জনতুষ্টিবাদ ও মিথ্যাচারের রাজনীতি
ড. মাহবুব উল্লাহ
জনতুষ্টিবাদ বাংলাদেশীর রাজনীতির একটি মারাত্মক ব্যাধি। নির্বাচনের মাধ্যমে ছেলে ভুলানো ছড়ার মতো প্রতিশ্রুতির কল্পকাহিনী শুনিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করাই আমাদের রাজনীতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি প্রদান, ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিশ্রুতির কথা অস্বীকার এবং ক্ষমতাসীন থাকাকালে সাফল্য অর্জনের কল্পকাহিনী প্রচারে বর্তমান শাসক দলটির জুড়ি মেলা ভার। মজার ব্যাপার হলো, মিডিয়া পক্ষে থাকলে এ রকম ভোজবাজির আশ্রয় নিয়ে পার পেয়ে যাওয়াও সম্ভব। এদের ছলচাতুরির কাছে প্রতিপক্ষ দল বিএনপির রাজনৈতিক পারঙ্গমতা একেবারেই নস্যি। এদের না আছে বড় গলা; না আছে কথার পিঠে কথা বলার ক্ষমতা; না আছে প্রতিপক্ষের মিথ্যাচারের সমুচিত জবাব দেয়ার দক্ষতা। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মিথ্যাচারের অনৈতিকতার যে কালচারটি আওয়ামীরা চালু করেছে সেখানে এ রকম বেয়াকুফের মতো হতবাক থাকা যে কত ক্ষতিকর হতে পারে, এবারের নির্বাচনের অবিশ্বাস্য ফলাফল তারই প্রমাণ।
নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাতে গিয়ে সদ্য ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ১৯৯৬-২০০১ পর্বে যখন তার দল ক্ষমতায় ছিল তখন বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছিল। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি, এই ডাহা মিথ্যা কথাটির সমুচিত জবাব প্রতিপক্ষ বিএনপি দিতে পারেনি। হয়তো বলা হবে, অত্যাচার, নিপীড়ন-নির্যাতনে দলটির এমন করুণ হার হয়েছিল যে, দলটির পক্ষে গুছিয়ে অপরপক্ষের প্রচারণায় জবাব দেয়া সম্ভব হয়নি; কিন্তু দলটি তো নির্বাচন করেছিল। নির্বাচনের প্রয়োজনেই এসব বিভ্রান্তিকর প্রচারণার জবাব দেয়া ছিল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতারই আবশ্যকীয় শর্ত। ১৯৯৬’র জুন থেকে ২০০১-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এবং অন্য দু’একটি ক্ষুদ্র দলের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন ছিল। দেখা যাক, এই সময়ে খাদ্যফ্রন্টে দলটির চবৎভড়ৎসধহপব কী ছিল। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছর থেকে ২০০০-২০০১ অর্থবছর পর্যন্ত একটি অর্থবছরও পাওয়া যাবে না, যে বছর বিদেশ থেকে সাহায্য এবং আমদানির মাধ্যমে খাদ্য আনতে হয়নি। সাহায্য হিসেবে প্রাপ্ত খাদ্যশস্য এবং আমদানি করে আনা খাদ্যশস্যের পরিমাণ যোগ করে বিদেশ থেকে আনা মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। এভাবে ১৯৯৬-’৯৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আনার পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৬৭ হাজার টন। পরবর্তীতে ২০০০-২০০১ পর্যন্ত খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আনার পরিমাণ হলো যথাক্রমে ১৯ লাখ ৫১ হাজার টন, ৫৪ লাখ ৯১ হাজার টন, ২১ লাখ ৪ হাজার টন এবং ১৫ লাখ ৫৪ হাজার টন। বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহের এ ধারা ১৯৮১-’৮২ অর্থবছর থেকে পরবর্তী সময়ের অর্থাৎ ১৯৯৫-’৯৬ অবধি ধারার সঙ্গে সঙ্গতিপুর্ণ। শুধু তাই নয়, ১৯৯৮-’৯৯ অর্থবছরে ৫৪ লাখ ৯১ হাজার টন খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে সংগ্রহ করার মধ্যদিয়ে ১৯৮১-’৮২ থেকে ২০০৪-২০০৫ সময়কালের রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়। পরিসংখ্যানের এই রুঢ় সত্যতা অস্বীকার করে একের পর এক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী জনসভাগুলোতে বলেছিলেন তার পুর্বকার শাসনামলে দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছিল। ১৯৯৮-’৯৯ সালে নগদ অর্থে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা