ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে
মুশফিক প্রধান
কারো কারো গায়ে ছিন্ন জামা, নগ্ন পা, কারো মাথায় হাতে ব্যান্ডেজ, মনে হয় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত একদল মানুষের বিধবস্ত প্রতিচ্ছবি। টেলিভিশনের পর্দায় ছবিগুলি দেখে কে বিশ্বাস করবে যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির এরাই একটা প্রধান অংশ? অথচ এরা কোন নাটকের অংশ নয়। নয় চলচিত্রের কোন কাল্পনিক চরিত্র। বরং মাথার ঘাম পায়ে ফেলা একদল মানুষ, যারা শেষ সম্বলটুকু নিঃশেষ করে দিয়ে, বসতবাড়ি বিক্রি বা বন্ধক রেখে বিদেশযাত্রা করেছিল। উদ্দেশ্য হত দরিদ্র পরিবারে যেন একটু স্বাচ্ছন্দ ফেরানো যায়। যে কাজ অন্য জাতি করতে চায় না, সেই ধাঙ্গরের কাজ থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা পর্যন্ত যত রকম কাজ আছে, সবই তারা হাসি মুখেই করতো। এমনকি আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে যে আট ঘন্টা কর্ম দিবসের কথা লেখা আছে, দেশ ও স্বজনের কথা ভেবে তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রম দিতো এই পরিশ্রমি এবং সৎ মানুষগুলো।
অথচ বছরের পর বছর তাদেরকে ঠকানো হচ্ছিল। ৪০ দিনারের বদলে ২০ দিনার তাও বিভিন্ন ছুতোনাতায় আরো ৭-৮ দিনার কেটে রাখা হতো। ফলে ওই শ্রমিকদের নিজেদেরই ঠিক মত চলতো না, দেশে টাকা পাঠানো তো অনেক দুরের কথা। আর এমন করেই এই বিক্ষোভের আগুন ধীরে ধীরে একদিন বিস্ফোরিত হয়েছে।
পাঠক, আপনারা নিশ্চই বুঝতে পারছেন, আমি কুয়েত ফেরৎ বাংলাদেশি শ্রমিকের কথাই বলছি, যাদেরকে ন্যায্য বিচার চাওয়ার অপরাধে সেখান থেকে জোর করে বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে। অথচ তাদের দেশের যে প্রতারক এবং শোষক মালিক গোষ্ঠি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তেমন জোরালো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
বিভিন্ন ওয়াজ মেহফিলে কিংবা ইসলামিক আলোচনা অনুষ্ঠানে আমরা মুসলিম উম্মা নামের একটি শব্দ হর হামেশাই শুনতে পাই। যদি ঠিক মত ইসলাম সম্বন্ধে জেনে থাকি, তবে বলবো, এর অর্থ মুসলমান মাত্রেই ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ। বাংলাদেশি যত আবেগ দিয়ে ব্যাপারটি অনুধাবন করেন, অন্য দেশের মুসলমানরা সেই একই আবেগ দিয়ে আমাদের দেখেন বলে মনে হয় না। দীর্ঘদিন প্রবাসি থাকার ফলে বাংলাদেশি মুসলমানদের প্রতি অন্য দেশের মুসলমানদের প্রতি সুক্ষ্ম একটি অবজ্ঞা প্রদর্শনের নানা রকম নজির দেখার অভিজ্ঞতা আমার আছে।
অথচ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ যারা, তাদের ভাষায়ই তো পবিত্র কোরান লিখিত হয়েছে। সেখানে এমন কোন উদ্ধৃতি তো দেয়া হয়নি, যেখানে ছোট জাতের মুসলমান বলে কোন কথা আছে। দ্ররিদ্র বলে তাদের উপহাস অবজ্ঞা করার কোন ব্যাপার আছে। অথচ সারা বিশ্বে বোধ হয় এক মাত্র মধ্যপ্রাচ্যই আছে, যেখানে কিনা বাংলাদেশিদের মিসকিন বলে অবজ্ঞা করা হয়। তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয়, এবং প্রতিবাদ করলে, নির্দয় প্রহারে ক্ষতবিক্ষত করে জোর করে পাওনা না মিটিয়েই দেশে ফেরৎ পাঠানো হয়।
বেশিদিন আগের তো কথা নয়। সাদ্দামের শৌর্যের মুখে, এই কুয়েতিরাই লেজ তুলে পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছিল। অভাবের তাড়নায় কুয়েতি নারীরা সৌদিদের লালসার সামনে অসহায় আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছিল। দুনিয়ার অন্য কোন মুসলমান দেশ সেদিন কুয়েতের পাশে ছিল না। আজ যাদের অন্যায় অত্যাচার করে, কুয়েত থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, সেই মিসকিন দেশের সৈনিকরাই সেদিন সাদ্দামের আগ্রাসনের জবাবে চরম সাহসে রুখে দাড়িয়েছিল। হায় রে কৃতঘ্ন কুয়েতি শাসকের জাত।
শুধু কুয়েতি বলি কেন? কথা নেই বার্তা নেই, এই কয়মাস ধরেই দেখছি, বিভিন্ন অজুহাতে সৌদি আরবও প্রবাসি বাংলাদেশিদের তাড়ানোর ফন্দি ফিকির করছে। অথচ পঞ্চাশের দশকেও এই আরবরা তসবিহ আর আতর বিক্রি করতে আর হজ্ব যাত্রি জোগাড় করার জন্য বাংলাদেশে হত্যে দিয়ে পরে থাকতো। নবাবি আমলে বাংলাদেশের টাকায় গড়ে উঠা লংগরখানার খাবার খেয়ে আরবরা বেঁচে থাকতো। আর এখন আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে তেল পাওয়ার পর সব ইতিহাস ভুলে এক একজন বিশিস্ট রাজ পরিবারের বংশধর হয়ে গেছে? আর বাংলাদেশিরা হয়ে গেছে অপাংতেয় মিসকিন?
