somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ যুদ্ধাবস্থা কেন? : ফরহাদ মজহার

১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৮:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এ যুদ্ধাবস্থা কেন?
ফরহাদ মজহার


‘বাংলাদেশের রাজনীতি বঙ্গোপসাগরে’ সম্প্রতি এই শিরোনামে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার একটি লেখায় আমি ইঙ্গিত দিতে না দিতেই বাংলাদেশে রণদামামা বেজে উঠেছে। বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের জলসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান কাজ বন্ধ করার নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ঐ এলাকায় মোতায়েন করা যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেবে না। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান দাইয়ু বাংলাদেশের জলসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালাচ্ছে। তাহলে শত্রুতা শুধু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধেও। চীন যদি তাদের মিত্র হয়, তাহলে এই শত্রুতা চীনের বিরুদ্ধেও বটে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার দরকার ‘পূর্বমুখী’ নীতির কবর রচনা চলছে। শুধু তাই নয়। চতুর্দিকে থেকে বাংলাদেশকে শত্রুপরিবেষ্টিত করবার এই ফাঁদ ভয়াবহ এবং বিপজ্জনক। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণকে জালের মতো ঘিরে ফেলা হয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা হচ্ছে জালের শেষ খেপ মারার মতো। শেষ টান দেওয়ার পর্যায়ে ঢুকে পড়েছি আমরা। উত্তরে-দক্ষিণে-পশ্চিমে শত্রু এখন পূর্ব দিকও বন্ধ করে দেবার আওয়াজ শুনছি। বাংলাদেশের জনগণ তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই করবার কোন অবকাশ বা সুযোগ যেন আর না পায়। সেই সুযোগ আর রাখা হবে না। গত দুই বছর যেভাবে শাসন চলেছে। সেইভাবেই চলবে। হয় দাসত্ব মানো, অথবা ধ্বংস হয়ে যাও এই নীতিরই বাস্তবায়ন চলছে।

বাংলাদেশকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে হবে। সন্দেহ নাই। কিন্তু দাহ্য পদার্থ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে শুধু মিয়ানমার বাংলাদেশের জলসীমা লংঘন করেনি। লংঘন করেছে ভারতও। ‘নয়া দিগন্ত’ পত্রিকায় আমি এর আগের একটি কলামে এই দুটো দেশ সম্পর্কেই লিখেছি। দুটো দেশই গ্যাস অনুসন্ধান করছে আমাদের জলসীমায়। দুটো দেশই সমানভাবে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য হুমকি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রধান প্রধান ব্লকগুলো মার্কিন কোম্পানি কনকোফিলিপসকে (ConocoPhillips) ইজারা দেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কনকোফিলিপস যুদ্ধবাজ রিচার্ড আরমিটেজের কোম্পানি।

কনকোফিলিপসের পক্ষে কিংবা সোজা কথায় ইঙ্গো-মার্কিন-ইসরায়েলি স্বার্থে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা আমাদের জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে কি না আজ নাগরিকদের সেটা ভেবে দেখতে হবে। এই অক্ষ শক্তির পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে অবৈধভাবে যারা ক্ষমতাসীন তারা তাদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইছে কি? নির্বাচন-টির্বাচন এই সকল কি ভুয়া কারসাজি নয়? রাজনৈতিক দলগুলোর নাকের সামনে মুলা ঝুলিয়ে রেখে মূল কাজ কি বঙ্গোপসাগরে ঘটছে? কেন বাংলাদেশ ভারতীয় আগ্রাসন মাথায় পেতে নিয়ে, যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে? ভারত যদি বাংলাদেশের জলসীমা দখল করে নেয়, তাতে কি আপত্তি নেই! এটাই কি ক্ষমতাসীনদের নীতি? যারা গায়ের জোরে ক্ষমতায়, যারা নিজেরা পরাশক্তির পক্ষে দখলদার, যারা আজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য প্রধান হুমকি তারাই নাকি আমাদের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করবে? বাংলাদেশের রাজনীতি যখনই এই দখলদারির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত হতে চলেছে যখনই সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার ও দেশের অখণ্ডতা রক্ষার ডাক উঠেছে, তখন ক্ষমতাসীনরা আমাদের নজর ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।

