লেখকঃ সাবেক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা এবং বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান
আন্দোলনের ফসলও তিতা লাগে : মা হ মু দু র র হ মা ন
দুই সপ্তাহ বিরতির পর নয়া দিগন্তের পাঠক আবার আমার নির্ধারিত কলাম পড়ছেন। এ সময়ের মধ্যে পাঠকদের কাছ থেকে অসংখ্য টেলিফোন এবং ই-মেইল পেয়ে প্রীতি লাভের সাথে বিব্রতবোধও করেছি। আমি তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা রাজনীতিবিদ কোনোটিই নই। নিতান্তই একজন খেটে খাওয়া পেশাজীবী। তার পরও আমার দুর্বল এই রচনারও যে ভক্ত পাঠককুল তৈরি হয়েছে, তা ভাবতে ভালোই লাগে। বিগত ২০ মাস ধরে প্রকৃতপক্ষে আমার অপটু হাতে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কেবল সময়ের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছি। যে দু’টি সপ্তাহ পাঠকদের কাছ থেকে দূরে থেকেছি, বিনয়ের সাথে বলছি তার দায় আমার নয়। গত শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক দিনকাল পত্রিকায় ‘কেস স্টাডি, দুদক’ শিরোনামে আমার যে লেখাটি ছাপা হয়েছে সেটি অনিবার্য কারণবশত ‘নয়া দিগন্ত’ পত্রিকায় ছাপানো সম্ভব হয়নি। লেখাটি এখনো দৈনিক দিনকাল পত্রিকার ওয়েবসাইটে পাওয়া উচিত। উৎসাহী পাঠক একটু কষ্ট করে লেখাটি পড়লে ‘নয়া দিগন্ত’ কতৃপক্ষের অপারগতার কারণ ধরতে পারবেন বলেই ধারণা করছি। এবার আজকের আলোচনায় যাওয়া যাক।
হঠাৎ করেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং আওয়ামী লীগের গভীর মাখামাখিতে অন্তত বাহ্যিকভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জনাব আশরাফুল ইসলাম ক’দিন পূর্বে অনেকটা প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের অভিমানাহত কণ্ঠে তার মনোবেদনার কথা জানান দিয়ে বললেন, সরকারের প্রকৃত পছন্দের দল বিএনপি-জামায়াত। তার ক্ষুব্ধ বক্তব্যের সূত্র ধরেই বিগত ২০ মাসের স্মৃতি এবার একটু ঝালাই করে নিচ্ছি। ১১ জানুয়ারি, ২০০৭ সাল, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোটের নেতৃবৃন্দের বঙ্গভবনে হর্ষোৎফুল্ল উপস্থিতি। বিদেশী কূটনীতিকদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ১৫ কোটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অথচ জনগণের দলের দাবিদার আওয়ামী লীগের তাবৎ নেতানেত্রী বঙ্গভবনের লাল গালিচার ওপর দিয়ে আনন্দের জোয়ারে ভেসে বেড়াচ্ছেন। এক দিকে মঞ্চে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বয়ম্ভু প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ শপথবাক্য পাঠ করছেন। অপর দিকে সম্মানিত অতিথিদের সম্মুখ সারির নির্ধারিত আসনে পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর মসনদে আসীন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্মিত মুখে চেয়ে আছেন। হয়তো ভাবছিলেন, তার নিজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান কবে এবং কতটা জাঁকজমকপূর্ণ হবে? আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা গর্বভরে বললেন, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার তাদেরই আন্দোলনের ফসল। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মহাভারতে বর্ণিত আছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পরাজয় থেকে বাঁচার অন্যায় কৌশল হিসেবে যুধিষ্ঠির গুরু দ্রোণাচার্যকে তার পুত্র অশ্বথামার মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ দেয়ার জন্য উচ্চৈঃস্বরে ‘অশ্বথামা হত’ বলার পর অনুচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন ‘ইতিঃগজ’। অর্থাৎ অশ্বথামা নামের একটি হাতি নিহত হয়েছে। সম্পূর্ণ মিথ্যাও বলতে হলো না, আবার কাজও হয়ে গেল। পরিণামে দ্রোণাচার্য যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ত্যাগ করে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবদের কাছে কৌরবরা পরাজিত হয়েছিল। একালের ড. ফখরুদ্দীন আহমদ যে দ্রোণাচার্য নন, সেটি শপথ গ্রহণের দিন বুঝতে শেখ হাসিনা অবশ্য ব্যর্থ হয়েছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে, সেই রাজনৈতিক ভুলের মাশুল শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ দিন ধরে দিয়ে যেতে হবে। এ দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের নেতৃত্বে চারদলীয় জোট শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জনের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রথম দিনই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের প্রধান উপদেষ্টারূপে নিয়োগপ্রাপ্তির সাংবিধানিক বৈধতার সামনে যে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, সেটি মুছে ফেলা বর্তমান সরকারের পক্ষে কোনো দিনই আর সম্ভব হবে না।
