স্বপ্ন ও নৈঃসঙ্গের যাতনা : আল মাহমুদ
৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৪১
স্বপ্ন ও নৈঃসঙ্গের যাতনা
: আল মাহমুদ
একজন কবির বেঁচে থাকার লড়াই হলো স্বপ্নকে বাঁচিয়ে চলার লড়াই। অতি সতর্কতার সাথে এই লড়াই চালিয়ে এসেছি। এখন আমার শরীরের অবস্থা তেমন ভালো নয়। তবু লেখার জন্য নিয়মমাফিক কলম নিয়ে বসতে হয়। অনেকেই আমার এই কলামটির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আমিও সাধ্যমতো নিয়মিত কাজটি করে চলেছি।
লেখার বিষয় সব সময় হাতড়ে না পেলেও যা মাথায় আসে তাই লিখে যেতে পারি না। চিন্তাভাবনা করতে হয়। কারো কোনো অনিষ্ট না করে এই কাজটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অন্তত করি। এতে আমার নিজের কথাই বেশি লিখতে হয় বলে খানিকটা লজ্জাবোধ করে থাকি। কিন্তু আমার বিষয় কী হবে, তা আগে থেকে স্থির করে নিতে পারি না। আমি লিখি কোনো তাৎক্ষণিক উদ্দীপনায় কিংবা লিখি অন্তরের তাগিদে। আমি বহুদ্রষ্টা একজন বয়স্ক ব্যক্তি, এই জীবনে অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনার সাক্ষী। আমার নিজেরও অনেক দুঃখ-কষ্টের কাহিনী আছে। সাধারণত নিজের দুঃখের কথা ফলাও করে বলতে অভ্যস্ত নই। মানুষের দুঃখ নিয়ে অনেক পুস্তক রচনা করেছি, এর মধ্যে কবিতার বইও আছে; যেমন আছে উপন্যাস।
দীর্ঘ জীবন পাড়ি দিতে গেলে অনেক বিয়োগান্ত ঘটনার স্মৃতি-বিস্মৃতি পার হয়ে আসতে হয়। ইতোমধ্যেই এসব বেদনার্ত বিয়োগান্ত ঘটনা অতিক্রম করে এসেছি। কান্না আমার স্বভাব নয় বলে অশ্রুপাত করি না। চিরকালই আমি নিঃসঙ্গ নীরব পথের যাত্রী ছিলাম, এখনো তাই আছি। আমার কাছে কারো কোনো দাবি থাকলে সেটা পূরণ করার চেষ্টা করি। তবে কিছু ঋণ আছে, যেগুলো পরিশোধ করার সাধ্য আমার নেই, আবার এমন ঋণও আছে যা পরিশোধ করতে চাইও না। থাকুক না কিছু পাওনা যা অপরিশোধ্য। চোখের জলের ঋণ কি আর কেঁদে পরিশোধ করা যায়?
আমার বিপদ হলো, জীবনের কথা বলতে গেলেই কৈশোর এসে উপস্থিত হয়। আর কৈশোর হলো এক ভাগ্যবিড়ম্বিত বালকের বাল্যের ঘটনাবলি। আমি যা মনে করতে চাই না, সেটা তো লিখেও বলতে সাহস নেই আমার। শুধু আমার মায়ের মুখটি স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে। মনে পড়ে, এই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আমাদের আঙ্গিনার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে চিৎকার করে মাকে ডাকতাম। মায়ের শব্দ শুনতে পেতাম, আমার নাম ধরে বলতেন, ‘এসেছিস� দাঁড়া, দরজা খুলে দিচ্ছি।’ দরজা খুলে দিলে পেতাম আমার মাকে। চিরকালের এ কথা। ভাত-তরকারি গরম করে সাজিয়ে দিতেন আমার সামনে। ক্ষুধার্ত বালক, আমার মা ভাবতেন আমি বহু দিন কিছু খাইনি। ঘরে যা ছিল সবটাই আমার জন্য সাজিয়ে পাশে বসে থাকতেন। এই তো আমার মা, চিরকালীন মাতৃ প্রতিচ্ছবি। এই ছবি কিছুতেই আমার স্মৃতি থেকে সরে যায় না। আমার মা জানতেন, তার একটি ছেলে কবি হৃদয় নিয়ে জন্মেছে। আর সব ছেলের মতো নয় সে। বিষয় বুদ্ধিহীন এই বালকটির জন্য আমার মায়ের দুশ্চিন্তার সীমা ছিল না। তিনি জানতেন, একে সবাই ঠকাবে। আর আমি জানতাম, সবার কাছে ঠকেও কিভাবে জিতে যাবো। এখন জয়-পরাজয়ের হিসাব মেলানোর সময় নয়। শুধু আয়ুষ্কাল পূর্ণ করে যাওয়ার প্রয়াস মাত্র।
