শেয়ারবাজারের ওঠানামা
আবু আহমেদ
আমাদের শেয়ারবাজার গত মাসের শুরুর দিকে (১১ ফেব্রুয়ারি) অপ্রত্যাশিতভাবে পড়ে যাওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ যেন নড়েচড়ে বসে। ওই দিন খুলনা ও সিলেটে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে সরকার ও স্টক এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা স্টক এক্সচেঞ্জে তালাও ঝুলিয়ে দেয়। বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলোতে এ রকম ঘটনা ঘটে কি না অনেকে জানতে চাইতে পারেন। তবে সত্য হলো, ঘটে। আরও বিচিত্র রকমের কিছু ঘটে। আমাদের দেশে সংস্কৃতি হলো, কোনো কিছু পছন্দ না হলে বা কোনো কিছু ক্ষোভ উদ্রেক করলে ওগুলো প্রকাশ করার জন্য কেউ রাস্তায় নেমে আসে, আবার কেউ রাস্তা অবরোধও করে। এই সংস্কৃতির কমতি কখন হবে আমরা জানি না, তবে সমাজে কিছু লোকের ধারণা হলো, এ ছাড়া কাজ হয় না।
শেয়ারবাজার নামবে-বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। বরং বলা চলে, এই বাজার অন্য আর্থিক ও পণ্যের বাজারগুলো থেকে অনেক বেশি ওপরে-নিচে যাওয়ার বাজার। এই বাজার একবার এ প্রান্তে যায়, আরেকবার অন্য প্রান্তে যায় বলেই এ বাজারের প্রতি এত আকর্ষণ। তবে একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে সময় লাগে অনেক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক বছর। উপত্যকা থেকে চূড়ায় যেতে যে উপাদানটা বেশি কাজ করে, সেটা হলো আশাবাদ। জনগণের মধ্যে যদি অর্থনীতি সম্বন্ধে বড় আশাবাদ জাগে, তাহলে তাদের শেয়ারবাজারও চূড়ার দিকে ধাবিত হবে।
হতাশা হলো এই বাজারের বড় শত্রু। জনগণ যদি দেখে, আমাদের অর্থনীতিতে বড় বড় বিনিয়োগ হচ্ছে, বিনিয়োগ ভোগের হার বেড়েই চলছে, রপ্তানি-আমদানি ঊর্ধ্বমুখী এবং ব্যক্তি খাত আশায় উজ্জীবিত, তাহলে জনগণের মধ্যে আশাবাদ জাগতে বাধ্য। ওই অবস্থায় করপোরেট আয় বা যেসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে আছে, ওগুলোরও আয় বাড়তে থাকবে। আর করপোরেট রেজাল্টসই হলো কথিত ফান্ডামেন্টাল বা মৌল ভিতের মূল। করপোরেট রেজাল্টস ভালো আসতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা উঁচু মূল্যে শেয়ার কেনার জন্য তৈরি হয়ে যায়। আমাদের বাজারটা যে ওই রকম বুঝে-শুনে আচরণ করে তা নয়।
সব সময় শেয়ারবাজার বুঝে-শুনে বা হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী চলে না-এটাই হলো শেয়ারবাজারের ধর্ম। আমাদের বাজারটা ২০০৭ সালে মূল্যের দিক দিয়ে অনেক ওপরে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই যাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি উপাদান কাজ করেছিল। তার মধ্যে দুটো হলোঃ এক আশাবাদ, দুই শেয়ারবাজারের ট্রেডিং সুবিধা জেলা-উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃতি। ফল হয়েছে ২০০৭ সালে অনেক বিনিয়োগকারী নেটওয়ার্কে বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকের পক্ষেই করপোরেট রেজাল্টগুলোকে পড়া ও বিশ্লেষণ করা অসম্ভব ছিল এবং এখনো আছে। চাহিদার বিস্কোরণ ঘটেছে এ জন্য নয় যে করপোরেশন বা কোম্পানিগুলো হঠাৎ ভালো ব্যবসা করা শুরু করেছে। ওই বিস্কোরণ ঘটেছে এ জন্যই যে ট্রেডিং ম্যাকানিজম তাদের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে তাদের বিনিয়োগকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ওই অবস্থায় ২০০৭ সালের মূল্য কোনো অর্থনীতি মানেনি। কোম্পানি কী দেবে সেটা বিবেচ্য বিষয় ছিল না, মূল দৌড় ছিল ক্যাপিটাল গেইনস বা মূল্য বৃদ্ধি থেকে আয়। শেয়ার সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সে অবস্থায় ভাটা পড়েছে। ২০০৮ সালের শেষে এসে অনেকে হতাশা থেকে শেয়ার বেচা শুরু করে।
