দারুন লেখাটি পড়ুন
মার্কিন বিশ্ব আধিপত্যবাদের সমাধির সূচনা জর্জিয়া থেকে
সিরাজুর রহমান
পশ্চিম ইউরোপে একের পর এক দেশ দখল করে ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ানের দম্ভ বেড়ে গিয়েছিলো। পাঁচ লাখ সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ১৮২১ সালের জুন মাসে তিনি গিয়েছিলেন রাশিয়া জয় করতে। নেপোলিয়ানের দর্পচূর্ণ হয়েছিলো সেখানে। প্রথমবারের মতো তাঁর বিরাট পরাজয় ঘটে। রাশিয়া থেকে তিনি যখন পিছু হঠতে শুরম্ন করেন তখন তাঁর বিশাল বাহিনীর একটা বড়ো অংশ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলো। এডলফ হিটলারের ইউরোপ বিজয় ছিলো নেপোলিয়ানের বিজয়ের চাইতেও দ্রম্নত- বলতে গেলে ঝড়ের গতিতে। তিন মিলিয়ন (৩০ লাখ) সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী তিনি পাঠিয়েছিলেন রাশিয়া জয় করতে। প্রায় ঝড়ের গতিতেই নাৎসি বাহিনী একের পর এক সোভিয়েটভুক্ত দেশ ও অঞ্চল দখল করে। রাশিয়ারও বিস্তীর্ণ এলাকা তারা দখল করে নিয়েছিলো। কিন্তু রম্নশ নর-নারী সবিক্রমে তাদের বাধা দেয় লেনিনগ্রাডে। রাশিয়ার প্রচণ্ড শীত আর বরফ নাৎসি বাহিনীকে কাবু করে ফেলেছিলো। তার ওপর লাখ লাখ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে সোভিয়েট বাহিনী বারম্বার সবিক্রমে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চার বছর পরে জার্মান বাহিনী যখন রম্নশ রণাঙ্গন ছেড়ে আসে তখন তাদের অবস্থাও নেপোলিয়ানের বাহিনীর মতোই বিধ্বস্ত, ছত্রখান। পশ্চিম রণাঙ্গনেও হিটলারের পরাজয়ের সূচনা সেখান থেকে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডবস্নু বুশ ও তাঁর নিওকনরা নিশ্চয়ই থার্ড টাইম লাকি প্রবচনটায় বিশ্বাস করেছিলেন। রাশিয়ার হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি সাবেক সোভিয়েটের ক্ষুদ্র অঙ্গরাজ্য জর্জিয়াকে মস্কোর বিরম্নদ্ধে লেলিয়ে দেবার সময় তারা নেপোলিয়ান আর হিটলারের দুর্দৈবের ইতিহাস উপেড়্গা করেছিলেন। সেখানে ওয়াশিংটনের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়। নিওকনরা এবং তাদের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ মার্কিন আধিপত্য-ভিত্তিক যে বিশ্ববিধানের নীলনকশা তৈরি করেছিলেন মস্কোর দোরগোড়ায় তারও পরাজয়ের সূচনা হয়েছে বলা চলে। সোভিয়েতের পতন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমী মিত্রদের সামরিক প্রাধান্যের কারণে হয়নি, যদিও আসল কারণটা তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো। পশ্চিমী অস্ত্রের মোকাবেলার জন্যে সোভিয়েট ইউনিয়নকেও অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছিলো। তাতে তার অর্থনীতি এবং সোভিয়েট জনতার জীবনযাত্রার মান উপেড়্গিত হয়েছে। বিবিসি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আর বছরের পর বছর সোভিয়েট জনতার কানে পশ্চিমের জীবনযাত্রার উঁচু মান এবং বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা তুলে ধরেছে। সোভিয়েট জনতার ড়্গোভ আর অসন্তোষ তাতে ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিলো। সোভিয়েট পদ্ধতির অবসানের সূচনা ভেতর থেকেই হয়েছিলো এবং প্রেসিডেন্ট মিখাইল গরবাচেভ সচেতনভাবে সে সূচনায় অগ্রণী ভূমিকা নেন। সোভিয়েট ইউনিয়ন বলতে গেলে হেমন্তের ঝরা পাতার মতোই খসে পড়েছিলো। অঙ্গ প্রজাতন্ত্রগুলো একে একে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। অবশিষ্ট রম্নশ ফেডারেশনও আর কমিউনিজম কিম্বা সমাজতন্ত্রকে আঁকড়ে থাকেনি। অস্তিত্বের প্রয়োজনে সে