জরুরি অবস্থা থেকে স্বাভাবিকতায় উত্তরণ পর্ব-১
সাদেক খান
মুখে মিষ্টি কথা বলেও কাজের বেলায় চারদলীয় জোটকে নির্বাচন বয়কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকার। ‘বিচারিক নয়, আইনি মীমাংসার মাধ্যমে শেখ হাসিনার শর্তহীন মুক্তি’ নিশ্চিত করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অভিযুক্তের দীর্ঘায়িত প্যারোল শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নূর আলীর কাছ থেকে ৫ কোটি টাকার জবরদস্তি চাঁদা আদায়ে ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত মামলায় শেখ হাসিনার হাইকোর্ট বা সুপ্রিমকোর্ট থেকে জামিন মেলেনি। প্যারোলে তার মুক্তি বহাল ছিল বলেই তাকে জামিন দেয়ার কোনো কারণ ছিল না, তার হালনাগাদ ডাক্তারি সুপারিশও ছিল না। প্যারোলের অবসানে নিু আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে জামিন প্রার্থনা করতে হতো। জরুরি অধ্যাদেশের কারণে এ ধরনের মামলায় নিু আদালতের জামিন দেয়ার এখতিয়ার নেই। এক রাত বা কিছু সময়ের জন্য হলেও তাকে বিশেষ কারাগারে পাঠিয়ে কারাবন্দী অবস্থা থেকে উচ্চ আদালতে জামিন প্রার্থনা করতে হতো। সে ক্ষেত্রেও তার সমস্যা হতো ডাক্তারি বোর্ডের সুপারিশ নিয়ে। তার বৈদেশিক চিকিৎসক তার জরুরি চিকিৎসা শেষ হয়েছে বলেই সার্টিফিকেট দিয়েছেন। জরুরি অধ্যাদেশ অনুযায়ী ওই মামলার চলতি অবস্থায় শেখ হাসিনার জামিন পাওয়া তাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।
সরকার তাকে কৌশলে নির্বাহী ক্ষমতার আওতায় শর্তহীন মুক্তি দিয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া এড়াতে সরাসরি মামলা তুলে নিয়েছে। সংবাদে প্রকাশ, আদালতকে ‘চূড়ান্ত’ পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করে বলা হয়েছে, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ মেলেনি। অথচ নূর আলীর জবানবন্দীই পর্যাপ্ত সাক্ষ্য। সংবাদে আরো প্রকাশ, ওই পুলিশ রিপোর্টের বিবরণ যাতে গোপন থাকে সে জন্য সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছে। সহজেই অনুমান করা যায়, অরাজনৈতিক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি বিশেষ দলের নেত্রীর সুবিধার্থে বড় ধরনের একটি দুর্নীতি মামলার ‘রাজনৈতিক মীমাংসা’ করেছে।
তার আগে প্যারোলের শর্তাধীন অবস্থায় ওয়াশিংটনে গিয়ে ‘অসুস্থ’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে দু-দু’বার ‘রাজনৈতিক’ ধরনা দেবেন, তার সুবিধাও করে দিয়েছে নির্দলীয় তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকার। তিনি আগামীতে আবারো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে একক পরাশক্তির আঞ্চলিক প্রভুত্ব রক্ষায় কী কী কাজ করতে পারেন তারও একটা বোঝাপড়া করে এসেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের উপমন্ত্রী পর্যায়ের কর্মকর্তা বাউচার সাহেবের সাথে। এখন সগর্বে বাংলাদেশে ফিরেছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বদৌলতে শিথিল করা জরুরি অবস্থার মধ্যে তার জন্য বিপুল পথসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। তার নিরাপত্তার জন্য বিশেষ সেনাদল সাথে সাথে থেকেছে। ট্রাফিক পুলিশ শহরতলি ও আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহনের বাস, ভ্যান, মোটর গাড়ি বিমানবন্দরের উত্তরে কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রেখে পথসংবর্ধনায় শেখ হাসিনার অনুসারী-অনুরাগী সমাগমের সুবিধা করে দিয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে তার মনোনয়ন প্রার্থীরা নিজ নিজ প্রার্থিতা ও এলাকার নামনিশানা তুলে ধরে মিছিল ও কর্মী-সমর্থকের বহর প্রদর্শনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছে। সে জন্য নির্বাচন কমিশন তার দলের কাছে মৃদু তিরস্কারপত্র প্রেরণ করেছে মাত্র।
