রাজার পরনে পিরান নাই
মাহমুদুর রহমান
বাল্যকালে পড়া গল্পটি এ যুগের বালক-বালিকাদেরও হয়তো বা জানা। এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা, যার ভয়ে বাঘে-মহিষে একসাথে পানি পান করে সেই রাজা পারিষদবর্গ নিয়ে সদর রাস্তা দিয়ে শহর পরিভ্রমণে বেরিয়েছেন। সর্বযুগে আমাদের চিরচেনা তোষামোদকারী পারিষদবর্গ রাজার পরনের পোশাকের সৌন্দর্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রাজাও তার উচ্চমানের রুচির তারিফ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন। এমন সময় রাস্তার পাশে দণ্ডায়মান নতশির প্রজাদের মধ্য থেকে এক নির্মল শিশু চিৎকার করে বলে উঠল, রাজা দেখি নেংটা। প্রকৃতপক্ষে সে দিন রাজা কোনো রকম পোশাক না পরেই তার রাজ্য পরিদর্শন করতে বের হয়েছিলেন। মধ্য পঞ্চাশের জীবনে পৌঁছে গল্পের এই অংশটুকুই কেবল স্মরণে আনতে পারছি। আজকের বাংলাদেশ সংবিধানবহির্ভূতভাবে যারা অধিকার করে বসে আছেন তাদের মধ্যে গল্পের সেই নেংটা রাজাদেরই আধিক্য। আমাদের অতি মুখচেনা পারিষদবর্গ আগের মতোই রাজাদের পরনে যে কাপড় আদতেই নেই সেই অদৃশ্য কাপড়েরই বুননশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রশংসার ফুলঝুরি ছোটাচ্ছেন। সবই আগের মতো রয়েছে। এখন অপেক্ষা করে আছি সেই সত্যবাদী, সাহসী শিশুদলের জন্য যারা সমস্বরে বলে উঠবে, রাজা তুমি নেংটা।
এক-এগারো পরবর্তী বাংলাদেশের রাজাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা তার দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি নাকি জাতীয় বেঈমান হতে চান না। এই ঘোষণা দিয়েই তিনি বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বিএনপিকে বিভক্ত করার অতি প্রয়োজনীয় কাজে। তার উদ্ভাবিত ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ তত্ত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে জন্ম দেয়া হয়েছিল সাইফুর-হাফিজ ব্র্যাকেটবন্দী এক বিকলাঙ্গ দলের যে দলটি আঁতুড় ঘরেই মৃত্যুবরণ করেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটভুক্ত যেকোনো পাতিনেতাও তার কার্যালয়ে সাক্ষাতের জন্য গেলে আনন্দের আতিশয্যে তিনি প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়েন। বিনয়ে বিগলিত ড. হুদা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকের দিনে তো আর একটু হলে জনাব তোফায়েল আহমেদের পদস্পর্শ করে দোয়া নিয়ে ফেলেছিলেন। দেশবাসী রক্ষা পেয়েছে যে সেই দৃশ্য টেলিভিশনে তাদের দেখতে হয়নি। বছরাধিককাল ধরে নির্যাতনসহ নানা কৌশল প্রয়োগ করেও যখন বিএনপিকে বিভক্ত করা সম্ভব হলো না তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে তার ভুল স্বীকার করলেন এবং বললেন, সাইফুর-হাফিজ নামক ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ বিএনপিকে নির্বাচন কমিশন কতৃক প্রকৃত বিএনপি’র স্বীকৃতি দেয়া নাকি নিছকই একটি দুর্ঘটনা ছিল। এর পরও তার ভাষ্য অনুযায়ী তিনি এখনো জাতীয় বেঈমান হননি। সততা ও দক্ষতার প্রতিভূ ড. ফখরুদ্দীন সরকারের ‘স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ’ নির্বাচন কমিশনের প্রায় দুই বছরব্যাপী কর্মকাণ্ডের নির্মোহ বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এই সময়ের মধ্যে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার কাজ হয়েছে। তবে দুঃখিত, এই ভালো কাজটির কোনো রকম কৃতিত্ব নির্বাচন কমিশনকে দিতে পারছি না। কারণ কাজটি করে দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ভোটার লিস্ট সেনাবাহিনীর কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন। ভুল বললাম। আরো কিছু কাজ তারা করেছেন। ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রস্তুতকালীন নির্বাচন কমিশনের ত্রিমূর্তি বারকয়েক সারাদেশকে জানান দিয়ে রাজধানীর পাঁচতারা হোটেলে খানাপিনা করেছেন। পারস্পরিক পিঠ-চুলকানোর এসব অনুষ্ঠানে ড. হুদার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের বিতর্কিত কূটনীতিকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত কথিত কূটনীতিবিদ মিজ রেনেটা ডেসালিয়ান। জাতিসঙ্ঘের আবাসিক প্রতিনিধিকে কথিত কূটনীতিবিদ নামে অভিহিত করছি এই কারণে যে, স্বয়ং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী তাকে কূটনীতিকের মর্যাদা দিতে অস্বীকার করেছেন। । ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন প্রকৃতপক্ষে বিতর্কিত সব কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রতি পদে জনগণের প্রত্যাশিত নির্বাচনকে দুরূহ করতে চেয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যে নির্বাচন কমিশনকে আইনি জটিলতায় পড়তে হবে এই সহজ বিষয়টি প্রশাসনে একজন প্রবেশনারি (Probationary) কর্মকর্তারও বোঝার কথা। কিন্তু সাবেক সচিব ড. শামসুল হুদা সেটি বোঝেননি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বুঝতে চাননি। অনেক পানি ঘোলা করে শেষ পর্যন্ত নভেম্বরের ২ তারিখেই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তফসিল ঘোষণা করলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এই বিষয়টিও যথেষ্ট রহস্যজনক। সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে মামলা চলাকালীন অবস্থায়ই অনেকটা জ্যোতিষীর মতো ড. হুদা আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ২ তারিখেই নির্বাচনের তফসিল জানাবেন। হয়েছেও তাই। এখন আমার মতো সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত কোনো নাগরিক যদি ধারণা করে বসেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগে থেকেই উচ্চআদালতের রায় প্রদানের দিনক্ষণ এবং রায়টি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন তাহলে সরকারের স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি কি লজ্জাকরভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে না? ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই তথাকথিত রোডম্যাপ ঘোষণার সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, ‘দল নিবন্ধনের জন্য আমাদের শেষ সময় হচ্ছে ২০০৮ সালের ৩০ জুন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোকে আর আমরা সুযোগ দিতে পারব না।’ অথচ দল নিবন্ধনের সাথে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করতেই ড. হুদা সময় নিয়েছেন বর্তমান বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করে ৩০ অক্টোবর। আজও পর্যন্ত দল নিবন্ধনের সেই কাজটি সম্পন্ন হয়নি। এখন নির্বোধের মতো বলা হচ্ছে, এমনকি মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগের দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেয়া হতে পারে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে যে দলটি জানতে পর্যন্ত পারবে না যে তারা আদৌ নিবন্ধন পাবে কি না সেই দলের পক্ষে কেমন করে মনোনয়ন দেয়া সম্ভব সেটি আমার মাথায় ঢুকছে না। অবশ্য এটি তো আর যার তার মাথা নয়, ডক্টরেটের মাথা বলে কথা। সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত আইনি জটিলতা এবং তার সমাধানের তরিকা তো আমরা দেখেই ফেলেছি। এখন দল নিবন্ধনের বিষয়টি যদি আদালত পর্যন্ত গড়ায় তাহলে ১৮ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের ভাগ্য যে ঝুলে যাবে না সেই নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন? এরপর রয়েছে আরপিও’র (RPO) মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনের অবাধ ক্ষমতা যেটি প্রয়োগ করে যেকোনো প্রার্থীকে