ধনতন্ত্র এবং মুক্ত অর্থনীতিকে আলিঙ্গন করে। হয়তো সে প্রকৃতই আশা করেছিলো পশ্চিমী বিশ্ব সত্যিকারের আন্তরিকতা দিয়েই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে, তাকে বিশ্ব সমাজে বরণ করে নেবে। দুর্ভাগ্যবশত সেটা হয়নি। জর্জ বুশ ও তাঁর নিওকনরা ড়্গমতায় এসে এক বিশ্ব আধিপত্যের দর্শন গ্রহণ করেন। এ দর্শনের মূল কথা ছিলো, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী দেশ ও সমৃদ্ধতম অর্থনীতি সেহেতু অন্য সকল দেশকে তার আধিপত্য বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নিতে হবে। সে হিসাব থেকে রাশিয়াকেও বাদ দেওয়া হয়নি। রাশিয়ার বিরম্নদ্ধে বূহ রচনা প্রাক্তন সোভিয়েটের অঙ্গ দেশগুলোর অধিকাংশই ১৯৯১ সাল নাগাদ পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নিওকনদের রণকৌশল অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এ দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, ধীরে ধীরে তাদের মস্কোর বিরম্নদ্ধে একটা প্রতিপত্তির বেষ্টনীতে পরিণত করা হয়। সবচাইতে বড়ো উস্কানিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় গত বছর, যখন ওয়াশিংটন রম্নশ সীমানার কাছাকাছি চেক প্রজাতন্ত্র আর পোল্যান্ডে ড়্গেপণাস্ত্রের ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। রম্নশ সিংহ আবার কবে জেগে উঠবে সে আশঙ্কায় নতুন স্বাধীন দেশগুলো স্বেচ্ছায় মার্কিন আশ্রয় আর মার্কিন বন্ধুত্ব গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় মার্কিন বৈদেশিক গোয়েন্দা বাহিনী সিআইএ-র সক্রিয় ভূমিকা ছিলো। বিপুল অর্থ ব্যয় করে তারা এ দেশগুলোতে ওয়াশিংটনপন্থী গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ইউক্রেন, জর্জিয়া প্রভৃতি দেশের তথাকথিত গোলাপী বিপস্নব এ প্রক্রিয়ার কিছু ফসল মাত্র। ইতিমধ্যে প্রায় অলড়্গ্যে বিশ্ব পরিস্থিতিতে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটতে থাকে। নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে ৯/১১ সন্ত্রাসের জের ধরে আল কায়েদা নেতাদের শায়েস্তা আর তালেবানদের ধ্বংস করার অছিলায় যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন গণবিধ্বংসী (জৈবিক ও রাসায়নিক) অস্ত্রের বিরাট মওজুদ গড়ে তুলেছেন, এই মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে ওয়াশিংটন ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাক আক্রমণ করে। বিশেষ করে ইরাক আক্রমণের বেলায় বিশ্ব জনমত এবং অধিকাংশ রাষ্ট্র সোচ্চার বিরোধিতা জানিয়েছিলো। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ওয়াশিংটন নানা রকম ভুয়া প্রমাণ পেশ করে। বুশের যুদ্ধবাজ মিত্র ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টোনি বেস্নয়ার গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য বিকৃত করে পার্লামেন্টে পেশ করেন এবং দাবি করেন যে সাদ্দামের গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্দেশদানের ৪৫ মিনিটের মধ্যেই সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির বিরম্নদ্ধে ব্যবহারের উপযোগী অবস্থায় আছে। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদ ইরাক আক্রমণের অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। শেষে জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনকে পদদলিত করে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন ইরাক আক্রমণ করে। পরবর্তীকালে প্রমাণ হয়ে গেছে, কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র ইরাকে ছিলো না, ইসরাইলের আধিপত্যের প্রতি সাদ্দামের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ দূর করা এবং ইরাকের বিশাল খনিজ তেলের সম্পদ কুড়্গিগত করাই ওয়াশিংটনের মূল লড়্গ্য ছিলো। ড়্গমতার পট-পরিবর্তন আফগানিস্তানের যুদ্ধ এখনো চলছে। এ কথা বলা সঙ্গত হবে যে পরাজিত হবার বদলে তালেবানদের প্রতিরোধ আরো জোরদার হয়েছে। সাড়ে পাঁচ বছর পরেও ইরাকে শান্তি স্থাপন সম্ভব হয়নি। প্রায় ১২ লাখ মানুষ মারা গেছে ইরাকে, বিধ্বস্ত দেশটির কোন লড়্গণীয় পুনর্গঠন এখনো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সমরশক্তির বিরাট অংশ এ দুটি যুদ্ধে নিয়োজিত আছে। মার্কিন অর্থনীতিতে তার বিরাট প্রভাব পড়েছে। তার ওপর যুদ্ধের কারণে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান উত্তেজনার কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। বর্তমানে ব্যারেল প্রতি মূল্য ইরাক আক্রমণের সময়ের ৬/৭ গুণ বেশি। সম্মিলিত এসব কারণে মার্কিন অর্থনীতি মন্দায় পড়েছে, তার প্রতিক্রিয়ায় গোটা পশ্চিমী ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির এখন নাভিশ্বাস উঠেছে বলা চলে। রাশিয়ায় কিন্তু ঘটেছে উল্টো ব্যাপার। খনিজ তেল আর খনিজ গ্যাসের বিশাল বিশাল উৎস আবিষ্কার ও আহরণ শুরম্ন হয়েছে। বিশ্ব বাজারের চড়া দামের পুরো সুযোগ নিয়েছে রাশিয়া। ফলে তার পেট্রো-ডলারের মওজুদ আকাশচুম্বী। একই সঙ্গে বেড়েছে তার আত্মবিশ্বাস। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব-আধিপত্যবাদ আর তার গ্রহণযোগ্য নয়। এ কথাটা গত বছর প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন রম্নশ প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুতিন মিউনিকের এক সভায়। পুতিন বলেন, তিনি আর মার্কিন অধি-শক্তিত্ব সহ্য করতে রাজি নন। তাৎপর্যপূর্ণ এই যে মার্কিন প্রতিরড়্গামন্ত্রী রবার্ট গেটস এবং রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন সে সভায় উপস্থিত ছিলেন। পুতিন বলেনঃ এক মেরম্নর পৃথিবীটা কি বস্তু? এতে একই ধরনের পরিস্থিতি, ড়্গমতা ও কতৃত্বের একক কেন্দ্র, শক্তির একমাত্র কেন্দ্র এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও একমাত্র কেন্দ্রের কথাই ধরে নেয়া হয়েছে। সেটা হচ্ছে এমন একটা বিশ্ব যেখানে মাত্র একজন প্রভু এবং একমাত্র সার্বভৌম শক্তি থাকবে। সেটা ধ্বংসকর, অগ্রহণযোগ্য এবং অসম্ভব। পদলেহী সাকাশভিলি পুতিনের সে হুঁশিয়ারির প্রথম বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে জর্জিয়ায়। সোভিয়েট আমলের সময় থেকে জর্জিয়ার দুটো প্রদেশ দড়্গিণ ওসেটিয়া আর আবখাজিয়া সার্বভৌমত্ব ভোগ করে এসেছে। ১৯৯১ সালে জর্জিয়া যখন রাশিয়ার বিরম্নদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এ দুটি অঞ্চলও তখন জর্জিয়ার শাসন থেকে নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করে। তখন থেকে তাদের যোগাযোগ রাশিয়ার সঙ্গে। তারা রম্নশ মুদ্রা রম্নবল ব্যবহার করে, তাদের অধিকাংশ নাগরিক রম্নশ পাসপোর্টধারী। জর্জিয়ার যুক্তরাষ্ট্রে শিড়্গাপ্রাপ্ত এবং সিআইএর সাহায্যে ড়্গমতাপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মিখাইল সাকাশভিলি মার্কিন ও পশ্চিমী সাহায্যে বিদ্রোহী অঞ্চল দুটো ফিরে পাবার আশা পোষণ করছিলেন। সে লড়্গ্যে যেন রাশিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখানোর মতো করে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে অতিমাত্রিক মাখামাখি শুরম্ন করেন, উত্তর অতলান্তিক