আমার সব লেখাই যে শেষ পর্যন্ত টিকে যাবে, এমন কথা বলি না। তবে যেটা আমার লেখা, এর দায়- দায়িত্ব আমি নিজেই বহন করে চলেছি। আমার অনেক প্রাপ্য ভাগ্যে জোটেনি। আবার অনেক দুষ্প্রাপ্য খ্যাতি আমি না চাইতেই আমার ওপর ঢেলে দেয়া হয়েছে। অনেকেই ভাবেন, লেখকজীবন বোধ হয় খুবই আনন্দের। কিন্তু আমি জানি লেখকজীবন সবচেয়ে অশ্রুসজল বেদনার কাহিনী মাত্র। আমি মাঝে মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে বিছানায় চোখ ব করে বসে থাকি। ভাবি, আমার অতীত মূলত দুঃখের ভেতরে অতিবাহিত হয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো, অনেক আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আপনজনের সান্নিধ্যে থেকেও আমি ছিলাম নিঃসঙ্গ। নিঃসঙ্গ চিন্তার দিক থেকে যেমন স্বপ্নের দিক থেকেও তেমনি। আমার স্বপ্নও কেবল নৈঃসঙ্গের যাতনায় মর্মরিত। এর বেশি তো আমার জানান দেয়ার সামর্থ� নেই। যারা কলাম লেখেন, লোকে বলে তাদের নিজেদেরও আড়াল থাকে না। কথাটা সত্য বলেই বিবেচনা করি। লিখতে লিখতে আমার সব আচ্ছাদন, রাখঢাকের ব্যাপারটা উন্মুক্ত করে ফেলেছি। এখন আফসোস হয়। কিন্তু আচ্ছাদন খুঁজে পাই না। নিজেকে ঢাকব কী দিয়ে? আবার এটাও বুঝি, আমার এভাবে আড়াল উঠে যাওয়ার ঘটনাটি অনেক পাঠকের লজ্জার অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে। তবুও যেহেতু আমি কবি ছাড়া আর কিছু নই, সে কারণে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে চাই।
কেমন হয় কবিরা? কোথায়, কিভাবে জন্মায় একজন কবি? কবির কী প্রয়োজন একটি দেশের জন্য? এসব প্রশ্নের জবাব অতীতে দেয়ার চেষ্টা করেছি। অনেক কথা লিখেছি, যা অন্য কবিরা লিখতে সম্মত হবেন না। আমি লিখেছি; কারণ আমি আমার পাঠকদের কাছে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।
অনেকে প্রশ্ন করেন, আমার উপন্যাসগুলো কি আমার জীবনেরই কোনো রঙ চড়ানো? আমি জবাব দিই না। কারণ এর কোনো জবাব হয় না। আমি মনে করি, উপন্যাস রচয়িতাদের নিজের জীবন ছাড়া লেখার আর কোনো বিষয়বস্তু থাকে না। থাকলেও সেটা শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনেই এসে মিশে যায়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। যখন ধারাবাহিকভাবে উপন্যাস রচনা করতাম, তখন আমার কিছু বু জুটেছিল। তারা সবাই সাংবাদিক, এখনো পেশায় নিয়োজিত। আবার কেউ এই লেখালেখির জগৎ থেকেই দূরে সরে গেছেন। কিন্তু তাদের স্মৃতি আমার মতো এক অযোগ্য কবির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা অন্তর্হিত হয়েছেন। সাধ্যমতো তাদের কথাও আমার রচনাবলির কোথাও না কোথাও জমা করে রেখেছি। বলা যায় আমি তাদের এককালীন স্মৃতিকে বিস্মৃত হইনি। অবশ্য ভুলে যাওয়াটা মানুষের একটি স্বাভাবিক ব্যাপার।
