ব্যর্থ রাষ্ট্র ইনডিয়া?: নেড়ি কুকুরের ইন্টারভিউ
- শফিক রেহমান
বুধবার ২৬ নভেম্বর ২০০৮-এর রাতে ইনডিয়ার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র ও মুভি ইনডাষ্ট্রির প্রধান শহর রূপে পরিচিত মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার জের এখনো চলছে। আমার এ ইন্টারভিউটি যখন আপনি নিচ্ছেন তখন বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন চলছেঃ
হামলাকারী সন্ত্রাসীরা কোন দেশের নাগরিক ছিল? ইনডিয়ান, পাকিস্তানি, বাংলাদেশী, বৃটিশ? নাকি একটি মিশ্র দল?
সন্ত্রাসীরা সংখ্যায় কতজন ছিল? ৫০, ৪০, ২৫? নাকি মাত্র ১২ জন?
সন্ত্রাসীদের সবাই কি নিহত হয়েছে? নাকি ১১ জন নিহত এবং একজন জীবিত অবস্হায় ধরা পড়েছে?
এই সন্ত্রাসের উদ্দেশ্য কি ছিল? প্যালেষ্টাইন, ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে আমেরিকা, বৃটেন ও ইসরেলের অন্যায় ও আগ্রাসী ভুমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো? নাকি কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের ন্যায্য দাবির কথা জানানো?
এত বড় একটি সন্ত্রাসী হামলা, যার ফলে অন্ততপক্ষে ১৭২ নিহত এবং ২৪২ আহত হয়েছে, সেটি গুটিকয়েক ব্যক্তির দ্বারা কিভাবে সম্ভব হলো? মুম্বাই তথা মহারাষ্ট্র তথা ইনডিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্হা কেন ফেইল করলো?
এসব প্রশ্নের সম্পুর্ণ অথবা আংশিক উত্তর হয়তো ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। তবে এ মুহুর্তে যে প্রশ্নটি আমার মনে আসছে সেটি হলো, কেন ইনডিয়াকে একটি ফেইলড ষ্টেট বা ব্যর্থ অথবা অকার্যকর রাষ্ট্র কেউ বলছে না? এ প্রশ্নটি কেউ-ই তুলছে না বলে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছি।
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, ১৭ আগষ্ট ২০০৫-এ বাংলাদেশের প্রায় ৪০০ স্হানে প্রায় একই সময়ে ছোটখাটো কিছু হোম মেইড বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের মিডিয়ার একাংশ, কিছু পলিটিশিয়ান, সুশীল বা কুশীল সমাজের একাংশ এবং এসবের পৃষ্ঠপোষক রুপে পরিচিত পশ্চিমি কুটনৈতিক গোষ্ঠী বা ডিপ্লম্যাটিক সার্কলের একাংশ বাংলাদেশকে একটি ফেইলড ষ্টেট বা ব্যর্থ রাষ্ট্র রুপে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর হয়ে যায়। বিশেষত দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিকে ধর্মীয় সন্ত্রাসের উৎগাতা রুপে প্রতিষ্ঠিত করতে অবিরাম ক্যামপেইন চালিয়ে যায়। এই ক্যামপেইনের ধারাবাহিকতায় আসে ওয়ান-ইলেভেন বা মুখোশপরা সেনাতন্ত্র।