তিরস্কারপত্র পাঠানো হয়েছে বিএনপিকেও। সিপাহি-জনতা বিপ্লব দিবসে ৭ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সভা উপলক্ষে মোটর শোভাযাত্রা ও গাড়িবহরের মাধ্যমে সংবর্ধনা জানানোর ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিবকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বলেছে, ‘সংবর্ধনা জানানোর সময় চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন রাস্তায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, যা আপামর জনসাধারণের চলাচলের ক্ষেত্রে মারাত্মক অসুবিধা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া ওই সংবর্ধনায় বিভিন্ন যানবাহন এবং দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো হয় এবং দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে রঙিন পোস্টারও প্রদর্শন করা হয়। ফলে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বাস্তবে শোডাউনে রূপলাভ করে। যেহেতু নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এরূপ রূপান্তরের কারণে সংসদ নির্বাচনে অনুসরণীয় আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে।’
খালেদা জিয়ার অনুসারীরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের ওই চিঠি অশুদ্ধ ও অবান্তর। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল ও পুনঃতফসিল দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। কাজেই ওই সভায় সম্ভাব্য নির্বাচন প্রার্থী জাহিরের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সিপাহি-জনতা বিপ্লব দিবস উদযাপনের সময় যদি মিছিলের কারণে যানজট বা নগরবাসীর অসুবিধা হয়ে থাকে, তবে তার দায়িত্ব নগর কতৃপক্ষের। তাদের জানিয়েই ওই সব কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। বস্তুত বিপুলসংখ্যক নগরবাসী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। এ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের কুম্ভীরাশ্রুপাত এখতিয়ারবহির্ভূত চাপল্য। বেগম জিয়ার জনসভা ও সিপাহি-জনতা বিপ্লব দিবস পালন উপলক্ষে দলের ওয়ার্ড কমিটি, অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন, গয়রহ যদি দেয়ালপত্র, রঙিন পোস্টার জারি করে থাকে তাতে নির্বাচনবিধি লঙ্ঘনের কোনো কারণ নেই। দলীয় শৃঙ্খলাভুক্ত এসব স্বচ্ছ কর্মকাণ্ডকে নির্বাচন প্রার্থিতার প্রচার হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আদপে আওয়ামী লীগের আগাম নির্বাচন প্রার্থিতার প্রচারাতিশয্যের দোষ ঢাকতেই বিএনপি’র ঘাড়েও অকারণে একই ধরনের দোষ চাপিয়ে প্রচারের উল্টো বিচার করেছে নির্বাচন কমিশন।
বেগম জিয়া চট্টগ্রামে ওই দিন লালদীঘি মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসভায় বলেছেন, ‘শহীদ জিয়া এই জায়গা থেকে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে একটি বাড়িও করতে চেয়েছিলেন। চট্টগ্রামের মাটিতে তার (শহীদ জিয়া) রক্ত মিশে আছে। কারামুক্তির পর আমিও চট্টগ্রাম থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ডাক দিতে এসেছি। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। যেসব অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে, তা আদায় করে নেয়া হবে।’
ঘোষিত নির্বাচনী তফসিল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা সাত দফা দাবি দিয়েছি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বেশ কয়েকটি ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছি। সরকার এসব দাবি বাস্তবায়ন করার কথা বলেছিল। কিন্তু তা করেনি। আমাদের জন্য মাঠ উঁচু-নিচু, আর অন্য কারোর জন্য সমতল করা হয়েছে। এই মাঠে কোনো খেলা হয় না, হতে পারে না। মাঠ সমতল হলেই নির্বাচনে খেলা যাবে। আমাদের দাবি মেনে নেয়া হলেই নির্বাচনে যাবো।...