আমি দাবি করতে চাই যে, আমার উপন্যাসগুলো একজন কবিরই উল্টাপাল্টা স্মৃতিকথা। উল্টাপাল্টা কারণ যখন যা মনে এসেছে, জীবনের কাহিনী হিসেবে সেটাই উপন্যাসে ঢুকিয়ে আনন্দ পেয়েছি। শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ালো, সেটা তখন যেমন ভাবিনি, এখনো ভাবছি না। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে আমি কী ভাবছি? এর জবাবে বলতে পারি, সেসব পুরুষের কথা ভাবছি, যাদের কাছে নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম। আমি নারীদের কাছেও ঋণী, কিন্তু তাদের বিষয়ে অনেক লিখেছি। লিখেছি ঋণ শোধ করার জন্য নয়, ঋণ স্বীকার করার জন্য। যা হোক, আমি এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নই যার সাক্ষ্য গ্রহণ না করলে বাংলা সাহিত্যের তিল পরিমাণ ক্ষতি হবে। সাহিত্য চলছে গতির নিয়মে। কালের গতি ক্ষয়ক্ষতির ধার ধারে না।
একটা কথা স্বীকার করতে চাই। সেটা হলো, সব সময় আমার লেখার বাসনা মনে তরঙ্গ তোলে না। তখন জোর করে লিখি, এই জোর জবরদস্তিতে যেটা বেরিয়ে আসে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বটে। কারণ নিজের খুশিমতো লিখে যাওয়া আমার পক্ষে সব সময় সম্ভব হয়নি। অনেক সময় রুটিন রক্ষার জন্যও কলাম পূর্ণ করে দিতে হয়। আমি যে থামিনি, এটাই হলো আমার বেঁচে থাকার লক্ষণ। আমি সাহিত্যে কী করেছি বা করিনি, তার একটা হিসাব-নিকাশ নিশ্চয় পাঠকদের কাছে আছে।
আমি শুধু বলব, ফাঁকি দিতে চেষ্টা করেও সেটা পারিনি। কারণ দায়বদ্ধতা একটি অদৃশ্য বিবেক। আমি বিবেকের তাড়নায় লিখি এবং বিবেকের তাড়নায় এই বয়সেও শিখি। এই নিরন্তর লেখালেখির জীবন আমি চাইনি। দৈবক্রমে এটাই আমার ভাগ্যে জুটেছে। যখন শুনি কিছু লোক আমার এই কলামটির জন্য অপেক্ষা করে আছেন, তখন আর স্বস্তিতে দিন কাটানো সম্ভব হয় না। অন্য দিকে আমাদের সমকালীন সাহিত্যে নানা বিষয়ে আমাকে সজাগ থাকতে হয়। সজাগ থাকি; তা না হলে আমি পিছিয়ে পড়ব। লেখাজোখার ব্যাপারে হার মানতে চাই না। আমার যখন পাঠক আছে, তখন আমি লিখব না কেন। এর মধ্যে নানা চিঠিপত্র পাই। এসব চিঠি বিভিন্ন দেশ থেকে আমার উদ্দেশে লেখা হয়। সব চিঠির জবাব দিতে গেলে আমার দম ফুরিয়ে যাওয়ার কথা। আমিও জবাব দিই, তবে তা এই কলামটির মাধ্যমে। জানি না এতে আমার পাঠককুল পরিতৃপ্ত কি না।
এমন ইঙ্গিত পাই, যেন আরো প্রেমের গল্পই লিখি। মনে মনে হাসি, ভাবি এ ধরনের প্রশ্নকর্তাদের বয়স নিশ্চয় অনেক কম। সব প্রশ্নের তো আর জবাব হয় না। আর কত লোককে জবাব দেবো? তবে কলম ব করেও রাখি না, ভালো-মন্দ যা-হোক আমি তো কিছু লিখে চলেছি।
