বর্তমান পরিস্তিতে দারুন একটি লেখা
বাংলাদেশকে আরো দুর্বল কে করল?
ড. রোজোয়ান সিদ্দিকী
প্রথম প্রথম খুব সরল বিশ্বাসে মনে করার চেষ্টা করেছিলাম যে, সরকার হয়তো ভুল করে বা না বুঝে সাম্রাজ্যবাদী ফাঁদে পা দিয়েছে। আমি আশাবাদী মানুষ। তবু আশা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই নিজেকে আহাম্মক মনে হচ্ছে। না, সরকার ভুল করেনি। তারা সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির দেখানো পথে স্বেচ্ছায়ই অগ্রসর হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তি যা চায়, সেটাই নিষ্ঠার সাথে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সরকার। ওই দুই শক্তি চায় বাংলাদেশ হবে ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র। তাহলে বাংলাদেশের ওপর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তারা সরাসরি কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ হবে আর এক ইরাক বা আফগানিস্তান।
কোনো রাষ্ট্রকে ব্যর্থ বা অকার্যকর করার জন্য দরকার তার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া। সীমান্ত গোলযোগপূর্ণ করে তোলা, নিজ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নড়বড়ে করে তোলা, প্রশাসনকে অকার্যকর করে ফেলা ও রাষ্ট্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়া। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের মেয়াদোত্তীর্ণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯ মাস ধরে নিষ্ঠার সাথে সেই কাজগুলোই করে আসছেন। আগামী পাঁচ মাসে নিশ্চয়ই তাঁরা ষোলকলা পূর্ণ করবেন।
অর্থনীতি দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রঘাতী বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচি সত্ত্বেও জোট সরকারের শেষ বছরে (২০০৫-০৬) দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছিল। বর্তমান সরকার গত দেড় বছরে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে তা ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এ অর্থ আরো কম হতো যদি প্রবাসীরা যথেষ্ট রেমিট্যান্স না পাঠাতেন। এদিকে সরকারের সীমাহীন উদাসীনতার কারণে এসব শ্রমবাজারও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করেই সরকার ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও সাধারণ মানুষের ওপর। যেন গোটা রাষ্ট্রের সব মানুষই সরকারের প্রতিপক্ষ। কেন তারা প্রতি বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমন করে এগিয়ে নিয়ে এলো? কেন এরশাদ আমলের (১৯৮৯-৯০) ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে তারা ৭ শতাংশে উন্নীত করল? সরকার ক্ষমতাসীন হয়েই সেই সাধারণ মানুষের আয়-রোজগারের পথ রুদ্ধ করে দেয়ার জন্য দোকানপাট, শত বছরের পুরনো হাটবাজার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে বুলডোজার নিয়ে নেমে পড়ল। মানুষের কর্মসংস্থানের হাজার হাজার স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো। হকার উচ্ছেদ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ, গ্যারেজ বের করার নামে দোকানপাট উচ্ছেদ করে তারা লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে বেকার করে দিলো। এসব মানুষই দেশের মালিক-মোক্তার। তারাই রাজপথে আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটায়। এরা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়। এসব মানুষের পেটে যদি লাথি মারা যায়, তাহলে তারা আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত, দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত মানুষের মতো আর প্রতিবাদী হয়ে রুখে দাঁড়াতে পারবে না। কোটি কোটি মানুষকে অভাবের দিকে ঠেলে দিতে পারলে তারা প্রাণশক্তি হারাবে এবং তখন বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদীদের অবাধ লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।
সে লক্ষ্যে সরকার একের পর এক সরকারি ও চালু মিলকারখানা বন্ধ করে দিয়ে বেকারের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে তুলল। তেমনি ট্যাক্স ফাঁকি, দুর্নীতি প্রভৃতি অভিযোগ তুলে শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের ঢালাওভাবে জেলে পুরল অথবা তাড়া করে বিদেশে পাঠিয়ে দিলো; যাতে তারা আর কোনো বিনিয়োগ করতে না পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। আবার কালো টাকা, কালো টাকা বলে তাড়া করে জেলে পুরল শত শত বিত্তবানকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কালো টাকা যখন ক্যাপিটাল বা পুঁজি হয়ে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এ ধরনের অপরিণামদর্শী ব্যবস্থা নিলো সরকার। কালো টাকা পুঁজি হলে, তা উৎপাদনে যেমন অবদান রাখতে পারত, তেমনি কর্মসংস্থানের পথও সুগম করতে পারত। সে টাকা এখন হয় অলস পড়ে আছে, নতুবা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। আর ভারত বলেছে, বাংলাদেশীরা নির্বিঘ্নে সে দেশে বিনিয়োগ করতে পারবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ যদি করতেই হয়, বাংলাদেশে নয়, ভারতে করো। বাংলাদেশ ভারত থেকে কিনে আনবে, উৎপাদনের কী দরকার?