‘বাংলাদেশের রাজনীতি বঙ্গোপসাগরে’ শিরোনামের কলামটিতে আমার দাবি ছিল গণমাধ্যমগুলোর ফালতু চেঁচামিচি ও তিলকে তাল বানানোর মহোৎসব থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি যে সকল দাহ্য ও জলীয় পদার্থ দিয়ে নির্ণয় হয় সেই দিকে নজর ফেরাতে হবে আমাদের। শুধু তেল নয় বা গ্যাস নয়, বঙ্গোপসাগর নিয়ে ভাবতে হলে তার জল ও ডাঙা দুটো দিক নিয়েই ভাবতে হবে। কক্সবাজার ‘কালো সোনা’র খনি (black gold)। ‘কালো সোনা’ কী? সোনার চেয়েও দামি নানান খনিজ সম্পদের মিশ্রণ।

কী তাদের নাম? জিরকন (Zircon), এলমেনাইট (elmenite), রুটাইল (rutile), গার্নেট (garnet), মেগনেটাইট (magnetite), মোনাজাইট (monazite), ইত্যাদি। এই খনিজ পদার্থগুলো প্রচুর পরিমাণে কক্সবাজার, টেনকাফ, মহেশখালি, নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটা বেলাভূমি ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, মার্কিন কোম্পানি ও ভারতীয় স্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশকে ভাড়া খাটানোর যুদ্ধ নয়! এটা কি অন্যের যুদ্ধে ‘প্রক্সি’ দেওয়া নয়? কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা না করে এক দখলদারদের হাতে আমাদের দেশ ও সম্পদ তুলে দেবার জন্য অন্য দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়তে নামা।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার দাইয়ু কোম্পানির কাজ বঙ্গোপসাগরে বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। এর পরও পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের যে উচ্চ পর্যায়ের টিম মিয়ানমারে উপরাষ্ট্র মন্ত্রী মং মিন্টের সাথে বৈঠক করেছে, তার ফল হয়েছে শূন্য। কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান না হবার মতো কোন পরিস্থিতি রয়েছে বলে কোন প্রমাণ নাই। কিন্তু কেউ সমাধান না চেয়ে যদি বিবাদ বাধাতে চায়, সেটা ভিন্ন কথা। এখানেই আমার আশঙ্কা।

আগামী ১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচন কেন্দ্র করে যে সকল ভুয়া তর্কাতর্কি চলছে, সেই সকল সাজানো ইস্যু থেকে যদি আমরা নজর ফেরাতে না শিখি, তাহলে আমরা গভীর অন্ধকারেই নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছি এ ব্যাপারে সন্দেহ নাই। আমাদের তাকাতে শিখতে হবে রাজনীতি আসলে কোথায় ঠিক হয়। কোথায়, কারা, কিভাবে একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের বর্তমান বিপর্যয়কে আরো ঘনীভূত করবার জন্য ক্ষমতাসীনরা এখন বঙ্গোপসাগর কেন্দ্র করে যুদ্ধের রাজনীতি সাজিয়ে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষের চোখে নির্বাচনের ঠুসি পরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধ্বংস এবং যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য তৈরি করে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশকে পরাশক্তির হাতে তুলে দেবার নকশাই আসলে বাস্তবায়িত হতে চলেছে।

মুখে নির্বাচন কিন্তু নির্বাচন কি হবে? এই সন্দেহেই বরং মিয়ানমারের ঘটনার মধ্য দিয়ে উদাম হয়ে পড়ছে। মিয়ানমারের ঘটনা ঠিক এখন কেন? কী তার উদ্দেশ্য? মিয়ানমার ও ভারত বাংলাদেশের জলসীমায় তেল, গ্যাস অনুসন্ধান চালাচ্ছে, সেটা তো বহু পুরানা খবর!! এত দিনে কি তাহলে অজগরের ঘুম ভাঙল?

নাকি আমরা ইঙ্গিত পাচ্ছি ক্ষমতাসীন দখলদারদের আরো বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের বিবাদে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলে বাংলাদেশকে যুদ্ধক্ষেত্র বানাবার পরিকল্পনা কি তাহলে আমাদের ঘাড়ে শেষমেশ এসেই পড়ল? জনগণ দখলদারদের সমস্ত সাজানো পরিকল্পনা এর আগে বানচাল করে দিতে পেরেছে। এই ক্ষেত্রেও জনগণই জয়ী হবে। সন্দেহ নাই।
দরকার তীক্ষ্ন গণনজরদারি। জনগণকে হুঁশিয়ার থাকতে হবে।
২৫ কার্তিক ১৪১৫, ৯ নভেম্বর, শ্যামলী
ইমেইলঃ [email protected] (সূত্র, নয়া দিগন্ত, ১১/১১/২০০৮)

Click This Link
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×