দারুন এবং প্রানবন্ত লেখাটি পড়ুন
জাতির পিতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা: মিনার রশীদ
এবারের অলিম্পিকে এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ অলিম্পিয়ান নির্বাচিত হয়েছেন আমেরিকান সাঁতারু মাইকেল ফেল্প্স। সে খবর সবার জানা। ক্ষণিকের মধ্যেই তিনি যেন ঝলসে উঠেছেন। তাকে নিয়ে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে গেছে। সাথে সাথে তাঁর পরিবারের অন্যরাও মিডিয়ার সামনে চলে এসেছেন মা, বোন, সবাই। সব নিকটজনকে দেখে সবার মনে প্রশ্ন, তার পিতা কোথায়? অবশেষে তাকেও খুঁজে পাওয়া গেল। তবে তিনি বায়োলোজিক্যাল ফাদার বা জন্মদাতা মাত্র পিতা নন। মেরিল্যান্ডের বাড়ি থেকে এই জন্মদাতা প্রতিটি মুহূর্তে তারই রক্তের উত্তরাধিকারী ফেল্প্সের সফলতা কামনা করলেও পিতা হিসেবে বেইজিংয়ে পুলের পাশে দাঁড়াতে পারেননি। কারণটি স্পষ্ট। জন্ম দেয়ার বায়োলজিক্যাল দায়িত্বটি পালন করলেও অন্য অনেক আমেরিকানের মতো পিতার দায়িত্ব তিনি পালন করেননি। আমাদের দেশে জন্মদাতা ও পিতা প্রায় সময়ে একই ব্যক্তি হন বলে আমরা এ দুয়ের পার্থক্যটি উপলব্ধি করতে পারি না। ফেল্প্সের এ ঘটনায় তা বোঝা সহজ হবে।
মাইকেল ফেল্প্স নন, আমার এই আলোচনার মূল নায়ক বাংলাদেশেরই এক মহান সন্তান, ইতিহাসের এক মহানায়ক। আগস্ট মাসটিতে তাঁকে নিয়েই আমরা মেতে থাকি। ব্যক্তিজীবনের মতো একটা জাতির জীবনেও জন্মদাতা ও পিতার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হতে পারে। জুনিয়র ফেল্প্স তার জন্মদাতাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। তবে তাকে পিতা হিসেবে মানতে আপত্তি তুলতেই পারেন। এ জন্য আমরা তাকে মন্দ বলতে পারব না। ফেল্প্সের এই উদাহরণ আমাদের তর্কিত একটা কঠিন বিষয় বুঝতে সহায়ক হতে পারে। আমরা উদার হলে এই তর্কের একটা সমাধানও বেরিয়ে আসতে পারে। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্থপতি (অন্য পরিভাষায় জন্মদাতা), নাকি এ জাতির পিতা!
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্থপতি কে? প্রশ্নটি করলে একমাত্র কিছু পাগল ও সম-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিকৃত কিছু মানুষ ছাড়া সবাই বলবেন, শেখ মুজিব। এখানে যারা একটু শ্রদ্ধাসহকারে বলতে চান তারা বলবেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখন যদি বলা হয়, বাংলাদেশ বা বাঙালি জাতির পিতা কে? তখন কিছু মানুষ অতি আগ্রহে সাড়া দিলেও অনেকেই চুপ মেরে যাবেন।
এই চুপ মেরে যাওয়ার মধ্যে স্বাভাবিক জড়তা ছাড়াও ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক কারণ বর্ণনার আগে অন্যান্য কারণ ব্যাখ্যা করলে ব্যাপারটি আরো সহজে বোঝা যাবে। এই যুক্তিগুলো দেখানোর উদ্দেশ্য হলো, রাজাকাররা (অতি ব্যবহারে শব্দটি এখন আওয়ামী-বিরোধিতার নামান্তর হয়ে পড়েছে) ছাড়াও আরো অসংখ্য ও অগণিত মানুষ জাতির পিতা শব্দ ব্যবহারের যে বিরোধিতা করেন, তা জানিয়ে দেয়া।
