বিশিষ্ট অর্থনীতিবীদ আবু আহমেদ এর লেখাটি পড়ুন
শেয়ারবাজার সবার জন্য নয় : আবু আহমেদ
সবার জন্য শেয়ারবাজার নয়- এই কথাটা আর্থিক বিজ্ঞানের সব বিশেষজ্ঞই বলে গেছেন। তাদের অভিমত হলো, সব লোক যখন শেয়ারবাজারের গ্রাহক হবে তখন বুঝতে হবে শেয়ারবাজারে অনেক কেলেগ্ধকারি হবে এবং শেয়ারবাজার এমন এক স্টস্নরে উঠবে, যে স্টস্নর থেকে শুধু পড়বেই। পড়ার পথে এই ধরনের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শুধু অর্থই হারায়। আর তখনই হৈচৈ শুরু হয়। শুরু হয় বলা সরকার তাদের রক্ষা করতে পারেনি। ঘটনা এমনও ঘটেছে, শেয়ারবাজারে ধস নামার কারণে সরকারেরই পতন হয়েছে। শেয়ারবাজারে কত লোক যুক্ত হবে, এটা নির্ভর করে লোকদের মধ্যে সাড়া কেমন হয়েছে; কিন্তু এই ক্ষেত্রে বাজারের ধারণের বাইরে সাড়া পড়লে সেটা বিপদের কারণ হবে। ১৯৯৬-এ এটাই ঘটেছিল বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে। সে সময় বাজার ছিল বর্তমানের এক-তৃতীয়াংশ। অন্স্নত ইস্যুড মহৃলধনের নিরিখে। কিন্তু বিনিয়োগকারী প্রবেশ করেছিল এখনকার সমান। সায়েদাবাদের বাস থেকে নেমে তারা সরাসরি মতিঝিলের শেয়ারবাজারে এসে বেচাকেনা করা শুরু করেছিল।
শেয়ারের অভাব পড়ে গেল। যে মহৃল্যই চাওয়া হচ্ছিল শেয়ারের, ত্রেক্রতার অভাব হচ্ছিল না। কিনলেই যখন লাভ হয়, তখন যারা বেচার তারাও বেচা কমিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ১০০ সিঙ্গারের শেয়ার বেচলে ঢাকা শহরে একটা ভালো ফ্ল্যাট কেনা যেত। এই অবস্টায় যারা এতদিন ঘরবাড়িতে বসা ছিল তারাও মতিঝিলের রাস্টস্নার ওপর গড়ে ওঠা শেয়ারবাজারে এসে হাজির হলো। রাস্টস্নাই হলো বাজার, ত্রেক্রতা-বিত্রেক্রতা নিজেরাই সরাসরি বেচাকেনা করতে লাগল। কিন্তু সেই পাগলামি বেশিদিন স্টায়ী হয়নি। মাসখানেকের ব্যবধানে সব ফদ্ধন্টে যেন নীরবতা নেমে এলো। নভেল্ফ্বর ১৯৯৬-এ আর ত্রেক্রতা পাওয়া যাচ্ছিল না। মতিঝিলের রাস্টস্না খালি হতে লাগল। এসব লোক অর্থ হারিয়ে ঘরে নেওয়া শেয়ারগুলো লোকসান দিয়ে বেচবে কি-না সেই সিদব্দান্স্নও নিতে পারেনি। লোকসান দিয়েও যে শেয়ার বেচতে হয়, এটা তাদের কাছে অজানা ছিল। সত্য বলতে কি, ১৯৯৬ সালে যা ঘটে গিয়েছিল এটা ছিল অবিশ্বাস্য, অতীব দুঃখের। সাধারণ লোকদের যারা বিনিয়োগকারী হতে চেয়েছিল তাদের রেগুলেটর এসইসি রক্ষা করতে পারেনি; বরং আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল সেই দিনের রেগুলেটর এসইসি। তারাই শেয়ার নামের লাখ লাখ কাগজকে বেচতে অনুমতি দিয়েছিল। সেই দিনকার বিনিয়োগকারীরা শেয়ার নামে যা কিনেছিলেন, সেগুলো ছিল স্রেফ কতগুলো কাগজ।
কাগজের বিত্রেক্রতা ছিল অনেক উদ্যোক্তা। তারা শিল্কেপ্পাদ্যোক্তা সেজেছিল আসলে শেয়ার নামের কাগজ বেচে নিরপরাধ লাখ লাখ লোকের পকেট কাটার জন্য। বলা চলে, না বুঝে ওইসব লোক ওইসব কাগজ কিনতে গেল কেন। সেই প্রশেম্নর অনেক জবাব আছে। বিনিয়োগকারীদের ভুলকে যারা পুঁজি করল তারা কি কম অপরাধ করেছে। মাত্র এক মাসের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতবদল হলো শেয়ার নামের কিছু কাগজের হাতবদলের মাধ্যমে। সবার সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম আর্থিক কেলেগ্ধকারি সংঘটিত হয়ে গেল। কোনো রেগুলেটর, কোনো কোর্ট এগিয়ে এলো না সেই দিন সামান্য পরিমাণও ক্ষতিপহৃরণ আদায় করে দেওয়ার জন্য। তারপর বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘ অর্ধযুগ শুইয়ে ছিল। এই বাজারে প্রাণ আনার জন্য অনেক সংস্টড়্গার করা হলো। অনেক বিনিয়োগকারী আর নতুন করে শেয়ারমুখী হলো না। তারা আজও ওই সময়কে একটা দুঃস্ট্বপম্ন মনে করে। আজকে আবার বাংলাদেশের শেয়ারবাজার সরগরম। নতুন করে অনেক বিনিয়োগকারী এই বাজারে প্রবেশ করেছে।