চরিত্র সৃষ্টিতে আমি পারঙ্গম, অন্য দিকে দুশ্চরিত্র নির্মাণে ততটা দক্ষ নই। ফলে আমার লেখা হয়ে যাচ্ছে একপেশে, আমি দুঃখী মানুষের ও ভালো মানুষের কথাই লিখি� আমার এমন একটা সুনাম বা দুর্নাম তৈরি হয়ে গেছে। কী করব? এর জন্য তো আমার মনমানসিকতাই দায়ী।
আমি দুশ্চরিত্র মানুষও দেখেছি। তাদের ভেতরটা যতটুকু দেখা যায়, অধ্যয়ন করেছি; কিন্তু লিখিনি। আমার মনে হয়, এটা আমার একধরনের ত্রুটি। ত্রুটি না হোক আমার তো এ ধরনের লেখার ঝুলি একেবারে শূন্য। এখন ভাবছি, খারাপ লোকদের নিয়েও লিখব। খারাপের মধ্য যতটুকু মনুষ্যত্ব থাকে সেই মানবিকতার চর্চা করব না কেন? এখানে প্রশ্ন হতে পারে, দুশ্চরিত্র নারীও তো আছে। আছে বৈকি। কিন্তু আমার জানার পরিধির মধ্যে তাদের খুব বেশি পাইনি। আছে, আমি জানি। কিন্তু লিখতে হলে মিশতে হয়। আর মিশতে গেলে ভেতরে ঢুকে যেতে হয়। ওই ধরনের চরিত্রের অন্তরে প্রবেশ করার সাহস এত দিন সঞ্চয় করতে পারিনি।
লেখকের বৃত্তি যখন গ্রহণ করেছি তখন আমাকে সব বিষয়েরই ভেতরে ঢুকতে হবে। আমি ভয় পাই, আমার বয়স হয়ে গেছে বেশি। কিংবা বয়সের কারণেই ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছি। এই ছেলেমানুষের হাত থেকে নিজের বিবেকের তাড়নায়ই আত্মরক্ষা করে চলতে চাই। কতটা কী করতে পারব বা না পারব, তা তো আগে থেকে বলতে পারি না। তবে নিজের কাছে সৎ থাকতে চাই। যা হোক, আমার লেখা নিয়ে নিজেই এত সব কথা বলতে চাইনি। প্রকৃতপক্ষে আমি একজন দুঃখী মানুষ। অনেক ব্যথা-বেদনা জমা হয়ে আছে আমার এই বুকে। লিখতে পারলে খানিকটা হাল্কা হওয়া যেত। কিন্তু আমার কাহিনী সবটুকু লেখার যোগ্য নয়। লেখক হলেই দায়িত্বজ্ঞানকে আমি এড়িয়ে চলতে অভ্যস্ত নই। তা ছাড়া আমি কবি হলেও কবির মতো জীবন কাটাইনি। একদা অনেক দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত ছিলাম এবং ওই সব ক্ষেত্রে আমার খানিকটা সাফল্যের কথাও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।
শুধু একটা কাজ এখনো করে উঠতে সাহস খুঁজে পাচ্ছি না। সেটা হলো, লেখক হিসেবে যেসব খ্যাত-অখ্যাত মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলাম, তাদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা। সেটা পারিনি। করতে পারলে হয়তো বা একটা কাজের কাজ হতো। কিন্তু আমার চরিত্রের একটা দিক হলো� ভয় পাওয়া। আমি ভয় পাই। তবে যদি কোনো দিন বুকে সাহস সঞ্চয় করতে পারি, তবে জানা মানুষের জীবন নিয়ে একটি বই অবশ্যই লিখব।
(সূত্র, নয়া দিগন্ত, ২০/১২/২০০৮)
Click This Link
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
বর্তমানবাংলা বলেছেন:
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই
লেখক বলেছেন: আমি তো বিচারক না । যারা বিচারক তাদের কাছে গিয়া বিচার চান ।
মেঘবাজি বলেছেন:
বাল মাহমুদরে কপি-পেস্ট করনের লাইগা মাইনাস
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














