জরুরি এই সরকার আসলেই কার?
মিনার রশীদ
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের চেতনা ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তা না হলে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট থাকার পরও গ্রেফতার না করে সরকার তার সাথে বৈঠক করে কিভাবে। তিনি বলেন, জামায়াতের সাথে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার না করে বসে থাকার কথা নয়।’ কিছু দিন ধরে আওয়ামী মিডিয়ায় এ নিয়ে একটি ওয়ার্মআপ লক্ষ করা যাচ্ছিল। বর্তমান সরকার শুধু চারদলীয় জোটের নয়, খোদ জামায়াত সমর্থিত এই দাবিটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সার্কেল প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। এটাই আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব যে ভুল হোক বা শুদ্ধ হোক এরূপ যেকোনো কথা প্রচার হয়ে গেলে তাদের টপ থেকে বটম পর্যন্ত সবাই তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং তার প্রচারে কেউ কখনো ক্লান্ত হন না।
১৯৯১ সালের নির্বাচনটি ছিল সূক্ষ্ম কারচুপির, ২০০১ সালেরটি হলো স্থূল কারচুপির। এখন সামনেরটির ফল যদি ঘটনাক্রমে তেমনই হয়ে পড়ে, তবে তা হবে পবিত্র বা বিশুদ্ধীকরণের ষড়যন্ত্র। এই সরকার এসেছে জোট সরকারকে ধুয়ে মুছে সাফসুতর করার জন্য। লন্ডনপ্রবাসী হেভিওয়েট কলামিস্ট থেকে বটতলার পত্রলেখক সবাই এই বিষয়টি প্রচার করছেন। তাদের কথামতো একজন বালকও বুঝে গেছে এই জরুরি সরকারের জরুরত এই কারণেই ঘটেছিল ।
দুই নেত্রীর সংলাপের কথা উঠলে হাসিনা বলেছেন, তার প্রতিপক্ষকে সাফসুতর করার জন্যই তার সাথে সংলাপে বসানোর চেষ্টা চলছে। সরকার দু’নেত্রীকে পাশাপাশি দু’টি বাড়িতে আটক রেখেছিলেন। এর ফলেই আওয়ামী লীগ বা হাসিনার সন্দেহের এই ‘শুদ্ধীকরণ’ প্রক্রিয়া কিছুটা সংঘটিত হয়ে যাওয়ার কথা। খালেদার ভেতর যে ভালোমানুষিটুকুর উদয় হয়েছে তার কৃতিত্বও সঙ্গত কারণেই হাসিনা দাবি করতে পারেন। এটাকে কটাক্ষ করে বদরউদ্দীন উমর লিখেছেন, এক বুড়ি আরেক বুড়িকে নানী বলতে চায়। তাতে ক্ষেপে যান লন্ডনের হেভিওয়েট কলামিস্ট এবং সম ওজনের একটা ঘুষি বিভ্রান্ত বামপন্থী উমরের দিকে ছুড়ে দেন। জানলাম যে আগের জমানায় এই উমর ছিলেন একজন মৌলবাদী যুবক। হাসিনাকে খোঁচাটি না দিলে উমরের পূর্ব ইতিহাস আমাদের জানা হতো না। তবে এ সংক্রান্ত উমরের জবাবটি এখনো চোখে পড়েনি।
এসবের ধারাবাহিকতায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বক্তব্যটি রেখেছেন। যারা বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু খোঁজখবর রাখছেন এবং মোটামুটি মাপের একটা মেমরিকার্ড মগজে লাগানো রয়েছে, তারা সত্যিই বেকায়দায় পড়ে গিয়েছেন। সবার মনে একই জিজ্ঞাসা, এই সরকার আসলে কার? সবার জানা আছে ‘সখী তুমি কার’ নামে একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা ছিল। সখী শব্দটির জায়গায় পছন্দমতো শব্দ বসিয়ে মনের হতাশা, ক্রোধ, আকাঙ্ক্ষা, পুলক বা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা সম্ভব । সর্বশেষ এর ব্যবহার হয়েছে বর্তমান নিরপেক্ষ সরকারের প্রযোজনায় ও তার স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সরাসরি পরিচালনায় বিএনপি হাইজ্যাক নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার সময়।
তখন সঙ্গত কারণেই কিছু পত্রিকা অত্যন্ত উল্লসিত হয়ে পড়ে। অত্যধিক পুলকিত আওয়ামী বলয়ের একটি কাগজ সব সংযমের বাঁধ ভেঙে সর্ববৃহৎ লাল অক্ষরে শিরোনাম দেয়, বিএনপি তুমি কার? যা হোক এই আচমকা ধাক্কায় একেবারে ভূমিসাৎ বিএনপি এই প্রশ্নটির জবাব দিতে খুব বেশি সময় নেয়নি । তাতে এ দেশের রাজনীতিতে ডকট্রিন অব নেসেসিটি তত্ত্বের উদ্ভাবক শামছুল হুদাও বুঝতে পেরেছেন যে বিএনপি আসলেই কার। মাঝখান থেকে বিপদে পড়েছে সামনে ঠেলে দেয়া ওই সব হাইজ্যাকারের অনেকেই ।