সাধারণত জাতি তাদের প্রিয় কোনো সন্তানকে একটি প্রিয় নামেই ডাকে। বিশেষণের আধিক্যে ভালোবাসাকে মেদবহুল করে ফেলতে চায় না। আমরা এখানে ব্যতিক্রম। শেখ মুজিবের জন্য একটি প্রিয় নাম আছে। তা হলো বঙ্গবন্ধু অর্থাৎ বাংলার মানুষের বন্ধু। আবার বন্ধুর সাথে পিতা সম্বোধনের একটা অসামঞ্জস্য আমাদের সমাজে রয়েছে। পিতা তো দূরের কথা, পিতৃস্থানীয় কাউকে বন্ধু হিসেবে ডাক দিলে এই মশকারিকে ভালো চোখে দেখা হয় না। এটা এমন সমাজ না যে, নিজের বাপকেও নাম ধরে ডাকা যাবে। এই টেকনিক্যাল কারণে বঙ্গবন্ধুকে অনেকে বঙ্গপিতা ডাকতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। সামাজিক কারণে কাউকে ভাই ডেকে পরে যখন বৈবাহিক কারণে শ্বশুর বা বাবা ডাকতে হয়, ব্যাপারটির টেকনিক্যাল জটিলতা সেই পর্যায়ের।
পিতা শব্দটির স্পর্শকাতরতাও ব্যক্তিভেদে ভিন্নতর হয়। অনেকেই মায়ের কবুল পড়া মানুষটিকে ছাড়া বা মায়ের সাথে সাতপাকে ঘোরা লোকটিকে ছাড়া অন্য কারো জন্য শব্দটি ব্যবহার করতে নারাজ। এই পর্যায়ের মানুষ নিজের শ্বশুরকেও পারতপক্ষে আব্বা বা বাবা বলতে চান না। আবার কারো জন্য এই সম্বোধন একেবারেই ডালভাত। ফরজ আর ওয়াজিব (শ্বশুর) পর্যায়ের পিতা ছাড়াও তারা যত্রতত্র নফল পিতা বা ধর্মপিতা বানিয়ে নেন। কাজেই এক জনের সাবলীলতাকে অন্য জনের জড়তার ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।
আরেকটি হলো ধর্মীয় কারণ। ধার্মিক মুসলিমদের একটি অংশ নিজের পিতার পরে জাতির পিতা হিসেবে আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিম (আঃ)কেই মনে করেন। এখানে অন্য কাউকে মেনে নিতে পারেন না।
তার পরও বলতে হয়, কাউকে জাতির পিতা বা এমন শ্রদ্ধার আসনে বসানো যার যার মনের ব্যাপার। যেসব দেশের জনগণ এটা মেনে নিয়েছে তারা তা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেছে। কেউ যাকে বাংলাদেশের স্থপতি মনে করে, অন্য কেউ তাকেই জাতির পিতা হিসেবে ভাবতে পারে। বিষয়টি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের ব্যাপার। তাই এক জনের ধারণা অন্য জনের ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না। আমাদের দেশে এক ধরনের মানসিক রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন মনে করা যে বিশেষণ লাগিয়ে উনি কথা বলছেন আমাকেও তা-ই করতে হবে। অথচ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাত্রায় ও ভঙ্গিতে মানুষে মানুষে তারতম্য হতেই পারে। এর সীমা ও পরিমিতিবোধ নিয়ে ভিন্ন জনে ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। প্রিয়জনকে অভ্যর্থনা জানাতে সামান্য হাসি, মৃদু চাহনি বা এজাতীয় সামান্য বডি ল্যাঙ্গুয়েজেই অনেকের কাজ সেরে যায়। আবার কোনো কোনো সমাজে বা কারো কারো জন্য রীতিমতো পাবলিক ডিসপ্লে অব এফেকশনের আশ্রয় নিতে হয়। এখন এক জনের আদর কিংবা শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পদ্ধতি যদি অন্য জনের ওপর আইন করে চাপিয়ে দেয়া হয়, তবে বিড়ম্বনা সহজেই অনুমেয়।