আপনি জানেন, ১৭ আগষ্ট ২০০৫-এর ঘটনাবলি ছিল কিছুটা অ্যামেচারিশ এবং ৪০০ স্হানে বোমা বিস্ফোরিত হওয়া সত্ত্বেও কেউ নিহত হয়নি। গত সপ্তাহে মুম্বাইয়ে কি হয়েছে? অন্ততপক্ষে ১৭২ জন নিহতের মধ্যে আছে ২৯ বিদেশি, যাদের অন্যতম আট ইসরেলি, পাঁচ আমেরিকান, দুই ফ্রেঞ্চ, দুই অষ্ট্রেলিয়ান, দুই কানাডিয়ান, এক জার্মান, এক জাপানিজ, এক বৃটিশ-সিপ্রিয়ট, এক ইটালিয়ান, এক সিংগাপুরিয়ান, এক থাই এবং এক মরিশিয়ান অর্থাৎ ১২টি ভিন্ন দেশের নাগরিক নিহত হয়েছে এই সন্ত্রাসী হামলায়।
কিন্তু কি আশ্চর্য! কোনো দেশই ইনডিয়াকে চিহ্নিত করেনি ব্যর্থ রাষ্ট্র রুপে। কোনো ইনডিয়ানও সে রকম কিছু বলেনি। তবে সেটিই স্বাভাবিক। কারণ ইনডিয়ান মিডিয়া তাদের দেশের ভালো ইমেজটাই প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী এবং ইনডিয়ান দেশপ্রেমিক বাহিনীর জেনারেল ও বৃগেডিয়াররা বিদেশপ্রেমে অনাগ্রহী।
আপনি জানেন, ওয়ান-ইলেভেনের প্রধান হোতাদের অন্যতম এক জেনারেল অষ্ট্রেলিয়ায় ক্যানবেরা-তে এবং এক বৃগেডিয়ার আমেরিকায় ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দুতাবাসে চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছেন। তারা অষ্ট্রেলিয়ান ও আমেরিকান ডলারে বেতন পাচ্ছেন। ভালোই আছেন অর্থাৎ তারা দেশ নয়, বিদেশকেই ভালোবাসেন। তাই তারা যখন নিজেদের দেশপ্রেমিক বলে দাবি করেন, তখন আমি লেজ নাড়াতে বাধ্য হই। আপনি জানেন, আমরা কুকুররা লেজ নাড়িয়ে আমাদের আনন্দ ও হাসি প্রকাশ করি।
আসলে তারা সৈনিক হওয়ার অনুপযুক্ত ছিলেন। কারণ তাদের দেহে মেরুদন্ড ছিল না। যদি মেরুদন্ড থাকতো তাহলে তারা স্বদেশেই থেকে যেতেন। যে থিওরি, আদর্শ ও নীতির কারণে তারা ওয়ান-ইলেভেনের হোতা হয়েছিলেন সেসবই তারা আঁকড়ে ধরে থাকতেন এবং পরিবর্তিত পরিস্হিতিতে চাকরি থেকে বিদায় নিয়ে সেসব থিওরি-আদর্শ-নীতি প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। স্বদেশেই থেকে গিয়ে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তারা কাজ করতেন।
কিন্তু তারা তা করেননি। অষ্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় ডলারমন্ডিত নিরুপদ্রব জীবনযাপনের মধ্যে তারা প্রমাণ করেছেন, আসলেই তারা ছিলেন বিদেশে চাকরিলোভী বিদেশপ্রেমিক সামরিক অফিসার।
তাদের এ কাজের ফলে গোটা সামরিক বাহিনী কলঙ্কলিপ্ত হয়েছে।
আমার বিবেচনায় কুকুর সব সময়ই উত্তম। আমাদের মধ্যে কোনো চাকরিলোভী অফিসার নেই। আমাদের মধ্যে কোনো মৌলবাদী নেই। কোনো সন্ত্রাসী নেই। আমরা কোনো রাজনীতি করি না। কোনো সন্ত্রাসমুলক কাজ করি না।
বরং আমরা সন্ত্রাস দমন, প্রতিরোধ ও চিহ্নিতকরণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সাহায্য করে থাকি।
আপনারা নিশ্চয়ই টেলিভিশনে লক্ষ্য করেছেন মুম্বাইয়ের তাজমহল হোটেলের ৪০০ রুমে আমরা কিভাবে ইনডিয়ান সিকিউরিটি ফোর্সকে রুম-বাই-রুম সন্ত্রাসী তল্লাশিতে সাহায্য করেছি। এই কুকুরদের বলা হয় স্নিফার ডগ যারা গন্ধ শুঁকে সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। এদের সাহায্যেই ইনডিয়ান সিকিউরিটি ফোর্স পেরেছে তাজমহল হোটেলে অবস্হানরত সন্ত্রাসীদের পরাজিত ও নিহত করতে।
