আশরাফুল ইসলাম কি বুঝে বলেছেন?
ড. রোজোয়ান সিদ্দিকী
একই সাথে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সাবেক এ দুই প্রধানমন্ত্রীর আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করছেন প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। কারাবন্দী উভয় নেত্রীর মামলাগুলো দক্ষতার সাথে পরিচালনা করে তিনি তাদের বেশির ভাগ মামলার জামিন আদায় করেছেন। এ দুই নেত্রীর কেউই আজ পর্যন্ত মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে রফিক-উল হকের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলেননি। কোনো দুর্মুখও আজ পর্যন্ত এমন কথা বলেনি, যেহেতু তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্ত করার চেষ্টা করছেন, তাই শেখ হাসিনার মামলাগুলোর যুক্তিতর্ক এমনভাবে উপস্থাপন করছেন, যাতে শেখ হাসিনা জামিন না পান, বরং বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়েই তাকে একজন নির্ভরযোগ্য নিরপেক্ষ পেশাদার আইনজীবী হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার তিক্ত রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি ও তাদের মধ্যস্থতা করার জন্য দেশে কোনো নির্ভরযোগ্য নিরপেক্ষ ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না অনেক দিন ধরেই। সদ্য অবসর নেয়া প্রবীণ বিচারপতি? না। সদ্য অবসর নেয়া আপিল বিভাগের বিচারপতি? না। অন্য কোনো প্রবীণ বিজ্ঞ নাগরিক? না। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে ডেকে এনেছিলাম অস্ট্রেলীয় নাগরিক স্যার নিনিয়ানকে। তার মধ্যস্থতা? তাও না। এসব ক্ষেত্রে একদল রাজনীতিক বলছিলেন, না, এরা কেউই নিরপেক্ষ হতে পারেন না। মানি না। মানব না। সে ধরনের এক ভয়াবহ ঊষর অঙ্গনে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মতো একজনকে পাওয়া গেল, যার ওপর দুই নেত্রীই নির্ভর করেছেন। আস্থা স্থাপন করেছেন। নিশ্চিত হয়েছেন, রফিক-উল হক কারো প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব করবেন না। এটা একটা আশা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সংবাদ।
শেখ হাসিনার দলে সুপ্রিমকোর্টের বাঘা বাঘা সব আইনজীবী আছেন। তার জোটে আছেন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থরক্ষার দুনিয়া কাঁপানো আইনজীবী। তারা এতটাই প্রতাপশালী যে, প্রধান বিচারপতির দরজায় লাথি মারা, এজলাস ভাঙচুর করা প্রভৃতি অপরাধ করেও তাদের আদালতে বিচারকের সামনে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। এসব আইনজীবীর কেউ কেউ আবার বাতিল হয়ে যাওয়া ২২ জানুয়ারির (২০০৭) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন। তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা যখন গ্রেফতার হলেন, তখন তার পক্ষে লড়তে এ আইনজীবীদের কারো টিকিটিরও নাগাল পাওয়া গেল না। বরং তারা কোনো না কোনোভাবে সরকার পক্ষে উকিল হিসেবে নাম লিখিয়ে সরকারের দাসানুদাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। সে ধরনের দুঃসময়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এগিয়ে এলেন শেখ হাসিনা ও একই সাথে বেগম খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নিতে। আর উভয় নেত্রীই তার ওপর আস্থা জ্ঞাপন করলেন।
কোনো কোনো মামলায় শেখ হাসিনার জামিন ও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির স্বার্থে নির্বাহী আদেশে সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়েছে কিছু শর্তে। এ দিকে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারের দায়ের করা চারটি মামলার সব ক’টিতে জামিন লাভ করে তিনিও বেরিয়ে আসেন জেল থেকে। তাদের কারামুক্তির পর ব্যারিস্টার রফিক-উল হক দুই নেত্রীকে এক টেবিলে বসিয়ে ভবিষ্যতের রাজনীতির একটি কাঠামোগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। বেগম খালেদা জিয়া তার এ উদ্যোগকে সমর্থন দেন। বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনাও নীতিগতভাবে তার সম্মতি জানান ব্যারিস্টার হককে।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের এ উদ্যোগে আশান্বিত হয় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সুবিবেচক মানুষজন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই (ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ) প্রধান আনিসুল হকও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং তারা মধ্যস্থতা করতেও রাজি আছেন বলে জানান। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, এমনকি ওই বৈঠক হতে পারে তার বাসভবনেও।