এখানে আমাদের আরো কিছু বিষয় বুঝতে হবে। গান্ধী ভারতের জাতির পিতা। তেমনি জিন্নাহ পাকিস্তানের। কাজেই বাংলাদেশেরও একজন জাতির পিতা থাকা দরকার। এ ধারণা থেকেই বিষয়টি সামনে এসেছে। ভারতের জন্মদাতা করম চাঁদ গান্ধী সে দেশের স্বাধীনতার পরে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। ফলে একটা জাতির পিতা হওয়া এবং সে হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে টিকে থাকা তার জন্য সহজ হয়েছে। জিন্নাহ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করলেও বছরখানেক সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় তার পিতৃত্বও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক পাশ্চাত্যের অ্যালার্জি তুল্য খেলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস করায় পুরো পশ্চিমা বিশ্ব ও তার মিডিয়া এই বিশেষ পিতৃত্বকে আগলে রেখেছে। তাদের মহানুভবতায় সে দেশের সেনাবাহিনী তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। তাতে তারা শুধু এই পিতৃত্বই রক্ষা করেনি। তা করতে গিয়ে সে দেশের গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়েছে। আজ আতাতুর্কের পিতৃত্ব এবং সে দেশের গণতন্ত্র মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সেনাবাহিনী পিতাকে জড়িয়ে ধরেছে, আর জনগণ পিতার ব্যাপারে নীরব থেকে গণতন্ত্রকে।
এর বাইরে অনেক জাতি আছে যারা এরূপ শক্তিশালী ভাবধারার কোনো পিতা ছাড়াই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ, তারা একেক জন নেতা পেয়েছে যারা তাদের জাতির ভাগ্য বদলে দিয়েছে। আজ উঠতে-বসতে জনগণ সেই নেতার কৃতিত্ব দেখতে পায়। তাদের রাস্তাঘাটে, বসতবাড়িতে, কর্মস্থলে, দোকানপাটে সর্বত্র সেই নেতার ছোঁয়া টের পায়। কাজেই জোর করে তাদেরকে সে দেশের জনগণের মনে গেঁথে দিতে হয় না। এমনই এক নেতা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ। মালয়েশিয়ার মাহাথির মুহাম্মদ। লি কুয়ান ইউ আত্মজীবনীতে কিছু কথা বলেছেন যা আমাদের জন্য এ ক্ষেত্রে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
১৯৭০ সালের প্রথম দিকে একবার তিনি জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে যান। সেখানে দেখতে পান, অনেক দেশের জাতীয় বিমান সংস্থার প্লেন তাদের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের বহন করে এনে অযথা দিনের পর দিন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। অথচ তিনি নিজে গিয়েছেন একটি যাত্রীবাহী বিমানে করে। তখনো তার এই ছোট্ট দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃহৎ ভারতের চেয়েও বেশি ছিল। তাকে নামিয়ে দিয়ে তাদের দেশের প্লেন অন্য যাত্রী বহন করে আয় করছে। সেখানে অনেক অনুন্নত দেশের প্লেনের সাথে বাংলাদেশের বিমানটিও ছিল ঠায় দাঁড়িয়ে। সে বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করতে ভোলেননি। কাজেই সিঙ্গাপুরের মতো দেশ উন্নতি করবে নাকি আমাদের মতো দেশ তা সহজেই অনুমেয়। লি কুয়ান ইউ একবার পাঁচ মিনিট দেরি করে অফিসে যান। এ জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান এবং সে দিনের বেতন থেকে এ সময়টুকুর পাওনা কেটে রাখার নির্দেশ দেন।
অথচ আমাদের এখানে জাতির পিতা বলা এবং না-বলা নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক ইগোর জন্ম দেয়া হয়েছে। আবার এক সময়ে যারা জাতির পিতা শব্দটিকে বিকৃত করে জুতার ফিতা বলে টিটকারী করত, তারা অনেকেই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে উচ্চারণটিও ঠিক করে নিয়েছে। কাজেই এই বিরোধিতার একটা রাজনৈতিক রঙ এবং তার পেছনে তদানুরূপ দর্শন রয়েছে।
