somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লিখি মানুষের জন্য, শিখি মানুষের জন্য : আল মাহমুদ

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ২:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবি আল মাহমুদ এর সুন্দর এই লেখাটি পড়ুন

লিখি মানুষের জন্য, শিখি মানুষের জন্য : আল মাহমুদ

একদিন লেখার ক্ষমতাও ফুরিয়ে আসে, চিন্তাভাবনা ছাড়া লেখা হয় না। আর ওই চিন্তাভাবনায় যদি কোনো বিভ্রান্তি থাকে তাহলেও লেখকের লেখা থমকে যায়। আশার কথা এই যে, আমি চিন্তার বিভ্রান্তিতে ভুগি না। আমার বিশ্বাস আছে আমার হৃদয় ঈমানের বলে বলীয়ান। আমি মানুষকে বিশ্বাস করি। অনেক সময় বিশ্বাস করে ঠকে যাই। এতে অবশ্য আমার একটু অনুতাপ হয়। কিন্তু আবার মানুষকে বিশ্বাস করি। মানুষের ওপর আস্থা হারানোকে পাপ মনে করি। যা হোক, শেষ পর্যন্ত আমাকে বারবার মানুষের কাছেই ফিরে আসতে হয়। মানুষকে ভালোবাসা ছাড়া এ বয়সে আমার আর কোনো কর্তব্যও নেই। আমি লিখি মানুষের জন্য, শিখি মানুষের জন্য এবং আশা করি এক সময় হয়তোবা আমার জীবনের একটা সঠিক মূল্যায়ন হবে, আশা নিয়ে বসে থাকি। আর অপেক্ষাই আমার কাজ।

জীবনব্যাপী অনেক লেখালেখি করেছি। লেখার জন্য একটা পরিচিতিও ঘটেছে বলে আমার মনে হয়। তবে স্বস্তি নেই, মনে কোনো প্রশান্তির পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। সব সময় ভয় এবং আশঙ্কার মধ্যে থাকি কখন কী ঘটে যায়।
অথচ ঘটে না কিছুই, কালস্রোত নিজের নিয়মে বয়ে চলে। এ জগতে কেউ কারো জন্য শেষ পর্যন্ত বসে থাকে না। আর কোনো সুখ-দুঃখও চিরস্থায়ী নয়। আজ ভালো তো কাল খারাপ। জগতে স্বার্থপরতা আগের মতোই মানুষকে যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। মাঝে মাঝে এই নিয়মের বাইরে চলে যাওয়ার স্বাদ জাগে। অবশ্য আমার একটা বিশেষ সুবিধা আছে সেটা হলো কবি হওয়ার সুবিধা। যে সুবিধা নিয়ে আমি খানিকটা স্বপ্নে এবং খানিকটা বাস্তবে পদচারণা করতে পারি। বাংলাদেশে এই সুযোগ কত দিন ভোগ করা যাবে তা অবশ্য আশঙ্কার বিষয়।

