সিইসি’র চেয়ারে অপ্রিয় আজিজ বনাম প্রিয় হুদা
মিনার রশীদ
বছর দুই আগের কথা। ১-১১ এর আগের সেই অগ্নিঝরা দিন! বিবিসি থেকে প্রচারিত বাংলা অনুষ্ঠান চলছে। তাতে এক দোকান মালিক সমিতির নেতার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হচ্ছে। দোকান মালিকরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখনকার সিইসি এম এ আজিজ এ চেয়ারটি না ছাড়লে তার কাছে তারা কোনো সওদা বিক্রি করবে না। দোকান মালিক সমিতির এই প্রতিজ্ঞার কথা বিবিসি ইথারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আঁতকে ওঠার মতো সংবাদ বটে। ব্যাপারটি কতটুকু গুরুতর ছিল যে বিবিসি তার মহামূল্যবান এয়ারটাইম খরচ করে তা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে। এটা যে একটা সার্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়েছে তা বোঝাতেই ‘নিরপেক্ষ’ বিবিসি তা করেছে।
দেশের নামী-দামি বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে মফস্বলের চা দোকানে বিনা পয়সায় বুদ্ধি বিলানো যেসব বুদ্ধিজীবী রয়েছেন তাদের সবার মুখে তখন একই উচ্চারণ, ‘নাহ্! এই অ-নিরপেক্ষ আপদকে জাতির ঘাড় থেকে সরাতেই হবে। এসব বুদ্ধিজীবীর কেউ কিন্তু কোনো দলের পক্ষে নয় নেহাত নিরপেক্ষ অবস্থান থেকেই এই নিরপেক্ষ আওয়াজটি তুলেছিলেন।
এই সময়টিতে জনতা আসলেই জেগে উঠেছিল। এই জাগ্রত জনতা বা আওয়ামী লীগ বঙ্গভবনে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। ভাগ্যিস! স্রষ্টা কিছু আবশ্যকীয় জিনিসের নিয়ন্ত্রণ বুদ্ধি করে নিজের হাতে রেখে দিয়েছিলেন। তাই বেচারা প্রেসিডেন্টের মতো তার অনেক বান্দার জীবন রক্ষা পেয়েছে। ফলে এসব বায়বীয় হুমকি তেমন কোনো বিপদের সৃষ্টি করতে পারেনি।
তবে একটা হুমকি ঠিকই কাজ করেছে। জাতিসঙ্ঘের প্রধান দেশের নাজুক পরিস্থিতির ব্যাপারে তার উৎকণ্ঠা জানিয়ে একটি সাধারণ চিঠি দেন। সেই চিঠি জাতিসঙ্ঘের আবাসিক প্রতিনিধি রেনাটা লক দেসালিয়ান নিজের মনের মতো ট্যাম্পারিং করলেন। অর্থাৎ মনিবের নাম নিয়ে তার এই আমলা বা কামলা এখানে একটা অভিনব ক্যু করে বসেন। তখন কামলার এই কৃতিত্ব দেখে মনিবও চুপ মেরে যান। মনিবের হয়ে তিনিই হুমকি দেন, এই দেশে ২২ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন হলে শান্তি মিশনে এ দেশের কোনো সৈনিক নেয়া হবে না। এমন একটি মধুর হুমকির জন্য এ দেশের অনেকেই যেন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল। তার পরের ইতিহাস তো সবার জানা। দেশে-বিদেশে এই ঘটনাটি জাতিসঙ্ঘ ক্যু বা দেসালিয়ান ক্যু নামে পরিচিতি পেয়েছে।
দেখা গেল আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী এই সেনাবাহিনীর রিমোট কন্ট্রোলটি এসব বিদেশী দেসালিয়ান ও দেশীয় (বুদ্ধিবৃত্তিক) দেউলিয়াদের হাতে পড়ে গেছে। জাতিসঙ্ঘ আরো নগ্নভাবে সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দোসরদের হাতের পুতুল সেজে বসেছে। এই বিশ্ব ক্লাবটির সাথে বিশেষ কানেকশনের সুবাদে কোনো বৈরী প্রতিবেশী কিংবা এই ক্লাবের কোনো কামলার সাথে বিশেষ সখ্য স্থাপন করে এ দেশের বৃন্তচ্যুত কোনো সুশীল গোষ্ঠী আমাদের সেনাবাহিনীকে তাদের ছকমতো কাজ করাতে সক্ষম হয়ে পড়বে। এই প্রক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের শান্তি মিশনটি এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অস্ত্র বনে গেছে।