আজকের ১৭ লাখ বিনিয়োগকারীর মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেক হবে নতুন, তারা ১৯৯৬ সালে বাজারেই ছিল না। এক-তৃতীয়াংশ বিনিয়োগকারী পুনঃবাজারে প্রবেশ করেছে শেয়ারবাজারে ন্দন এসেছে ভেবে। তিন-চার লাখ বিনিয়োগকারী ১৯৯৬ সালেও বাজারে ছিল, পরের অর্ধযুগও বাজারে ছিল, এখনো আছে। এরা হলো পুড়ে যাওয়া কয়লা। এদের অভিজ্ঞতার ভাwৈর অনেক সমৃদব্দ। এদের মধ্যে প্রায় সবাই ১৯৯৬ সালের লোকসান কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। তবে এদের মধ্যে অনেকে ১৯৯৬ সালে মোটেই লোকসান দেয়নি, যেটা দিয়েছে সেটা হলো লাভের লোকসান। সিঙ্গারের ১০০ শেয়ার বেচলে সেদিন ২৫ লাখ টাকা পেত, পরে বেচে পেয়েছে ২ লাখ টাকা। কিন্তু এদের কেনা ছিল ওই শেয়ার মাত্র ২০ হাজার টাকায়।
মহৃল্য অনেক প্রকারের। তার মধ্যে দু্রাপ্যতাজনিত মহৃল্যও একটি। স্ট্বর্ণ ও ডায়মন্ডের মহৃল্য যে এত বেশি, এটা এগুলোর কাম্যতা বা উপকারের জন্য নয়। উপকারই যদি মহৃল্য নির্ধারণ করত তাহলো তো পানির মহৃল্য অনেক হওয়া উচিত ছিল। ১৯৯৬-এ শেয়ারের সরবরাহ ছিল কম, সে জন্য সেদিন একই ব্যক্তিরা কম মহৃল্যে বেচে আবার বেশি মহৃল্যে একই শেয়ারকে কিনেছে। অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোকে বা কোানির লাভ-লোকসানকে হিসাবে নেওয়ার চিন্স্না করার সময় তাদের ছিল না। ২০০৭ও চাহিদার তুলনায় শেয়ারের সরবরাহ অনেক পেছনে ছিল। সে জন্য ২০০৭ কোনো কোনো ব্যাংকের শেয়ার অভিহিত মহৃল্যের ৪০ বা ৬০ গুণেও বেচাকেনা হয়েছিল। সেই দিনও শেয়ারবাজার মৌল ভিত্তির অনেক ওপরে উঠে গিয়েছিল অন্স্নত কোনো কোনো শেয়ারের ক্ষেত্রে। আজকে শেয়ারবাজার যখন বাস্টস্নবতার কাছাকাছি এসে ঠেকেছে, তখন যারা ওইসব শেয়ার ওই উঁচুমহৃল্যে কিনেছিল, তারা অনেকগুলো টাকা হারিয়েছে।
কোনো কোনো শেয়ার বিনিয়োগকারীরা এত উচ্চ মহৃল্যে কেনেন যে, অনেক বছর অপেক্ষা করেও তাদের কেনা মহৃল্য ওঠাতে পারবেন কি-না সন্দেহ। আসলে আর্থিক বিজ্ঞানগুলোতে শেয়ারের উচিত মহৃল্য বের করার জন্য অনেক সহৃত্র-ফর্মুলা এবং ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। যারা ওইসব পড়ে বাস্টস্নবে কাজে লাগাতে পারেন তারা এই বাজারে ভালো করেন। ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্দ্ব্রের শেয়ারবাজার ওয়ালস্দ্ব্রিট ত্রক্র্যাশ করে। ওই ধস ১৯৩২ পর্যন্স্ন অব্যাহত ছিল। সেদিনও ব্যাংকগুলো বিনিয়োগকারীদের অতি উদারভাবে শেয়ার কেনার জন্য ঋণ দিত। ঋণ পেয়ে অযথা লাভের লোভে জুতা পলিশ করে, এমন ছেলেরাও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী হয়। সেই একই চিত্র তথায়ও ফুটে ওঠে। অনেক অর্থ অনেক কম শেয়ারকে দৌড়াচ্ছিল। মহৃল্য উঠে যায় আয়ের তুলনায় ৩০-৩৫ গুণে। সেই মহৃল্য আর ওঠেনি। ধস নামল। যারা না বুঝে শেয়ার কিনল তারা সর্বস্ট্বান্স্ন হলো এবং এদের মধ্যে যাদের অনেক টাকা আছে যারা লাভের আশায় শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছিল, তাদের সংখ্যাই বেশি ছিল। যারা ঝানু এবং অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী ছিল, তারা নীরবে শেয়ার বেচে বের হয়ে যায়। আর এসব ঝানু লোকও পুনঃশেয়ার কেনে; কিন্তু ত্রক্র্যাশ হওয়ার পর তাদের বেচা মহৃল্যের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মহৃল্যে। সে জন্যই বলছি, এই বাজার সবার জন্য নয়। এ বিষয়টা যুক্তরাষ্দ্ব্রে যেমন সত্য, আমাদের দেশেও সত্য। শিক্ষিত লোকেরাও ভুল করে। ২০০১-এ যুক্তরাষ্দ্ব্রের শেয়ারবাজারে ধসের মহৃল্য দিয়েছে কিন্তু শিক্ষিত লোকেরাই!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

