয়ে গেছে, লোপা তাদের মধ্যে ছিলো না।

ফাঁকা বাসায় ফিরি। সবাই অফিসে বেরিয়ে গেছে। খানিক ঘুমিয়ে নিয়ে আমি দুপুরের দিকে যাবো। ফোনের দিকে তাকিয়ে আচমকা মনে হয়, শেষরাতে সত্যি কি কোনো ফোন এসেছিলো? নাকি স্বপ্ন? হয়তো স্বপ্নের ভেতরে লোপার সঙ্গে কথা বলেছি ফোনে এবং তা সত্যি ধরে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। এরকম হয়, হতে পারে শুনেছি। আমার আগে কখনো হয়নি, আজ হবে কেন? অথচ এয়ারপোর্টে লোপার চিহ্নও কোথাও দেখা গেলো না, তার কী ব্যাখ্যা হয়? সিকিউরিটির লোকটা যে বললো, ওরকম একজনকে বাচ্চা কোলে বসে থাকতে দেখেছে ট্রানজিটে? কোনটা সত্যি?

সন্ধ্যায় বাসার বাকি তিন বাসিন্দাকে জিজ্ঞেস করি শেষরাতে ফোন বেজে ওঠার শব্দ তারা কেউ শুনেছে কি না। কেউ কিছু বলতে পারলো না।

মাস দুয়েক পরে দেশ থেকে নতুন-পুরনো কিছু পত্রিকা এসে পৌঁছেছে। শনিবার দুপুরে শুয়ে শুয়ে সেগুলো দেখছিলাম। অকস্মাৎ চমক লাগে। নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না, বিশ্বাস করতেও ইচ্ছে করে না। ছবি না থাকলে হয়তো চোখ এড়িয়ে যেতো। স্বল্প পরিচিত আয়ত চোখের মেয়েটিকে চিনতে ভুল হয় না। সাপ্তাহিক একটি কাগজে ছবিসহ লোপার মৃত্যুসংবাদ! দেশে যাওয়ার পর পরই কী একটা বিদঘুটে জ্বরে পড়ে। অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে থাকলে হাসপাতালে নেওয়া হয়, আর ফেরেনি।

এতো তাড়াতাড়ি! অসময়ের মৃত্যু মন খারাপ করে, অপচয় মনে হয়। দীর্ঘ জীবনের পরে একটা বয়সের মৃত্যু তবু হয়তো মানা যায় - সময় হয়েছিলো ধরে নিয়ে সান্ত্বনা খোঁজাও সম্ভব। লোপার জীবনটা বড়ো হ্রস্ব থেকে গেলো! আর তার ছেলে? মাকে সে সারাজীবন চিনবে ছবি দেখে, মায়ের কোনো স্মৃতি তার থাকবে না। কোনো মানে হয়!

লোপার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া আমার বাকি থেকে গেলো। সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিলো? সে সত্যিই ফোন করেছিলো শেষরাতে? নাকি আমার কাঁচা ঘুমের স্বপ্ন বা অবচেতন কোনো তাগিদ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো তার খোঁজে? সারাজীবন এই রহস্য আমি বয়ে বেড়াবো, উত্তর আর কোনোদিন জানা হবে না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725342 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28725342 2007-08-12 13:50:51
গল্প : সংকট ২ সহকর্মী হিসেবে শওকতের সঙ্গে সিন্ডির খানিকটা বন্ধুত্বমতো আগেই ছিলো। সিন্ডি রাজি হয় বন্ধুর উপকারটি করতে। টাকাপয়সা বা অন্য কোনো লেনদেনের ব্যাপার নেই। তার নিজের কিছু এসে যায় না। কোনো লোকসান কিছু নেই, শওকতের এ দেশে থাকার কাগপত্রের যদি একটা গতি হয়ে যায়, ক্ষতি কি? আর সে নিজে বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছে। মাত্র বছর দুয়েকের ব্যাপার, শওকতের গ্রীনকার্ড হয়ে গেলে কাগজে সই করে ছাড়াছাড়ি করে নিলেই হলো। কাগজের বিয়ে কাগজেই শেষ। সিন্ডি একটিমাত্র শর্ত, এই খবর যেন আর কারো কানে না ওঠে। সামাজিকভাবে তা ভালো দেখায় না। আর ইমিগ্রেশন ঘুণাক্ষরেও টের পেলে শওকতকে বড়োজোর ডিপোর্ট করবে, কিন্তু তাকে জেলে যেতে হবে।

চুক্তি অনুযায়ী বছর দেড়েক আগে কাগজে-কলমে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ইমিগ্রেশনে শওকতের জন্যে আবেদনও করে আসে সিন্ডি। শওকতের অস্থায়ী গ্রীনকার্ড হয়ে আছে। আর মাস ছয়েকের মধ্যে ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের জন্যে ডাকবে, ইমিগ্রেশন মামু সন্তুষ্ট হলে তবে স্থায়ী গ্রীনকার্ড।

