১০ টাকা কেজি চাল ও বিনামুল্যে সার নিয়ে যতকথা
মোকাররম হোসেন
সাম্প্রতিক আলোচিত একটি বিষয় হছে, ১০ টাকা কেজি চাল ও বিনামুল্যে সার। বলা হছে, বর্তমান ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ন একটি ছিল, ১০ টাকা কেজিতে চাল ও বিনামূল্যে কৃষকদের মধ্যে সার বিতরন। সরকার গঠনের পর মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সরকারের গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রীবর্গ বলতে শুরু করেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে এ ধরনের কোন প্রতিশ্রুতি দেয়নি, এটা বিএনপিসহ বিরোধী গোষ্ঠীর অপপ্রচার। এ ব্যপারে নির্বাচনের আগে ও পরে প্রকাশিত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরা হল,
ক. বিবিসি সংলাপঃ ১০ টাকা কেজি চাল ও বিনামুল্যে সার দেয়ার কথা শেখ হাসিনা একবারও বলেননিঃ মুহিত শীর্ষক আমার দেশের সংবাদে বলা হয়, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও নবনির্বাচিত এমপি আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো এবং বিনামুল্যে কৃষকদের সার দেয়ার কথা শেখ হাসিনা একবারও বলেননি। বিবিসি সংলাপে দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, নেত্রী দ্রব্যমুল্য কমানোর কথা বলেছেন। দ্রব্যমুল্য কখন কমানো হবে নির্দিষ্ট করে দিন-তারিখ বলে দেয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে দর্শকরা বলেছেন, শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রচারের সময় ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো ও বিনামুল্যে সার দেয়ার কথা বলেছেন। সংলাপে উপস্হিত প্যানেল আলোচক জানিপপ চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, উইমেন ফর উইমেনের সভানেত্রী সালমা খান ও বিএনপি নেতা হান্নান শাহ দর্শকদের প্রশ্নের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সালমা খান নির্দিষ্টভাবে বলেন, দক্ষিণবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের সময় শেখ হাসিনা ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো ও বিনামুল্যে সার দেয়ার কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে তারা আরো বলেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-মিছিলে একটি শ্লোগানই ছিল-‘১০ টাকায় চাল খাব, নৌকায় ভোট দেব।’ এমন কি মুহিত সাহেবের আসনেও এ শ্লোগান উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে যখন বিব্রতকর পরিস্হিতি, তখন সংলাপের উপস্হাপক প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন।(আমার দেশ, ০৪/০১/২০০৯)
খ. ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো সম্ভব হবে নাঃ খাদ্যমন্ত্রী। খাদ্যমন্ত্রী ড. মোঃ আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, কোনো অবস্হায়ই ১০ টাকা কেজি দরে জনগণকে চাল খাওয়ানো সম্ভব হবে না। তিনি দাবি করেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় প্রচার হচ্ছে, আমরা ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়াব। আমাদের নেত্রী নির্বাচনী ইশতেহারে বা কোনো নির্বাচনী জনসভায় ১০ টাকা কেজি দামে চাল বিক্রির কথা বলেননি। ১০ টাকায় চাল খাওয়ানো সম্ভব নয়। আমাদের লক্ষ্য হবে, প্রয়োজন অনুসারে সবাই যেন খাদ্য পায়। চালের কেজি ১০ বা ১৫ টাকা বিষয় নয়।’ গরিবদের জন্য ভিজিএফ কার্ডসংখ্যা দ্রুত বাড়ানো হবে বলে তিনি জানান। (আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, ০৮/০১/২০০৯)
গ. গত ৮ জানুয়ারী দলের মুখপাত্র স্হানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘১০ টাকা কেজি চাল ও বিনামুল্যে সার দেয়ার ব্যাপারে শেখ হাসিনার কোনো অঙ্গীকার ছিল না। তিনি বিষয়টিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির অপপ্রচার হিসেবে উল্লেখ করেন। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ,০৮/০১/২০০৯, দৈনিক সংবাদ, ০৯/০১/২০০৯)
ঘ. মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের প্রথম দিনেই বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ১০ টাকা চাল খাওয়ানো কোনভাবেই সম্ভব নয়, এ ব্যপারে নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগ কোন প্রতিশ্রূতি দেয়নি। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ,০৭/০১/২০০৯, দৈনিক সংবাদ, ০৯/০১/২০০৯)