তার পরও একটা চক্ষুলজ্জার ব্যাপার রয়েছে। সেটুকু কাজে লাগিয়ে জাতিসঙ্ঘের কাছে তার এই কাজের ব্যাখ্যা চাওয়া দরকার। শান্তি মিশনের মুলা ঝুলিয়ে বা তার ভয় দেখিয়ে এভাবে কোনো দেশের গণতন্ত্রকে তছনছ এবং দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে না। জাতিসঙ্ঘের চার্টারের সাথে এ কাজ সামঞ্জস্যশীল নয়। সেই একই কামলা আজ ফতোয়া দেয় যে জরুরি আইনের মধ্যেই নির্বাচন করা সম্ভব। ব্যারিস্টার রফিক এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ দেশের সব মানুষের কণ্ঠ তার এই কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।
এই রিমোট বাটনটি টিপেই সেনাবাহিনীকে পেছনে রেখে সামনে কিছু সুশীল ড্রাইভার বসিয়ে আজব কিসিমের একটা সরকার বসিয়ে দেয়া হলো। অপ্রিয় আজিজরা সরে গিয়ে প্রিয় হুদারা সামনে এগিয়ে এলেন।
এম এ আজিজের বড় অপরাধ তিনি নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছেন। তিনি বিএনপি’র খাস লোক। অথচ এই বিচারপতির পেশাগত জীবনে কখনোই কোনো দুর্নাম শোনা যায়নি। বিচারক জীবনের কোনো রায় নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়নি বরং তার অনেক রায় প্রশংসিত হয়েছে। তবে তার দুর্বলতা ছিল তিনি সুশীলদের মতো এত বাকপটু ছিলেন না। তার দ্বারা কোনো অন্যায় সংঘটিত হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেল, এই লোক নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন না। তার ঠোঁটের কোনো কথা নিয়ে নয় বরং তার মনের মধ্যে কী লুকিয়ে আছে সেটা নিয়েই বাজার গরম করে ফেলা হলো।
বিএনপি এ দেশের মিডিয়া জগতে সর্বত্র বঞ্চনার শিকার। আর সেই তথাকথিত নিরপেক্ষ ইমেজটিই ব্যবহার করা হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে তারা কোনো কার্যকর প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারেনি।
তখন আমরাও বারবার বলেছি এই মারাত্মক খেলার পরিণাম নিয়ে। আমাদের সেই সাবধান বাণী গুমরে ফিরেছে। ধরে নিলাম, বিচারপতি আজিজ বিএনপি মানসিকতার লোক ছিলেন। প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমদও আওয়ামী মানসিকতার লোক ছিলেন। তার পরও তিনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছেন। কারণ তিনি সৎ ছিলেন। আমাদের দরকার ছিল এই সততার। এই সততাকেই আমরা ‘নিরপেক্ষতা’ মনে করে তা কামনা করে এসেছি। সততা ও নিরপেক্ষতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। তাই সব সৎ মানুষ নিরপেক্ষ হলেও সব নিরপেক্ষ মানুষ সৎ হয় না।
কারণ পাগল ও শিশু ছাড়া কোনো মানুষই নিরপেক্ষ নয়। এক নেত্রীর এই কথাটি তখন মানা সম্ভব না হলেও এখন মেনে নেয়া সহজ হয়েছে। নিরপেক্ষ লোক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার নমুনা একেক করে উন্মোচিত হয়েছে।