টিভিতে চোখ থাকলেও শওকতের অস্বস্তি বাড়ে। ঠিক আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এরকম উদ্বিগ্ন গলায় ফোন আগে কোনোদিন করেনি সিন্ডি। এমনিতে কাজের বাইরে কথাবার্তা তেমন হয়ও না, হঠাৎ কোনো কারণে সিন্ডি বারকয়েক ফোন করেছে, এ বাসায় এসেছেও। এই অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়ার সময় লীজের কাগজে সই করতে এসেছিলো, আগের বাসা থেকে এখান উঠে আসার সময় শওকতের জিনিসপত্র টানাটানির সময় টিংকু-মিশেলের সঙ্গে সে-ও হাত লাগিয়েছে। শওকতের জন্মদিনে টিংকু আর মিশেলের সঙ্গে এসেছিলো সর্বশেষ। সেদিন তাদের দু’জনের একত্রে কিছু ছবি তুলে দিয়েছিলো টিংকু। বলেছিলো, ছবিগুলো রাখিস, বড়ো মামুর লগে তোর ইন্টারভিউয়ের সময় কামে লাগবো। টিপুর পরামর্শে একটি ছবিতে শওকতকে সিন্ডির কাঁধে হাত রেখে গালে গাল লাগাতে হয়। অস্বস্তি হয়েছিলো, এই প্রথম কোনো অনাত্মীয় মেয়ের শরীরের এতো ঘনিষ্ঠ হওয়া তার। কাগজে-কলমে হলেও সিন্ডি তো সত্যি সত্যি তার বউ নয়। কোনো দুর্বলতা জন্মায়নি, এই মেয়েটি তার সত্যিকারের বউ হলে কেমন হতো, তা-ও মনে আসেনি। বিয়ে করা বউ হলেও সিন্ডি বাইরের মানুষ, বউ নয়।

দরজায় টোকা পড়ার আগে বসার ঘরটি একটু ভদ্রস্থ করবে ভেবেছিলো। টিভিতে বার্লিনের দেওয়াল দেখতে দেখতে ভুলেই গেলো। ঘর গোছানোর দরকার খুব একটা ছিলো, তা নয়। ব্যাচেলর একটি ছেলের ঘর ছবির মতো গোছানো হওয়া সম্ভব নয়। কেউ হয়তো তা আশাও করে না। এককালে নাকি মেয়েরা - মা, ভাবী-বউদি, এমনকি প্রেমিকা - মৃদু অনুযোগ ও কপট বকুনিসহ ব্যাচেলরদের ঘরটর গোছানোর কাজটি সম্পন্ন করে দিয়ে যেতো। কিন্তু কাগজের বিয়ে মানে সংসারী হওয়া নয়, এই বউয়ের কাছে সেসব আশা করা চলে না। বউ নিজের ঘরে আসছে ফোন করে অনুমতি নিয়ে - তা-ও শুধু কাগজের বিয়েতেই হওয়া সম্ভব।

ঘরে ঢুকে সিন্ডি হাতব্যাগটি পাশে রেখে সোফার ওপরে ধপ করে বসে। কে জানে কেন এই প্রথম শওকত অনুভব করে, মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী। আগে এরকম মনে হয়নি কেন? পায়ের গোড়ালি পর্যšত নামানো সাদা স্কার্টের সঙ্গে পরেছে লাল রঙের ব্লাউজ। কাঁধ পর্যন্ত নামানো সোনালি চুলগুলি সামান্য এলোমেলো। তার মুখচোখ খানিকটা বিপর্যস্ত। শওকত সাবধানে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছো, সিন্ডি?

ভালো না।

তোমাকে খুব ডিস্টার্বড দেখাচ্ছে, কী হয়েছে?

সেটা বলতেই আসা। গলাটা শুকিয়ে আছে, একটু পানি পেতে পারি?

নিশ্চয়ই। পানি খাবে, নাকি কোক?

সিন্ডি একটু ম্লান হাসে, যে কোনো একটা হলেই চলে।

শওকত গ্লাসের আধাআধি পর্যন্ত ভরে ফেলে বরফের টুকরো দিয়ে। ফ্রিজ থেকে কোকের ক্যান বের করে গ্লাসে ঢালে। খানিকটা ঢেলে থামতে হয়, ক্যানে আবদ্ধ কোকের বুদবুদ গ্লাস ভরিয়ে দিয়েছে। তাকিয়ে বুদবুদগুলোকে মিলিয়ে যেতে দেখে সে। তারপর আবার ঢালে।

গ্লাসে ছোটো চুমুক দিয়ে সিন্ডি বলে, আমি খুবই দুঃখিত, কিন্তু তোমার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিটা আমি রাখতে পারছি না, সাওকাট।

শওকত জানে, সিন্ডি কোন প্রতিশ্রুতির কথা বলছে। ওই কাগজের বিয়ে ছাড়া আর কোনো দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার নেই তাদের। সে চুপ করে থাকে।

আরেক চুমুক কোক গলায় নামিয়ে সিন্ডি বলে, আমি জানি ব্যাপারটা তোমার জন্যে ভালো হচ্ছে না। তোমার কাগজপত্রের ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে আমি খুবই খুশি হতাম। কিন্তু আশা করি তুমি বিশ্বাস করবে যে আমার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু সিন্ডি, ব্যাপারটা আর মাত্র মাস ছয়েকের। তুমি খুবই বন্ধুর মতো আমার উপকার করতে চেয়েছিলে, তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। এতোদূর পর্যন্ত এসে সামান্য সময়ের জন্যে সব ওলটপালট করে দেওয়াটা কেমন অর্থহীন হয়ে যায় না?