সে যাই হোক। এবারে বিবেচনা করুন মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার টাইমলাইনটি।
বুধবার ২৬ নভেম্বর ২০০৮
রাত নয়টা ২০ মিনিট
মিলিটারি বোটে মুম্বাই পোর্টে বন্দুকধারীদের আগমন।
রাত নয়টা ৩০ মিনিট
টুরিষ্টদের প্রিয় ভেন্যু ১৩৭ বছরের পুরনো কাফে লিওপোল্ড সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত। তাদের সঙ্গে ছিল একে-ফরটি সেভেন বন্দুক ও গ্রেনেড।
রাত নয়টা ৪০ মিনিট
ইহুদি অধ্যুষিত শাবাদ সেন্টার সংলগ্ন পেট্রল ষ্টেশন আক্রান্ত। সেখানে দুজন ইহুদি নিহত এবং অন্য ইহুদিরা জিম্মি।
রাত নয়টা ৪৫ মিনিট
মুম্বাইয়ের বিশাল রেলওয়ে ষ্টেশন ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাল আক্রান্ত। ১০ নিহত এবং ১০ আহত।
রাত দশটা
মেট্রো সিনেমা আক্রান্ত। পুলিশ বাহিনী থেকে চুরি করা একটি শাদা পুলিশ জিপে চড়ে এখানে সন্ত্রাসীরা আসে।
রাত দশটা ৫০ মিনিট
চৌপাট্টি এলাকায় সংঘর্ষে দু’জন সন্ত্রাসী নিহত। ইনডিয়ান নৌবাহিনী সমুদ্রতীরে বিস্ফোরক পদার্থ খুঁজে পায় এবং এমভি আলফা নামে একটি কার্গো শিপকে তাড়া করে।
রাত দশটা ৪০ মিনিট
কামা এবং জিটি হসপিটাল আক্রান্ত। এখানে সন্ত্রাসীরা বাইরে এবং ভেতরে থেকে হামলা চালায়। দু’জন নিহত।
রাত বারোটা
১০৫ বছরের পুরনো তাজমহল হোটেল আক্রান্ত। সন্ত্রাসীদের মেশিনগান ও গ্রেনেড হামলায় হোটেল রক্তাক্ত। তারা শতাধিক ব্যক্তিকে জিম্মি করে। সবাইকে কিচেনে নিয়ে দরজা চাবিবন্ধ করে দেয়। হোটেলের অন্যান্য গেষ্ট যে যেখানে পারেন লুকিয়ে থাকেন। ইনডিয়ান সিকিউরিটি ফোর্সের সঙ্গে শুরু হয় সন্ত্রাসীদের প্রায় ৬০ ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধ। বার বার বিস্ফোরণের শব্দে প্রকম্পিত হতে থাকে হোটেল। আগুন ধরে যায়।
রাত সোয়া বারোটা
ওবেরয় ট্রাইডেন্ট হোটেল আক্রান্ত। এখানে কান্দাহার রেষ্টুরেন্টে সন্ত্রাসীরা ঢুকে পড়ে এবং প্রায় ২০০ অতিথিকে জিম্মি করে। ইনডিয়ান কমান্ডোরা হোটেলে চলে আসে এবং বন্দুকযুদ্ধ চলতে থাকে।
এসব বন্দুকযুদ্ধের ফল আমরা জানি।
সফল হয়েছে ইনডিয়ান সিকিউরিটি ফোর্স। ব্যর্থ হয়েছে সন্ত্রাসীরা। পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন ইনডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু কেউ বলেনি ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র হিসেবে ইনডিয়া।
এখন বিবেচনা করুন ইনডিয়ায় মুম্বাইয়ের গুরুত্ব এবং তাজমহল হোটেলের ঐতিহ্য।
মুম্বাই যার নাম আগে ছিল বম্বে সেই শহর ইনডিয়ার প্রধানতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং ইনডিয়ান মুভি ইনডাষ্ট্রি তথাকথিত বলিউড-এর কর্মস্হল। বলা হয়, আমেরিকার যেমন নিউ ইয়র্ক, ইনডিয়ার তেমনি মুম্বাই। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকায় লস অ্যাঞ্জেলেসের গুরুত্ব সেখানে হলিউড থাকার কারণে। মুম্বাইয়ে বলিউড থাকার কারণে তার গুরুত্ব ইনডিয়ায় নিউ ইয়র্কের চেয়েও বেশি।
