কোন সংস্কৃতিকে বাঁচাতে চান?
মুশফিক প্রধান
লালনের ভাস্কর্য ভাঙ্গা নিয়ে বেশ কিছুদিন পত্র পত্রিকায় এবং ব্লগে ঝড় তোলা হলো। এতদিন লেখালেখি করি, কিন্তু লালনের "ল" ও কারো লেখায় চোখে পড়েনি। আজ কিছু উগ্র মানুষের কারণে যখন লালনের ভাস্কর্য তুলে নেয়া হলো, তখনই শুনি হই চই, এটা সেটা ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্লগে ব্লগে ভরে উঠলো লালনের জন্য এতদিন "গোপন" করে রাখা "প্রেম।
আমাদের চারিত্রিক বৈশিস্টই হলো, চোর পালালে এর পর চিৎকার চেচামেচি শুরু করা। শুধু তাই নয়, যে যার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সর্বচেস্টা করা হয়, ভিন্নামতালম্বি রাজনৈতিক গোষ্ঠির উপর সব দোষ চাপিয়ে দেবার। ফলে আসলে ঘটনা তো আড়ালে পড়ে যায়ই, সাথে সাথে এই উতোর চাপানোর খেলায় সমাধানের পথটিও হয়ে পড়ে রুদ্ধ।
প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ কোন মতলবে লালনের মুর্তিটি বিমানবন্দরের সামনে স্থাপনের প্রয়োজন পড়লো? যদি আমাদের জাতিয় পরিচয় ভাস্কর্য আকারে উপস্থাপনের প্রয়োজনই পড়তো, তবে আরো আগে কেন তার ব্যাবস্থা করা হলো না? তাছাড়া যদি কারো ভাস্কর্য স্থাপনের একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে তার প্রধান দাবিদার আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা।
যারা আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন, তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন, আমাদের সংস্কৃতি আজ কোন পথে? নব্য প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা কি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসটুকুও ঠিক মত জানে? নিতান্ত অন্ধের মত শিশুকাল থেকে হয় কিন্ডারগার্ডেন এবং কিশোর বয়সে এ লেভেল ও লেভেল নামের পাশ্চাত্য শিক্ষায়, শিক্ষিত দীক্ষিত এই ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি যত আদরনীয়, বাংলা সংস্কৃতি তেমনি অবহেলিত। এরা ভাষাটাও সঠিকভাবে বলতে পারদর্শি নয়।
একইভাবে মাদ্রাসাতে পড়ুয়ারাও আলিফ বে তে থেকে শুরু করে আরবীয় সংস্কৃতি চর্চায় এতটাই মশগুল যে, বাংলা সংস্কৃতিই অনেক কিছুকেই তারা পৌত্তলিকতা বলে জ্ঞান করে। আর বাংলা মিডিয়ামে পড়া ছাত্র ছাত্রদের অবস্থা, বাংলা জানলে ইংরেজি জানে না, আর অংক জানলে বিজ্ঞান জানে না।
এক দেশে এ রকম তিন চার রকম শিক্ষা ব্যাবস্থা থাকার ফলে, ভিন্ন ধারার ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার মানুষ তৈরি হচ্ছে। যার কারণে তুচ্ছ বিষয় নিয়েও দেখা দিচ্ছে মানসিকতা আর ব্যাক্তিত্বের দন্দ। ফলে রুদ্ধ হচ্ছে জাতিয় প্রশ্নে ঐক্যমতের পথ। আর এই অভ্যন্তরিন বিবাদকে পুজি করেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে অবিশ্বাসি, দেশি বিদেশি মহল নানা সময়ে নানা ষড়যন্ত্র করছে। যা একদিন আমাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে।
যারা ধর্ম গেল গেল বলে রব করছেন তারা সঙ্খ্যায় নিতান্তই ক্ষুদ্র। তেমনি যারা সংস্কৃতি গেল গেল বলে সস্তা আবেগ মাখানো, বুলি কপচিয়ে চলছেন, তারাও ততধিক ক্ষুদ্র। সাধারণ মানুষের কাছে এসবের কোন মুল্য নেই। অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ কোন জাতির সংস্কৃতি তখনই মর্যাদা লাভ করে যখন তারা নিজের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালি করতে সক্ষম হয়। এজনই সামুদ্রিক শ্যাওলা দিয়ে তৈরি জাপানিদের খাবার, আজ বিশ্বে সমাদ্রিত, যেহেতু তারা এখন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালি। আর বলিউড তো সুদুর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে।
অথচ আমাদের নিজস্ব একটি শক্তিশালি সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও, শ্রেফ "ভিখিরি" বলে আমরা নিজেরাই তাকে লালন ধারণ করি না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে নিয়োজিত আমাদের বুদ্ধিজীবি মহলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে যতদিন পর্যন্ত দেশপ্রমিক বিবেকবান মানুষ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যাবে, ততদিন এই সাংস্কৃতিক হীনমন্যতা ঘুচবে না।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