জানি সাওকাট। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ব্যাপারটা চুকে যেতো। কিন্তু আমি সত্যিই অপারগ।

শওকত একটু চুপ করে থেকে বলে, বেশ তো, তাহলে কী করতে চাও বলো।

বিয়েটা অ্যানালমেন্ট করাতে হবে। ডিভোর্স নয়, অ্যানালমেন্ট।

মানে?

ডিভোর্স হলে সেটা সারাজীবন আমার রেকর্ডে থেকে যাবে। যদিও এটা কোনো বিয়ে ছিলো না এবং শুধু একজন বন্ধুকে সাহায্য করতে যাওয়া ছাড়া যে আর কিছু নয়, এই কথা কেউ বুঝবে না। আসলে জানানোও যাবে না। কাকে বলবো, কীভাবে ব্যাখ্যা করবো? বললে কে বিশ্বাস করবে? যদি তোমার সঙ্গে আমার সেরকম একটা ভালোবাসার সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যেতো, আমরা সত্যিকারের দম্পতির মতো ঘরসংসার করতাম, তাহলে না হয় কথা ছিলো। তখন তাকে আর মুছে ফেলার কথা উঠতো না। হয়তো আমরা চাইতাম না, চাইলেও পারা যেতো না। তা তো হয়নি। এখন অ্যানালমেন্ট করলে ভবিষ্যতের এই যন্ত্রণা আমাকে পোয়াতে হয় না। শুধু আমি কেন, তুমি এ দেশে বাস করতে চাইলে ওই ডিভোর্স তোমাকেও সারাজীবন ভোগাবে।

কফি টেবিলে রাখা সিন্ডির কোকের গ্লাস দেখে শওকত। সেখানে আর কোনো বুদবুদ উঠতে দেখা যায় না। অর্ধেক গ্লাস নিরেট কোক। চুপ করে থাকে সে। কী বলবে? কী বলা যায়?

সিন্ডি বলে, অ্যানালমেন্টটা সেরে ফেলতে হবে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু তুমি জানতে চাও না কী এমন হলো যে আর ছ’টা মাস আমি অপেক্ষা করতে পারছি না?

কারণ নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে, তোমার কাছে তার ব্যাখ্যাও আছে। ইচ্ছে হলে বলবে, না হলে নয়। পুরোটাই তোমার ব্যাপার।

বন্ধু হিসেবেও জানতে চাইতে পারতে।

তা পারতাম। কিন্তু তুমি জানো, আমি কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কখনো কৌতূহল দেখাই না। উচিতও মনে করি না। ইচ্ছে হলে বলতে পারো, আমার শুনতে আপত্তি নেই।

তুমি কি খুব রেগে যাচ্ছো?

শওকত মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ফলাফল যা হয় তাকে মলিন মুখের হাসি বলা চলে বড়োজোর। বলে, যা হওয়ার তা হবে, রাগ করবো কেন?

এক চুমুক কোক খায় সিন্ডি। বলে, তোমাকে বলবো বলেই এসেছি। না হলে ফোনেই আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারতাম। বললে আশা করি তুমি বুঝবে, সিদ্ধান্তটা আমাকে কেন নিতে হলো।

বলো, শুনি।

তিন মাস আগে এক পার্টিতে একটি ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। আমরা দেখা করতে শুরু করি। পরস্পরকে পছন্দের ব্যাপার ঘটে। প্রেমও। স্টিভ আমাকে বিয়ে করতে চায়। তোমার ব্যাপারটা ভেবে বিয়ে পিছিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলাম। ওকে বলেছি, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। স্টিভ নাছোড়বান্দা, একটুও অপেক্ষা করতে চায় না। একদিন অবুঝের মতো বলতে লাগলো, আমাকে ভালোবাসলে বিয়ে করতে চাও না কেন? আর আমাকে নিয়ে স্টিভ এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে বলেও মনে হয়, আমাকে সে হারাতে চায় না। আমিও ওকে খুবই ভালোবাসি।

একটু থেমে সিন্ডি কোকের গ্লাসে ছোটো একটা চুমুক দেয়। শওকতের বলতে ইচ্ছে হয়, এই তুমিই কখনো সংসার পাতবে না ঠিক করেছিলে, তার কী হলো? বলে আর কী লাভ! সে চুপ করে থাকে।

সিন্ডি নিজেই তার ব্যাখ্যা দেয়, আমার আগের বয়ফ্রেন্ডের কথা তুমি জানো। তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর বিয়ে সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন আমি সেই মানসিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি, সত্যি বলতে কি স্টিভের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। এখনকার এই বিশ্বাস, এই অনুভূতিটাও আমি আর হারাতে চাই না। ওকে আমি সত্যিই খুব ভালোবাসি। আশা করি তুমি বুঝতে পারছো, সাওকাট।

শওকতের অনেক প্রশ্ন মনে আসছে। ইমিগ্রেশনের কাজ মিটিয়ে তখন কি অ্যানালমেন্ট করার উপায় থাকতো? ঝামেলা নিশ্চয়ই হতো। অ্যানালমেন্ট করা বিয়ের সুবাদে পাওয়া গ্রীন কার্ডও বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। গত দুই বছর বিবাহিত দম্পতি হিসেবে দুজনের একত্রে ট্যাক্স ফাইল করা হয়েছে, ইমিগ্রেশনের কাছে বিয়েটা আরো বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে। তার কী হবে? অ্যানালমেন্টে তা মুছবে না। এখন এসব বলার কোনো মানে নেই আর, শওকত জানে।

সে আস্তে করে বলে, বুঝতে পারছি। মিশেল-টিংকু জানে?