চুক্তি সংস্থা ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হবার জন্যে চেষ্টা-তদ্বির শুরম্ন করেন। ওয়াশিংটনও রাশিয়ার বিরম্নদ্ধে অবরোধ আরো কঠোর করার আশায় জর্জিয়াকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে, জর্জিয়ান সেনাবাহিনীকে প্রশিড়্গণ দেয়। সাকাশভিলি আশা করেছিলেন রাশিয়ার সঙ্গে জর্জিয়ার সশস্ত্র সংঘাত দেখা দিলে ওয়াশিংটন ও ন্যাটো তাঁর পড়্গে সামরিক হস্তড়্গেপ করবে। দড়্গিণ ওসেটিয়া আর আবখাজিয়ায় গত ১৫ বছর ধরে মিশ্র রম্নশ ও জর্জিয়ান শান্তিরড়্গী বাহিনী নিয়োজিত ছিলো। কিন্তু ৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে জর্জ বুশ ও মিঃ পুতিনসহ বিশ্ব নেতাদের অনেকেই যখন বেইজিংয়ে ২৯তম অলিম্পিকের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন এবং বিশ্ব মিডিয়ার মনোযোগও ছিলো সেদিকে, তখন রাতের আঁধারে জর্জিয়ার সেনাবাহিনী দড়্গিণ ওসেটিয়া আক্রমণ করে। তারা রম্নশ শান্তিরড়্গী সেনাদের হত্যা করে; কামান আর মর্টারের গোলায় রাজধানী তাসখিনভালি প্রায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়; রম্নশ দাবি অনুযায়ী দু হাজারেরও বেশি লোক তাতে মারা যায়। হাজারে হাজারে মানুষ পালিয়ে রম্নশ প্রদেশ উত্তর ওসেটিয়ায় চলে যায়। আশাহত সাকাশভিলি ভস্নাদিমির পুতিন বর্তমানে রম্নশ প্রধানমন্ত্রী। তিনি সত্বর বেইজিং থেকে ফিরে এলেন। দু দিন না যেতেই রম্নশ ট্যাঙ্ক বহর রম্নশ নাগরিকদের রড়্গার্থে দড়্গিণ ওসেটিয়ায় প্রবেশ করে। এবারে পালিয়ে যাবার পালা ছিলো শান্তিরড়্গী বাহিনীর জর্জিয়ান সৈন্যদের এবং দড়্গিণ ওসেটিয়ার সংখ্যালঘু জর্জিয়ান বেসামরিক ব্যক্তিদের। তাদের ধাওয়া করে রম্নশ ট্যাংক বহর জর্জিয়ার মূল ভূমিতে প্রবেশ করে। জর্জিয়ান বাহিনী মোটামুটি প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। রম্নশ বাহিনী তাদের পরিত্যক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারম্নদ হয় দখল করে, নয়তো নষ্ট করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আধুনিক সামরিক ঘাঁটি এবং কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী পোটি বন্দরটিও বিধ্বস্ত করে দেয়, জর্জিয়ার যুদ্ধ জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেয়া হয়। সাকাশভিলির আশা অনুযায়ী ওয়াশিংটন কিম্বা ন্যাটো রম্নশ পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে সৈন্য পাঠায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ও ন্যাটোর অধিকাংশ দেশের সম্মতি ছিলো না। ন্যাটো কিছু পরিমাণ সৈন্য আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে বটে, কিন্তু আর বেশি সৈন্য পাঠাতে বৃটেন ছাড়া অন্য দেশগুলো ইতস্তত করছে। জর্জ বুশের সামরিক অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয়তায় তারা শঙ্কিত। ইরাক দখলের সাড়ে পাঁচ বছর পরেও প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন সৈন্য সেখানে শান্তি রড়্গার কাজে নিযুক্ত আছে। আফগানিস্তানে মোতায়েন আছে আরো পঞ্চাশ হাজারের বেশি। তাছাড়া বুশ বার বার ইরান আক্রমণের হুমকি দিচ্ছেন তেহরানকে তাদের পারমাণবিক গবেষণা বন্ধ করতে রাজি করানোর জন্যে। সে হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে বড়োসড়ো একটা বাহিনী রিজার্ভ রাখা দরকার। অর্থাৎ রাশিয়ার মোকাবেলা করতে হলে যে বিশাল বাহিনীর প্রয়োজন সে বাহিনী আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তাছাড়া ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে মার্কিন