বিচার চাই ইনসাফ চাই, চুপ করে থাকবেন না
আল মাহমুদ
এ দেশে লেখালেখি করে নির্বিবাদে বেঁচে থাকা খুবই মুশকিল। আমার বৃত্তি যেহেতু লেখালেখি, সে কারণে অতি সাবধানে চলাফেরা করা আমার খানিকটা আয়ত্তে এসেছে বলে ধারণা হয়। আমি লিখবার আগে কখনো ভাবি না আজ কী নিয়ে লিখব? যখন লেখার সময় ঘনিয়ে আসে তখন আমি বসে পড়ি এবং কাজটা শুরু করি এবং শেষও হয়ে যায়। কোনো দুর্ভাবনা আমাকে শেষ পর্যন্ত ইতস্তত করার সুযোগ দেয় না। এভাবেই মূলত আমার এ সময়ের চিন্তা-ভাবনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশের কাজটা সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। কখনো চিন্তা করি, কখনো নিশ্চিন্তে লিখি। বহু দিন ধরে লেখাই আমার প্রধান কাজ হয়ে উঠেছে। লেখা ছাড়া কি-ই বা করতে পারতাম? জীবন সম্পর্কে আমার কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেই। তবে আমি বিশ্বাসী মানুষ। অকপটে আমার এই ঈমানের কথা বলে এসেছি। আমি বুঝতে পারছি না, আমাকে কে কিভাবে নিচ্ছেন।
তবে পত্রপত্রিকা খুলে আমার সম্বন্ধে যা দেখতে পাই, তাতে আমি মোটামুটিভাবে খুশি। সাধারণত কেউ আমাকে ঘাটায় না। আমিও কাউকে নিয়ে কোনো ক্ষতিকর মন্তব্য করি না। এতটা বয়স হয়েছে, এটা ভাবতেই আমার অস্বস্তি বোধ হয়। কিন্তু যখন ভাবি আমি দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ-বেদনার পর্যায়ক্রমিক তরঙ্গে হাবুডুবু খেতে খেতে এ পর্যন্ত সময়ের এক বিরাট দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছি। আমার পক্ষের লোক যেমন আমাকে নিয়ে পুলক বোধ করে, বিপক্ষের লোকও আমার খুব বেশি ক্ষতি কামনা করে না। আমি স্বাভাবিকতার মধ্যে শান্তিপূর্ণ জীবন কাটিয়ে চলেছি।
অনেক প্রতিশ্রুতি আমি রক্ষা করতে পারিনি। দেয়ার মতো এর কোনো কৈফিয়ত আমার কাছে নেই। আমি ভাবি, আমি যা লিখতে পারিনি সেটার জন্য আমাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। যদি আমি আলসেমিতে কাল কাটাতাম, তাহলে আমাকে দোষারোপ করা চলত। আমি কোনো অলস ব্যক্তি নই। সময়কে বৃথাই চলে যেতে দিইনি, যা পেরেছি তা তো শস্য হিসেবে গ্রন্থাকারে আমার তাকে উঠেছে, যা পারিনি তা দুঃসাধ্য না হলেও পারিনি। আমি এ কথা বলি না, আমি অনেক করেছি। না, আমি অনেক কিছু করতে পারিনি। আবার অনেক কিছু করেছি, যা আশাতিরিক্ত।
এখন জীবনের এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। এখান থেকে অতীতের সবটা দেখা যায় না। অনেক মুখ মনে পড়ে। যখন মনে পড়ে তখন হৃদয় অস্থির হয়ে যায়। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারি না। হৃদযন্ত্রের ছটফটানি শুরু হলে আমি ঘরের ভেতর পায়চারি শুরু করি। অনেকটা জিনে পাওয়া মানুষের মতো।
আমি একবার বলেছি, আমি যা লিখি সেটাই বই হয়ে বেরিয়ে যায়। এটা একধরনের অনিয়ন্ত্রিত দুর্ভাগ্যের মতো। আমি স্বীকার করি, সবই আমার লেখা; কিন্তু সব লেখাই যে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে এটা আমার ইচ্ছা নয়। কিন্তু অবস্থাটা আমার ইচ্ছার বশবর্তীও নয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আমার এই সময়ের বেঁচে থাকাটা এগিয়ে চলেছে। সব কথা আমি বলতে চাই না। সব কথা প্রকাশযোগ্যও নয়। কিন্তু কোনো কিছুই আড়াল থাকছে না। আমি একটু আড়াল চাই বটে। আমি কখনো ভুলি না যে, আমি খুবই দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছি। ফলে আমার মধ্যে সহমর্মিতাবোধ একটু বেশি। আমি কবি হওয়াতে একটু বেশি স্পর্শকাতরও বটে। আমার দেশকে আমি সবসময় খানিকটা বাস্তবতা, খানিকটা কবিসুলভ স্বপ্নের মধ্যে অবলোকন করে এসেছি। এমনিতে এ দেশে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে জীবনের ঘানি টেনে চলেছে। তাদের প্রতি আমার সহানুভূতির সীমা নেই। আমি চাই এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটুক।
