কবি আল মাহমুদের সুন্দর একটি লেখা তুলে ধরছি ।
ভালোবাসাই আমার প্রকৃত শক্তি
- আল মাহমুদ
লিখতে লিখতে বেঁচে থাকা হলো শিখতে শিখতে বেঁচে থাকা। জীবনের একটা সময় আসে যখন বেঁচে থাকার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এখন আমার সেই সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে। প্রকৃত বন্ধু আমার কখনো কেউ ছিল কি না জানি না, তবে পরিচিত মুখের স্মৃতি আমাকে অনেক সময় আকুল করে। জীবনের একটা সময় আমি কাটিয়েছিলাম সীতাকুণ্ড নামে একটি শহরে। এটা হিন্দু সম্প্রদায়ের বিখ্যাত তীর্থস্থান। চাচার সাথে থাকতাম। আমার চাচা ওখানকার সারের গুদামের দায়িত্বে ছিলেন। আমি নবম শ্রেণীতে সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। সীতাকুণ্ডে আমার পেটের অসুখ লেগেই থাকত। তবু অনেক স্মৃতি বহন করে চলেছি যা সীতাকুণ্ডের সাথে জড়িত। ওখানকার বাজারে ঝুড়িভর্তি লইট্টা মাছ বিক্রি হতো। হয়তো বা বছরখানেক সেখানে ছিলাম। কিন্তু সীতাকুণ্ডের অনেক স্মৃতিই মনে জমা হয়ে আছে। আজো চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে নেমে সীতাকুণ্ড স্টেশনে দাঁড়াই। এখানে আমার অনেক বন্ধু জুটেছিল। আজ ওদের নামও মনে নেই। বন্ধুরা আমাকে জোর করে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত। খাওয়াতে চেষ্টা করত। কিন্তু ঝাল একেবারেই সহ্য করতে পারতাম না বলে অভুক্তই থাকতে হতো। সীতাকুণ্ড হলো আমার সেই ঝাল খাওয়ার কষ্টকর স্মৃতির গল্প। এর একটি-দু�টি আমি বইয়ে প্রকাশ করেছি। কেউ কেউ বলেন, এগুলো সার্থক গল্প হয়েছে।
মানুষ ইচ্ছে করলেই অতীতে ফিরে যেতে পারে না। কিন্তু অতীত সব সময় কবিকে স্মৃতির ভেতর টানাটানি করে। সীতাকুণ্ড হলো আমার জন্য তেমনি এক স্মৃতির শহর। অনেক বিষয়ের অবতারণা করেছি এই সীতাকুণ্ড শহরকে কেন্দ্রে রেখে। অনেকের মুখ আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
মানুষ শুধু স্মৃতি নিয়ে বাঁচে না বরং বিস্মৃতি মানুষকে অনেক দুঃখ থেকে রেহাই দেয়। মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ হলো কোনো কিছু ভুলতে পারা। অকপটে স্বীকার করি, আমার এই গুণ অপেক্ষাকৃত কম। আমি সহজে কিছুই ভুলতে পারি না।
অনেকে লেখক জীবনকে মহার্ঘ ভেবেছেন, আমি ভাবিনি। আমার বরং ইচ্ছে হয়, অলেখকের মতো সাধারণ জীবন কাটাতে। তবে আমি অনেক সাহিত্য রচনা করেছি, যা আমার জীবনের সমান্তরাল অর্থাৎ নানা স্মৃতিতে ভরপুর। সারা জীবন আমি কেবল মানুষ খুঁজে বেড়িয়েছি। প্রকৃত আত্মীয় মানুষ আমার জন্য কেউ ছিল না, আর থাকলেও আমার স্বভাব দোষে তা আবিষ্কার করতে পারিনি। নানা চরিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে আমি মানুষের মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। পরে আমি একাকী থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক পরে, একাকী থাকাও শেষ পর্যন্ত আমার ভাগ্যে জোটেনি। যা হোক, লেখক জীবনের জন্য নৈসঙ্গের একান্ত দরকার। আমার জীবনে যদি কোনো বিশ্রাম ঘটে থাকে তাহলে তা পেয়েছি আত্মীয়জনের মধ্যেই বলে এখন ধারণা হয়। আমি লিখতেও চেয়েছি। এখন দাবি করতে পারি যে, আমি লেখার চেয়ে শিখেছি বেশি। এই শেখার কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। আমি মানুষকে বিশ্বাস করে বারবার ঠকেছি, কিন্তু মানুষের প্রতি এখনো আমার আস্থা কমেনি।
শৈশবকাল থেকে আমি মায়ের কাছ থেকে নানা অভাব, দারিদ্র্যে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আর কোনো দিন মায়ের কাছে সন্তানের মতো ফিরে যেতে পারিনি। যখন ফিরে গিয়েছি তখন আমি নিজেই স্বতন্ত্র পুরুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে অনেক দূরের মানুষে পরিণত হই। মা-ও আর আঁচল বিছিয়ে আমাকে ঠাঁই করে দেননি। কারণ আমি ছাড়াও তার আরো কয়েকজন পুত্র-কন্যা ছিল, হয়তো আমার মা আমার অভাব সঠিকভাবে উপলব্ধি করেননি। হয়তো বা আমার লেখক হওয়ার এটা একটা প্রধান কারণ। শুধু লিখে তো আর জীবন চলে না! জীবনের চাহিদা বহুবিচিত। আমি যে সব চাহিদা পূরণ করতে পেরেছি� এই দাবি করি না। তবে পৃথিবীতে কিছু মাতৃস্নেহবঞ্চিত ছেলেমেয়ে আছেন, আমি তাদের একজন। এ অবস্থার জন্য আমি আমাকেই দায়ী করলেও আজ মনে হয় দোষটা আমার একার নয়, আমার মা-ও আমাকে তেমনভাবে আকর্ষণ করেননি।