এ ধরনের প্রস্তাব করে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও এফবিসিসিআই প্রধান আনিসুল হক কী পাপ করলেন বোঝা গেল না। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলে বসলেন, দুই নেত্রীর বৈঠকের বিষয়ে একজন আইনজীবী ও ব্যবসায়ীরাই বেশি আগ্রহী। আমি মনে করি, তাদের রাজনীতিতে নাক না গলিয়ে আইন ও ব্যবসায় থাকা উচিত।
কথাটা চমকে ওঠার মতোই। কী সাংঘাতিক এক রাজনীতিক এই সৈয়দ আশরাফ! তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাজনীতি শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরই বিষয়। এতে নাক গলানোর অধিকার নেই অন্য কোনো পেশার মানুষের। অর্থাৎ সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, একশ্রেণীর মানুষের পেশা হবে রাজনীতি, যার মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করবে। সৈয়দ আশরাফ অবশ্য এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। রাজনীতি থেকে জীবিকা আসবে কিভাবে? কর্মী-সমর্থকদের মাসিক চাঁদায় লাখ লাখ রাজনৈতিক কর্মীর পেট ভরানো যাবে? তা হলে? আশরাফুল ইসলামের মর্মে বোধকরি রয়েছে, পেশা হিসেবে রাজনীতিকে বেছে নিলে আয়ের উৎস হবে চাঁদাবাজি। অর্থাৎ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম রাজনীতিকদের এক টানে চাঁদাবাজের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। কী ভয়াবহ চিন্তা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের! তার এ বক্তব্য আরো অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সেগুলো আলোচনার আগে আমরা ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের প্রতিক্রিয়ার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারি।
ব্যারিস্টার হক বলেছেন, আশরাফুল যদি আমাকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলে থাকেন, তাহলে তিনি ভুল করছেন। আমাকে উদ্দেশ করে এ বক্তব্য দিলে তা হবে দুঃখজনক। আমি দুই নেত্রীকে এক টেবিলে আলোচনার ব্যাপারে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছি, আশরাফুলের সাথে নয়। তার সাথে আমার পরিচয়ও নেই। আমি তো ব্রিফলেস ব্যারিস্টার, সে জন্য রাজনীতির কথা বলার চেষ্টা করছি। রাজনীতিতে নাক গলানোর চেষ্টা করছি। দুই নেত্রীকে একই আলোচনার টেবিলে বসার যে প্রস্তাব দিয়েছি, তার সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। আমি দেশের মানুষের মনের কথা বলেছি। আর আইনজীবীদের রাজনীতি করা উচিত। তা না হলে জাতীয় সংসদের এক-তৃতীয়াংশ আসন খালি থাকবে। কারণ আমাদের সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে কমপক্ষে ১০০ জন আইনজীবী সংসদ সদস্য থাকেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের অনেক সভ্য দেশের সংসদে এক বড় অংশ থাকেন আইনজীবীরা।
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কোনো পাল্টা বক্তব্য দেননি এফবিসিসিআই নেতারা। না দিয়ে থাকলে ভালোই করেছেন। এ ধরনের স্ববিরোধী বক্তব্যের জন্য কারো ওপর রাগ না করে বোধহয় করুণা করাই ভালো।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ডজন ডজন আইনজীবী আছেন ও থাকবেন। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যেও আইনজীবী আছেন। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানও একজন আইনজীবী। শেখ হাসিনার আইনজীবী হিসেবেই তিনি বিশেষ কারাগারে গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা করে এসেছেন। সৈয়দ আশরাফের কথা মানলে এখনই আওয়ামী লীগ থেকে বিদায় করে দিতে হয় জিল্লুর রহমান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল মতিন খসরু, সাহারা খাতুন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দীন মাহমুদ প্রমুখ আইনজীবীকে। পারবেন সৈয়দ আশরাফুল? তেমনিভাবে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের যদি রাজনীতিতে নাক না গলাতে হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ থেকে বের করে দিতে হবে বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমানকে, যমুনা গ্রুপের নুরুল ইসলাম বাবুল, এইচআরসির সাবের হোসেন চৌধুরীসহ অসংখ্য ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তাকে। পারবেন সৈয়দ আশরাফ?