আমি লিখে জীবন কাটিয়েছি। লেখার মধ্যেই ব্যক্ত হয়েছে আমার জীবনের অনেক অনুদঘাটিত রহস্য। আমাকে যারা সমালোচনা করেন তারা মূলত আমার বিশ্বাসেরই সমালোচনা করেন। কাজের মূল্যায়ন করতে কেন জানি একটু দ্বিধাগ্রস্ত। আরে ভাই, আমার তো সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে অনেক পরিশ্রমসাধ্য কাজ আছে। সেগুলোর দিকে তাকালে আমার প্রতি হয়তো বা ভালোবাসারই সৃষ্টি হবে, ঘৃণা নয়। অতীতের অনেক ঘটনা আমাকে আজো প্রভাবিত রেখেছে। আমি আগেও বলেছি, আমার কবিজীবনের সবটাই অন্যের ঋণে জরজর, আমি তা শোধ করতে পারি না। পারি না এবং এখন আর শোধ করতে আমার তেমন আগ্রহও নেই। আমি একজন ক্ষমাপ্রার্থী মানুষ। অনেক নারীর কাছে যেমন তেমনি অনেক পুরুষের কাছেও। আমার জন্য অনেক অশ্রুসজল চোখ এত দিন অপেক্ষায় কাটিয়ে এত দিনে বুঝে নিয়েছে, আমি কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতো যোগ্যতা রাখি না। তবে আমি চেষ্টা যে ছাড়িনি এটা আমার প্রিয়জন অনেকে জানেন। আমি এই ভূপৃষ্ঠে একদম একা চলাফেরা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? আমার চোখের দৃষ্টি তো আমাকে সাহায্য করেনি। এমতাবস্থায় অনেকে লেখা ছেড়ে দেয়। আমি ছাড়িনি। ছাড়িনি আমার প্রাণশক্তির জোরে। এখনো আমি একটা আস্ত উপন্যাস ক্রমাগত বলে যেতে পারি। সন্দেহ নেই, এই গুণ নিয়ে খুব কম মানুষই জন্মায়। এই গুণ আমার জন্মগত। আমি মনে মনে পরিকল্পনা করি এমন একটা উপন্যাস সৃষ্টি করা যায় কি না, যা আমার অতীতের সব ঘটনাকে ছুঁয়ে যাবে। আমার উপন্যাস হবে আমারই জীবন, সত্য-মিথ্যায় ভরা, স্বপ্ন-কল্পনায় জড়াজড়ি এবং জীবনের মতোই অপরিতৃপ্ত ও অসমাপ্ত।
জানি না পারব কি না। আবার ভাবি পারব না কেন? সারাজীবন আমি তো কোনো প্রতিশ্রুতিরই খেলাপ করিনি। পারি বা না পারি, একবার শুরু তো করা যায়। শেষ না হলে আমি কী করব। ধরে নিতে হবে যে, এই গল্পের কোনো শেষ নেই। এ পর্যন্ত আমি যত নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছি, এসবে আমার কোনো পরিতৃপ্তি নেই, বরং আফসোস আছে। আমি এমন একটি নারী চরিত্র সৃষ্টি করতে চেয়েছি যার মধ্যে থাকবে এক পরিশ্রমী বাঙালি নারীর হুবহু প্রতিরূপ। জানি না পারব কি না। আমি তো বলেছি আমি আর কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না তবুও তো মুখ থেকে বেরিয়ে যায় নানা কথা। আশার কথা আবার হতাশারও কথা। আমার চিত্ত মনে হয় অত দৃঢ় না। সে সারাজীবন আপসরফা করেই চলে এসেছে। এখন আর আফসোস করে কী হবে? যদি অপরিসীম দারিদ্র্যের কশাঘাত আমার ওপর না থাকত তাহলে হয়তো অনেক অপ্রীতিকর কাজ যা আমি করে এসেছি, তা করতাম না। আমাকে বাঁচতে হয়েছে মাথা রক্ষা করে। এ বাঁচার মূল্য এখনো কারো দ্বারা নির্ণীত হয়নি। কারো জীবনকালে তা হয়ও না। মৃত্যুর পরও যে হবে এটা নির্ভর করে কী কাজ করেছি এবং কাজের পরিমাপটা কত বড়। তবে আমি দাবি করি, আমি সাহিত্যে-কাব্যে কোনো ফাঁকিঝুঁকি করিনি। জীবন বাজি রেখে খেলেছি এবং একদিন অবশ্যই এর মূল্য আমাকে দিতে হবে আমি থাকি কিংবা মরে যাই। আমি আগে একবার উল্লেখ করেছি যে, আমি একাকী থাকতে চেয়েছি। পৃথিবীর ওপর দিয়ে একাকী হেঁটে এসেছি।