ঙ. অন্যের প্রতিশ্র"তি আ.লীগের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে: কৃষিমন্ত্রী শীর্ষক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সংবাদে বলা হয়, ক্ষমতায় গেলে বিনামূল্যে সার বিতরণ ও ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির প্রতিশ্র"তি দেওয়ার কথা এবার নাকচ করলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'অন্যের প্রতিশ্র"তি' আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। মতিয়া চৌধুরী বলেন, "আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে বিনামূল্যে সার বিতরণ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কথা কোথাও বলা হয়নি। আমাদের নির্বাচনী ইস্তেহারেও এ ধরনের কথা নেই।" রোববার বিকেলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে মতিয়া চৌধুরী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। নির্বাচনে মহাজোটের বিজয়ের পর থেকে বিএনপি দাবি করে আসছে- আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্র"তিতে বিনামূল্যে সার বিতরণ এবং ১০টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর কথা বলেছে। তারা এখন সে কথিত প্রতিশ্র"তি পূরণের দাবি করছে। এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী অভিযোগ করেন, "যারা এসব কথা বলেন তারা তাদের কথা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়। কেউ এটা প্রমাণ করতে পারলে আমরা তা মাথা পেতে নেব।" (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১১/০১/২০০৯, দৈনিক সংবাদ, আমার দেশ ১২/০১/২০০৯)
এবার ফিরে যাওয়া যাক নির্বাচনের আগে ১০ টাকা কেজি চাল ও বিনামুল্যে সার নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কে কী বলেছিলেন,
১. আ’লীগ ক্ষমতায় গেলে ১০ টাকা দরে চাল দেবে, ৫ টাকায় কাঁচামরিচঃ জিল্লুর রহমান। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর রহমান বলেছেন, তার দল এবার ক্ষমতায় গেলে প্রতি কেজি চালের দাম কমিয়ে ১০ টাকা ও কাঁচামরিচের দাম পাঁচ টাকা করা হবে। ২ ডিসেম্বর ২০০৮ কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর কমিউনিটি সেন্টারে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক কর্মী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। (নয়া দিগন্ত, ০৩/১২/২০০৮)
২. কোটালীপাড়ার সেই মাঠে ভোট চাইলেন হাসিনা শীর্ষক প্রথম আলো সংবাদে বলা হয়, জনসভায় শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সরকার গঠন করতে পারলে অবশ্যই পদ্মা সেতু করব । আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া) আসনে গতকাল সোমবার তিনি প্রচারনা কালে এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ১৮ হাজার কমিউনিটি হেলথ সেন্টার তৈরি করে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোরায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু জোট সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ক্ষমতায় এসে চার হাজার কমিউনিটি হেলথ সেন্টার তৈরির পরও প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে এগুলো চালু করবে। বয়স্ক ভাতা দ্বিগুণ করা হবে, তাদের চলাফেরা ফ্রি করে দেব। কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে সার বিতরণ করা হবে।- বক্তব্যের সময় উপস্থিত লোকজন পদ্মা সেতুর দাবি তুললে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সরকার গঠন করতে পারলে অবশ্যই পদ্মা সেতু করব। (প্রথম আলো, ১৮/১২/২০০৮)
৩. ১৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এক পথসভায় বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের মধ্যে বিনামুল্যে সার বিতরণ করা হবে।’ গত ২৪ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুর বাসষ্ট্যান্ডে পথসভায় তিনি বলেন, ‘নৌকা এবার বিজয়ের মার্কা, ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ার মার্কা।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বক্তব্য গত ১৮ ডিসেম্বরের দৈনিক প্রথম আলো ও ২৫ ডিসেম্বর দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার রিপোর্টে ছাপা হয়। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্রতিটি প্রচার মিছিলের মুল শ্লোগানই ছিল ‘১০ টাকায় চাল খাব, নৌকায় ভোট দেব।’ প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতারাও সভা-সমাবেশে ১০ টাকায় চাল খাওয়ানোর কথা বলেছেন। (আমার দেশ, ১০/০১/২০০৯)