আওয়ামী লীগ দলগতভাবে এবং শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এক-এগারোর সরকারকে খুবই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ যে নীতিগতভাবে সংবিধানবহির্ভূত ক্ষমতা দখলের খুব একটা বিরোধী নয় তার প্রমাণ ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের সময়ও দেশবাসী দেখতে পেয়েছেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হঠিয়ে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিবাজ জেনারেল এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করেছিলেন তখন আওয়ামী লীগের মুখপত্র দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ রীতিমতো সম্পাদকীয় ছাপিয়ে ক্ষমতার দৃশ্যপটে জেনারেলের আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিল। তবে এবার স্বয়ং শেখ হাসিনা তার দলের স্বৈরাচারপ্রীতির পূর্বের রেকর্ডকে অতিক্রম করেছেন। ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ বিদেশ যাত্রার সময় জিয়া বিমানবন্দরে শেখ হাসিনা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার সে দিনের বক্তব্য দৈনিক ইত্তেফাকের ১৬ মার্চের সংবাদ অনুযায়ী নিুরূপ ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাত্রার প্রাক্কালে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে এ সরকারের সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেয়া হবে। বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার মহাচোর ধরছে। এতে আতঙ্কের কিছুই নেই। আমরা এটা ‘রেটিফাই’ করব।...
যৌথ বাহিনীর কর্মকাণ্ডে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটছে বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, বড় বড় চোর ছাড়াও মহাচোর ধরা পড়ছে। জনগণের সম্পদ যারা পাচার করেছে তাদের তো ধরতেই হবে।... শেখ হাসিনা বলেন, বছরের ৩৬৫ দিনই আমি দেশে ও জনগণের পাশে থাকি। এর মধ্য থেকে আমি জনগণের কাছ থেকে ৩০টি দিন চেয়ে নিয়েছি। বিদেশে থাকতে আমার ইচ্ছে করে না।
শেখ হাসিনার বক্তব্যকে মোটামুটি তিন অংশে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, তিনি একটি অনির্বাচিত, সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতাবিহীন সরকারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের সব দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন। অর্থাৎ এই সরকার এ যাবৎ দেশের স্বার্থবিরোধী, অর্থনীতি ধ্বংসকারী এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারবিরোধী যেসব কাজকারবার করেছে তার জন্য প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে ভবিষ্যতে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, যৌথ বাহিনীর সব কর্মকাণ্ডের অবারিত প্রশংসার মাধ্যমে গ্রামের হাটবাজার ধ্বংস, শহরের হকার উচ্ছেদ এবং বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না করেই বস্তি উচ্ছেদের নামে হাজার হাজার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করে আশ্রয়হীন করার দায়দায়িত্বও শেখ হাসিনা গ্রহণ করেছেন। তৃতীয়ত, তার বক্তব্যের শেষাংশে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, তিনি নাকি তার স্বদেশ ছেড়ে থাকতে পারেন না। অথচ শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে দেশবাসী তার ভিন্ন রূপ দেখেছেন। তার কন্যার কন্যা জন্মলাভের সময় সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খুলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ তিনি প্রায় এক মাস সেখানে অবস্থান করেছিলেন। এই কলামটি লেখার মুহূর্তেও শেখ হাসিনা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনো পুত্রের কাছে ওয়াশিংটনে, কখনো কানাডায় কন্যাগৃহে, কখনো লন্ডনে সহোদরার বাড়িতে আবার কখনো বা ফিনল্যান্ডে ভাগ্নের বিয়ের অনুষ্ঠানে ভালোই সময় কাটছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর। সরকার তার স্বামীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যখন তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয় তখন দেশবাসীকে বলা হয়েছিল, প্রধানত কান ও চোখের চিকিৎসার জন্যই নাকি তার এবারকার বিদেশ ভ্রমণ। কিছুটা বিস্ময়ের সাথেই আমরা তিন মাস ধরে লক্ষ করছি, তার চিকিৎসা ব্যতীত আর সব কর্মকাণ্ডই চলছে। অবশ্য সংবাদমাধ্যমে মাঝে মধ্যে