যেকোনো সময় নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা সম্ভব। এমনকি প্রার্থীর একজন কর্মীর কথিত অপরাধের কারণেও নাকি প্রার্থীপদ বাতিল হতে পারে। এর সাথে জরুরি বিধির ১৬(২) ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ তো রয়েছেই। জরুরি বিধির ১৬(২) ধারার অপপ্রয়োগ নিয়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক নিোক্ত মন্তব্য করেছেন, ‘নির্বাচনের সময় যদি জরুরি বিধির ১৬(২) ধারা বহাল রাখা হয়, তাহলে কিভাবে নির্বাচন হবে? কেউ তো কথা বলতে পারবে না। মানুষের ঘাড়ের ওপর একটি খাঁড়া ঝুলিয়ে রেখে আপনি বলছেন নির্বাচন করো। এ কারণে লোকের ধারণা, ইলেকশনের নামে সরকার সিলেকশন করতে চাইছে। ১৬(২) ধারা বহাল রাখলে এই সিলেকশন করা আরো সহজ। যেমন ধরুন তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দু’জনকে এ ধারায় গ্রেফতার করা হলো। ব্যস, সিলেকশন সহজ হয়ে গেল।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে সর্বশেষ যে ভাষণটি দিয়েছেন তার মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওই ভাষণে ড. হুদা ২০০১ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন এবং প্রকারান্তরে বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হয়নি। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি আমলের সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের নির্বাচন উপহার দিতে চেয়েছেন। পান থেকে চুন খসলে যাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত লাগে তারা পৃথিবীর ইতিহাসের নৃশংসতম ঘাতকের অন্যতম জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের এই প্রশস্তিতে আবার অতিশয় পুলক অনুভব করেছেন। প্রশ্ন হলো ড. শামসুল হুদা ১৯৭০ সালের প্রসঙ্গ আনলেন কেন? তার কি এই বোধটুকুও নেই যে সেই নির্বাচন প্রকৃত অর্থে সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধিকার অর্জন এবং ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রথম অধ্যায় ছিল। ১৯৭০ সালের গণজাগরণের তোড়ে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী শেষ পর্যন্ত খড়কুটার মতো ভেসে গিয়েছিল। তাহলে কি তিনি ইঙ্গিত করছেন, বর্তমান দখলদারদের উৎখাতের জন্য নির্বাচন নয়, আর একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন হবে? পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তো স্বদেশে ঠাঁই হয়েছিল। নির্বাচন নিয়ে চক্রান্তকারী নির্বাচন কমিশনের রাজাদের ঠাঁই হবে কোথায় সেটাই এখন ভাবনার বিষয়।
সততার পরাকাষ্ঠা বাংলাদেশের আর এক রাজা দুদক চেয়ারম্যান লেঃ জেনারেল (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধূরী। নয়া দিগন্তের নির্ধারিত কলামে আবার এই ভদ্রলোক সম্পর্কে লেখালেখি করা বিপজ্জনক। পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি দুদক কিংবা দুদক চেয়ারম্যানের বিষয়ে লিখলে সেই লেখাটি অবধারিতভাবে হয় সম্পাদক মহোদয়ের কাঁচির নিচে পড়বে অথবা লেখাটি ছাপানোই হবে না। আমি কিন্তু ভাই নাছোড়বান্দা মানুষ। মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কাউকে ভয় করতে শিখিনি, যা সত্য বলে মনে করব সেটি লিখে যাবো নিঃসঙ্কোচে। পরিণামে যদি ফাঁসির দড়িতে গলা ঢোকাতে হয় কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হয় তাতেও পরোয়া নেই। কবি নজরুল ইসলামের একটি কবিতার পঙ্ক্তি আমার সব লেখার অনুপ্রেরণা। ‘দাঁড়ি মুখে সারি গান লা শারিক আল্লাহ্।’ লেঃ জেনারেল অবঃ হাসান মশহুদ চৌধূরীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় আরব আমিরাতে তিনি যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আরব রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আমি একটি বিনিয়োগ প্রতিনিধিদল নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছিলাম এবং আবুধাবিতে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। পরে তিনি সেনাবাহিনী প্রধান হলেন। সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে তার মেয়াদের শেষের দিকে ক্ষমতার করিডরে গুঞ্জন শুনতাম চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে তাকেই সেনাপ্রধান হিসেবে রেখে দেয়া হবে। পরে আবার শুনলাম তিনি নাকি বিষয়টিকে অনৈতিক বিবেচনা করে সরকারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। চার দিকে এক্সটেনশনের ছড়াছড়ির মধ্যে এই নীতিবোধের গল্প শুনে ভালোই লাগল। দু’জনই একই সরকারের ভিন্ন দায়িত্বে থাকলেও সেই সময় কখনো মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছে এমন কোনো ঘটনা স্মরণে আসছে না। তবে দুই-একবার টেলিফোনে কথা হয়েছে। রেডিসন হোটেল নির্মাণের বিষয়ে সহায়তা প্রদানের অনুরোধ করে তৎকালীন সেনাপ্রধান টেলিফোন করেছিলেন এবং যত দূর মনে পড়ে সাধ্যমতো সহযোগিতাও করেছিলাম। তারপর গল্ফ ক্লাবের সদস্য হওয়ার অনুরোধ করে কাগজপত্রসহ একজন সেনা কর্মকর্তাকে বিনিয়োগ বোর্ডে আমার অফিসে পাঠিয়েছিলেন তাও মনে আছে। কিন্তু গল্ফ ক্লাব বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবানদের জায়গা। সেখানে আমার মতো নিতান্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজনের যাওয়া-আসা শোভা পায় না বিবেচনা করে তার অনুরোধে সাড়া দিতে পারিনি। আমি আবার কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের বিষয়টি একেবারেই পছন্দ করি না। যা হোক, লেঃ জেনারেল (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধুরী ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা হলেন এবং সচিবালয়ে আমি চারদলীয় জোট সরকারের শেষ ষোলো মাসের জন্য যে অফিসটিতে বসতাম কাকতালীয়ভাবে তিনিও সেই একই অফিসে বসতেন। ধারণা করছি, জ্বালানি উপদেষ্টারূপে ষোলো মাসের আমার সব কর্মকাণ্ড তার নখদর্পণে। কিছু দিন পর তিনি তার তিন বন্ধু সুলতানা কামাল চক্রবর্তী, জনাব শফি সামি এবং ড. আকবর আলি খানকে নিয়ে নৈতিক কারণ দেখিয়ে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সরকার থেকে পদত্যাগ করলেন। লেঃ জেনারেল (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধূরীর ‘নীতিবোধের’ এই প্রকাশে তার প্রতি আমার সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছিল।
তারপর এক-এগারো। যে ভদ্রলোকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের অধীনে উপদেষ্টার পদে থাকাটাকে নীতিবিরুদ্ধ বিবেচনা করেছিলেন সেই একই ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের অধীনে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় দুদক’র চেয়ারম্যানের পদটি সানন্দে গ্রহণ করলেন। যে ব্যক্তির অধীনে উপদেষ্টা থাকা যায় না সেই ব্যক্তির অধীনেই দুদক চেয়ারম্যান হওয়া যায় এমন নীতিবোধ অন্তত আমার বোধগম্য নয়। নীতিনৈতিকতা সম্ভবত আবরণ মাত্র, অভ্যন্তরের রহস্যটি অনেক গভীরের। তাহলে কি উপদেষ্টামণ্ডলী থেকে পদত্যাগ এক-এগারোর প্রেক্ষাপট তৈরি করার একটি ষড়যন্ত্র ছিল মাত্র? শুরু হলো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হুঙ্কার দিলেন, দুর্নীতির রুই-কাতলা ধরা হবে। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, চুনোপুঁটিও ছাড়া হবে না কারণ বাজারে চুনোপুঁটির দামও চড়া। যেন দুর্নীতি দমন নয়, উদ্দেশ্য রকমারি মাছের ব্যবসা করা । দুদক’র কথিত স্বচ্ছতার বেলুন ফুটো হতে সময় লাগল না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনের মামলা দেয়া হলো। সেই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ ক্রয় কমিটির সদস্য প্রতিটি মন্ত্রী আসামি। কিন্তু কি আশ্চর্য! যেকোনো ক্রয় কমিটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি কেবিনেট সচিব সা’দত হুসেইন এসব মামলায় একটিতেও আসামি নন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন এই কেবিনেট সচিব বর্তমান সরকারের আমলে গদা ঘোরানো রাজাধিরাজদেরই একজন। তিনি এখন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান। এই প্রকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় অনুমোদন দিতে লে. জেনারেল (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধূরীর অতি সংবেদনশীল নীতিবোধ মোটেও পীড়িত হয় না । এ দিকে মামলা রুজু হওয়ার পরও পিএসসি চেয়ারম্যান মহোদয়ও পদত্যাগ করার কোনো রকম নৈতিক চাপ অনুভব করেন না। পাঠকদের স্মরণে থাকার কথা, এই সা’দত হুসেইন চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতার মেয়াদান্তে বিশিষ্ট সুশীলে (?) পরিণত হয়েছিলেন । হামেশা তাকে টেলিভিশনে জ্ঞান দিতে দেখা যেত । সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজের পদত্যাগের দাবিতে মহাজোটের সহিংস আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এক দিন টেলিভিশনে সা’দত হুসেইন দাবি করলেন, তিনি বিচারপতি আজিজের স্থলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকলে অবশ্যই পদত্যাগ করতেন। এসব নীতিকথা এখন জনাব সা’দত বেমালুম হজম করে বসে আছেন।
যা হোক, দিন পনের আগে ট্রাস্ট ব্যাংকের কাগজপত্র হাতে আসার পর লক্ষ করলাম ২০০২ এবং ২০০৩ সালে ব্যাংকটি বৈদেশিক মুদ্রা সংশ্লিষ্ট একটি অতি সন্দেহজনক লেনদেন খাতে বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসান দিয়েছে । সেই সময় আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মালিকানাধীন ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৩৫ কোটি টাকা। উল্লিখিত দুই বছরে এই ৩৫ কোটির মধ্যে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান লে. জেনারেল অবঃ হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদ টাঃ ২২ কোটি ৪১ লাখ ৭১ হাজার ১৪০ টাকা লোকসান দিয়েছে । বেগম খালেদা জিয়ার সরকারকে নতুন মূলধন লগ্নি করে অবধারিত দেউলিয়াত্ব থেকে ব্যাংকটিকে বাঁচাতে হয়েছিল। নতুন যে মূলধন লগ্নি করা হয়েছিল তার মধ্যে সবই কিন্তু বাংলাদেশের পনেরো কোটি জনগণের করের টাকা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কতৃক ঠিকাদার নিয়োগের ফলে রাষ্ট্রের ১৪ কোটি টাকা ক্ষতিসাধনের দায় যদি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বহন করতে হয় তাহলে ট্রাস্ট ব্যাংকের ক্ষতিসাধনের দায় চেয়ারম্যানের বহন না করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় আপাতদৃষ্টিতে (Prima-facie) বরং ট্রাস্ট ব্যাংকের ঘটনাতেই মামলার উপাদান অনেক বেশি শক্ত। এ ছাড়া দুদক চেয়ারম্যান সেনাবাহিনী প্রধান থাকাকালীন অবস্থায় নিজে লাভবান হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যে বিশেষ নির্মাণবিধি (Building-code) প্রণয়ন করেছিলেন এবং নিজ বাড়ির অবৈধ নির্মাণ বৈধ করার জন্য আড়াই লাখ টাকা জরিমানা প্রদান করেছিলেন যেকোনো বিচারে সেটি নৈতিক লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য। অক্টোবরের ২৭ তারিখে দুদক চেয়ারম্যান তার কার্যালয়ে যে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন সেখানে উপরোক্ত অভিযোগ সম্পর্কে তিনি নিোক্ত স্বীকারোক্তি প্রদান করেছেন,
‘প্রশ্নঃ পত্রিকায় এসেছে ২০০২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে আপনি ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০ কোটি টাকার ওপরে মানি লন্ডারিং বা দুর্নীতি হয়েছে। এটি সত্য কিনা ?