জোব্বা পরে, দাড়ি মোচের বাহার দিয়ে এই সব উগ্র ধনী মুসলমানরা বাহ্যিকভাবে যতই মুসলমান হবার ভড়ং দেখাক না কেন, এদের কান্ড কারখানা ইসলামের ঠিক বিপরীত। ভোগ আর লোভ লালসার বিচারে এদের অবস্থান এতটাই উচ্চে যে, তারা নিজেরাই নিজেদের তুলনা। রুচিতে বাধছে বলে, সেসবের পুর্ন বৃত্তান্ত দিচ্ছি না। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখতে পাই ভারতীয় এবং শ্বেতাঙ্গদের প্রতি আরবদের আচরনে। ভারতীয়দের প্রতি এদের আচরন শ্যালকের মত, আর শ্বেতাঙ্গদের প্রতি দাসসুলভ। ঘাটের মড়া আরবদের অপ্রাপ্তবয়স্কা কুমারী কন্যা সাময়িক বিবাহের সুযোগ দিয়ে ভারতীয়রা শ্যালক হবার মর্যাদা পেয়েছে। আর গণ্ডমুর্খ আরবদের আধুনিক শিক্ষা আর কারিগরি সহায়তা দিয়ে শ্বেতাঙ্গরা পেয়েছে প্রভুর মর্যাদা।
আমাদের নারী নিয়ে ব্যাবসা করার মত মনবৃত্তি নেই সত্যি। কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানে আমরা ওদের চেয়ে অনেক উন্নত। শুধু আমাদের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে আমরা পিছিয়ে আছি বলে, আমাদের দরিদ্র প্রবাসি জনগোষ্ঠিকে এহেন বঞ্চনা আর অবজ্ঞা সহ্য করতে হচ্ছে।
কুয়েতের সাধারণ মানের রেস্টুরেন্টে এক বেলা খাবারে যা দাম দেখলাম, সেটি কুয়েতি দিনারে ১ দিনার। অর্থাৎ ৩ বেলা খেলে, মাত্র ছয় দিনেই সারা মাসের বেতন কাবার। অথচ এই সামান্য বেতন দিতেও যেন তাদের বেশ কস্ট বোধ হয়। শ্রেফ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বলে প্রথমত আমাদের ঠকানো হচ্ছে, দ্বিতীয়ত নিচু শ্রেণীর মুসলামান জ্ঞান করে হেনস্থা এবং অত্যাচার করছে। যা ইসলামের দৃস্টিতে নিষিদ্ধ / হারাম।
আমাদের দেশের ওলামা মাশায়েখরাও দেখি এই আচরনের বিরোধীতা করছেন না। বাকিদের কথা নাই বা বললাম। তাই মনে হয়, এ ধরনের মুসলমানদের কেউ যদি মুসলিম উম্মা’ বলে গলাবাজি করে, তাহলে তাকে বলি, ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে।
কেননা কবিতার এই ছন্দের মত, তাদের কেরোসিন শিখার মত আচরণের পর এর চেয়ে সভ্য কোন প্রতিক্রিয়া তারা আশা করতে পারেন না।
কেরোসিন শিখা(আরব)বলে মাটির প্রদীপে(বাংলাদেশি)- ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে
হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা(আমেরিকা ইউরোপ ভারত); কেরোসিন শিখা বলে, এসো মোর দাদা
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