আর এই মুম্বাই-এর প্রতীক হচ্ছে ঐতিহ্যবাদী দি তাজমহল হোটেল। বলা যায়, নিউ ইয়র্কের প্রতীকী ভবন যেমন দি এম্পায়ার ষ্টেট বিলডিং, মুম্বাইয়ের প্রতীকী ভবন তেমনি দি তাজমহল হোটেল।
এই হোটেলটির জন্ম হয়েছিল একটি ক্ষোভ থেকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক দিনে জামশেদ জি টাটা নামে পার্সি বংশোদ্ভুত এক শিল্পপতি গিয়েছিলেন সেই সময়ের বম্বের সবচেয়ে অভিজাত হোটেল ওয়াটসস-এ। তখন ইনডিয়া ছিল শ্বেতকায় বৃটিশদের শাসনে। ওয়াটসস হোটেলের কর্তৃপক্ষ ঢুকতে দেয়নি জামশেদ জি টাটাকে। কারণ তিনি ছিলেন ইনডিয়ান।
এই অপমানের পর জামশেদজি টাটা সংকল্প করেন উপমহাদেশের সেরা হোটেলটি তিনিই বানাবেন। তার এ প্ল্যানটি বাস্তবায়িত হয় ১৯০৩-এ।
আরব সাগরের তীরে গেটওয়ে-র পরই দি তাজমহল হোটেল নির্মিত হয়। ছাই ও শাদা রঙের পাথরে সলিডভাবে বানানো এই হোটেলের গম্বুজের রঙ লাল। আরব সাগর থেকে তাজমহল হোটেলটি দেখা যায় এবং ইনডিয়ার বহু ভিউ কার্ডে সম্রাট শাহজাহানের অরিজিনাল তাজমহল নয়, জামশেদ জি টাটার হোটেল তাজমহলের ছবি ছাপা হয়।
ওয়াটসস হোটেল অনেক আগেই অদৃশ্য হয়েছে। কিন্তু সুদৃশ্য তাজমহল হোটেল এখনো ইনডিয়ার নাম্বার ওয়ান হোটেল রুপে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় হোটেলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্তমান মালিক রতন টাটা বলেছেন, অতি সত্বর তাজ হোটেলকে তার পুর্ব অবস্হায় ফিরিয়ে আনা হবে।
এ হোটেলেই আসেন পশ্চিমের বিত্তশালী টুরিষ্ট, ডিপ্লম্যাট, ফিল্ম ষ্টার ও বিজনেস ম্যাগনেটরা। এখানেই আছে সেরা খাবারের দামি সব রেষ্টুরেন্ট এবং বিলাসবহুল ও আরামদায়ক প্রায় ৪০০ গেষ্ট রুম। তাজে থাকার চাহিদা বেশি হওয়ার ফলে ভবনটিকে সম্প্রসারিত না করে এর পাশেই দি তাজ ইন্টারকন্টিনেন্টাল নামে একটি আধুনিক হোটেল নির্মাণ করা হয়। অনেকে এটিকে বলেন, দি নিউ তাজ। আর পুরনো ভবনটিকে বলেন দি ওল্ড তাজ।
পুরনো তাজের জাঁকজমক ও আড়ম্বর এত বেশি যে অভিজ্ঞ টুরিষ্ট, মিলিয়নেয়ার বিজনেসম্যান, কৌশলী ডিপ্লম্যাট ও সুপারষ্টাররা হোঁচট খেয়ে যান। হোটেলের গেইটকিপার, বেলবয়, রিসেপশনিষ্টদের পেরোতে তারা নার্ভাস বোধ করেন।
কিন্তু ২৬ নভেম্বরের সন্ত্রাসীরা সেই হোটেলে ঢুকতে এক ফোঁটা নার্ভাস হয়নি। বিনা দ্বিধায় তারা সেখানে ঢুকে পড়ে এবং নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গেষ্টদের হতাহত করে পজিশন নেয়।
তাদের পুর্ণ পরিচয় এই মুহুর্তে পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে, তারা সবাই ছিল মুসলিম। প্রশ্ন উঠেছে কেন তারা মুম্বাইয়ে তাজ হোটেলকে বেছে নিল তাদের কার্যক্রমের জন্য?