আসলে কারো সমালোচনা করতে গেলে পরিমিতিবোধের এ আকাল আওয়ামী নেতাদের কণ্ঠে অহরহই ধরা পড়ে। দর্জি যদি হৃদরোগের শল্যচিকিৎসককে সে বিষয়ে পরামর্শ দেয়, তবে তাকে নাক গলানো বলা যেতে পারে। মুচি যদি মঙ্গলগ্রহগামী নভোযানের কাঠামো তৈরির পরামর্শ দেয়, তবে তাকে নাক গলানো বলা যেতে পারে। কার্যত নাক গলানো বিষয়টি অপরের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রধানত ব্যবহার হয়।
সৈয়দ আশরাফ উপলব্ধিই করতে পারেননি যে, রাজনীতি কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপারে, ব্যক্তিগত পছন্দে নির্ধারিত হতে পারে না আপনি কোন দলের সমর্থক। সে ব্যক্তি হতে পারেন যেকোনো শ্রেণী পেশার মানুষ। আবার রাজনীতির নির্বাচনে প্রার্থী হলে ভোট চাইতে যেতে হয় সব পেশার মানুষের কাছে। দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষক-সাংবাদিক-চিকিৎসক, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী-কবি-সাহিত্যিক, গায়ক-আইনজীবী, অভিনয় শিল্পী ও বিজ্ঞানী রাজনীতি করে আসছেন। নির্বাচিত হলে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। কেউ তো কোনো দিন কোনো দেশে প্রশ্ন তুলেনি। এই প্রথম এক অল্প পানির তিত পুঁটির ফড়ফড়ানি শুনলাম আমরা।
রাজনীতিককে যে বিরাট পণ্ডিত হতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু তার মধ্যে রাজনীতির সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান থাকাটা অপরিহার্য। খুব পণ্ডিত ব্যক্তি নির্বাচনে পাস করে এসে মন্ত্রী-এমপি হবেন এমনও সচরাচর খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সাথে যদি মেধা যুক্ত হয়, তা হলে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা যেন শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে না যায়, সে দিকেও নজর রাখা দরকার। আর সে কারণেই সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোতে রাজনীতি পরিচালনার জন্য থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গঠন করা হয়। সেখান নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রাজ্ঞ, দক্ষ মেধাবী ব্যক্তিদের সমাহার ঘটানো হয়, যাতে রাজনীতি সঠিক খাতে প্রবাহিত থাকে।
রাজনীতির ওপর দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, উৎপাদন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধি সব কিছু নির্ভরশীল। সঠিক রাজনীতি, সঠিক সিদ্ধান্ত, মেধা-প্রজ্ঞার সমন্বয়ের মাধ্যমেই দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। আর রাজনীতি পেশা নয়, সেবা। আশা করি আওয়ামী লীগের বিজ্ঞ ও মেধাবী ব্যক্তিরা দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদককে এ বিষয়ে খানিক বিদ্যাবুদ্ধির জোগান দেবেন। (সুত্র. নয়া দিগন্ত, ০৯/১০/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