‘আমরা ইলেকশন চাই, সিলেকশন মানতে রাজি নই।’... ‘আমাদের দাবি মেনে নিন, বিএনপি ও চারদলীয় জোট নির্বাচনে যাবে ইনশাআল্লাহ। জনগণ আবারো আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে এ দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ করে দেবে।’
পানির বাটি আধাভরা না আধাখালি, পাত্রাধার তেল না তেলাধার পাত্র, এমন সূক্ষ্ম ভেদবিচার এ ক্ষেত্রে নিষ্প্রয়োজন। বেগম জিয়ার বক্তব্যের সরল অর্থ, তার দলের (ও জোটের) সাত দফা দাবি পূরণ না হলে চারদলীয় জোট নির্বাচনে যাবে না। নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বেগম জিয়া বলেন, এই কমিশন সত্তরের নির্বাচনের কায়দায় (একতরফা) নির্বাচন করতে চাই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঘড় ও সমুদ্রোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ উপকূলবাসীর মৃত্যু হয়, পশুপাখি ঘরদুয়ার ভেসে যায়, মনপুরা দ্বীপ বিরান হয়ে যায়। সে কারণে মওলানা ভাসানীর ডাকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং আরো কিছু দল নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকার করে এবং দুর্গত সেবায় আত্মনিয়োগ করে। সেই প্রসঙ্গ টেনে বেগম জিয়া প্রশ্ন তোলেনঃ ‘তাহলে বুঝতে হবে, তারা কোন ধরনের নির্বাচনে কাকে ক্ষমতায় আনতে চায়। কাজেই এই পাতানো নির্বাচনে গিয়ে লাভ কী?’
জনতার উদ্দেশে বেগম জিয়া আরো বলেন, জরুরি আইনে ‘আমার ওপর জুলুম হয়েছে। কিন্তু আমি দেশ ছেড়ে যাইনি। বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। সুখে-দুঃখে আমি আপনাদের সাথে আছি।’
আপনারা জানেন, এক বছর আমি কারাবন্দী ছিলাম। এর আগে ছয় মাস ছিলাম গৃহবন্দী। এ সময় আমার পরিবার ও দলকে তছনছ করে দেয়া হয়েছে। জানি না কী আমার অপরাধ ছিল। তবুও সাহস হারাইনি। জনগণের ওপর আমার অটুট ভরসা ছিল। জানি, দেশকে ভালোবাসতে হলে ঈমানের পরীক্ষা দিতে হয়। জানতাম, যতই ষড়যন্ত্র করা হোক, যতই অপপ্রচার চালানো হোক, জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। আপনারা জানেন, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা। আমার বিবেক ছিল পরিষ্কার। তাই কোনো নির্যাতনের কাছে মাথা নত করিনি। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাইনি। তাদের (সরকার) আমি জানিয়ে দিয়েছিলাম, ‘বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। মরণ হবে, তবুও এ দেশ ছেড়ে যাবো না।’ সুখে-দুঃখে আপনাদের পাশে ছিলাম, পাশেই থাকব। মানুষকে বিপদে রেখে আমি পালিয়ে যাবো না। তার পরিণতি যা-ই হোক।’
তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘তারা আমাকে বিনা বিচারে বন্দী করে রেখেছিল, মামলার পর মামলা দিয়েছে। জনগণ এর প্রতিবাদ করেছে। অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আমি মুক্তি পেয়েছি।’
আওয়ামী লীগের পরোক্ষ সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘একটি দল বলছে, নির্বাচনে কে আসল না আসল, তাতে কিছু যায়-আসে না। ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন হতে হবে। তাহলে তাদের প্রশ্ন করছি, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন কেন হলো না, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? যারা লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ পিটিয়ে মারে, অক্সিজেন পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে চায়, তাদের হাতে ক্ষমতা নিরাপদ নয়। তারা ক্ষমতায় গেলে দেশকে বেচে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না।’
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে মহাজোটের নির্বাচন বর্জনের হুমকির কারণে যদি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির তফসিল মুলতবি করা যুক্তিসঙ্গত হয়ে থাকে তাহলে বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের সাথে সাত দফার ভিত্তিতে ফয়সালা সাপেক্ষে ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচনানুষ্ঠানের তফসিল পেছানোর দাবিও যুক্তিসঙ্গত, অন্যথায় নির্বাচন বর্জন ঘটবে, একথাই বুঝিয়ে দিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে তিনি আরো বলেন, ‘এরা মেয়াদোত্তীর্ণ সরকার, এদের এত দিন ক্ষমতায় থাকার কথা নয়। এ সরকার ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি বাতিল করেছে, যা তারা করতে পারে না। সরকার গঠন করলে আবারো এই ছুটি বহাল করা হবে।’...