না, ওদের সঙ্গে এখনো কথা বলিনি। ওরা খুবই আশ্চর্য হবে আমি জানি। তাতে কিছু এসে যায় না। ক্ষতি যা হওয়ার, তা তোমারই। আশা করি তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না। তোমাকে সাহায্য করতে পারলে আমি খুবই খুশি হতাম, কিন্তু হলো না। আমাকে ক্ষমা করো, সাওকাট।

মন খারাপ কোরো না, সিন্ডি। তোমার সাধ্যমতো চেষ্টা তুমি করেছো। বন্ধুরা তাই করে। তোমার জীবন, তোমার ভবিষ্যতের চিন্তা তোমাকেই করতে হবে। নিজের জন্যে যেটা সবচেয়ে ভালো হয়, তাই তোমার করা উচিত।

আমি শুধু ভাবছি, তোমার এখন কী উপায় হবে?

একটা কিছু হয়ে যাবে, ভেবো না। না হলে দেশে ফিরবো। ফিরে যাওয়ার রাস্তা তো খোলা আছেই।

সিন্ডি কোকের গ্লাসে শেষ চুমুক দেয়। বলে, কিন্তু তুমি এ দেশে থাকতে চেয়েছিলে। এখন আমি কি তোমার জন্যে অন্য কোনো মেয়েকে খুঁজবো?

না, ধন্যবাদ। তার দরকার নেই।

সিন্ডি উঠে দাঁড়ায়। শওকতও। সিন্ডি বলে, তোমার সময় হলে পরশু আ্যনালমেন্টের সই-সাবুদের ব্যাপারটা সেরে ফেলতে চাই।

ঠিক আছে, তাই হবে।

কখন কোথায় আসতে হবে, আমি তোমাকে কাল ফোন করে জানিয়ে দেবো।

কাল সন্ধ্যায় ফোন কোরো, তখন ঘরে থাকবো।

সিন্ডি করমর্দনের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, আমরা কি এখনো বন্ধু থাকতে পারি?

শওকত সিন্ডির বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে, নিশ্চয়ই।

সিন্ডি এগিয়ে এসে শওকতকে আলতো আলিঙ্গন করে। দরজা খুলে বাইরের ল্যান্ডিং-এ দাঁড়ায়। বলে, একটা কথা বলি। ইচ্ছে হলে বিশ্বাস করতে পারো, না-ও পারো।

বলো।

সাওকাট, তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি। তুমি একটিবার চাইলে স্টিভ কেন, আর কাউকেই আমার দরকার ছিলো না। তুমি কোনোদিন ফিরেও দেখলে না, আমি কিন্তু অপেক্ষায় ছিলাম। শুধু কাগজে নয়, তুমি একবার চাইলে আমি সত্যি সত্যিই তোমার হতে পারতাম।

সিন্ডি বিদায় নেওয়ার অনেক পরে একা ঘরে শওকতের মনে হলো, বার্লিনের দেওয়াল উঠেছিলো কেন? ভেঙে ফেলা হবে বলেই তো।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28724847 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28724847 2007-08-09 13:01:57
গল্প : সংকট ১ ফোনে সিন্ডির গলার স্বর অস্থির। কিছু তাড়াও আছে বলে মনে হয়। কিন্তু তার উচ্চারণ ঘন ও একাগ্র, কথা স্পষ্ট। সাওকাট, আই নীড টু স্পীক টু ইউ। তোমার কি সময় আছে? ইট’স ভেরি ইমপর্ট্যান্ট।

শওকত বলে, বেশ তো, বলো।

ফোনে নয়, সামনাসামনি বলতে চাই।

কখন, কবে বলো।

তোমার সময় থাকলে আজ রাতেই, এখনই।

আমার কোনো সমস্যা নেই।

তাহলে আমি তোমার ওখানে চলে আসতে পারি? আই মীন, তোমার যদি অসুবিধা না থাকে।

চলে এসো, কোনো অসুবিধা নেই।

আধঘণ্টার মধ্যে আসছি আমি।

ফোন রেখে শওকত কিঞ্চিৎ কৌতুক বোধ করে। এক হিসেবে সিন্ডিও এই অ্যাপার্টমেন্টের ভাগীদার, লীজের চুক্তিতে শওকতের সঙ্গে তার নাম আছে। তবু আসার জন্যে তাকে অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়! হাস্যকর বটে। লীজের কাগজে স্বাক্ষর থাকলেও সিন্ডি এখানে বসবাস করে না। কখনো করেনি, কথাও ছিলো না। কিন্তু কী কথা বলতে আসছে সিন্ডি? রাত এখন প্রায় এগারোটা, অসময় তো বটেই। সামান্য অস্বস্তি লাগে। উদ্বেগ হয়। ভালো খবর নিয়ে সে আসছে না, তা অনুমান করা যায় নিশ্চিন্তে। জরুরি কিছু হবে নিশ্চয়ই যা কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না, ফোনেও বলা যায় না। বিষয়টা কি?