লেখক-সাহিত্যিকদের জন্য এ দেশে জীবন দিন দিনই কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো উৎসাহ নেই, উদ্দীপনা নেই, পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্যের উৎসাহ স্বভাবতই স্তিমিত হয়ে আসে। আমি নিজেও আর খুব বেশি উৎসাহবোধ করি না। আমার মতো লেখকেরও জীবন অত্যন্ত দুরূহ অবস্থায় অতিবাহিত হচ্ছে। অবশ্য সারাদেশেই সাহিত্য-সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। কোনো মননশীল রচনা বা জীবনঘনিষ্ঠ লেখকের উদ্দীপনা আর আমাদের পরিবেশের মধ্যে বিরাজ করে না। বলা বাহুল্য যে, আমরা ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছি। কোনো আদর্শ নেই। জীবন দর্শন নেই। চতুর্দিকে আছে লোভ ও লালসার হাতছানি। তবুও আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে মনুষ্যত্ব পরাজয় মানবে না। মানুষ দারুণ কষ্টের মধ্যে থেকেও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসার স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্নের মধ্যে আমার মতো কবিরও যেহেতু আশা নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে সে কারণে নিরাশার অন্ধকার আমরা আগেভাগে নামিয়ে আনব কেন? এখনো আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বপ্নকল্পনার পথে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে আগ্রহী। বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাপূর্ণ দেশ কত দিন দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে অত্যাচারিত হয়ে বসে থাকবে? আমরা কি এখনো ষোলো কোটি মানুষ এক ভাষায় এক মতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারি না? আমরা অশুভের বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে দাঁড়ালে কার কী ক্ষমতা আছে আমাদের ভূলুণ্ঠিত করতে পারে। আমাদের নেতৃত্ব যদি বুদ্ধিমান ও সাহসিকতাপূর্ণ মানুষের মাধ্যমে উচ্চকিত হয় তাহলে এই জাতির বৈপ্লবিক ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা হবে। বহু দিন আমরা আত্মকলহে মগ্ন থাকলেও এখন চৈতন্য উদয়ের সময় এসেছে।

সবাই বুঝতে পারছে বাংলাদেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে পেছনে ঠেলে দেয়ার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থা দেশবাসীর জন্য এমনই যন্ত্রণাদায়ক যে, ভয় হয় সহসা না ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে মানুষের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা বাতাসে-মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। সবারই এই ধারণা যে, বাংলাদেশকে ঠেলে পেছনে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এ অবস্থা বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। একসাথে সোল্লাসে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় চেতনা আকাশে-বাতাসে ফেটে পড়বে। কী স্বার্থে বা কার স্বার্থে বাংলাদেশকে পেছনে ঠেলে রাখার চেষ্টা চলছে তা আমরা না জানলেও অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠেছে, এটা বুঝতে পারছি। যদি এর থেকে অব্যাহতি পেতে হয় তাহলে প্রথমেই বাংলাদেশের জনগণের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা কবি-সাহিত্যিক মানুষ। আমাদের সম্বন্ধে ধারণা হলো আমরা স্বপ্নের মধ্যে চলাফেরা করি। বাস্তবের কোনো বোধ নাকি আমাদের নেই। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস এর সৃজনকাল থেকে অধ্যয়ন করে এলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশের স্বপ্নচারী কবিরা অনেক বাস্তব বিষয়ের সুন্দর পরামর্শ দিয়ে এসেছেন, যা এখন বাংলাদেশের ইতিহাস হয়ে উঠেছে।