উত্তরঃ অ্যামাউন্ট সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হতে পারব না। কিন্তু কোনো একটা বিশেষ কারণে মূলত ফরেন এক্সচেঞ্জ বা অনেক সময় বলা হয় ফরেক্স ট্রানজেকশনের কারণে ট্রাস্ট ব্যাংকের একটি বড় লস বা ক্ষতি হয়েছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতেই একটি কার্যক্রম নেয়া হয়েছিল। আপনারা ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করলে সে তথ্য জানতে পারবেন।
প্রশ্নঃ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, আপনি আপনার নিজের ডিওএইচএস এলাকায় ২১ নম্বর সড়কের ৩২০ নম্বর বাড়িটির অবৈধ অংশ বৈধ করে নিয়েছেন। এটি সত্য কিনা?
উত্তরঃ এটি সত্য। সেখানে শুধু আমার বিষয়টিই নয়, ডিওএইচএস এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করার সময় যারা ওখানকার নিয়ম মানেননি, তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। সেখানে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। তবে একটি অনিয়মকে বৈধতা দেয়ার জন্য তা করা হয়েছিল।’
এর পরও এই স্বঘোষিত নীতিবান ভদ্রলোকটি স্বপদে আর বহাল থাকতে পারেন কি না সে বিচারের ভার পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।
পারিষদদের বিষয়ে কিছু না লিখলে আজকের কলামটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এক-এগারোর পর আমাদের সংবাদমাধ্যম নিত্যনতুন স্তাবকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল। এমনই এক স্তাবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক উপদেষ্টাদের কঠোর পরিশ্রম দেখে প্রায়ই বড্ড কাতর হয়ে পড়তেন। এক দিন তো ভারাক্রান্ত কণ্ঠে সেই অধ্যাপক এমনভাবে উপদেষ্টাদের কঠোর পরিশ্রমের জন্য হা-হুতাশ করা আরম্ভ করলেন যে আমি ভাবলাম তিনি বোধ হয় অনুষ্ঠান শেষ করেই তোয়ালে হাতে দৌড় লাগাবেন তার প্রিয় উপদেষ্টাদের ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল মুছিয়ে দেয়ার জন্য। মাঝখানে বিদেশে থাকা ভদ্রলোককে আবারো টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পাচ্ছি তিনি বেআব্রু রাজাদের আব্রু ঢাকার জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই ব্যক্তি রাজনীতিবিদরা অভিযুক্ত হলেই সচরাচর তার বক্তব্যের মাধ্যমে সেসব অভিযোগকে বিচারের আগেই অকাট্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকেন। অর্থাৎ অভিযুক্ত যে নির্দোষ সেটি প্রমাণ করার দায় অভিযুক্তের কাঁধেই বাকচাতুর্যের মাধ্যমে চাপিয়ে দেন। অথচ দুদক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এবার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর তার সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা আমরা দেখতে পেয়েছি। এ ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্তের আগেই অধ্যাপক মহাশয় অতিশয় নিশ্চিত যে, দুদক চেয়ারম্যান নির্দোষ প্রমাণে সক্ষম হবেন। বাস্তবে দুদক চেয়ারম্যান যে সংবাদমাধ্যমে তার অপরাধ স্বীকার করে ফেলেছেন সেই সত্যটি তার কাছে বিবেচ্য নয়। এই স্তাবকের দ্বিমুখী আচরণে আমি মোটেও বিস্মিত হইনি। এরাই তো সেই পারিষদবর্গ যারা পোশাকবিহীন রাজার অদৃশ্য পোশাকের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে বেশুমার প্রশংসাবাক্য খরচ করে সচরাচর নিজের আখের গুছিয়ে থাকেন। দেশে দেশে, যুগে যুগে এই শ্রেণী একটি অপরিবর্তনশীল জীব হিসেবেই রয়ে গেছে। উর্বর মাটির দেশ বাংলাদেশে এই প্রজাতির বাড়বাড়ন্ত চমকিত হওয়ার মতোই।
লেখকঃ সাবেক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা এবং বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান
[email protected]
(সুত্র. নয়া দিগন্ত, ০৫/১১/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