কাজ থেকে শওকত ফিরেছে সাড়ে ন’টায়। টিভিতে ডেভিড লেটারম্যানের লেট নাইট শো দেখছিলো সে। লেটারম্যান মজার লোক, মুচকি হাসি থেকে হো হো দমফাটানো হাসি-হাসানো সবই পারে সে। সেলিব্রিটিদের ইন্টারভিউ করতে গিয়ে উদ্ভট প্রশ্নে তাদের নাস্তানাবুদ করা লেটারম্যানের প্রিয় কীর্তি। তারপরেও তারা, বিশেষ করে উঠতি সেলিব্রিটিরা, এই অনুষ্ঠানে হাজির হওয়াকে গৌরবময় অর্জন বলে মনে করে। জানে, ভালোমন্দ যা-ই হোক, পরিচিতি কিছু বাড়াবে লেটারম্যান, যা শেষ পর্যন্ত কাজেই লাগবে তাদের। শো-বিজনেসে নেগেটিভ পাবলিসিটিও এক ধরনের পাবলিসিটি বটে, তাকে তুমি কীভাবে ভাঙিয়ে খেতে পারবে তা তোমার ব্যাপার।

ক্লাস এবং কাজের পরে দিনশেষে টিভি দেখা শওকতের একমাত্র আয়েশ। সাত বছর আগে এ দেশে এসেই টিভিতে আটকে গিয়েছিলো সে। দেশে থাকার কালে টিভি চ্যানেল ছিলো মোটে একখানা, তা-ও মাত্র কয়েকঘণ্টার। এখন তো দেশে নতুন নতুন চ্যানেল চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ দেশে বসেও স্যাটেলাইটে অনেকগুলো দেশী চ্যানেল দেখা যায়, অনেক বাড়িতে সে দেখেছে। তার আগ্রহ হয় না।

এ দেশে টিভি চ্যানেলের গোনা-গুনতি নেই, তার বেশিরভাগ দিবারাত্র চালু। একটি জিনিস শওকত বুঝে গিয়েছিলো, মার্কিনি ধাঁচের উচ্চারণে ও টানে ইংরেজি শিখে নেওয়ার সবচেয়ে সোজা পথ হলো প্রচুর টিভি এবং হলিউডি ছবি দেখা। বাক্যগুলো কীভাবে গঠিত হচ্ছে, একেকটা শব্দ উচ্চারণের সময় ঝোঁকটা কোথায় পড়ছে, মার্কিনি উচ্চারণের ধরণ - এইসব খেয়াল করা। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজে শেখা বৃটিশ ইংরেজির থেকে এখানকার ইংরেজি একেবারে অন্যরকম। প্রথম প্রথম বুঝতে বেশ অসুবিধা হতো। পরীক্ষার খাতায় লিখতে গেলে কোনো ঝামেলা নেই, কিছু বানানের পার্থক্য ছাড়া ব্যাকরণ সেই একই। মুখে বলার ধরণ ও উচ্চারণ খুবই আলাদা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকাতরে টিভি দেখা তাকে মার্কিনি ইংরেজিতে অভ্যস্ত করে তুলেছে। এ দেশীয়দের কায়দায় প্রায় নিখুঁতভাবে ইংরেজি বলা এখন পুরোপুরি শওকতের আয়ত্বে। এমনকি, কথা বলার সময় দরকারমতো কাঁধ ঝাঁকানো-টাকানোসহ।

ঢাকায় তাদের বসবাসের দুই পুরুষ চলছে, শওকত আর তার বড়ো দুই ভাইবোনের জন্মও ঢাকায়। অথচ বাড়িতে সামান্য ঢাকাইয়া মিশেল সহযোগে সিলেটের মৌলভীবাজার অঞ্চলের ভাষাই চলে। দেশের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা এলে তাদের ঢাকার বাড়ি এখনো মৌলভীবাজার হয়ে যায়।

শওকতের পিতা সেনাবাহিনীতে ডাক্তার ছিলেন, কর্নেল হয়ে অবসর নিয়েছেন দু’বছর আগে। এখন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, ফার্মগেটে নিজস্ব চেম্বারসহ ওষুধের দোকান। পশার ভালোই, বাংলাদেশে রোগীর অভাব কোনোকালে হওয়ার নয়। ফলে শওকতের পড়াশোনার খরচ দেশ থেকে পাঠাতে অসুবিধা কিছু হয় না। থাকা-খাওয়া বা আনুষঙ্গিক খরচও পাঠাতে ইচ্ছুক বাবা, যাতে তার পড়াশোনার ব্যাঘাত না ঘটে। শওকতের সংকোচ হয়। এ দেশের একেকটি ডলারের জন্যে বাংলাদেশের প্রায় সত্তর টাকা লাগে। জানে, বাবার সঙ্গতি আছে এবং চাওয়ামাত্র তিনি সানন্দে সে ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু শওকত নেবে কেন?