পরে লেখক জীবনের গভীরে প্রবেশ করে আমার সব সময় মনে হয়েছে, আমার জন্য মাতৃস্নেহ আমার মায়ের মধ্যে হয়তো সঞ্চিত ছিল কিন্তু আমি ঠিকমতো আদায় করে নিতে পারিনি। ফলে বিচ্ছেদটা অনিবার্য ছিল। দুঃখটা অনন্তকালের। পৃথিবীতে এই অভাববোধ নিয়ে আমি অবিশ্রাম লেখালিখি করে গেছি। কিন্তু অভাবের জায়গাটা চিরকাল অনটন নিয়েই কাটিয়ে দিতে হয়েছে। আমার সমগ্র সাহিত্যে একটা রোদনধ্বনি আছে, যা আমি ইচ্ছে করেই গোপন করতে চাইনি। ভেবেছি কান্না বা অশ্রুজল আমার সাহিত্যে এক-আধটু লেগে থাকুক, লেখক হিসেবে আমি কখনো কোনো শত্রুপক্ষ তৈরি করতে চেষ্টা করিনি। কিন্তু কিছু লোক এমনিতে অযথা অকারণ শত্রুতায় আমাকে বেছে নিয়েছে। আমার কোনো উপায়ই ছিল না। আমি যেমন আমার প্রভুর কাছে সব সময় ক্ষমাপ্রার্থনা করে এসেছি, তেমনি নিজেও আমি অন্যকে ক্ষমা করে বিনয়ের সাথে চলতে চেয়েছি। এতে আমার জন্য ভালোই হয়েছে। চরম শত্রুতা বা হিংস্রতা আমার সাহিত্যজীবনে আমি সৃষ্টি করেনি।
আমি মূলত প্রেমের কবি। ভালোবাসাই আমার প্রকৃত শক্তি। যেহেতু আমি কবি হিসেবে আমার জাতির মধ্যে অধিক প্রবিষ্ট হতে চেয়েছিলাম, আমার নিয়তি আমাকে সেটাই পুরস্কার হিসেবে দান করেছে। আমি দাবি করি যে, আমি মানুষকে ভালোবেসেছি এবং ভালোবাসার প্রতিদানও আমাকে নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে। লেখক-জীবন আলিঙ্গন করে আমাকে অনেক কিছুই বুঝতে হয়েছে। লেখককে সমাজের গভীরে সব সময় সচেতন থাকতে হয়। এমনিতে মানবসমাজ খুবই জটিল বিষয়। নরনারীর মর্মব্যথা ঠিকমতো উপলব্ধি করতে না পারলে সমাজে কবি হিসেবে বেশি দিন স্থায়ী হওয়া যায় না। আমি সব সময় ভেতরে থাকতে চেয়েছি এবং আজো ভেতরেই আছি। আমার জীবন বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে নানাভাবে কেটে গেছে। এ জন্যই দেশের মানচিত্রটি সব সময় আমার কাছে তরতাজা হিসেবে জাগ্রত থেকেছে। কার্য উপলক্ষে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে চারণের মতো ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। যে ঘরে আমি এক-আধবার ঠাঁই পেয়েছি, সেখানেই চিরকালের মতো আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করেছি। ছেড়ে এসেছি কিন্তু ভুলতে পারিনি। এই একটি বিষয়ে আমি একজন স্বতন্ত্র মানুষ। প্রকৃত কবির মতো আমার আত্মীয়তার বন্ধন সারা দেশে সর্বত্র রক্তপ্রবাহের মতো সঞ্চালিত রেখেছি। বাংলাদেশে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমার ঠাঁই-ঠিকানা নেই। সর্বত্রই আছে আমার জন্য আপনজন। এটা যে কবি বলেই হয়েছে এমন নয়, আমার মধ্যে প্রকৃত ভালোবাসার ছিটেফোঁটা আছে বলে এটা সম্ভব হয়েছে। আজ আমার একটি ঠিকানা তৈরি হলেও এই কিছু দিন আগেও ছিলাম ঠিকানাবিহীন মানুষের দলে। বাংলাদেশের জল-স্থলে-অন্তরীক্ষে আমার অন্তরের আকুলতাকে বপন করেছি। আমার জীবন বৃথা যায়নি। ভালোবেসেছি, ভালোবাসা আদায়ও করে নিয়েছি। এই দেশে আমার অনাত্মীয় কেউ নেই।
এখন মৃত্যুর শীতলতা পাওয়ার জন্য নিজেকে প্রায় প্রস্তুত করে রেখেছি। জানি না, মৃত্যুর স্বাদ কেমন। তবে কখনো ভীতত্র্রস্ত মানুষ ছিলাম না। আজো নই। আমি চারণের মতো কেবল জীবনকেই পার করে এসেছি। জীবনের কেচ্ছা-কাহিনী আমার সারা বুকে স্মৃতির মতো জমা পড়েছে। এ জন্যই সম্ভবত মানুষ আমাকে এখনো বন্ধু হিসেবে, অগ্রজ কবি হিসেবে নির্ভরতার মধ্যে গ্রহণ করে। আমি এর মূল্যও দিতে চাই। কবিতা যা পারে, মানুষের গদ্যশক্তি তা শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