বিএনপি’র পছন্দের লোককে যদি আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে না পারে তবে আওয়ামী লীগের পছন্দের লোককে পরবর্তীকালে কিভাবে বিএনপি গ্রহণ করবে? এই সহজ কথাটি তখন বোঝানো যায়নি। যে নিয়োগ করবে তার পছন্দ সেখানে থাকবেই। এটাই বাস্তব সত্য। আওয়ামী লীগ যখন এসব নিয়োগ দিয়েছে তারাও নিজেদের সুবিধার কথা ভেবেই তা করেছে। এ বিবেচনায় শুধু শক্ত আওয়ামী সমর্থক হলেই চলেনি কাউকে কাউকে খোদ গোপালগঞ্জের অধিবাসীও হতে হয়েছে।
সিস্টেমের এই অনিবার্য ত্রুটিটুকু মানতে না পারলে পৃথিবীতে কোথাও গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। এই ত্রুটিটুকু নিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করতে হবে। গণতন্ত্রের বিকাশের সাথে সাথেই এই ত্রুটির মাত্রাটুকু কমে আসবে। কাজেই এই জেদ গণতন্ত্রের জন্য কতটুকু আত্মধ্বংসী ছিল তা আজ আরো স্পষ্ট হয়েছে। আমাদের দরকার ছিল, সিস্টেমকে নিরপেক্ষ করা, ব্যক্তিকে নয়। কিন্তু সব যুক্তিকে পায়ে ঠেলে আমাদের রাজনীতিকে এসব চক্র ভুল পথে ধাবিত করে।
এখন অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর পাওয়া এই প্রিয় হুদার নিরপেক্ষ কাজকর্মের দিকে একটু দৃষ্টি বুলাতে পারি। ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি বিএনপিকে নিরপেক্ষ করার কাজে হাত লাগান। মান্নান ভূঁইয়াকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলে তার এই ‘নিরপেক্ষ’ হৃদয়টি কেঁপে ওঠে। তার হৃদয়ের সেই কম্পনটি ঠোঁটেও ফুটে ওঠে। একটি দলের গঠনতন্ত্র ঠিক করবে বা সংশোধন করবে সেই দলের সদস্যরা। কিন্তু এখানেও তিনি তার পদ ও পদবি ভুলে গিয়ে যে মন্তব্য করেন তাতে বিএনপি’র প্রতি তার এই নিরপেক্ষ দরদটি স্পষ্ট বোঝা গেছে। তিনি ডকট্রিন অব নেসেসিটির কথা বলে মেজর হাফিজকেই জেনারেল সেক্রেটারি ভেবে বসলেন এবং তাকেই সংলাপের চিঠি পৌঁছে দেন। আবার এই সংস্কারবাদীরা টেকনিক্যাল জটিলতায় বৃন্তচ্যুত হয়ে পড়লে বিএনপি’র ‘ঐক্যের’ জন্য তিনি নিজেও উদগ্রীব হয়ে পড়েন। প্রথমে পুরো বিএনপিকে হাইজ্যাকের প্রচেষ্টা, তাতে ব্যর্থ হয়ে নিদেনপক্ষে ভেঙে দুর্বল করা, তাতেও সফল না হলে নিজেদের এজেন্ডাগুলো আবার আগের মতো সেঁটে দেয়ার মধ্যে এই সিইসি’র প্রচেষ্টা অত্যন্ত নগ্নভাবে ধরা পড়েছে। তার অনেক মন্তব্য এ ব্যাপারে জ্বলন্ত সাক্ষ্য হয়ে আছে।
অন্য দিকে আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপের দিন তিনি একেবারেই গলে যান। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো দলের সম্মুখে নির্বাচন কমিশনের এমন গলন প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়েছে কি না তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। তাদের জন্মের জন্যও আওয়ামী লীগের প্রতি সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান। তখন তার এই তরলবদ নিরপেক্ষ চেহারা ও উচ্চারণ আবারো সবার দৃষ্টিতে পড়েছে। কিন্তু দেখা গেল তিনি সব সময় তরল নন। তার কঠিন হতে সময় লাগে না। বিশেষ একটি দল বা জোটের