এ সরকার দুই বছরে দেশকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে দেশের শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দায়িত্বশীল, যোগ্য ও অভিজ্ঞ সরকার দরকার। বিএনপি ও জোটের সেই অভিজ্ঞতা আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় দুই বছর দেশের মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। দেশটাকে একটা বিশাল কারাগারে পরিণত করেছে। অনেকের ওপর জেল-জুলুম, অত্যাচার হয়েছে।
আমরা দেশে অরাজকতা চাই না। প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। জনগণকে সাথে নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে যেতে চাই। জনগণকে সাথে নিয়ে আবারো দেশের উন্নয়ন করতে চাই। বিএনপি’র ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। সফলতাও আছে। সফলতাকে সামনে এনে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
ইতঃপূর্বে ৫ নভেম্বর ঢাকায় চারদলীয় জোটের নেতাকর্মীদের মিলিত বৈঠকে বেগম জিয়া সাফ সাফ বুঝিয়ে দেন, সরকারি মহল আর আওয়ামী লীগ মহল থেকে কানাঘুঁষায় সিগনাল দেয়া হচ্ছে আগামী নির্বাচনে হারজিতের চাবিকাঠি থাকবে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের হাতে। এই নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপিকে ৫০ আসন আর জামায়াতকে তিনটি আসন দেয়া হবে। তাই তড়িঘড়ি করে এই নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে নন তিনি। বরং নির্বাচনের বাইরে থাকবেন, তাতে যা হয় হবে। আর যদি সরকার বিএনপি ও চার দলের সব দাবি মেনে নেয়, তাহলে ভিন্ন কথা।
অন্য নেতারাও বলেন, পাতানো নির্বাচনে অংশ নেয়া আত্মঘাতী হবে বলে তারা মনে করেন। তবে এ ব্যাপারে বিএনপি’র চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তকেই তারা শিরোধার্য হিসেবে মেনে নেবেন।
এর আগের দিন ৪ নভেম্বর রাতে বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বেগম জিয়ার সাথে দেখা করলে বিএনপি’র চেয়ারপারসন তাকে স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচনের তফসিল পেছাতে হবে। বিএনপির দাবি-দাওয়া মানতে হবে। তবেই তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।
৫ নভেম্বর একটা প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েও সরকারকে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য সতর্ক করে দেন বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বলেন, ‘একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশের সঙ্কট আরো প্রকট করে তুলতে পারে। তাই এই পথ পরিহার করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি কখনো প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করি না। যে যা-ই করুক না কেন, আমি আগামীতে তাদের সবার সাথে ন্যায়সঙ্গত ও আইনানুগ আচরণ করার আশ্বাস দিচ্ছি। দেশ বাঁচাতে শান্তি, স্থিতি, সংহতি ও ঐক্য বজায় রেখে সংযম ও দূরদর্শিতার সাথে সব সমস্যা মোকাবেলার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’...