সম্মান কারো কাছ থেকে জোর করে আদায় করা যায় না। জাতির পিতা শব্দটিতে এমন কিছু রয়েছে তা দিতে অনেকেই রাজি নয়। কারণ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকে জাতির পিতা বানিয়ে এর একটা স্থায়ী ফায়দা নিতে চায় দলটি। তাদের হাব-ভাব ও আচরণে তা স্পষ্ট। কাজেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো এই কৌশলগত সুযোগটি দিতে নারাজ। এর বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধিতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে যতটুকু না সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলে ধরেছে, তার চেয়েও বেশি পার্টি অ্যাসেট হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তারপরও আওয়ামী লীগ কেন এটি জোর করে দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তা বোধগম্য নয়। কেউ তাকে জাতির পিতা হিসেবে মানলে যেমন আপত্তি নেই, তেমনি এমন ভাবে না মানলেও দূষণীয় হতে পারে না। ভক্তের অতি বন্দনা কিংবা হিংসুকের ঘৃণা তাকে ইতিহাস নির্ধারিত অবস্থান থেকে নামাতে কিংবা তুলতে পারবে না। ১/১১-এর পর এর মূল হোতাদের কেউ কেউ যখন জাতির পিতা শব্দটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসেন তখন (ওপরে বর্ণিত তিনটি কারণে) তাকে জাতির পিতা বলতে নারাজ শ্রেণীটি প্রমাদ গোনে, এবার তাহলে পিতা না ডেকে উপায় থাকবে না। তাতে অন্য গ্রুপটি অত্যন্ত আহ্লাদিত হয়ে পড়ে। ভাবখানা এমন ছিল যে, তারা এরশাদের মার্শাল ল-এর মতো এবারো আনহ্যাপি হতো না। কাজেই সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়েছে যে, জাতির পিতা ভাবধারাটিকে এক্সপ্লয়েট কিংবা এটিকে এক ধরনের ঘুষ হিসেবে ব্যবহার করে এবং একে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের ধারাটিকে অন্য দিকে প্রবাহিত করে ফেলা হয় কি না। সন্দেহ দেখা দেয়, তুরস্কের মডেলটিই হুবহু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় কি না। এই সন্দেহ থেকে এখনো আমরা মুক্ত হতে পারিনি।
সন্দেহ নেই, শেখ মুজিবকে এ দেশের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বঙ্গবন্ধু হিসেবে মেনে নিয়েছিল। যদিও দেশের মানুষের সাথে বন্ধুত্বের এই সম্পর্ক তিনি আজীবন ধরে রাখতে পারেননি। জনগণের এই বন্ধুটিই রাতারাতি তাদের শাসক হয়ে পড়লেন। রাবার স্ট্যাম্প একটি সংসদ দিয়ে আঙুলের ইশারায় দ্রুততম সময়ে সংবিধান সংশোধন করে সারা জীবনের জন্য প্রেসিডেন্ট হয়ে বসলেন। মাত্র এক ঘণ্টা সময়ের মাঝেই তিনি সংবিধানের মৌলিক চরিত্রটি বদলে ফেলেন। জনগণ কাতর চোখে দেখল, তাদের প্রিয় বন্ধিট এমন শক্তিশালী প্রভু (প্রেসিডেন্ট) হয়ে পড়েছেন যে, তাকে সরাতে গেলেও সংসদের তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের সমর্থন দরকার! রাবার স্ট্যাম্প সংসদ থেকে তিন-চতুর্থাংশ সদস্য জোগাড় করা কত কঠিন তা সহজেই অনুমেয়। এর সহজ অর্থ হলো কাজটি অসম্ভব। অন্য দিকে ভাইস প্রেসিডেন্টও নিয়োগ দেবেন প্রেসিডেন্ট। ফলে কেমন অবিডিয়েন্ট সার্ভেন্টটি সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হবেন তা-ও অনুমান করতে কষ্ট হয় না। মন্ত্রীরা দায়ী