কিছুকাল আগেও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি মুসলিম ছিল ইনডিয়ায়। এখন ইনডিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। কিন্তু অন্য ইনডিয়ানদের তুলনায় তারা গরিব ও কম শিক্ষিত। শুধু বলিউডের কয়েকজন নায়ক, কয়েকজন মিউজিশিয়ান এবং ন্যাশনাল ক্রিকেট টিমের কয়েকজন প্লেয়ার বাদে দেশের প্রায় সবক্ষেত্রেই ইনডিয়ান মুসলিমরা উপেক্ষিত ও অবহেলিত। ইনডিয়ান টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন প্রোগ্রামে মেকআপম্যান ছাড়া মুসলিমদের কোনো অস্তিত্ব দেখা যায় না।
শহরের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৩৮ শতাংশ এবং এটা ইনডিয়ান সমাজের অন্য যে কোনো অংশের চেয়ে বেশি এমনকি দলিতদের চেয়েও (সুকেতো মেহতা, দি গার্ডিয়ান, লন্ডন, ২৮.১১.০৮)। কলামিষ্ট সুকেতো মেহতা লিখেছেন, বম্বের ঠিক উত্তরে গুজরাটে ২০০২ সালে মুসলিম নিধনযজ্ঞের পর মুসলিমরা মনে করে, রাষ্ট্র যখন তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না তখন তাদের রক্ষার ব্যবস্হা নিজেদেরই করতে হবে।
সুকেতো মেহতা তার রচনাটি শেষ করেছেন এভাবেঃ
আমার বয়স যখন মাত্র ১২ ছিল তখন আমার চাচা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাজ হোটেলে। সেদিনটি ছিল রোমান্টিক। কারণ সঙ্গে ছিলেন চাচার প্রেমিকা। পরে তিনি হন আমার চাচি।
সেই প্রথম তাজ হোটেলের সি লাউঞ্জ-এ বসে সামনে আরব সাগরের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে সবচেয়ে দামি ভেলপুরি (চটপটি) খাওয়ার সৌভাগ্য হয়।... তার প্রায় ১২ বছর পরে ১৯৯৯-এ গিয়েছিলাম তাজের পেছনে একটি শস্তা হোটেলে। এদিনটি রোমান্টিক ছিল না। আমি সেখানে গিয়েছিলাম একটি তরুণ মুসলিমকে ইন্টারভিউ করতে যার পুরো পরিবারই আক্রান্ত হয়েছিল হিন্দু দাঙ্গাকারীদের হাতে। এ তরুণটি একটি আন্ডারগ্রাউন্ড মুসলিম সংগঠনে যোগ দিয়েছিল।
সে আমাকে বলে, শিগগিরই মুসলিমরা বিশ্বজুড়ে তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করবে এবং ইনডিয়ায় সেটি দেখা যাবে বম্বেতে। এবার আমরা রেডি থাকবো। আমাদের সব অস্ত্র ও যন্ত্র আছে। আমাদের ভাইয়েরা জাহাজে করে আরো অস্ত্র পাঠাবে।
আমি ওই মাস্তানকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মুসলিমদের জন্য বম্বে যদি এত খারাপই হবে তাহলে কেন সে বম্বেতে থাকছে?