বাংলাদেশের অদম্য চাষিরা কৃষি খাতে বিপ্লব এনেছিলেন। গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর আমলে খাদ্যমূল্য ছিল সহনশীল পর্যায়ে। কৃষিতে ভতুকি ছিল। সঙ্কট একেবারে কখনো হয়নি, তা নয়। কিন্তু জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বলে সে সঙ্কটে সরকারকে মনোযোগ দিতে হয়েছিল। কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য এসেছিল। বর্তমান সরকার ভতুকি প্রত্যাহার, জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যাতে দ্রব্যমূল্য চলে গেছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে মধ্যবিত্তও পড়ে যাচ্ছে গভীর সঙ্কটে। সরকারের লক্ষ্যও তা-ই। এর ফলে তারাও প্রতিবাদের শক্তি হারাবে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পথ সহজ হবে। এক দিকে সীমাহীন বেকারত্ব সৃষ্টি, ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে আনা, অপর দিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যাঁতাকলে পিষ্ট হবে মানুষ।
আবার রফতানি খাতেও সরকার ধস নামিয়ে দিয়েছে। গত দুই অর্থবছরে সরকার তাদের সাম্রাজ্যবাদ তোষণনীতির মাধ্যমে রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। জোট সরকারের শেষ বছর অর্থাৎ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০০৭-০৮) সে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গত দুই বছরের অপশাসনে প্রাথমিক পণ্য, পাট ও পাটজাতদ্রব্য, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক সব ক্ষেত্রেই রফতানি আয় হ্রাস পেয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টিতেও সরকার দারুণ সফল হয়েছে। জোট সরকারের আমলে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৮৮৯ মিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে (২০০৭-০৮) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯২১ মিলিয়ন ডলারে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বৈধ আমদানি ছিল ১ হাজার ৮৬৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমান সরকার তা সাফল্যের সাথে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। আর বাংলাদেশ রফতানি বাজার হারিয়েছে। সেটা দখল করে নিয়েছে ভারত।
কোনো রাষ্ট্রকে ব্যর্থ বা অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর জন্য দরকার সীমান্ত গোলযোগপূর্ণ করে তোলা। সে কাজটিও চমৎকারভাবে সম্পন্ন হয়ে এসেছে। বাংলাদেশের তিন দিকই ঘিরে আছে ভারত। মিয়ানমারের সাথে আমাদের সীমান্ত সামান্যই। এসব সীমান্তে ভারত ও ভারতীয়রা অবিরাম হামলা চালাচ্ছে। পাখির মতো হত্যা করছে বাংলাদেশীদের। সরকার প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারছে না। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সীমান্তের দেড় কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে দুই বিডিআর সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সরকার এটাকে শুধু গ্রহণযোগ্য নয় বলতে পেরেছে। গত ছয় মাসে সীমান্তে বাংলাদেশের প্রায় ১০০ লোককে হত্যা করেছে ভারত। তার পরও চুপ করে বসে আছে সরকার। কেন এই প্রসঙ্গ জাতিসঙ্ঘে উত্থাপন করছে না? কারণ এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে তো বাংলাদেশকে ব্যর্থ বা অকার্যকর রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। সুতরাং ভারত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাবে, সরকার মিন মিন করবে। বাংলাদেশ ব্যর্থ বা অকার্যকর রাষ্ট্র করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের আরো একটি শর্ত পূরণ হবে।
এর সাথে নিজ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও আছে। এক দিকে মূল সীমান্তে অবিরাম ভারতীয় হামলা, অপর দিকে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ব্লকগুলো দাবি করছে ভারত ও মিয়ানমার। সরকার জলসীমানা নির্ধারণে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে, ফয়সালা না করে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্লকগুলো ইজারা দেয়ার টেন্ডার দিয়েছে। গোলযোগ আরো বাড়বে। ব্যর্থ রাষ্ট্র করার পক্ষে আর এক কদম এগিয়ে যাওয়া যাবে। আবার বাংলাদেশের সীমান্ত সংরক্ষিত না অরক্ষিত, সেটা নির্ণয় করার জন্য সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে সরেজমিন সীমান্ত ঘুরিয়ে এনেছে। তারা রায় দিয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্ত অরক্ষিত। অতএব বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র।