শেখ হাসিনার চেকআপের খবর বেশ ফলাও করেই প্রচারিত হচ্ছে। এ দিকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক মোদাচ্ছের আলী উৎসাহের আতিশয্যে ডান কান এবং বাম কান নিয়ে তার নেত্রীর জন্য এক চরম বিব্রতকর বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। সরকারের ভাবগতিকও বোঝা দায়। কানাডায় কন্যা-জামাতার আতিথ্য গ্রহণ শেষে শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে বিমানবন্দরে পৌঁছেই দেখলেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের গাড়ি এবং একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার হুকুম তামিলের জন্য অপেক্ষমান। দূতাবাসের সেই গাড়িতে চড়েই শেখ হাসিনা বিমানবন্দর থেকে পুত্রের বাড়িতে যান। শেখ হাসিনার বর্তমান প্রটোকলটি ঠিক বুঝতে পারলাম না। অবশ্যই তিনি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু একই সাথে তিনি প্যারোলে সাময়িকভাবে মুক্ত ১৫টি দুর্নীতি মামলার আসামি। শহীদ জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জামিনে মুক্তি দিলে আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর নেতৃবৃন্দ সেখানে সরকারের সাথে বিএনপি’র আঁতাত খুঁজে পান। আর বিদেশ ভ্রমণরত প্যারোলে মুক্ত শেখ হাসিনাকে সর্বত্র বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো সর্বোচ্চ প্রটোকল প্রদান করলেও আঁতাতের গন্ধ খোঁজার পরিবর্তে তারা একই সাথে পরম সন্তোষ ও গর্ববোধ করেন। আওয়ামী লীগের এই স্ববিরোধী মানসিকতা দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থেকে আরম্ভ করে একেবারে সামান্য কর্মীর আচার-আচরণের মধ্যেও দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান।
এই সরকারও যে আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বল সেটি তাদের ২০ মাসের কর্মকাণ্ডে প্রতি পদে পদে প্রমাণ করেছে। এক-এগারোর পর থেকেই ছায়া সরকার বিএনপিকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে। তাদের সেই অপচেষ্টায় বেহুদা নির্বাচন কমিশন বিনা প্রশ্নে সকল প্রকার সহযোগিতাও প্রদান করেছে। কোনো রকম জনসমর্থন না থাকা সত্ত্বেও প্রথমে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মহাসচিব জনাব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং পরবর্তী পর্যায়ে জনাব সাইফুর রহমান ও মেজর (অবঃ) হাফিজের নেতৃত্বে এক সংস্কারবাদী ভুয়া বিএনপি জন্ম দেয়ার চেষ্টা দেশবাসী দেখেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পক্ষপাতমূলক আচরণে দেশের ১৫ কোটি মানুষ বিব্রতবোধ করলেও ‘অসীম সাহসী’ ড. শামসুল হুদা থেকেছেন নির্বিকার। কী কারণে জানি না, কেবল সম্প্রতি তিনি তার অতীত ক্রিয়াকর্মের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তাতে শেষ রক্ষা হবে কি না তার উত্তর পেতে আমাদের নিদেনপক্ষে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে সরকারের প্রতি আওয়ামী লীগের অভিমান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার দিনটিকে শোকদিবস হিসেবে এ বছর বেশ ঘটা করেই পালন করেছে। ১৫ আগস্টের ছুটি বহাল রাখা সংক্রান্ত শেখ হাসিনার সরকারের সিদ্ধান্ত হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ আবেগে উদ্বেল হয়ে সপ্তম আকাশে বিচরণ করছিলেন। সঙ্গত কারণেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বিচার বিভাগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিলেন। তাদের আনন্দের ফোলানো বেলুনে সুঁইয়ের প্রথম খোঁচাটি এলো জেলহত্যা সংক্রান্ত রায় প্রদানের মাধ্যমে। আদালত বললেন, জেলহত্যা অবশ্যই সংঘটিত হয়েছে; তবে একজন ব্যতীত অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারের আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ন্যায়বিচারের স্বার্থেই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, উচ্চ আদালত তাদের মুক্তিদানের নির্দেশ দিয়েছেন। আর যায় কোথায়? আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের দৃষ্টিতে স্বাধীন আদালত রাতারাতি ষড়যন্ত্রের আদালতে পরিণত হয়ে গেল। এই ধাক্কাও না হয় সামাল দেয়া যেত, কিন্তু আপিল বিভাগ যখন তারেক রহমানের জামিনের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল খারিজ করে দিলো তখন আর সেটিকে নিরীহ সুঁইয়ের খোঁচা বলা গেল না। এবার আওয়ামী বেলুনে রীতিমতো গজালের খোঁচা। রাগে-দুঃখে অগ্নিশর্মা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার সৈয়দ বংশের মর্যাদার বিষয়টি একেবারে ভুলে জনাব তারেক রহমান সম্পর্কে আওয়ামী