somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও কিছু প্রশ্ন : নেছার আমিন

২২ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও কিছু প্রশ্ন
নেছার আমিন


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রধান বিদ্যাপীঠ । ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সীমিত সংখ্যক ছাত্র-শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরূ হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় আজ একটি বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে।এ বিশ্ববিদ্যালয় তার আটাশি বছর অতিক্রান্ত করেছে। এই বয়সে মানবদেহ যেমনিভাবে নানা রোগে ভোগে, ক্ষয়ে যায় জীবনীশক্তি ঠিক তেমন অবস্থা যেন আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও। স্বাধীনতার পর থেকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তার মনের মতো চলতে চলতে প্রায় স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে একদা প্রাচ্যের অফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

২৬০·৫০ একর জমির ওপর অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯ টি অনুষদ, ৫৬ টি বিভাগ ও ৯টি ইনষ্টিটিউট রয়েছে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০,৯৭০। অনেকের মতে, এখন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন লেখাপড়া ছাড়া আর সবই হয়। যদিও অনেকে মনে করেন, “অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান এবং সুযোগ সুবিধা দেশের অন্য যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে উন্নত।” বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষক স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রী করতে গেছেন, অনেক বিষয়ের ওপর গবেষণা কাজও পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। কিন্তু তারপরও দুর্ণাম ঘুচছে না প্রতিষ্ঠানটির।

৮৮ বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখতে এসে নিহত হয়েছেন প্রায় ৮০ জন তরুণ। আর এর প্রায় সবই ঘটেছে স্বাধীনতার পর। এসব হত্যাকান্ডের বিচার তো দূরে থাক কোন সুষ্ঠু তদন্ত এ পর্যন্ত হয়নি। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে উল্লেখ করা হলেও সরকারের ইঙ্গিত ছাড়া এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না।

বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ঘটনা, শিক্ষা ক্ষেত্রে অস্থিরতা, শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র-শিক্ষার সম্পর্কের অবনতি বা শিক্ষকদের অন্তর্দ্বন্ধ, অযাচিত রাজনৈতিক বা দলীয় হস্তক্ষেপসহ নানা ঘটনা এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক মনে করেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল আইন তথা “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ” সংশোধন এবং পরিমার্জন করে যুগোপযোগী করা বিশেষ জরুরী। তবে সে পরিবর্তন অবশ্যই হওয়া প্রয়োজন শিক্ষার স্বার্থে।

১৯২১ সালে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৮ বছরের ইতিহাসে ১৯২১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীনে, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানী শাসকদের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিচালিত হয়েছে। পাকিস্তানী শাসকরা শুরু থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান এবং ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের এ ইচ্ছার সুসংগঠিত বহিপ্রকাশ ঘটে। ৬১ সালের এ অধ্যাদেশকে তৎকালীন শিক্ষক সমাজ কালা কানুন হিসাবে আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে প্রথম থেকেই। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে ‘বাংলাদেশ অধ্যাদেশ-১’ নামে অধ্যাদেশ জারি করে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের নিয়ন্ত্রনে নেয়। ১৯৭৩ সালে পূর্ণাঙ্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি হয়। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ।

৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে শিক্ষকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জ্ঞান এবং গণতন্ত্রকে সুনিশ্চিত করতে ৬১ সালের কালাকানুন সংশোধন করে সিনেট, সিন্ডিকেট, ডিন, একাডেমিক কাউন্সিলিসহ বিভিন্ন বডিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে এবং সরাসরি চ্যান্সেলরের মাধ্যমে উপাচার্যের নিয়োগ পরিবর্তন করে ভিসি প্যানেলের নির্বাচনের বিধানসহ আরও কয়েকটি বিধান সংযোজন করা হয়।

বিগত পঁয়ত্রিশ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ৭৩-এর উদারতা এবং গণতান্ত্রিকতার নানা ধরনের অপব্যবহার হয়েছে। মুক্তিবুদ্ধির চর্চা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে প্রকাশ্যে দলবাজিতে। বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের নেতিবাচক দিক এবং তা সংশোধন করা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে।