তৃতীয় প্রসঙ্গ অকার্যকর প্রশাসন। প্রশাসন অকার্যকর করার জন্য সরকার প্রথম থেকেই ছিল সাঙ্ঘাতিক তৎপর। ড. ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মসনদে বসার পরপরই যে নির্লজ্জ প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিলেন, সেটা জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কের অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য তাদের চেয়ে অনেক অযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার অপদস্থমূলক ব্যবস্থা নেয়। কারণ একটাই, সরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। তারপর দুর্নীতি দুর্নীতি বলে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যাতে প্রশাসন আর কোনো কাজ করতেই সাহস না পায়। এতে এখন কেউ আর কোনো কাজ করছে না। কাজ করলে কখন আবার দুর্নীতির অভিযোগে ফেঁসে যান। ফলে এখন সাম্রাজ্যবাদীদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রশাসন অচল। সবাই নির্ভর করতে চাইছে উপদেষ্টাদের ওপর। তাদের আবার সময় খুব কম। ফলে সাফল্যের সাথে জনপ্রশাসন অচল করে দেয়া গেছে।
আর শেষ প্রশ্ন শান্তি ও স্থিতিশীলতার। হ্যাঁ, এক-এগারোর আগে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা মিলে দেশে ভয়াবহ অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল করে দিয়েছিল। রাজপথে প্রকাশ্যে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিল নিরীহ মানুষ। সে সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন যা করছে, তা আরো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সরকার বিএনপি বা চারদলীয় জোটকে নির্বাচনের বাইরে রেখে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে নির্বাচন করতে চাইছে। সরকার নিষ্পত্তি হওয়া যুদ্ধাপরাধীর সস্তা মতলবি ইস্যুকে অকারণে মদদ দিচ্ছে, যা দেশকে আবারো অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য। সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাকে ইসলামি মৌলবাদের উত্থান বলে চালিয়ে দেয়াও কঠিন হবে না। সে সূত্র ধরে বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র বলার পথ সুগম হবে।
এর ওপর সরকার উপযাচক হয়ে গঠন করেছে ট্রুথ কমিশন। সাধারণত চার কারণে ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়ে থাকে। সেগুলো হলোঃ ১. নতুন গণতন্ত্রপন্থী রাষ্ট্রে গণতন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। নতুন সরকারগুলো অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে। তারা শান্তি প্রক্রিয়ায় আপসের পথ বেছে নিতে ট্রুথ কমিশন গঠন করে। ২. অনেক সঙ্ঘাত মাঝপথে শেষ হয়। সেখানে জবাবদিহিতার চাপ থাকে। আগের সঙ্ঘাত বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা হ্রাস করে দেয়। সেখানে অমানবিক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিরা শক্তিশালী থাকে। এ ক্ষেত্রে আপসের পথ হিসেবে ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়। ৩. সঙ্ঘাত এড়াতে পরাজিতদের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের লক্ষ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ থেকে মুক্তি ও বিচার নিষ্পত্তির জন্য ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়। ৪. গৃহযুদ্ধ বা সঙ্ঘাতমূলক পরিবেশে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় উভয় পক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য ট্রুথ কমিশন গঠন করা হতে পারে।