স্বভাবসুলভ অরাজনৈতিক মন্তব্য করে ফেললেন। বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার আগেই তার দৃষ্টিতে তারেক রহমান হয়ে গেলেন ‘দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’। যদিও তার নেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা এবং টাকার অঙ্কে দুর্নীতির অভিযোগ উভয়ই তারেক রহমানের তুলনায় অধিক। আওয়ামী লীগের হতদরিদ্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হওয়া সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে থেকে এমন অযৌক্তিক ও রুচিহীন প্রতিক্রিয়া আমি অন্তত আশা করিনি। তার কাছে আমার প্রত্যাশার মাত্রাটি কেন বেশি ছিল তার একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মরহুম সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মরহুম সৈয়দ নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ পুত্র। আমার জানা মতে, জনাব আশরাফ যুক্তরাজ্যের সুবিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন এবং তিনি একজন ব্রিটিশ নাগরিক। বাংলাদেশের আইনানুযায়ী যেহেতু কোনো বিদেশী নাগরিক সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না কাজেই আমি ধারণা করছি যে, জনাব আশরাফুল ইসলাম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগে তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ দিন থাকার কারণে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের সে দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার কথা। কোনো দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সেই দেশটির শিষ্টাচারের সংস্কৃতিও পরিত্যাগ করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কনিষ্ঠ ভ্রাতা সৈয়দ সাফায়াত ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তার সাথে আমার বার দুয়েক দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাকেও আমার কাছে মরহুম পিতার মতোই যথেষ্ট সজ্জন ব্যক্তি মনে হয়েছে। সৈয়দ সাফায়াত সম্ভবত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন একজন সম্ভ্রান্ত ভারতীয় গুজরাটি হিন্দু ব্রাহ্মণ মহিলার সাথে। মিসেস আশরাফুল ইসলাম সম্ভবত যুক্তরাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রণনালয়ে চাকরি করছেন। এদিকে কুলীন সৈয়দ বংশ আর ওদিকে উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ কন্যা। দেখা যাচ্ছে কোনো দিকেই কৌলীনত্বের কোনো অভাব নেই। তাহলে আচার-আচরণে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছ থেকে আমাদের সুশীল ব্যবহার আশা করতে দোষ কোথায়? এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, বৈবাহিক সূত্রে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। শেখ হাসিনার পুত্র জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় যে একজন মার্কিন আইনজীবীকে বিয়ে করেছেন এ তথ্য বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক জানেন। শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার পুত্র ববি সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের এক কন্যাকে জীবনসঙ্গিনী করেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে বিদেশে চিকিৎসারত শেখ হাসিনা স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এসব আন্তর্জাতিক বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে আওয়ামী লীগের সাথে সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তি এবং আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির গাঁটছড়া যে ক্রমেই জোরদার হচ্ছে তার প্রমাণ জাতি সাম্প্রতিক সময়ে দেখতেও পেয়েছে। অবশ্য বাংলা এবং বাঙালির জন্য সর্বদা পেরেশান দল আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীদের বৈবাহিক সম্পর্ক খোঁজার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এতটা উপেক্ষিত থাকে কেন, এমন বেমক্কা প্রশ্ন দেশবাসীর মনে উদয় হলে তাদের দোষ দেয়া যাবে না। কাকতালীয়ভাবে একই প্রকৃতির ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জোরে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারও যথেষ্ট বলীয়ান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ বর্তমান এবং সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে একাধিক পরিবারকে রীতিমতো বহুজাতিক আখ্যা দেয়া যেতে পারে। সম্ভবত সে কারণেই বাংলাদেশ সরকারের তিন দশক ধরে প্রচলিত, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশী নাগরিক বিবাহ সংক্রান্ত আচরণবিধি পরিবর্তন করে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশী নাগরিকের সাথে বিবাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। বিদেশী স্ত্রী থাকার কারণে জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনে নিযুক্ত কূটনীতিক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে মামলা হওয়ার পরই সরকার তড়িঘড়ি করে ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশ পরিবর্তন করে ফেলেছে। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারের ক্ষমতালাভের অন্তরালে সুশীল(?) সমাজের যে অবদান রয়েছে তার কিছুটা ঋণ পরিশোধের চেষ্টা হিসেবেই বাংলাদেশের অন্যতম সুশীল(?) স্তম্ভ ড. দেবপ্রিয়কে সম্ভবত বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন আদর্শগত ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সাথে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে, তার প্রমাণ কর্তাব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবনাচারের মধ্যেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা আর না বাড়িয়ে মূল প্রসঙ্গে ফেরত যাওয়া যাক।
এক-এগারোর প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের জনগণ বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত হলেও দীর্ঘ ২০ মাস পর এখন সবাই মোটামুটি একমত যে, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ করার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যতীত ঘটনাটি অন্য কিছু ছিল না। বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, তাদের এ দেশীয় এজেন্ট সুশীল(?) সমাজ, চিহ্নিত সংবাদমাধ্যম, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট এবং দৃশ্যমান ও ছায়া সরকারের কর্তাব্যক্তিদের যোগসাজশে দেশের স্বার্থবিরোধী এই কাণ্ডটি ঘটানো হয়। তৎকালীন পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়নে চারদলীয় জোটের ব্যর্থতা এবং দেশের জনগণকে আস্থায় নিয়ে তাদের সঠিক রাজনীতি চর্চা না করার ফলে পরিকল্পনাকারীদের পক্ষে কাজটি সমাধা করা সহজ হয়ে যায়। তবে এক-এগারোর কুশীলবদের স্বার্থের সঙ্ঘাত যে অবশ্যম্ভাবী ছিল সেটি এখন আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়ায় পরিষ্কারভাবেই প্রমাণিত হচ্ছে। বোঝা দরকার যে, পঞ্চপাণ্ডবের যার যার নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। আধিপত্যবাদী শক্তি এবং যে চিহ্নিত সংবাদমাধ্যমের সম্পাদককুল এক-এগারো বাস্তবায়নে অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ্যেই কবুল করেছেন, তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি দালাল সুশীল(?) সমাজকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা এবং দেশের জনগণকে সেনাবাহিনী থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। বিদেশী অর্থে পরিচালিত ‘যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’ কার্যক্রম এবং নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসের রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিল এই চক্রান্তেরই অপরিহার্য অংশ। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের দৃশ্যমান সরকার এবং তাদের পেছনে ছায়া সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ফাঁকতালে ক্ষমতা দখল এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করা। এদের মধ্যে দুই-একজন নির্বোধ আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা না বোঝার কারণে পরিস্থিতির শিকার হলেও হতে পারেন। আর আওয়ামী নেতৃত্বে মহাজোটের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাদবাকি চার পাণ্ডবের কাঁধে সওয়ার হয়ে জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামি জোটকে রাজনীতির ময়দান ছাড়া করে ফাঁকা মাঠে একতরফা প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া। সুশীল(?) সমাজকে জনগণ অতি দ্রুত চিনে ফেলে প্রত্যাখ্যান করার ফলে সাম্রাজ্যবাদীদের মূল পরিকল্পনা যে বাস্তবায়ন করা যাবে না সেটি এক-এগারোর পরবর্তী প্রথম তিন মাসের মধ্যেই সবার কাছেই দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। ভগ্নহৃদয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মিজ প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস বাংলাদেশের শাহী দরবার ছেড়ে ইরাকের ভীতিকর অগ্নিকুণ্ডে যেতে বাধ্য হন। আতঙ্কিত পঞ্চপাণ্ডবের পর মন্দের ভালো হিসেবে সেক্যুলার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য একের পর এক চরম পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ নিতে থাকে। জরুরি অবস্থার মধ্যেই অনুষ্ঠিত সীমিত পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে অংশগ্রহণ করে এবং প্রত্যাশিতভাবেই মেয়র পদগুলো বাগিয়ে নেয়। নতুন নতুন ফ্ল্যাগ পাওয়ার আনন্দের আতিশয্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই ১৯৯১ সালের মতো মন্ত্রণালয় ভাগাভাগির কাজটিও নাকি তারা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে ফেলেছে। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনে শেষ পর্যন্ত বাদ সাধলো উচ্চ আদালত। আইনকে নিয়ন্ত্রিত করার সরকারি নগ্ন অপচেষ্টা অজানা কারণে দীর্ঘ দিন ধরে সহ্য করার পর হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ বোধ হয় ভাবলেন, আর ছাড় দেয়া সম্ভব নয়। স্বাধীন বিচার বিভাগের ক্ষয়প্রাপ্ত ভাবমর্যাদার পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বিচার বিভাগ দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখুক এটি আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থক সুশীল(?) আইনজীবীদের পছন্দ নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে উচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে লাঠিমিছিল, একই ব্যক্তির নির্দেশে রাতারাতি আদালত প্রাঙ্গণে বস্তি স্থাপন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে প্রধান বিচারপতির কক্ষ ভাঙচুরসহ তাণ্ডব সৃষ্টি এবং সম্প্রতি তারেক রহমানকে জামিনে মুক্তি দান প্রসঙ্গে আওয়ামী ঘরানার সমস্বরে রীতিমতো আদালত অবমাননাকর মন্তব্য প্রদান দলটির ফ্যাসিস্ট চরিত্রেরই ধারাবাহিকতা মাত্র।
অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে, দেশের দ্রুত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সঙ্গীসাথীরা ক্রমেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। শেখ হাসিনার ন্যায় সরকারের কাছে আবেদন করে প্যারোলে মুক্তি না নেয়া, বন্দী অবস্থায় ভোটার না হয়ে জাতীয় নেতাসুলভ আত্মসম্মানবোধ প্রদর্শন এবং শুধু বিচার বিভাগ ও দেশের জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা রাখার ফলে কারারুদ্ধ বেগম খালেদা জিয়া বর্তমান বাংলাদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছেন। সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের কোনো অনুকম্পা গ্রহণ না করে আদালত থেকে জামিন গ্রহণের মাধ্যমে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী মুক্তিলাভ করলে দেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ তাকে ঘিরেই যে ঐক্যবদ্ধ হবে এবং দেশী ও বিদেশী আগ্রাসন প্রতিরোধের লড়াই শুরু করবে, এ বিষয়টি এখন উপলব্ধি করার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। ফলে যে আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার জন্য শেখ হাসিনা ২০ মাস ধরে অপেক্ষা করতে করতে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছেন সেই ফসলের স্বাদ যে ইতোমধ্যেই তার এবং দলের নেতৃবৃন্দের কাছে তিতা লাগতে আরম্ভ করেছে, সেটি দেশবাসী ভালোই বুঝতে পারছে। সরকারের সাথে আগের আঁতাত থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এখন বলছেন, তারা উপজেলা নির্বাচনে এবং জরুরি অবস্থা চলাকালে কোনো সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচারে তাদের এই সিদ্ধান্ত সঠিক এবং বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের অবস্থানও এই বিষয়ে অভিন্ন। তবে স্মরণে রাখা দরকার যে, চারদলীয় জোটের এই নৈতিক অবস্থান ড. ফখরুদ্দীন আহমদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন এবং বিগত ২০ মাস ধরে আপসহীন অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অপর দিকে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিদেশী শক্তির সহায়তা সত্ত্বেও তাদের অনৈতিক এবং অগণতান্ত্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার পরই। এ কারণেই বিশ্বাসীদের সর্বদা স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে মহান আল্লাহ্তায়ালাই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। পবিত্র কুরআন শরিফের সূরা আল-ইমরানের ৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘এবং কাফেররা চক্রান্ত করেছে এবং আল্লাহ্ও কৌশল অবলম্বন করেছেন। বস্তুত আল্লাহ্ হচ্ছেন সর্বোত্তম কুশলী।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