হয়েছিল ৪২ লাখ ৫৬ হাজার টন। সে বছর সাহায্য বাবদ পাওয়া গিয়েছিল ১২ লাখ ৩৫ হাজার টন। এসব পরিসংখ্যান আমার কোনো মনগড়া কথা নয়। এই পরিসংখ্যানের সুত্র সরকারের খাদ্য বিভাগ এবং এসব তথ্য-উপাত্ত পরিবেশিত হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জরিপ ২০০৫ গ্রন্হে। ১৯৯৮-’৯৯ সালে ৫৪ লাখ ৫১ হাজার টন খাদ্যশস্য, যা দীর্ঘদিনের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ, বিদেশ থেকে আনার কারণ হলো, ১৯৯৮ সালের বন্যা। সেই বন্যার কথা যাদের মনে আছে তারা জানেন, বন্যাটি ৩ মাস অব্যাহত ছিল। এ রকম দীর্ঘমেয়াদি বন্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কমই ঘটেছে। সম্ভবত ১৯৫৫ সালের বন্যার সঙ্গেই এটি তুলনীয়। দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হওয়ার ফলে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, বাংলাদেশে ৩০ লাখ লোক অনাহারে মৃত্যুবরণ করবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতার শাসনামলে দুর্ভিক্ষে ৩ থেকে ৪ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটেছিল বলে বেসরকারিভাবে দাবি করা হয়। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ছিল ২৬ হাজারেরও কিছু বেশি। দুর্ভিক্ষে গণমৃত্যু তার পিতার শাসনকালের করুণ সমাপ্তির অন্যতম কারণ বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। সম্ভবত এই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়েই তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, খাদ্যাভাবে কারো যেন মৃত্যু না হয়। এ কারণেই রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি।
নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তার শাসনামলের সাফল্যের দাবি করতে গিয়ে তিনি যদি বলতেন, তারা কাউকে খাদ্যাভাবে মরতে দেননি। তা হলে সেটি হতো সত্যের কাছাকাছি; কিন্তু সেসব কথার ধারে-কাছেও তিনি যাননি। কারণ এতসব কথা লোকজন তো বোঝে না। নিরেট সত্য কথা বললে বলতে হয়, দীর্ঘস্হায়ী বন্যায় শস্য হয়নি। জাতিসংঘের দুর্যোগ আশঙ্কা, সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে খাদ্য আমদানি এবং খাদ্য বিতরণ নিশ্চিত করা; কিন্তু এতসব সত্য বিশ্লেষণ জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির ব্যাকরণসিদ্ধ নয়। তাই হাম্বড়ামি করে দাবি করা হয়েছিল, তার সময়ে দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছিল। এটা মিথ্যাচার নয় তো আর কী? নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী আচরণবিধিতে কিছু কিছু বিষয়ে মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়াকে নিষিদ্ধ করেছে; কিন্তু এ রকম জ্বলজ্যান্ত মিথ্যাচার, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করে নির্বাচনী ফলাফলে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে, সে সম্পর্কে তারা কিছুই করেনি। এ দেশে শাসক দলের অধীনে নির্বাচন হলে তার ফলাফল গ্রহণযোগ্য হয় না বলে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্হার প্রচলন করা হলো। সাংবিধানিক ভাষার মারপ্যাঁচে কীভাবে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সুদীর্ঘ দুই বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে এবং ক্ষমতায় থেকে তার যা করার নয়, সেসব করার ঘটনা তো আমরা দেখলাম। এর ফলে জাতি এগুলো না পিছালো-সেই বিচার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম করবে।