থাকবেন প্রেসিডেন্টের কাছে। সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণ পর্যন্ত এই শক্তিশালী প্রেসিডেন্টের হাতে। সব রাজনৈতিক দল বন্ধ ঘোষণা করে একমাত্র একটি দল করা হয় এবং প্রজাতন্ত্রের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সেই দলে যোগদান বাধ্যতামূলক ছিল। চারটি সংবাদপত্র এই পরাক্রমশালী সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকি সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জানি না, কোনো গণতন্ত্রমনা মানুষ এই সিস্টেমের সপক্ষে সাফাই গাইতে পারেন কি না।
কাজেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের স্থপতি (অন্য পরিভাষায় জন্মদাতা) থেকে জাতির পিতায় উন্নীত করতে হলে এজাতীয় জটিল অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব দেয়া জরুরি হয়ে পড়ে। অনেকে বলতে চান, তিনি সেই সুযোগ পাননি। কিন্তু জনগণ সেই প্রভাতকাল দেখতে পেয়েছে। ফলে দিনটি কেমন হতো তা অনুমান করে নিয়েছে। এর থেকে ভিন্ন চিন্তা থাকতে পারে। ফলে এ ক্ষেত্রে জনমত স্পষ্টভাবে বিভক্ত। বিভক্ত জনমত দিয়ে কাউকে জাতির পিতা ঘোষণা করা যায় না। তার পরও যারা তাকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত বাংলাদেশের স্থপতি উপাধিটি বাদ দিয়ে জাতির পিতা অভিধায় নিজেরা সম্বোধন করতে এবং অপরকে তা করাতে বদ্ধপরিকর, তারা এই দুটি ভাবধারার মধ্যে পার্থক্যটি বুঝতে পারেন না। আগেই বলেছি, জন্মদানের পরও সন্তানের প্রতি কিছু কর্তব্য থাকে যা কাউকে জন্মদাতা থেকে পিতার মানে উন্নীত করে। এখানেই আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক ব্যর্থ। এ দেশের সর্বস্তরের জনগণ যুদ্ধ করে দেশটি স্বাধীন করলেও বঙ্গবন্ধু শুধু আওয়ামী লীগকে নিয়েই সরকার গঠন করেন। মওলানা ভাসানীসহ অনেককেই দারুণভাবে উপেক্ষা করেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা বা পিতাকে জনগণ নতুন এই দেশটির স্থপতি হিসেবে মেনে নিলেও জাতির পিতা হিসেবে মানতে রাজি নয়। জন্মপ্রক্রিয়ার সময় এই স্থপতি অনুপস্থিত থাকলেও তাকেই বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে মেনে নিয়েছে। এখানে অন্যদের অবদান স্বীকার করলেও তার এই স্থানটি আলাদা করে রেখেছে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি বাড়িয়ে বলতে বেশির ভাগ মানুষ রাজি নয়। বঙ্গবন্ধুও দোষে-গুণে মানুষ ছিলেন। তারও সীমাবদ্ধতা ছিল। তার পরও এ দেশকে স্বাধীন করতে তার ভূমিকা সবার ওপরে। কাজেই তার প্রকৃত কৃতিত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই এই অর্থহীন বিতর্কটি এড়ানো যায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তোমার যা ইচ্ছে ডাকো। কিন্তু আমাকে তা ডাকতে বাধ্য কোরো না।
কাজেই যারা ১/১১-এর বিশেষ তোহফা নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে তাকে জাতির পিতা বানাতে চান কিংবা এ দেশটিকেই তার নামে অভিহিত করতে চান, তাদের চার পাশে একটু তাকিয়ে দেখা দরকার। জীবিত থাকতেই শুধু এই চাটুকার বা চাটার দল এই মহানায়ক ও তার প্রিয় দেশের ক্ষতি করেনি। সেই ক্ষতির ধারা আজো অব্যাহত রয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