সবার জানা আছে, লগি-বৈঠার তাণ্ডবের মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী এ দেশের রাজনীতিতে এক-এগারো নামে একটি অভিনব খাল কেটে এনেছিলেন। আশা ছিল তা দিয়ে তাদের নিজেদের নৌকাটি আরাম করে ভেসে আসবে। কিন্তু দেখা গেল তাদের সেই কাটা খাল দিয়ে কুমিরটি চলে এসেছে। অর্থাৎ খাল কেটে এই কুমির তারাই এনেছেন। এখন তার দায়টি চাপাতে চাচ্ছেন এই কুমিরের আক্রমণে যারা বেশি আহত হয়েছেন, তাদের ওপর । অনেক ভিডিও ফুটেজ ও পত্রিকার বিবৃতিতে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তাদের নতুন উদ্ভাবিত ‘ পবিত্রকরণ বা বিশুদ্ধীকরণ ’ তত্ত্বের সামনে এসব প্রমাণ কিছুই নয়।
এই জরুরি সরকার গত দুই বছর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এখন কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি দমনের নামে রাজনীতির দমনপ্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। ব্যবসায়ীদের মাঝে যে প্যানিক সৃষ্টি করা হয়েছিল তার ধকল দেশ এখনো সামলিয়ে উঠতে পারছে না। সব মিলিয়ে দেশকে প্রায় ২০ বছর পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। সব পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এই সরকার জনগণের সচেতনতার উত্তাপ কিছুটা টের পেয়েছে। বড়পুকুরিয়া মামলাটি সম্পর্কে এই সরকার নিজেই সম্যক অবগত। প্রথম যে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছিল তার তদন্ত রিপোর্ট যখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন তাকে পরিবর্তন করে ফেলা হয়। কাজেই এর মাধ্যমে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ হাইকোর্ট এই মামলাটি তিন মাস স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ এই মামলাটি নিয়েই বিরোধী দলের এক নেতাকে এভাবে মিডিয়া থেরাপি বা আওয়ামী থেরাপি দেয়া হচ্ছে। এই সরকার আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে যত মামলা করেছে, তা সব সাজানো। আর চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে যা করে তার সব খাঁটি। দেশের সবচেয়ে পুরনো দল আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা মানসিকতাই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অ্যাসেট।
যে অবৈধ সরকারকে ও তার সব কাজকে বৈধতা দেয়ার জন্য তারা সেই প্রথম থেকেই এক পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাংবিধানিকভাবে ও আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ সেই সরকারের একটি কাজ নিয়ে আওয়ামী বলয়ের এই ‘জাত গেল’ ‘জাত গেল’ রব সবাইকে চিন্তিত করে তুলেছে। তারা এই শব্দ দিয়েই সম্ভবত অন্য কিছু গোপন করে ফেলতে চাচ্ছেন।
পুরো বিষয় বা দৃশ্য থেকে খণ্ড বিষয় বা দৃশ্য উপস্থাপনের তাদের সেই পুরনো কৌশলটি এখানেও সক্রিয়। কারো সম্পর্কে মন্তব্য করতে হলে তার জন্ম পটভূমি, বিস্তৃত কর্মপরিসর ও সর্বশেষ অবস্থান বা ফলাফল জেনেই মন্তব্য করতে হয়। এ বিবেচনায় এ জরুরি সরকারের জন্মদাতা ও পালনকর্তা হিসেবে তারাই চিহ্নিত হয়েছেন। এই দাগ মুছে ফেলা এখন তত সহজ হবে না। তা দেখেই আওয়ামী লীগের এক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাও শেষমেশ স্বীকার করেছেন, এই সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল নয় পরিণতি মাত্র। জানি না এই নেতার এই বোধোদয়টি বাকিরা সম্যক উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন কি না।
এই সরকারের প্রকাশ্য এজেন্ডার সাথে সাথে কিছু গোপন এজেন্ডা ছিল, নিরপেক্ষ নাম নিয়ে আসা এই সরকারেরও একটা পক্ষ ছিল।
বিষয়টি আজ সব মহলে স্পষ্ট হয়েছে। জনগণের সচেতনতার উত্তাপ পেয়ে সরকার তার নিজস্ব ও মূল এজেন্ডা নিয়ে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। এখন সরকারের সামনে দু’টি অপশন অবশিষ্ট রয়েছে। এক. সুশীল ঘরানার কাছাকাছি বা তাদের অধিকতর পছন্দের দলটিকে কোনোভাবে ক্ষমতারোহণে সহায়তা করা। তবে এই কাজটি বর্তমানে ততটুকু নিরাপদ হবে না। বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বিবেচনায় কাজটি দুরূহ হতে পারে। জনগণের সচেতনতার এই তাপ স্বভাবতই সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও অনুভূত হচ্ছে। কাজেই এ ব্যাপারে সেখান থেকেও একটা চাপ কাজ করে থাকতে পারে। ফলে