আমাদের দেশের সুশীলরা দেশ থেকে বদাচার, অনাচার ও অপশাসন দুর করতে নানা ধরনের ডধঃপযফড়ম বডির কথা বলেন। দু’চারটে এ রকম সংস্হা ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত কেউ নির্বাচনী প্রচারাভিযানে দিনকে রাত, রাতকে দিন করার মতো মিথ্যাচার করলে তাকে বা তাদেরকে নিবৃত্ত করার জন্য কোনো ডধঃপযফড়ম বডির কথা বলেননি। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেভাবে মিথ্যাচারের বন্যা বয়ে গেল, তা দেখে মনে হচ্ছে, এগুলো নজরদারি করার জন্য একটি ডধঃপযফড়ম ইড়ফু থাকলে সঠিক হতো। এই সংস্হার কাজ হবে মিথ্যাচারকারীদের মিথ্যাচার প্রমাণ দিয়ে ধরিয়ে দেয়া, যারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয় তাদের ডধৎহরহম দেয়া এবং তাতে কাজ না হলে আরো কঠোর নিবর্তনমুলক ব্যবস্হা গ্রহণ করা। আমাদের অঘটন ঘটনপটিয়সী তথাকথিত ঈরারষ ঝড়পরবঃু এই ন্যায্য গণতান্ত্রিক দাবির প্রতি আদৌ কোনো রকম সমর্থন জানাবে কিনা জানি না। আমি অন্তত এ ব্যাপারে সংশয়মুক্ত নই। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে পৌত্তলিকতার প্রতি প্রশ্রয়শীল, যারা প্রগতিবাদিতার নামে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণশীল এবং যারা মৌলবাদবিরোধিতার নামে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি প্রেমাকুল তাদের প্রতি এদের রয়েছে অন্ধ অনুরাগ। এই অন্ধ অনুরাগের বশবর্তী হয়ে এদের সব অপকর্মের প্রতি এরা চোখ বুঁজে থাকতে অভ্যস্ত। আসলে এরা ওদেরই দোসর। ভিন্ন সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ঈরারষ ঝড়পরবঃু নামধারীরা আসলে ওদেরই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র ব্যতিক্রমধর্মী দেশ যে দেশে এ রকম দলমন্য ঈরারষ ঝড়পরবঃু বিদ্যমান। এদের ঊরারষ ঝড়পরবঃু বললে অন্যায় হবে কি?
বর্তমান মন্ত্রিসভা যে একটি টিম হিসেবে কাজ করছে না, সেটি ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান টিসিবি’র মতো সংস্হার প্রয়োজন নেই বলে মিডিয়ার কাছে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বাজার প্রক্রিয়ার ওপর কোনোরকম হস্তক্ষেপ করতে রাজি নন। অন্যদিকে তার পরপরই খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক টিসিবি’র প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন এবং প্রয়োজনে টিসিবি’র মাধ্যমে বাজারের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপের কথাও জোরের সঙ্গেই বললেন। এসব বিপরীতমুখী চড়ষরপু অবস্হানের কথা যখন জনগণের কর্ণকুহরে পৌঁছে গেছে এবং এসব নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন বিব্রত, তখন ফারুক খান সাহেব এটা বলেননি-ওটা বলেননি বলে তার মুখনিসৃত স্পষ্ট কথাগুলোকে অস্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন মাত্র; কিন্তু লাভ কী হলো? আজকাল নেতানেত্রীদের কথা শুধু দৈনিক সংবাদপত্রে ছাপার হরফে প্রকাশিত হয় না, এগুলো ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সবাকচিত্র রুপেও প্রকাশ পায়। তাই নিজের বলা কথা বেমালুম অস্বীকার করার সুযোগ কোথায়? দিন বদলের কথা বলে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংসদীয় আসন জিতে নেয়ার পরও দিন বদলেছে বলে ঠাহর করা যায় না। সেই একই ঐতিহ্য চলছে দলবাজি। কি বিশ্ববিদ্যালয়ে, কি সিভিল সার্ভিসে সেই পুরনো ধারাতেই যদি চলতে হয়, তাহলে দিন বদলের মেকী প্রতিশ্রুতি কেন দেয়া হয়েছিল? বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভিস’ বলে কোনো কিছু নেই। এমনকি সরকারি প্রশাসনের মতো কোনো ক্যাডার সার্ভিসও নেই। তারপরও আমার এক অধ্যাপক বন্ধু কৌতুকের সুরে বললেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যাডার সার্ভিস চালু হয়ে গেছে। এই ক্যাডার অবশ্য সিভিল সার্ভিসের ক্যাডার নয়। জানি না আগামী দিনে আরো কত রকমের, কত রংয়ের সার্ভিস চালু হবে!
লেখকঃ প্রফেসর, ডেভেলপমেন্ট ষ্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (সূত্র,আমার দেশ,২৪/০১/২০০৯)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