২০০৭ সালে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও তাদের অর্থ অন্য খাত থেকে সরিয়ে এ খাতে বিনিয়োগ করতে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান উঁচু মূল্যে স্টক এক্সেচেঞ্জের সদস্য কিনে ভিন্ন সাবসিডিয়ারি খুলে অথবা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ করে বিনিয়োগকারীদের অতি উচ্চসুদে কথিত মার্কিন হিসেবে ঋণও দিতে লাগল। ফলে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত এই বাজারে অর্থ সরবরাহ শেয়ার সরবরাহকে ছাড়িয়ে যায়। সবার লক্ষ্য হলো, এই বাজার থেকে লাভ করা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদে ঋণ নিয়ে, আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ক্যাপিটাল গেইনস বা মূলধনি আয়ের মাধ্যমে। তবে এ প্রক্রিয়ার নিরাপদে ছিল যারা, ঋণ বিক্রি করেছে তারা। শেষের দিকে এসে অনেক বিনিয়োগকারী দেড় বছরে যা লাভ করেছিল, মাত্র তিন মাসে তার সবই হারিয়েছে। এ সময়ে রেগুলেটর ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অনেকটা উদার করে রাখে। দাবির মুখে রেগুলেটর বারবার মার্জিন রুলসকে বেশি ঋণের পক্ষে পরিবর্তন করে।
শেয়ারবাজার কোনো এক জায়গায় বসে থাকার বাজার নয়, আবার শেয়ারবাজারকে নিয়ে কেলেঙ্কারীর ঘটনাও অনেকই হয়ে থাকে। অনেকে বলেন, কেলেঙ্কারি ছাড়া শেয়ারবাজার হয় না। ওয়ালস্ট্রিট ও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, ওই ইতিহাস অনেক কেলেঙ্কারিতে ভর্তি। রেগুলেটর এক ধরনের কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল তো কয়েক বছর পর অন্য ধরনের কেলেঙ্কারি মাথা ছাড়া দিয়ে উঠল। অন্য ব্যাপার হলো, প্রত্যেক ধস ও কেলেঙ্কারির পরই রেগুলেশনে নতুন কিছু যোগ হয়েছে এবং বাজারও সংস্কার হয়েছে। তবে বাজার উঠতে থাকলে কেউ কেলেঙ্কারিটা লক্ষ করে না, করলেও এড়িয়ে যায়। যত সমস্যা হয় বাজার পড়ে গেলে। বাজার পড়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যরা যত বিতর্ক করেছে, বাজারের ওঠা নিয়ে তার শতাংশও করেনি। প্রত্যেকের কাছে ভালো লাগে বাজার ওঠাটা। এটা হলো মানবিক মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ। শেয়ার স্টক নামের সম্পদের মূল্য বাড়লে এগুলোর ধারকদের আয়ও বেড়ে যায়, তারা বেশি করে বেড়াতেও বের হয়। আমাদের অর্থনীতিতে এই বাজারটা এখনো অনেক ছোট। যেখানে আমাদের জিডিপি ৮০ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে আমাদের এই বাজার হলো মাত্র ১৫ বিলিয়ন ডলারের।