৪. নারী নেত্রী সালমা খান বিবিসি সংলাপে বলেন, দক্ষিণবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের সময় শেখ হাসিনা ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো ও বিনামুল্যে সার দেয়ার কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-মিছিলে একটি শ্লোগানই ছিল-‘১০ টাকায় চাল খাব, নৌকায় ভোট দেব।’ (বিবিসি সংলাপ, ০৩/০১/২০০৯)
৫. খালেদার প্রাণ নাশের চেষ্টা সাজানো নাটক শীর্ষক জনকন্ঠের সংবাদে বলা হয়, ২৪ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুর বাসষ্ট্যান্ডে পথসভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘নৌকা এবার বিজয়ের মার্কা, ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ার মার্কা।’ তিনি সেখানকার প্রার্থী হাবিবুর রহমানকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ১০ টাকায় চাল খেতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে। দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে। (জনকন্ঠ, ২৫/১২/২০০৮)
৬. ২০০৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় ‘টাঙ্গাইল ও জামালপুরে শেখ হাসিনা...’ শিরোনামে ডাবল কলামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হাইস্কুলের জনসভায় তিনি ড. আবদুর রাজ্জাককে দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, জোট সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসন থেকে মুক্তি এবং অর্থনৈতিক সফলতা অর্জনে নৌকায় ভোট দিন। তিনি ্লোগান দেন, নৌকা মার্কায় ভোট দেব, ১০ টাকা সের চাল খাব। ধানের শীষে ভোট দেব না ২০ টাকা সের চাল খাব না।’ একই দিনে জামালপুরের মাদারগঞ্জ বালিজুড়ী এফএম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মির্জা আজমের জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দেশকে বাঁচাতে হলে নৌকা ছাড়া উপায় নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে দেশে ১০০ ভাগ লোককে শিক্ষিত করা হবে। দ্রব্যমুল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা হবে। চালের সের ১০ টাকা হবে, দেশ আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ণ হবে।’ (প্রথম আলো, ১৭/০৯/২০০৬)
৭. ২০০৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আমার দেশের প্রথম পাতায় শিরোনাম ছিল ‘টাঙ্গাইল ও জামালপুরে শেখ হাসিনাঃ ২০ টাকার চাল ১০ টাকায় খেতে হলে নৌকায় ভোট দিন’। (আমার দেশ, ১৭/০৯/২০০৬)
বিবিসি বাংলা বিভাগের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও কলামিস্ট সিরাজুর রহমানের কথায় বলা যায় ------নতুন অর্থমন্ত্রী আব্দুল মুহিত বলেছেন, ১০ টাকা কেজির চাল আর সারের ভতুকির কথা দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নেই। জনাব মুহিতকে প্রশ্নঃ বাংলাদেশের ক’জন মানুষ ইশতেহার পড়ে ভোট দেয়? আর ইশতেহারের কত কপি ছেপেছে আওয়ামী লীগ সোয়া আট কোটি ভোটারের জন্য? নেতা-নেত্রীরা নির্বাচনী সভাগুলোতে যেসব কথা বলেন, যেসব প্রতিশ্রুতি দেন, তার ওপর ভরসা করেই বাংলাদেশের মানুষ ভোট দেয়। এখন আবার এলজিআরডি মন্ত্রী আশরাফুল ইসলাম তার স্বভাবসুলভ উদ্ধৃত আর দুর্বিনীত ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, শেখ হাসিনা আদৌ ১০ টাকা কেজির চাল আর সার ভতুকির কথা বলেননি। কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত মানুষ কি তাহলে স্বপ্নেই সেসব কথা শুনেছে হাসিনার মুখে? আশরাফুল ইসলামকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আসল গোয়েবলসের মিথ্যার মুখোশও একদিন খুলে গিয়েছিল। (নয়া দিগন্ত, ১২/০১/২০০৯)
লেখক. পিএইচডি গবেষক,জার্মানী, ই-মেইল, [email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