সামনে এলেই তার ভেতরে ঘনীভবন ক্রিয়াটি সংঘটিত হয়ে যায়। জনগণ বুঝে যায় এই নিরপেক্ষ মানুষটির সবচেয়ে ঘৃণার জায়গাটি। সে দিন তিনি টিভি ক্যামেরার সামনে নিজেকে পুরোপুরি খুলে দেন। হুজুর শব্দটি অত্যন্ত সম্মানের হলেও প্রায়ই এটির ব্যবহার হয় কারো প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করার জন্য। মুসলিমপ্রধান এই দেশে মওলানা ভাসানীসহ অনেকেই এই বেশে রাজনীতি করে গেছেন। তবে এই বেশ ও শব্দের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ বৃন্তচ্যুত শেকড়ছেঁড়া হুদা সাহেবদের একটা চিরাচরিত ফ্যাশন। নিজের শেকড়কে অবজ্ঞা করার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এই হুদারাই বহন করে চলেছে। এদের এই ফ্যাশনটি সহনশীল এ দেশের মানুষ সহজভাবেই মেনে নিয়েছে। কিন্তু সমস্যা করেছে হুদা সাহেবের এই চেয়ারটি।
তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস যা হোক এই চেয়ারে বসার পর তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি এভাবে অবজ্ঞার স্বরে কথা বলতে পারেন না। তিনি বসে আছেন এমন একটি চেয়ারে যেখান থেকে নিজের পছন্দ-অপছন্দটি গোপন রাখা অতীব জরুরি হয়ে পড়ে। তা ছাড়া এই পদের একটি নিজস্ব ওজন রয়েছে। এই চেয়ারটি এর চেয়েও হালকা এর আগে কখনো হয়েছে কি না জানি না ।
একজন মানুষের শিক্ষা, রুচি, মন ও মননের পরিচয় মেলে যখন রেগে যান তখন তার আচরণ দেখে। এই বিবেচনায় তার এই উচ্চারণ ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবাইকে শঙ্কিত করে তুলেছে। তার এই আচরণ ও উচ্চারণে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেউলিয়া তার সমগোত্রীয় কিছু মানুষ পুলকিত হলেও সারাদেশের প্রজ্ঞাবান ও প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ মানুষ হতাশ হয়েছে। এম এ আজিজকে ওপরে তোলা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তাকে সরিয়ে যাকে আনা হলো তিনি অবশ্যি আগের চেয়ে বেশি নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করবেন এটাই কাম্য ছিল। আজিজের পরে নিরপেক্ষতার এই স্যাম্পলই যখন আনা হলো তবে জাতির জীবন থেকে দু’টি বছর কেড়ে নেয়া হলো কেন?
জানি না সে দিন এম এ আজিজকে সরানোর জন্য যে নিরপেক্ষ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা এ ব্যাপারে কী ভাবছেন? এম এ আজিজ কি কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রতি তার ভালোবাসা ও ঘৃণা এমন স্পষ্ট করে কখনো প্রকাশ করেছিলেন? এ ব্যাপারে আরো চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বাধা কোথায়?
প্রধান উপদেষ্টাও প্রায়ই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। খুবই মধুর লাগে তা শুনতে। কিন্তু সেই জ্ঞানভিত্তিক সমাজটি কি যুক্তির ওপর চলবে, নাকি শক্তির ওপর নির্ভর করে? যদি যুক্তিই এই জ্ঞানভিত্তিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি হয় তবে জানতে ইচ্ছা করে আজিজকে যেতে হলে এই হুদাকে যেতে হচ্ছে না কেন?
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