উত্তরে সে জানালার বাইরে তাজ হোটেলের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, কারণ বম্বেতে আছে টাকা। অনেক অনেক টাকা।
এ কারণেই সন্ত্রাসীরা বার বার আক্রমণ করছে বম্বেকে। তারা বেছে নিয়েছে তাদের সন্ত্রাসী কাজের জন্য ইনডিয়ার সবচেয়ে বেশি সফল কমার্শিয়াল শহর বম্বেকে এবং সেই শহরের সবচেয়ে বড় বিজনেস হোটেলটিকে। কেননা সেখানেই টাকা বানানো হয়। অনেক অনেক টাকা।
লক্ষণীয় যে, সুকেতো মেহতা বলেননি ধর্মীয় লক্ষ্য পুরণে ইনডিয়ান মুসলিমরা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। তিনি যা বলেছেন তার সারমর্ম হচ্ছে, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ইনডিয়ার গরিব মুসলিমরা সন্ত্রাসের পথে যাচ্ছে।
অন্যভাবে বলা চলে, ইনডিয়া ব্যর্থ হয়েছে তাদের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় অর্থাৎ মুসলিমদের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্যমুলক বিধি-ব্যবস্হাকে দুর করতে।
তা সত্ত্বেও সুকেতো মেহতা বলেননি রাষ্ট্র হিসেবে ইনডিয়া ফেইল করেছে। একই দিনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় ইনডিয়ার প্রখ্যাত সম্পাদক ও বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী এমজে আকবর, অমিত চৌধুরী, শশি থারুর, বিকাশ স্বরুপ, সনিয়া ফ্যালেরো, ষ্টিফেন ট্যাংকেল, দিব্যেশ আনন্দ প্রমুখ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক বিভিন্ন লেখায় বম্বের ঘটনা সম্পর্কে তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা তারা করেছেন। ইনডিয়ান সরকার ও সমাজের তীব্র সমালোচনা তারা করেছেন।
কিন্তু তারাও বলেননি, রাষ্ট্র হিসেবে ইনডিয়া ব্যর্থ হয়েছে বা ইনডিয়া অকার্যকর হয়েছে।
বস্তুত আমিও তাদের সঙ্গে একমত। ইনডিয়া ফেইলড ষ্টেট নয়। ইনডিয়ার বহু সাকসেস আছে। ইনডিয়া পারমাণবিক বোমা বানিয়েছে, মহাশুন্যে রকেট পাঠিয়েছে, সবচেয়ে শস্তা মোটরকার নানো বানাচ্ছেন তাজেরই মালিক টাটা! বলা হচ্ছে, আর দুই দশকের মধ্যে ইনডিয়া হবে বিশ্বের তৃতীয় সুপারপাওয়ার।
বার বার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা ও সন্ত্রাসী হামলা সত্ত্বেও ইনডিয়া তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। তাই ২৬ নভেম্বর ২০০৮-এর ঘটনার পর কেউ বলছে না ইনডিয়া ব্যর্থ হয়েছে। যেমন ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এ নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ার এবং ওয়াশিংটনে পেন্টাগন আক্রান্ত হওয়ার পর কেউ বলেনি আমেরিকা ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়েছে।
অথচ আমেরিকায় সেসব সন্ত্রাসী হামলা এবং ইনডিয়ার এই সর্বশেষ সন্ত্রাসী ঘটনা বিশাল প্ল্যানের ফসল, যার পেছনে কাজ করেছে বহু দিন ধরে সুসংগঠিত সব শক্তি।
সেই তুলনায় বাংলাদেশে ১৭ আগষ্ট ২০০৫-এ একযোগে প্রায় ৪০০ স্হানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি ছিল ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে তুলনামুলকভাবে ছোট। বিএনপি সরকারের সময়ে র�্যাব ও পুলিশ বাহিনী সন্ত্রাসীদের জীবিত অবস্হায় গ্রেফতার করেছিল এবং আদালতে তাদের বিচার সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু তার আগে থেকেই বাংলাদেশকে আরো ব্যাপকভবে চিত্রিত করা হতে থাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র রুপে। পরিণতিতে ওয়ান-ইলেভেন।
ইনডিয়াতে এত বড় বিস্ফোরণ এবং এত হতাহতের পর তাদের সেনাবাহিনীর কেউ দিল্লিতে গিয়ে সরকার পরিবর্তন যে করলো না, আশা করি সেই বিষয়টি আমাদের দেশের সবাই বিবেচনায় রাখবেন। এখানে আরো জানাতে চাই, আজ লন্ডনের দি ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার অনলাইনে শীর্ষ ২০টি বিপজ্জনক দেশের লিষ্টে ইনডিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিপজ্জনক বাকি ১৯টি দেশ হচ্ছেঃ পাকিস্তান, ইরাক, আফগানিস্তান, ইসরেল ও দখলীকৃত প্যালেষ্টাইন, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, চেচনিয়া, জ্যামাইকা, সুদান, কলাম্বিয়া, হেইটি, ইরিত্রিয়া, গণপ্রজাতান্ত্রিক কঙ্গো, লাইবেরিয়া, বুরুন্ডি, নাইজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে এবং লেবানন। লক্ষ্য করুন, এই লিষ্টে বাংলাদেশের নাম নেই।