কোষাগার প্রায় নিঃশেষিত। এ মুহূর্তে আর বড়ো আকারের কোনো যুদ্ধে নামার সামর্থ ওয়াশিংটনের নেই। মিখাইল সাকাশভিলির বিধ্বস্ত সেনাবাহিনী আর তাঁর আহত অনুভূতিতে মলম লাগানোর চেষ্টা ওয়াশিংটন তাই করতে চায় কূটনৈতিকভাবে। জর্জ বুশ তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসকে পাঠিয়েছিলেন জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসিতে। বুশের চাপে ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি তিবলিসি আর মস্কোর মধ্যে ছুটাছুটি করেছেন। জার্মান চ্যান্সেলার অ্যাঙ্গেলা মেরকেলও গিয়েছিলেন। তারা সকলেই মস্কোকে তার সৈন্য সরিয়ে নিতে এবং আবখাজিয়া এবং দড়্গিণ ওসেটিয়ায় জর্জিয়ার সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু মনে মনে তারা সকলেই জানেন যে শেষোক্ত অনুরোধটি মেনে নিতে, অর্থাৎ প্রদেশ দুটি সাকাশভিলির হাতে তুলে দিতে দুই প্রদেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ কিম্বা মস্কোর সরকার কিছুতেই রাজি হবে না। জর্জ বুশ প্রতিদিনই দু একবার করে মস্কোকে হুমকি দিচ্ছেন। হয় সার্বভৌম জর্জিয়া থেকে সরে যাও, নইলে । নইলে যে কি হবে সে কথাটা কিন্তু তিনি খুলে বলছেন না। তবে তাঁর প্রশাসনের কাজে-কর্মে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক সমাজের নামে ইরানের বিরম্নদ্ধে যে ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যেভাবে একের পর এক অবরোধ চালানো হচ্ছে, সে ব্যর্থ টেকনিকই জর্জ বুশ ব্যবহার করতে চাইছেন রাশিয়ার বিরম্নদ্ধে। গত্যন্তর নেই কিন্তু বুশের জন্যে সমস্যা বিস্তর। আন্তর্জাতিক সমাজ বলতে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাঁর মিত্র দেশগুলোর কথাই বলে থাকেন, কেননা বিশ্বের অধিকাংশ দেশই ইরাকে, আফগানিস্তানে এবং ইরানের ব্যাপারে বুশের নীতিকে সমর্থন করে না। ইউরোপীয় মিত্ররা জানে রাশিয়া ইরান নয়, অনেক বেশি শক্তিশালী দেশ। নেপোলিয়ান এবং হিটলারের বিরম্নদ্ধে যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ রম্নশরা করেছে সে ধরনের আরেকটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করার মতো সম্পদ তার আছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশই আর একটি বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। আর একটা বিবেচনা আছে মহাদেশীয় ইউরোপের দেশগুলোর। তাদের রান্না করার আর ঘরবাড়ি গরম রাখার গ্যাস আসে মূলত রাশিয়া থেকে। সুতরাং তারা হয়তো জর্জ বুশের ক্রোধ প্রশমিত করার জন্যে কিছু পরিমাণ কূটনৈতিক সমর্থন তাঁকে দেবে কিন্তু রাশিয়ার বিরম্নদ্ধে যুদ্ধ করতে যাবে না। একটা ব্যাপার এখানে লড়্গণীয়। বৃটেন ও উত্তর ইউরোপের কয়েকটা দেশ জর্জিয়ার ব্যাপারে জর্জ বুশের সঙ্গে অভিন্ন মত পোষণ করলেও পশ্চিম ইউরোপের দুটো বড়ো দেশ ফ্রান্স ও জার্মানি মোটামুটি নিরপেড়্গ ভূমিকা নিয়েছে, ইতালী তো বলেই দিয়েছে যে সে মস্কোর অবস্থানকেই সমর্থন করে। বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে হলে জর্জ বুশ ও তাঁর নিওকনদের বিশ্ব আধিপত্যবাদকে বিসর্জন দিতেই হবে। বিশ্ব বিধান সম্বন্ধে সবগুলো দেশকে, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নতুন করে ভেবে দেখতে হবে। মস্কোকে শত্রম্নর মতো দরোজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা এখন আর সম্ভব কিম্বা নিরাপদ নয়। তাকে ভেতরে ডেকে আনতে হবে, বন্ধুত্ব আর সহযোগিতার কথা বলতে হবে তার সঙ্গে। আর কোনো গত্যন্তর যুক্তরাষ্ট্র কিম্বা ইউরোপের নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