বাংলাদেশে এ রকম কোনো সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ না করলেও সরকার রুয়ান্ডা-বুরুন্ডির মতো ট্রুথ কমিশন গঠন করে বসেছে। এটা ব্যর্থ বা অকার্যকর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর দুর্নীতিবাজদের রেহাই দেয়ার জন্য যদি এই কমিশন গঠন করা হয়ে থাকে, তাহলে তারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। সে জন্য আইন আছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আছে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আছে। কিন্তু এই কমিশন গঠন করে সরকার যেন ঘোষণা দিয়ে দিলো যে, বাংলাদেশে এক মহা সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রঃ নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি ও মার্কিন নীতি শীর্ষক এক রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নীতিনির্ধারণী রিপোর্ট। তাতে ১৭৭টি রাষ্ট্রের ওপর জরিপ চালিয়ে ৩২টিকে ব্যর্থ বা অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অক্লান্ত শ্রমে বাংলাদেশ গত বছরের তালিকার ১৬ নম্বর থেকে এবার ১২ নম্বরে উঠে এসেছে।
আর যুক্তরাষ্ট্রের বিচারে কোনো রাষ্ট্র দুর্বল, ব্যর্থ বা অকার্যকর হলে সে রাষ্ট্র চারটি বিষয়ে হুমকি সৃষ্টি করে। সেগুলো হলো সন্ত্রাসবাদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। সন্ত্রাসবাদের জন্য আলকায়েদাসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকেই বেছে নেয়। একেবারে ব্যর্থ রাষ্ট্র তাদের পছন্দ নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র দুর্বল দেশগুলোকে নিরাপদ স্বর্গরাজ্য মনে করে। কারণ উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি হলে অপরাধীরা সহজেই তাদের কাজ হাসিল করতে পারে। পরমাণু অস্ত্র বিস্তারে দুর্বল রাষ্ট্র ঝুঁকি সামলাতে অক্ষম। ওই দেশগুলোতে রাসায়নিক, জীবাণু ও তেজস্ক্রিয় উপকরণ সহজেই চলাচল করতে পারে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা হিসাব দিয়েছে, যেসব দেশের সীমান্ত অরক্ষিত, সেসব দেশের সীমান্ত দিয়ে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৮০টি পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় বস্তুর চোরাচালান ধরা পড়েছে। গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের চালানও সেখান দিয়ে আনা-নেয়া সহজ। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহায়তায় সরেজমিন তদন্ত করে দেখে গেছেন যে, আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশ ক্রমেই আরো বেশি দুর্বল ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। এর সীমান্ত অরক্ষিত। ফলে তা মার্কিন নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তা ছাড়া বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা অঞ্চলে। ভারতীয় পণ্ডিতরা বলছেন, বাংলাদেশ অকার্যকর রাষ্ট্র। সুতরাং ভারতের জন্য হুমকি। তাই ভারতের উচিত বাংলাদেশকে দখল করে নেয়া। ফলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ বিশাল হুমকির মুখে। এত কিছু সত্ত্বেও সরকার সম্পূর্ণ নির্বিকার।
মেয়াদোত্তীর্ণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর কাছে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা জানতে চাই, বাংলাদেশ কি সত্যি সত্যি আরো দুর্বল ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে? বাংলাদেশ কি সত্যি সত্যি মার্কিন ও ভারতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে? যদি তা না হয়ে থাকে, যদি দেশের প্রতি সামান্য ভালোবাসাও থেকে থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে এই চক্রান্তের জবাব দিন। বলুন, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত বাংলাদেশ সম্পর্কিত রিপোর্টটি সত্য নয়। এটা বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ। তা না হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে আরো দুর্বল, আরো অকার্যকর করার দায়ভার তো আপনাদের ওপরই বর্তাবে। কারণ মার্কিন ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশকে আপনারাই আরো দুর্বল ও আরো অকার্যকর করে তুলেছেন। ভবিষ্যতে সে দায় মোচন খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না।
তবে এসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র আমরা নস্যাৎ করে দিতে পারি জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য দিয়ে। সে ঐক্য যাতে না হয়, তার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, যারা রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, তারাই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে সে ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