আজকে চিন্তা করে দেখুন, আমাদের এ বাজারটা যদি ৫০ বিলিয়ন ডলারের হতো, তাহলে তো আমরা দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনায়াসেই এ বাজারকে ব্যবহার করে অর্থায়ন করতে পারতাম। সে অবস্থায় ৪৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্টের অর্থায়নের জন্য কি আমাদের কথিত ডোনারদের কাছে অর্থ চাইতে হতো! অন্য সত্য হলো, আমাদের এই বাজারও ৪০০-৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প অর্থ সহজেই অর্থায়ন করতে পারে। তবে উদ্যোক্তারা ও সরকারও অন্য অনেক কারণে এ বাজারের কাছ দিয়ে আসে না।
বাজার পড়ে গেলে সেই বাজারকে ওঠানো সরকারের দায়িত্ব নয়। বাজার পড়ে গেলে কম অর্থে বেশি শেয়ার পাওয়া যায়। সেই অর্থে বেশি মুনাফাও। তাই আপনা থেকেই বাজার আবার সঠিক স্তরে বা ভারসাম্যের অবস্থানে যাবে। পড়ে যাওয়াটা একটা সাময়িক ব্যাপার হবে মাত্র। সরকারের এসব ক্ষেত্রে অতি দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। সরকারের মূল কাজ হচ্ছে বাজারটা বড় হচ্ছে কি না, বাজারকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, বাজারের মাধ্যমে সমাজের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের লোকজন বেশি করে বিনিয়োগ করছে কি না, সর্বোপরি বাজারটা আশার স্তরে রেগুলেট হচ্ছে কি না-এসব দেখা। আমাদের এই বাজারে ভালো আইপিও আনার জন্য আমরা অনেক দিন থেকে বলে আসছি। সত্য হলো, এ বাজারে এখনো কোনো মোবাইল ফোন কোম্পানি, কোনো হোটেল কোম্পানি, কোনো ভৌত অবকাঠামো খাতের কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি।
গ্রামীণফোন হলো অর্থনীতিতে বৃহত্তম কোম্পানি। আমাদের কাছে অবাক লাগত অর্থনীতির বৃহত্তম কোম্পানিকে শেয়ারবাজারের বাইরে দেখে। একসময় এ কোম্পানি টেলিফোন খাতে মনোপলি ব্যবসা করেছে। পরে আমরা এ কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার জন্য অনেক কথাই বললাম। প্রথম দিকে এ কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার কথা শুনতেই পারত না। আমাদের দুর্ভাগ্য ছিল, তখন রেগুলেটর বিটিআরসিও এ কোম্পানির বাজারে না আসার পক্ষে ছিল। নতুবা কমপক্ষে এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ছিল। সময়ে বিটিআরসিতে পরিবর্তন আসে এবং আমাদের কথাও তারা শুনতে লাগল। একপর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ কোম্পানি ১০ শতাংশ শেয়ার ছেড়ে বাজারে আসতে রাজি হলো। আমাদের জানামতে চার বিলিয়ন ডলারের এই টেলিফোন কোম্পানি আইপিও বা গণ-অফারের পক্ষে তাদের দরখাস্তসহ নিরীক্ষিত হিসাব জমা দিয়েছে। তবে সেই জমা দেওয়ার ব্যাপারটাও ঘটে গেছে অনেক আগেই। যখন উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক তুঙ্গে, তখন কি এক অজানা অথবা কোনো খোঁড়া যুক্তির অজুহাতে রেগুলেটর এসইসি এ আইপিওকে আজও অনুমতি দিতে পারেনি। এই দীর্ঘায়িত বাজারকে, বাজারের অন্য বড় কোম্পানির কর্ণধারদের একটি ভুল সিগন্যাল দিচ্ছে।
বড় ইস্যু এলে আমাদের বাজারের গভীরতা যেমন আসবে, অন্যদিকে এ কোম্পানিকে যদি বাজারে আনা যায়, তখন অন্য অনিচ্ছুক উদ্যোক্তারাও একটা পরিষ্কার মেসেজ পাবে। আমরা শেয়ারের মূল্য নিয়ে অত চিন্তিত নই, চিন্তিত বেশি বাজারকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে উদ্যোগগুলোর অভাবকে নিয়ে।
আবু আহমেদঃ অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ। (সুত্র, প্রথম আলো, ০৭/০৩/২০০৯)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