আমার কোনো সাহায্যকারী সহানুভূতিশীল কাউকে পাইনি। সবাই আমাকে ঠকাতে চেয়েছে। আমি জেনেশুনেও ঠকেছি। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছি। মানুষের ওপর আমার অপরিসীম আস্থা আজো অটুট আছে। আমি একটা কথা বারবার উল্লেখ করলে হয়তো বা পাঠকদের বিরক্তি উৎপাদন করবে। তবুও এ কথা না বলে পারব না যে, সাহিত্যের ব্যাপারে আমি কোনো আপসরফা করে চলতে চাইনি। আমি থামতেও চাইনি, কাউকে থামাতেও চাইনি। যারা আমার প্রতি ঘৃণাভরে তাকিয়েছেন আমি তাদের প্রতি প্রীতিপূর্ণ দৃষ্টি তুলে হাসার চেষ্টা করেছি। এর বেশি আর কি-ই বা করতে পারতাম। জীবনের শেষ প্রতিজ্ঞা হলো শেষ দিন পর্যন্ত আমি লিখে যেতে চাই যদি আমার প্রভু আমাকে মঞ্জুর করেন। আমি আগেও হয়তো বলেছি কবি বা সাহিত্যিকের জীবন যে এত কষ্টের তা যদি আমি ঘুণাক্ষরে আগে আন্দাজ করতে পারতাম তাহলে কিছুতেই এ পথে আসতাম না। হায়! বাল্যের কথা খুব মনে পড়ে। কত ভালো ছাত্র ছিলাম আমি, কত অনায়াসে একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু আমি কিভাবে যে কবির জীবনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছিলাম! আমি জানি আফসোসে কোনো লাভ হয় না। মানুষের জীবন একবারের মতোই আসে, আর আসে না। জীবনানন্দ দাশ বলেছেন এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর, এ বাণীর চেয়ে সত্য কোনো বাণী নেই।
ব্যর্থতা-সাফল্য সব মিলিয়ে সাহিত্য আমার হাতে দিয়েছে একটিমাত্র সোনার টাকা। এ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। আমি নিশ্চিত জানি মৃত্যু এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি এটাও জানি মৃত্যুতে আমার শেষ হবে না। শুরু হবে আরেক জীবন। অশেষ অফুরন্ত। জানি না সেখানে আমার কী হবে।
আফসোস হয় গাছ হয়ে কেন জন্মাইনি। পাথর হয়ে কেন পড়ে থাকিনি। তাহলে তো আমাকে কোনো হিসাব দিতে হতো না। হায়! হিসাব চাইলেই আমার হৃদকম্পন শুরু হয়। ওরে আমার প্রাণপাখি হিসেবের কথা শুনলেই তোমার এত ছটফটানি শুরু হয় কেন? কোথায় পালাবে? ধু ধু করে মরুভূমি...
আজকাল চোখ বুজলেই একটা অফুরন্ত অতীতের দৃশ্য আমাকে অভিভূত করে ফেলে। হয়তো বা সব বয়স্ক মানুষেরই এমনটা ঘটে থাকে। পেছনে ফেলে আসা দিনগুলো স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে এমনভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে কে রাখল তা আমি জানি না। শুধু মনে হয় প্রত্যেকটি ভাঁজে আছে ভয় আর দুর্ভাবনার বীজ। আমি চিন্তাভাবনা থেকে মুক্তি চেয়েছি। কিন্তু আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে চিন্তার শিকড়। আমার শরীরের ভেতর দিয়ে এই শিকড়ের যন্ত্রণাময় অবস্থান আমি টের পাই। জানি না তবু মানবজীবন জ্ঞানী মানুষদের এতটা আপ্লুত করেছিল কেন? এ জন্যই কি রবীন্দ্রনাথ গাছ হয়ে জন্মাতে চেয়েছিলেন?
আমি গাছ-মাছ-পশু-পাখি কোনো কিছুই হয়ে আবার জন্মাতে চাইনি। আমার ধর্ম পুনরায় জন্মাবার বিশ্বাসে আস্থা রাখে না। মানবজীবন একবারই আসে। মৃত্যুতে এর পরিসমাপ্তি, পরকাল থেকে আবার শুরু। একটা আফসোস শুধু আমি আমার পাঠকদের জন্য বর্ণনা করতে পারি। আর সেটা হলো জীবনের সবটাই আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। মনে হয় নানা ধরনের প্ররোচনা-লোভ-লালসাকে যেন পথের উপর কে ছড়িয়ে রেখেছিল। আমি বিভ্রান্তের মতো কখনো সে দিকে হাতও বাড়িয়েছি, আবার পরক্ষণে অনুতপ্ত হয়ে হাত সরিয়ে নিয়েছি। জীবন তো এভাবেই চলে গেছে। আফসোস করার মতো কিছু নেই, আনন্দে আটখানা হওয়ারও কিছু নেই।
যে শস্য ঘরে তুলেছি তার নাম কবিতা। আমার কবিতার শরীরেই লেগে আছে আমার ঘাম, রক্ত, মাংসমজ্জা। কেউ কি আছে এর মূল্যায়ন করার? যদি কেউ না থাকে তাহলেও কোনো প্রশ্ন নেই, যদি কেউ থাকেন তাহলেও তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যা খুশি তা-ই বলে দিন। তবে চুপ করে থাকবেন না। বিচার চাই, সুবিচার চাই, ইনসাফ চাই, এই তো একজন কবির যথার্থ আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