যা হোক, বয়স অনেক হয়েছে। বলা যায় এখন বয়সের ভারে কাবু হয়ে ঘরের মধ্যেই একরকম আবদ্ধ জীবনযাপন করছি। তবু কবির স্বপ্ন কি কবিকে ছেড়ে যায়? এখনো আমার দেশকে নিয়েই মনে মনে স্বপ্ন রচনা করি। সব সময় ভাবি একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশ তার ভাগ্যের সবগুলো দুয়ার খুলে দিতে সক্ষম হবে। এ দেশের ভাগ্যের সাথে ওৎপ্রোতভাবে আমার ভাগ্যও জড়িত। এ কারণেই ইচ্ছা করলেও দেশচিন্তা না করে একজন কবি বেঁচে থাকতে পারেন না। একজন কবি সবসময় নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত মনে করে থাকেন। মনোবাসনা তাকে অসংখ্য বিপদের মধ্যে সাহসিকতার সাথে এগিয়ে চলার উৎসাহ দেয়। কিন্তু কিছু লোক সবসময় কবির বিরুদ্ধে কৃপণতা ও হীনম্মন্যতার অভিশাপ প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড় করায়। আমি তুচ্ছজ্ঞান করি এসব বাধা-বিপত্তির। জানি, আমাকে লিখতে হবে। স্বাধীন সাহসী মানুষের মতো বাংলাদেশের সব অসুবিধা ঘেঁটে তা পর্যালোচনা করে অভিমত ব্যক্ত করতে হবে। হয়তো এতে কিছু বাড়াবাড়ি থাকতে পারে, কিন্তু সত্যই এর প্রাণশক্তি। সত্যই একে সাহসী করেছে। সব সময় বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই আমাদের। এর সৃষ্টিতে যেমন অংশ নিয়েছি, তেমনি এর সমৃদ্ধিতে আমার অংশ থাকবে বৈকি। কথা হলো, আমরা একটা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। এই যুদ্ধের পরিণতি এখনো আমরা দেখতে পাইনি। অবশ্যই আমরা একদিন বিজয় দেখব। আগেও বলেছি এবং বারবার উল্লেখ করতে লজ্জাবোধ হলেও আবারো না বলে পারছি না যে, সৃজনশীল ও মননশীল শিল্প-সাহিত্যকে বাঁচাতে হলে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। কেবল শূন্যের ওপর সৃজনরীতি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা সব দেশে সব জাতির মধ্যে আছে। আমাদের নেই। এটা সঠিক কাজ নয়। যারা দেশের মননশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখেন, তারা আসলে দেশের সংস্কৃতিকেই বাঁচিয়ে রাখেন। এ ধরনের মানুষের প্রতি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত দরকার। একটু অগ্রসর হয়ে এসব সৃজনশীল ও মননশীল মানুষের দিকে সরকার হাত বাড়িয়ে দেবেন এটাই আশা করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে তেমন কোনো পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন নেই বললেই চলে। এর প্রতিবাদ আগেই করেছি। আবার করলাম।

অনেক বিষয়ের প্রতিবাদ করি, যদি তা প্রতিবাদযোগ্য হয়। কিন্তু আমি তো প্রতিকার করতে পারি না। আমি আশার কথা বলতে পারি, কিন্তু নিরাশার ঘটনা এসে উপচে পড়লে তা প্রতিরোধ করতে পারি না। এই অসহায়তা নিয়ে বেঁচে থাকি। কারণ, বাঁচার মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান আছে। এটা আমাদের ধারণা। যাদের জন্য লিখি, তাদের হাসিখুশি মুখ কৌতুকে উদ্দীপক নয়ন আমি কল্পনায় দেখতে পাই। তারা আমার জন্য দোয়া করেন এই দোয়ায় সতেজ থাকি। তবে মনে হচ্ছে আরো কী যেন করার ছিল আমি ঠিকমতো তা করতে পারিনি। মানুষকে আশ্বাস দিয়েছি, কিন্তু তা পূরণ করতে পারিনি। আমি সব পারি না। কিছু পারি কিছু অপূর্ণ থাকে। ক্ষমার ছায়ায় বসবাস করছি। মানুষের অভিসম্পাত থেকে আমি দূরে থাকতে চাই। আমার আপনজন যারা, তারা আমার জন্য সবসময় মঙ্গল ও শুভ কামনা করেন। যদিও অতটা যোগ্য আমি নেই।

মাঝে মাঝে ভাবি, লেখক জীবনের সার্থকতা বা সাফল্য কোথায়? শুধু বইপত্র লিখে স্তূপ করে সাজানো গেলেই কি সার্থকতা ও সাফল্য পরিপূর্ণ হয়? আমার বিশ্বাস আমার তা হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যকে আমার নিজের অন্তরাত্মা গ্রহণ করতে চায় না। না, না করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমিও বুঝি, লেখক জীবনের সার্থকতা কেবল স্তূপীকৃত লেখার মধ্যে প্রতিফলিত হয় না। লেখা ছাড়া মানুষের জন্য যদি কিছু করে থাকি তাহলেই জীবনের সার্থকতা প্রতিফলিত হয়। বহু কষ্টে এ সিদ্ধান্তে এসে হাজির হয়েছি। আরো এগোলে হয়তো আরো কিছু জানব। এখন এগিয়ে চলার শক্তি কতটা আছে কে জানে!
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×