এখন দুই নম্বর অপসনটি নিয়ে ভাবা এই সরকারের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। আর তা হলো সত্যিকার অর্থেই একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। সে জন্য চারদলীয় জোটের সাথে এই সরকারের ইতোমধ্যে খারাপ হওয়া সম্পর্কটি উন্নয়ন বা স্বাভাবিক করার দরকার হয়ে পড়েছে। আগের হঠকারী অবস্থান থেকে সরকারের এই পিছু হঠাকেই এখন টার্গেট করেছে আওয়ামী বলয়। তারা চায় আওয়ামী স্ট্যান্ডার্ডে নিরপেক্ষ সরকার। প্রকৃত নিরপেক্ষতা কখনো তাদের কাম্য নয়। যে কারণে অনশনের হুমকি দিয়ে বানানো প্রেসিডেন্ট, বিশেষভাবে বাছাই করা প্রধান উপদেষ্টা এবং খোদ গোপালগঞ্জের সিইসি’র নিরপেক্ষ ভূমিকাকেও সহ্য করতে পারেনি। একই মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, তাদেরই সৃষ্ট ও তাদের মাধ্যমেই পরিপুষ্ট এই সরকারকে নিয়েও।
হঠকারী অবস্থান থেকে প্রকৃত নিরপেক্ষতার দিকে সরকারের সরে আসার এই প্রচেষ্টা আওয়ামী লীগ বা সেই জোটের পছন্দ নয়। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সরকারকে তারা সমর্থন ও বাহবা দিয়েছিল কার্যত তার কিছুই হয়নি। বিএনপিকে ভাঙতে গিয়ে রাজনীতির এই আনাড়ি খেলোয়াড় তাকে আরো শক্তিশালী করে দিয়েছে। চারদলীয় জোট আগের চেয়ে আরো মজবুত হয়েছে। মাঝখান থেকে বিএনপিতে যে এজেন্ট সেট করা হয়েছিল এই ব্যর্থ অভিযানে তাদের আগের অবস্থান ও কার্যকারিতা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। বিএনপিতে বসে বা জাতীয়তাবাদী মধু খেয়ে যারা আওয়ামী রাজনীতি করত তারা চিহ্নিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বলয়েও এর প্রভাব পড়বে বলে অনুমিত হচ্ছে। এখনকার বিএনপি আগের বিএনপি’র চেয়ে আরো শক্তিশালী রূপে সামনে আসছে।
প্রত্যেক কারবালার পরেই নাকি ইসলাম জিন্দা হয়। তেমনি দেখা যাচ্ছে এরূপ প্রতিটি রাজনৈতিক কারবালার পর জাতীয়তাবাদী শক্তি আরো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করে এই চক্রান্তকারীরা ভেবেছিল এই শক্তি শেষ হয়ে গেছে। দেখা গেল পরের দিনই তা বাউন্স করেছে। দেশের এই প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে সমগ্র জাতির সেই ক্রোধ ও প্রতিক্রিয়া দেখে এরা ভয় পেয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে সেই জল্লাদকে হত্যা করে আসল ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের আড়াল করতে সক্ষম হয়।
জাতীয়তাবাদী শক্তির ওপর দ্বিতীয় আঘাতটি এসেছে তথাকথিত এক-এগারোর মাধ্যমে। দেখা যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী শক্তির অপকার করতে এসে প্রকারান্তরে উপকার করে দিয়েছে। এতে সেই কারবালার হোতাদের মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে । কোনো কিছুই তাদের গণনামতো ঘটছে না। এরা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে ধাক্কা মেরে যে কুয়ায় ফেলেছে দেখা যাচ্ছে তা-ই মধুর ফোয়ারা হিসেবে পরিবর্তন হয়ে গেছে।
হাজারো সমস্যায় ভারাক্রান্ত তৃতীয় বিশ্বের সব সরকারের প্রতি সেসব দেশের জনগণের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। দেখা যায়, বিপুল জনপ্রিয় সরকারও মেয়াদের শেষপ্রান্তে একেবারে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে। বর্তমান জরুরি সরকারের প্রতি এই রাসায়নিক বিক্রিয়াটি ঘটেছে আরো দ্রুতগতিতে। কোন পক্ষটি বেশি কাছাকাছি ছিল তা-ও জনগণ বেশ ভালোভাবেই মাপতে পেরেছে। জনগণের এই পরিমাপক যন্ত্রটি সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল নন। চারদলীয় জোটের প্রতি স্বাভাবিক সেই ক্ষোভের পরিমাণটি কমে গিয়ে এখন জনস্রোত ঘুরে যাওয়া স্বাভাবিক। ২০০৬ সালে জনস্রোতটি যতটুকু আওয়ামী লীগের অনুকূলে ছিল এখন তা সেই অবস্থায় নেই তা বুঝতে এখন একজন আওয়ামী বালকেরও বোধ হয় কষ্ট হচ্ছে না। এই বাস্তব উপলব্ধিটুকুই সম্ভবত ‘বিশুদ্ধীকরণ তত্ত্ব’ নামে বাজারে আসছে । সময়ই বলবে তা এখন কতটুকু কাজে লাগে। (সুত্র.নযা দিগন্ত, ২৭/১০/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