আমেরিকায় আসার পর থেকেই নিজে কাজ করে সে। টানাটানি হয় মাঝেমধ্যে, সেমেস্টার বাদ পড়ে যায়, তবু নিজের রোজগারে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিও আছে। আর বছরখানেকের মধ্যে পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এরপরে দেশে গিয়ে সে স্থিত হবে, বাবা-মা দু’জনেরই বাসনা তাই। বড়ো ভাই আর্মিতে, তার পোস্টিং ঢাকার বাইরে। বোনটিরও বিয়ে হয়ে গেলো বলে। সুতরাং ঢাকার বাড়িতে অচিরে বাসিন্দা বলতে বাবা-মা ছাড়া আর কেউ থাকছে না। শওকতকে তাঁরা কাছাকাছি চান, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কর্তব্যপরায়ণ ও বাধ্য ছেলে হিসেবে প্রথম কয়েক বছর তার সম্পূর্ণ ইচ্ছে সেরকমই ছিলো। এখন আর সে ততো নিশ্চিত নয়।

ডেভিড লেটারম্যান শেষ হলে শওকত রিমোট চেপে চ্যানেল বদলাতে থাকে। হিস্ট্রি চ্যানেলে বার্লিন দেওয়াল নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। বার্লিনের দেওয়াল ভাঙার উৎসব। ধারাভাষ্যকার বলে যায়, দুই জার্মানির মধ্যে মানুষজনের যাতায়াত বন্ধের জন্যে এই দেওয়াল তোলা হয়েছিলো। পরিহাসের বিষয়, ইতিহাসের চক্রে ২৮ বছর পর তা ভাঙা হলো সেই যাতায়াতের সুবিধার জন্যেই।

আজ তার ক্লাস ছিলো না। কাজে গিয়েছিলো দুপুর একটায়, শেষ করে ফিরেছে একটু আগে। বেনিগ্যান’স নামের একটি আইরিশ-আমেরিকান রেস্টুরেন্টের কিচেন তার কর্মস্থল। এ দেশে আসার আগে সে রান্নাঘরে কোনোদিন ঢোকেনি। দরকার হলে বড়োজোর গরম পানি রান্না করার ক্ষমতা ছিলো বলে তার ধারণা, তা-ও করে দেখা হয়নি কখনো।

আমেরিকায় সে এখন ছাত্র এবং রন্ধনশালার কর্মী। মূল রন্ধনকর্মের জন্যে আছে শেফরা, তার কাজ প্রেপ করা। শওকত লক্ষ্য করেছে, আমেরিকানরা যে কোনো শব্দ সংক্ষেপ করায় খুবই পারদর্শী। প্রেপারেশনকে বানানো হয়েছে প্রেপ। সেদ্ধ করা মুরগির হাড় ছাড়িয়ে মাংস কুচি করে বা চৌকো করে কাটো, গোমাংসের কিমা পরিমাণমতো নিয়ে গোলাকৃতি চ্যাপ্টা প্যাটি বানাও স্টেক বা বারগারের জন্যে, আলু-পেঁয়াজ কেটে দাও, সালাদের জন্যে ফল-সবজি ও আনুষঙ্গিক সব তৈরি রাখো - শওকতের কাজ বলতে এই। সে একা নয়, ছ’সাত জোড়া হাত এই কাজ একনাগাড়ে করে যায়।

রেস্টুরেন্টে বাঙালি আরেকজন আছে, টিংকু। শেফের কাজ করে, সে-ই শওকতের কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। ঠিক চাকরি দেওয়া নয়, বদলি করিয়ে আনা। চেইন রেস্টুরেন্ট বেনিগ্যান’স-এর যেটাতে শওকত প্রথম ঢুকেছিলো, বাসা থেকে সেখানে যেতে-আসতে ড্রাইভ করতে হতো ষাট-সত্তর মাইল। এখন যাওয়া-আসা মিলিয়ে পনেরো-ষোলো। অনেকটা সময় ও অধুনা দুর্মূল্য গ্যাসের খরচ বাঁচে। গাড়ির আয়ুও। তার টয়োটা করোলার বয়স তার এ দেশে বসবাসের বয়সের সমান, যদিও এর মালিকানা পেয়েছে সে বছর দুয়েক হয়। এর আগেরটা ছিলো নিসান সেন্ট্রা। বারো বছর বয়সী বুড়ো সেন্ট্রাকে এক সকালে আর ঘুম থেকে জাগানো গেলো না, ট্রান্সমিশন বসে গিয়েছিলো। সারানোর খরচ গাড়ির বাজারদরের সমান। পাঁচ বছর মেয়াদী মাসিক কিস্তিতে তখন শওকত অন্য কারো ব্যবহৃত এই করোলা কিনেছিলো। ব্যবহৃত অবস্থায় কেনা হলেও নির্ভরযোগ্য এখনো, শওকত গাড়ির যতœও করে, তবু বয়স হয়ে যাওয়া গাড়ির ভরসা নেই। যে কোনো সময় হয়তো বসে যাবে, এবং তাকে পথে বসাবে।

টিংকু আরেকটি কাজ করেছিলো শওকতের জন্যে। সিন্ডির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সিন্ডি এখানকার হোস্টেস। খেতে আসা মানুষজনকে প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে বেনিগ্যান'স-এ স্বাগত জানানো এবং তাদের টেবিলে নিয়ে বসানোর কাজ তার। সিন্ডির বান্ধবী মিশেলকে বিয়ে করেছে টিংকু, তাদের এক বছর বয়সী একটি বাচ্চাও আছে। শওকত নিজে কখনো এদেশীয় মেয়েকে বিয়ে করবে না। তবু করতে হয়েছে, চুক্তির বিয়ে। টিংকুর মধ্যস্থতায় সিন্ডি দু’বছরের চুক্তিতে কাগজের বিয়ে করতে সম্মত হয় শওকতকে গ্রীনকার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। দীর্ঘকালের বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সিন্ডির সম্প্রতি তখন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে তাদের জানাশোনা, বাগদানও হয়ে গিয়েছিলো। বিয়ের ঠিক আগে সিন্ডি বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করে তার বয়ফ্রেন্ডটি অবিশ্বস্ত, একাধিক মেয়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পর্ক রাখার প্রতিভাসম্পন্ন। এই আবিষ্কারে সিন্ডি বড়ো রকমের একটি ধাক্কা খায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় কখনো বিয়েই করবে না সে।