গত দুই বছরে অনেক ভুল হয়েছে, প্রতিহিংসার চর্চা হয়েছে। আমি, আমার পরিবার এবং দল তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের ক্ষতি হয়েছে আরো বেশি।... দেশ আজ এক গভীর সঙ্কটে। প্রিয় মাতৃভূমি এর আগে এত সঙ্কটে কখনো ছিল না। আজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। গণতন্ত্র উত্তরণের প্রক্রিয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে। দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। মানুষের সীমাহীন সঙ্কট চলছে। এই নাজুক সময়ে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। বিভেদ-বিভাজন ভুলে আমাদের সঙ্কট উত্তরণের পথে সামনে এগোতে হবে। একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, অবাধ ও অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই সঙ্কট থেকে বের হতে হবে।
অতঃপর ৯ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ অপরিবর্তিত রেখে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা যাচাই-বাছাই ইত্যাদির বিষয়ে কিছু হেরফের করে পুনঃতফসিল ঘোষণা করেছে। বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলের পক্ষ থেকে সেই স্বল্প-পরিবর্তিত পুনঃতফসিল তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বলেছেন, তফসিল পরিবর্তনের নামে যে প্রসাধন চর্চা করা হয়েছে, সেটা ‘জাগলারি’ বা ভেল্কিবাজির মতো। নির্বাচনে অংশগ্রহণের যথার্থ সুযোগ দিতে প্রার্থীদের বিল ও ব্যাংক দেনা পরিশোধের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করতে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তা ছাড়া সংশোধিত জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ২০০৮ সম্পর্কে বিএনপি’র নীতিগত আপত্তি আমলে নিয়ে পূর্ববর্তী জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অধীনেই আশু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান তিনি। সংশোধিত জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ২০০৮ জারির আগে এ সম্পর্কে অন্যান্য দলের সাথে মতবিনিময় করলেও নির্বাচন কমিশন বিএনপি’র সাথে কোনো মতবিনিময় করেনি। খুশিমতো (বা কাউকে খুশি করতে) জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ২০০৮ প্রণয়ন ও পাসের ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন। এখন তফসিল পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন একতরফাভাবে খুশিমতো কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব। বলেন, তার দলের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্য দিকে পাঁচ মাস পুত্র-কন্যা-ভগ্নীর ঠিকানায় প্যারোলে বিদেশে কাটিয়ে ৬ নভেম্বর দেশে ফিরেই সাংবাদিকদের কাছে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঘোষিত তারিখেই নির্বাচন হতে হবে। কোনো অজুহাতেই নির্বাচন পেছানো যাবে না। তারপর ৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের তিন দিনব্যাপী বৈঠক শেষে দলের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংবাদ ব্রিফিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনঃ ‘১৮ ডিসেম্বরের পর নির্বাচন মেনে নেবে না আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় দু-চার দিন এদিক-ওদিক করা হলেও নির্ধারিত তারিখেই নির্বাচন দেয়ার দাবি আওয়ামী লীগের। ১০ নভেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে সুধা সদনে বৈঠক করেন। তার বিদায়কালে দলীয় মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের আবারো বলেনঃ ১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচন হতেই হবে। তা না হলে দেশে চরম অবস্থা দেখা দেবে, দেশ রাজনৈতিকভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা খারাপের দিকে চলে যাবে, বিদেশী বিনিয়োগ হবে না। কারণ, এ সরকার আর থাকতে পারবে না। আমরা বলার পর সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি ও ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন।
আমরা পূর্বঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ নভেম্বর মনোনয়ন জমা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু এরই মধ্যে পুনঃতফসিল করে ২০ তারিখ করা হয়েছে। এটা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। শুনছি তফসিল আবার পেছানো হতে পারে। কিন্তু আমাদের সাফ কথা ঘোষিত ১৮ ডিসেম্বরেই নির্বাচন চাই। ভোটাররা এ নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। কোনো মতেই এ তারিখের নির্বাচন পেছানো চলবে না। একই দিনে যুবলীগের সভায় মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র আজ বন্দী। ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন না হলে ‘বিপর্যয়’ ঘটবে।
ওই দিনই আশির দশকের ১০১ জন জিয়াভক্ত ছাত্রনেতা যুক্ত বিবৃতি দিয়ে বলেন, একটি বিশেষ দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাজানো-পাতানো নির্বাচন করতে চায়। চারদলীয় জোটকে বাইরে রেখে নির্বাচন করলে দেশ অনিবার্য সঙ্ঘাত ও অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হবে। এ দেশ এভাবে বিপদাপন্ন হলে তার দায়ভার সরকার ও ইসিকে বহন করতে হবে।
এভাবে জরুরি অবস্থাপূর্ব উগ্র রাজনৈতিক মেরুকরণের দুই মেরু থেকেই বিস্ফোরণোন্মুখ উত্তেজনার পুনরাবির্ভাবের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাজনৈতিক সংলাপসংক্রান্ত মুখপাত্র উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান অবশ্য এখনো আশাবাদী, আরো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সব পক্ষের সাথেই গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার আশু মীমাংসা হবে। সেই আশাবাদ কতটা বাস্তবসম্মত, সেটা অদূর ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে।
লেখকঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট। (সূত্র, নয়া দিগন্ত, ১৪/১১/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