সন্ত্রাসের উত্থান বহু দেশেই হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিস, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ইনডিয়া, পাকিস্তান, টার্কি, স্পেন, বৃটেন, আমেরিকাসহ অনেক দেশেই বড় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। তারা সন্ত্রাস মোকাবেলার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্রকে আরো নিরাপদ করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। রাষ্ট্রকে আরো স্হিতিশীল করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্হা নিচ্ছে।
অথচ সন্ত্রাসী ঘটনাকে অজুহাত করে বাংলাদেশকে আরো অস্হিতিশীল করা হয়েছে। এটা কতিপয় ব্যক্তির অদুরদর্শিতা, অবিমৃষ্যকারিতা এবং অনিয়মানুবর্তিতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। বহির্শক্তির উস্কানি, পরামর্শ ও চক্রান্তে এরা বাংলাদেশকে চরম বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশকে এরাই ব্যর্থ রাষ্ট্র করতে চাইছে।
কথাগুলো আমি বলছি এই কারণে যে, অদুর ভবিষ্যতে আরেকটি ওয়ান-ইলেভেনের পুনরাবৃত্তিতে কোনো ব্যক্তি যেন উৎসাহিত না হন।
বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে একটি সাধারণ নির্বাচনের দিকে। ছদ্মবেশী সেনাতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের দিকে।
এই পথে আগামীতে কিছু সহিংসতা ঘটলেও ঘটতে পারে। নির্বাচনের ফল অমীমাংসিত হতে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলমান থাকতে পারে।
তবুও বাংলাদেশকে আপনারা কেউ ব্যর্থ রাষ্ট্র বলবেন না। কারণ একটি রাষ্ট্রকে ভালো-মন্দ সব ধরনেরই পরিস্হিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। আরো মনে রাখবেন, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে একটি অস্বচ্ছ সেনাতন্ত্রের চেয়ে একটি খোঁড়া গণতন্ত্রও শ্রেয়।
সে যাই হোক। ঈদুল আজহায় কোরবানিতে ডাষ্টবিনে যদি আমি গত দুই বছরের তুলনায় বেশি হাড়-মাংস-নাড়ি-ভুড়ি পাই তাহলেই বুঝবো, বাংলাদেশের পরিস্হিতি স্বাভাবিক হতে চলেছে। বলতে পারেন, ৯ ডিসেম্বর ঈদুল আজহার দিনটি থেকে ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিনটি পর্যন্ত আপনাদের মতোই আমিও দারুণ টেনশনে থাকবো।
এই টেনশন কাটানোর জন্য আপনি আমার একটি প্রিয় গান বাজিয়ে শোনাতে পারেন। গুরু দত্ত পরিচালিত মুভি সিআইডি-তে ওপি নায়ারের সুরে গানটি গেয়েছিলেন মোহাম্মদ রফি। গানের প্রথম কয়েকটি কলিঃ
অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল
জি না এহা
জারা হাটকে জারা বাঁচকে
ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান!
কহি বিলডিং, কহি ট্রাম হ্যায়
কহি মোটর, কহি মিল।
মিলতা হ্যায় এহা সব কুছ
এক মিলতা নাহি দিল!
ইনসাফ কা নাহি নাম নিশান
ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান!
১৯৮০-তে মোহাম্মদ রফি পরলোক গমন করেন। তার মৃত্যুর ২৮ বছর পরে মুম্বাইয়ে জীবিত থাকাটা সত্যিই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অমিতাভ বচ্চন এই প্রথম তার বালিশের নিচে রিভলভার নিয়ে ঘুমাচ্ছেন অথবা ঘুমানোর চেষ্টা করছেন।
কিন্তু মুম্বাইয়ের নেড়ি কুকুরদের কোনো সমস্যা নেই। আপনারা টিভি চ্যানেলে এটাও নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, তাজ হোটেলে বোমা বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণ ও অগ্নিকান্ড চলার সময় একটি নেড়ি কুকুর প্রায় সারাক্ষণই সাংবাদিকদের পাশে নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করেছে। ওই নাম না জানা কুকুরটিকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। ঘেউ ঘেউ।
লেখকঃ সম্পাদক, মৌচাকে ঢিল
২০০৮-১২-১২
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