টিংকু আর মিশেল দূতিয়ালির কাজটি করে, দু’জনে সিন্ডিকে বুঝিয়ে বলেছিলো, এটা সত্যিকারের বিয়ে নয়, শুধুই কাগজপত্রে। একসঙ্গে বসবাসের প্রশ্নও নেই, আর শওকত যে ধরনের লাজুক ছেলে, সে কোনোদিন হাতটিও ধরতে চাইবে না। গ্রীন কার্ডের জন্যে কেবলমাত্র কাগজপত্রে দেখাতে হবে যে তারা বিবাহিত, তাদের যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে এবং অ্যাপার্টমেন্টের লীজ কনট্রাক্টে দু’জনের নাম আছে। কাউন্টি ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে যে বিয়েটি হবে তা শুধুই একটি কাগজে সই করার বেশি কিছু নয়। আর ইমিগ্রেশন অফিসে বার দুয়েক যেতে হবে ইন্টারভিউয়ের জন্যে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28724843 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28724843 2007-08-09 12:13:10
'আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি'
হতভম্ব, বিহ্বল মানুষ। কাঁদতেও যেন ভুলে গেলো। তার খানিকটা আতংকেও। পাকিস্তানী সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধের সময়ে সেনাবাহিনীর অপরিমেয় নৃশংসতার স্মৃতি তখনো টাটকা। তারা জানে উর্দিধারীদের কাছে যুক্তির কোনো জায়গা নেই।

সরল যুক্তিতে অবশ্য মানুষ বোঝে, যেহেতু শেখ মুজিবের হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতরা এবং সেই হত্যকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারিরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, শেখ মুজিবের নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করাও অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। হত্যাকারীরা শেখ মুজিবকে বেঈমান হিসেবে বেতার-টিভিতে ঘোষণা দিয়েছিলো, যদিও কথিত সেই বেঈমানী আজও প্রমাণিত হলো না। সুতরাং চুপ করে না থেকে মানুষের তখন আর উপায় কী?

একটা কথা খুব জোরেশোরে বহুদিন ধরে প্রচারিত - শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডে অসংখ্য মানুষ নাকি খুশিতে পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টি বিতরণ করেছিলো। এরকম আদৌ ঘটেনি, তা নয়। কিন্তু তা ব্যতিক্রমের হিসেবে থাকা উচিত। এই ঘটনাগুলি ছিলো নিতান্তই কিছু কিছু শহরাঞ্চলে, গ্রামে এই ধরনের ঘটনার কথা কেউ শুনেছেন বলে জানা যায় না।

অঘাষিতভাবে 'নিষিদ্ধ' শেখ মুজিবের নাম প্রথম প্রকাশ্যে উচ্চারিত হলো একজন কবির মুখে। ১৯৭৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে। শহীদ মিনার হয়ে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে। বইমেলার শেষদিন (তখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা শেষ হতো) বলে অতিরিক্ত কিছু ভিড়।

মঞ্চে কবিতাপাঠ চলছে। কবিরা একে একে মঞ্চে উঠে কবিতা পড়ে চলে যাচ্ছেন। পরেরজন আসছেন। কবিতার শ্রোতা খুব বেশি কোনোকালেই হয় না, কেউ কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, বেশিরভাগই ব্যস্ত অন্যকিছুতে। শীর্ণ ও দীর্ঘকায় শশ্রুমণ্ডিত নির্মলেন্দু গুণ মঞ্চে এলে কিছু মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তাঁর বেশ কিছু কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পেয়ে গেছে তখন। কিন্তু আজ তিনি যা করবেন, তার জন্যে কেই তৈরি ছিলেন না। মাইক্রোফোনে শেখ মুজিবের নাম উচ্চারিত হতেই সবাই সচকিত। কী হচ্ছে এটা? লোকটা পাগল নাকি? এক্ষুণি তো তাকে ধরে নিয়ে যাবে!

কাউকে কাউকে ত্রস্তপায়ে বাংলা একাডেমির সীমানা ছেড়ে চলে যেতেও দেখা যায়।

নাঃ, এই নিয়ে অবশ্য নির্মলেন্দু গুণকে বিশেষ কোনো হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়নি শেষ পর্যন্ত। তবে এই ঘটনা অন্য অনেক সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো।

নির্মলেন্দু গুণের কবিতাটি নিচে তুলে দেওয়া হলো:

------------------------------------------------------

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি / নির্মলেন্দু গুণ

সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হ’য়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শহীদ মিনার থেকে খ’সে পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মতো আমিও পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি, ‘সমকাল’
পার হয়ে যেতে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শাহবাগ এ্যভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝর্ণাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মতো আমারো স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালোবাসা আছে শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো
কান পেতে শুনুক,
আসন্ন সন্ধ্যায় এই কালো কোকিলটি জেনে যাক -
আমার পায়ের তলার পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সে স্বপ্নের কথা রাখলাম।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28724370 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28724370 2007-08-05 23:20:41
অনেককালের পুরনো একটি দিন ফিরে এলো
একদিন দুই বাপ-ব্যাটা রওনা হয়েছি বিখ্যাত মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি দেখতে। ডাইনোসর বিষয়ে তার আগ্রহ সেই আধো আধো বোলের বয়স থেকে, ক্রমে বিবিধ প্রকারের ডাইনোসর সংক্রান্ত তথ্যের চলমান ভাণ্ডার হয়ে ওঠে সে। এই মিউজিয়ামে অনেক ডাইনোসর-কংকাল আছে সে জেনেছে। সুতরাং সেখানে যাওয়া তো আবশ্যক।

ছেলেকে নিয়ে সাবওয়েতে। নিউ ইয়র্কের রাস্তাঘাট চিনি না, সাবওয়ে সম্পর্কে ততোধিক অজ্ঞ। আমরা যে শহরে বাস করি, সেখানে সীমিত দূরত্বে কিছু ট্রেন চলাচল সবে শুরু হয়েছে। কোন ট্রেনে উঠতে হবে, কোথায় ট্রেন বদল করতে হবে, কোথায় যাত্রা শেষ করতে হবে এইসব তথ্য লেখা কাগজ পকেটে।

নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে ভূগর্ভে, ফলে ট্রেন চলাকালে বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার টানেল ছাড়া কিছু দেখার নেই। পুত্রের বিবিধ কৌতূহল, সে বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। এইসব আমাদের হয় নিত্যদিন। ভাবি, আমাদের বাবাদের আমরা এতো প্রশ্ন করতে পারতাম না। ওই বয়সে পিতা সম্পর্কে ভালোবাসার চেয়ে সমীহ বা ভয়ের অনুভূতিই বেশি ছিলো মনে আছে।

ছেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আচমকা অনেককাল আগের একটি কথা মনে পড়ে যায়। আমি আমার পিতার সঙ্গে ট্রেনে করে যশোর যাচ্ছি। আমার বয়সও তখন দশ হয়েছে কি হয়নি। সেই যাওয়ার উপলক্ষ কী ছিলো, কেন শুধু আমরা দুই পিতাপুত্র যাচ্ছি সেসব কিছুই মনে পড়ে না। সেই ভ্রমণটি আমার স্পষ্ট স্মরণে আছে।

বগুড়া থেকে শান্তাহার জংশন। সেখানে ট্রেন বদলে ব্রডগেজ রেলে ওঠা। ব্রডগেজে এই আমার প্রথম নয়। দাদার বাড়ি জয়পুরহাট যেতে হলেও শান্তাহারে ট্রেন বদলে ব্রডগেজ ট্রেনে উঠতে হয়। তখন বগুড়ার সঙ্গে জয়পুরহাটের নামমাত্র সড়কপথ থাকলেও তা ছিলো অতিশয় দুর্গম এবং বাস সার্ভিস বলে কিছু ছিলো না।

শান্তাহার থেকে জয়পুরহাট মাত্র পাঁচটি স্টেশনের দূরত্ব। এবারে আমরা যাচ্ছি জয়পুরহাটের উল্টোদিকে এবং দূরত্বও অনেক অনেক বেশি।

ব্রডগেজে দীর্ঘযাত্রায় ট্রেনের দুলুনি খূব বেশি করে টের পাওয়া যায়। দুলুনিতে শুধু বালক কেন, বয়স্কদেরও ঘুম পেয়ে যায়। মাঝেমধ্যে ঘুম ভাঙিয়ে বাবা আমাকে দর্শনীয়গুলো দেখান। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, রাজশাহীর বিখ্যাত চলনবিলের বিশাল বিস্তার। নাটোরে বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা খাওয়া হলো। আবার ঘুম ভাঙলো বাবার ডাকে। চৌকোনা এক ধরনের মিষ্টি কোনো স্টেশন থেকে কিনেছেন, আমাকে খাওয়াবেন। ঘুমচোখে বাইরে তাকাই। জানালার পাশে বসেছি বলে বাইরে মুখ বাড়ালে বাতাসের তীব্র ঝাপটা মুখে লাগে। হাত প্রসারিত করে দিলে বাতাসের তোড়ে হাতটা খুলে যাবে মনে হয়। মিষ্টি মুখে দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখি বেশ বড়ো একটা বাঁক নিচ্ছে ট্রেন। আমি পেছনের সবগুলো বগি দেখতে পাচ্ছি। রোদ পড়ে ট্রেনের ধাতব শরীর চকচক করে। ট্রেনের গতির প্রতিক্রিয়ায় রেললাইনের পাশে ধুলোর ছোটো ছোটো ঘূর্ণি। বালক বিস্ময়-বিহ্বল চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তখন সে জানে না, এই দৃশ্য তার সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে। চোখ বুজলে এই ছবি অবিকল দেখবে সে বারংবার।

নিউ ইয়র্কের চলন্ত সাবওয়েতে বসে পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, অনেক অনেক বছর পর, যখন বাবা আর কোথাও নেই, এই ট্রেনযাত্রা কি তার মনে পড়বে? যেমন আমার পড়লো?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28723378 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28723378 2007-07-30 12:16:03
চুপকথা : উপন্যাসের খসড়া - অখণ্ড পিডিএফ
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28722553 http://www.somewhereinblog.net/blog/zubairblog/28722553 2007-07-25 12:02:08