সিনেট, সিন্ডিকেট, ডিন, একাডেমিক কাউন্সিল, ভিসি প্যানেল, শিক্ষক সমিতি (অধ্যাদেশবহির্ভূত) প্রায় ছ’-সাতটি বডিতে বছরের বিভিন্ন সময় নির্বাচনের জন্য শিক্ষকদের একটা বড় অংশের পক্ষে শিক্ষা ও গবেষণা কাজে মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না । নিজের দলের স্বার্থে বা ব্যক্তিগত লাভালাভের কারণে শিক্ষকদের নির্বাচনকেন্দ্রীক তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্ধ সৃষ্টি করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন বর্ণে বিভক্ত হয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির কবলে পড়ে বা সংশ্লিষ্ট নেতা-নেত্রীকে খুশি করতে কূটচালে বিপর্যস্ত করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ , গবেষণা এবং স্বাভাবিক লেখাপড়া । অনেক সময় ছাত্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বা শিক্ষকদের অন্তর্দ্বন্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছাত্রের ক্যারিয়ার। তাছাড়া নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ভোটভিক্ষা করে বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তির পক্ষে অনেক দায়িত্বই সুচারুভাবে পালন করা সম্ভব হয় না। বর্ণ’ভিত্তিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপর্যস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র এককভাবে বা সমষ্টিগতভাবে ধর্মঘট ডাকতে পারবে না অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্রকে, ক্লাস, ল্যাবরেটরি বা লাইব্রেরীতে যেতে কেউ বাধা দিতে পারবে না। অধ্যাদেশে এ জাতীয় কথা লেখা থাকলেও এর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য বাস্তব প্রয়োগ নেই। দিনের পর দিন, অনির্দিষ্টকালের জন্য ছাত্র ধর্মঘট, ক্যাম্পাসে মিছিল, মিটিং বা ছাত্র সংগঠনগুলোর কাউন্সিল অধিবেশন, জাতীয় ইস্যু নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মিছিল-সমাবেশ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সরকারী দলের সমর্থক প্রক্টর ও পুলিশের সহযোগিতায় অপর পক্ষকে কোণঠাসা করার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ পাঠদান বিষয়ে মাঝে মধ্যেই বিষয়ে মাঝে মধ্যেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান আগের মতো নেই একথা সবাই বলে । এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩০,৯৭০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র ১,৭০০ জন। ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ১ঃ ১৮। ১,৭০০ জন শিক্ষকদের মধ্যে অনেকে আছেন শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে, এছাড়া অনেকে ব্যস্ত কনসালটেন্সি নিয়ে এবং অনেকে রাজনীতি নিয়ে। অনেক শিক্ষক আবার বিভিন্ন কেলেংকারিতেও জড়িয়ে পড়ছেন। পরিবর্তনশীল জ্ঞানের রাজ্যে বিচরনে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক। অথচ শিক্ষকেরা সে রকম কোন প্রশিক্ষন পায় না । ২০০৭-০৮ সালের বাজেটে শিক্ষক প্রশিক্ষণ খাতে অর্থ বরাদ্ধ দেয়া হয়েছিল মাত্র ১৩ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রভাষক সপ্তাহে ১৬ টি ক্লাস, সহকারী অধ্যাপক ১৪ টি ক্লাস, সহযোগী অধ্যাপক ১২ টি ক্লাস এবং অধ্যাপক ৮ থেকে ১০ টি ক্লাস নেয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিভাগেই এ নিয়ম মানা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক কনসালটেন্সি বা অন্য কোন আর্থিক সুবিধাসম্পন্ন কাজ করলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে । ১৯৮৫ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কনসালটেন্সি বন্ধে ১৩টি কমিটি রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি।

ইতিমধ্যেই অনেক বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু সেমিস্টার পদ্ধতির নিয়মকানুন যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। সেমিস্টার পদ্ধতিতে ১৫টি ক্লাসের পর মিডটার্ম ও ৩০টি ক্লাসের পর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা নেয়ার নিয়ম। কিন্তু এই নিয়মও মানা হচ্ছে না। কোন কোন শিক্ষক ৩০ টি ক্লাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই ক্লাস বন্ধ করে দেন। আবার কোন কোন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত কাজকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আবার কোন কোন শিক্ষক ক্লাসে পাঠ্যসূচীর সাথে সামজঞ্জস্যপূর্ণ আলোচনা না করে নিজের ইচ্ছামত অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় মেতে ওঠেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কিছু শিক্ষকের এমন ধরনের কার্য-কলাপ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

প্রভাষক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পর্যন্ত পদের শিক্ষকদের প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট ইত্যাদির জন্য গবেষণা প্রবন্ধ বাধ্যতামূলক হলেও এ বিষয়েও আছে ব্যাপক শূণ্যতা। অন্যান্য অনুষদে যাই আছে কলা এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদে শিক্ষকদের গবেষণা এবং প্রকাশনার সংখ্যা মোটেই সন্তোষজনক নয়। এক সময় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরিচিতি ছিল সিনিয়র স্কলার ও শিক্ষার্থীদের জুনিয়র স্কলার হিসেবে। প্রতিনিয়ত লেখাপড়া আর গবেষণার মগ্ন থাকা ছিল তাদের প্রধান কর্ম। প্রয়োজনীয় সব বই আর উপকরণ সরবরাহ করতো ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। সেখানে এখন লাইব্রেরীগুলোতে প্রয়োজনীয় বইয়ের সংখ্যা অনেক কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রতিবছরই প্রচুরসংখ্যক শিক্ষার্থী ড্রপ আউট হয়ে যায়। এ ড্রপ আউটের কারণ কি বা ড্রপ আউট হওয়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে এসবের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাই সাধারণত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তাছাড়া বর্তমান সময়ে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছেন ট্রাডিশনাল নোট দিয়ে।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সেশন-জট। সেশন-জটের কবলে পড়ে শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরূত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভুয়া ভর্তি বা জালিয়াতী করে ভর্তি এবং ভুয়া সার্টিফিকেট কেনাবেচার অভিযোগও বহু পুরানো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে কোন কারচুপি বা জালিয়াতি ছিল না-এ বিষয়টি নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গর্ববোধ করতেন। তাই এসব জালিয়াতির ঘটনা অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে।

তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সৃষ্টি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ছোঁয়া অনেকাংশে কম। মাত্র দুটি সাইবার সেন্টার ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ইন্টারনেট সার্ভিস খুবই দুর্বল হওয়ায় ছাত্ররা আন্তর্জাতিক সংবাদ ও পড়ালেখার নির্দেশনা বলতে গেলে পায়ইনা। ক্লাসরূম নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয় ছাত্রছাত্রীদের। কোথাও কোন রূম ফাঁকা আছে নাকি হণ্য হয়ে দল বেঁধে তার সন্ধানে নামে সবাই। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের ক্লাস করতে হয় আগের সেই ছোট রূমটিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৪ টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও গত ৮৮ বছরে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম সম্পাদিত হয়নি। অর্থের অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব গবেষণা কেন্দ্র মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অথচ গবেষণা এবং নতুন নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়-বরাদ্দের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের মাধ্যমে সরকারি তহবিল থেকে। এ বাজেটের আবার শতকরা ৯০ ভাগের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় বেতনভাতা ও অবকাঠামোগত খাতে। বাকী অর্থ ভাগ ব্যয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা খাতে। প্রতিবছরই এ বরাদ্দের হার কমছে।
বিভিন্ন সরকারের সবুজ সঙ্কেতের অভাবে ১৯৯০ সালের পর থেকে ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং অন্যান্য পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। অছাত্র, বহিরাগত ক্যাডার বা ক্ষমতাসীনদের আর্শীবাদপুষ্টরা নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকান্ড। সৃষ্টি হচ্ছে না নতুন নেতৃত্ব। নির্বাচিত নয় বলে কোন দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতাও নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অফোর্ড নামে খ্যাত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল অফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় আবাসন ব্যবস্থা। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমার অন্যতম কারণ তীব্র আবাসন সংকট। প্রতি বছর বেশি করে নতুন ছাত্র ভর্তি করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক সংকট সমাধানকল্পে কর্তৃপক্ষ নতুন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মাত্র এক তৃতীয়াংশই থাকতে পারছে হলে। অনেক শিক্ষার্থী হলে উঠতে না পেরে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। হলে উঠতে গেলে নবীন ছাত্রদের নানান বিড়ম্বনা মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। গত কয়েক দশক থেকে আবাসিক হলগুলো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে। এখানে গোল্ডেন অ+ পাওয়া ছাত্র থাকে ঘিঞ্জি পরিবেশ তথা গণরুমে । এতে লেখাপড়ার কি অবস্থা হয় তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। গনরূমগুলোতে বন্দিদশার মত জীবন কাটানোর চিত্র প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মত প্রথম সারির পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠার খবর হলেও আবেদন সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষের কাছে।

ক্যান্টিন ও ডাইনিংগুলো থেকে যে খাদ্য সরবরাহ করা হয় তাতে হল প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সুস্বাস্থ্য ও মেধার বিকাশে পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন থাকলেও হলগুলোর ক্যান্টিন ও ডাইনিংয়ের খাবার ও অত্যন্ত নিন্ম মানের। পঁচা, ভাসি খাবার খেয়ে জ্বর, জন্ডিস সহ নানান রোগ শোকে ভুগতে হয় শিক্ষার্থীদের। ডাইনিং-ক্যান্টিন দেখার জন্য এক বা একাধিক আবাসিক শিক্ষক থাকলেও তাঁরা খুব একটা নজর দেন না । এই নজরদারির অভাব, রাজনীতি, দলীয়করণ, অর্থলিপ্সার কারনে ক্রমেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিম্নমূখী হতে চলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব ছিল জ্ঞানের বিস্তার ও নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি এসব দায়িত্ব পালন করছে যথাযথভাবে? গত কয়েক বছর আগে কার্টুনিস্ট রফিকুন্নবী একটি পাক্ষিক ম্যাগাজিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি কার্টুন এঁকেছিলেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে শাহবাগের গেট দিয়ে সহস্র কচি মনের তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লাইনে দাড়িয়ে রয়েছে। ৫বছর পর সেই ছাত্ররাই ছাগল হয়ে বেরুচ্ছে নীলক্ষেতের গেইট দিয়ে। এ থেকেই প্রমানিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু ভূমিকা রাখছে পারছে।

দেশের ক্রান্তিকালে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গন অভ্যুস্থান এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পালন করেছে প্রধান ভূমিকা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও দেশ গঠন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন বা অধিকার আদায়ে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা বিশ্বাস করে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব জরাব্যাধি, প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য ও গতিময়তা।
ই-মেইল- [email protected]
Click This Link
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×