কারা এবার ভিসি হলেন ?
সান জোসেপ
Yes, we can শ্লোগান কে সামনে রেখে ওবামা যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করা জয় পেয়েছেন তেমনি দিন বদল এর স্লোগান তুলে এক অবিস্মরনীয় জয় পেয়েছেন শেখ হাসিনা। সেই দিনবদলের প্রতিক্ষায় প্রহর গুনতে থাকলাম আমরা তরুণ প্রজন্ম। আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা অন্যতম লিডার যিনি তারুণ্যের চাহিদা বুঝেন। তিনি আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন ‘টুয়েন্টি-‘টুয়েন্টিওয়ান ভিশন’ আর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর। এই ভিশনকে বাস্তবায়ন করতে গেলে শেখ হাসিনাকে আরও দুই টার্ম ক্ষমতায় আসতে হবে, আর সে জন্যে সত্যিকার অর্থেই তাকে কৃ্ত ওয়াদা পুরন করতে হবে এবং কিছু বদল/পরিবর্তন করে দেখাতে হবে।
কিন্তু তার সরকারের বয়স ২ মাস যেতে না যেতে তারুণ্যের স্বপ্নের পালকগুলো যেন শীতের ঝরা পাতার মত খসে পড়তে লাগল। যে উচ্চাস আর উদ্দীপনা নিয়ে আমরা ভোট দিয়েছিলাম পরিবর্তনের আশায়, সেখানে আজ স্বপ্ন ভঙ্গ আর হতাশার চাঁদরমুড়িতে তারুণ্যকে যেন নির্বাসনে পাঠানোর ব্যবস্থাই চলছে। ক্ষমতা গ্রহনের সাথে সাথে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গু্লোতে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে যেন স্বাগত জানানো হল দিনবদলের(?) পালাকে। সেই পুরোনো কায়দায় দলীয় আনুগত্যের ধ্বজাদারীদেরকেই ভিসি পদে আসীন করা হল।মুজিব সেনাদের ভয়ে অনেক ভিসিই সেচ্ছায় মানসম্মান নিয়ে সরে গেছেন আবার অনেককেই অব্যহতি দেয়া হয়েছে। এস.এস.সি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে দেশের তিনটি শিক্ষা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বোর্ড তিনটি হচ্ছে ঢাকা, যশোর ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড(নয়াদিগন্ত, ০১/০২/০৯) ঢাকা, ইডেন, বদরুন্নেছা ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজসহ ১২ টি সরকারী কলেজে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়েছে একই দিনে ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭তম ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী। দিনবদলের পালায় প্রত্যাশা ছিল সবার কাছে গ্রহনযোগ্য কাউকে ভিসি পদে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু শেষ পযর্ন্ত কট্টর নীল দলের সমর্থক একজনকে ভিসি করা হল।তিনি নীল দলের (আওয়ামী শিক্ষক গ্রুপ)আহবায়ক ছিলেন কয়েক বছর এবং নীল দল থেকে শিক্ষক সমিতির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছেন। তাছাড়া এবার টেলিভিশনের টক শোতে তিনি আওয়ামিলীগের পক্ষে জোড়ালো বক্তব্য রাখেন এবং নির্বাচনী প্রচারনায় অংশগ্রহন করেন (আমারদেশ, ১৬/০১/০৯)।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রো-ভিসি পদে নীল দলের বর্তমান আহবায়ক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদকে নিয়োগ দেয়া হল।২০০৬ সালে ড. রশীদ ডীন থাকার সময় ভর্তি-পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে নিজ মেয়ের ভর্তি নিশ্চিত করেন যা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে দন্ডনীয় অপরাধ। তিনি ২০০৭ আগষ্টের ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেফতার হন , কারা বন্দি থাকেন এবং আদালত কতৃক ২ বছর দন্ড প্রাপ্ত হন।অবশেষে প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমায় মুক্তি পান। বলতে গেলে তিনি ছাত্রদেরকে আমাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন এবং টিভি পর্দায় আমরা দেখলাম কৃত কর্মের জন্য সেনাবাহিনী প্রধান থেকে শুরু করে একজন সাধারন সৈনিকের কাছে পর্যন্ত মাফ চেয়েছেন। বিক্ষোভের এ আগুন ঢাকার সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী এই বিভিষিকাময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয় এবং সরকারকে জারি করতে হয় কারফিউ । এখন বুঝা যাচ্ছে কার স্বার্থে উনি এসব করেছিলেন, অবশ্য আওয়ামিলীগ তাকে যথাযথ পুরস্কার দিতে ভুল করেনি । জানিনা বিডিআর ঘটনার পিছনে ছাত্র বিক্ষোভ ও আওয়ামী-শিক্ষকদের গ্রেফতারের প্রতিশোধ স্প্রিহা কাজ করেছিল কিনা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুস সোবহানকে ভিসি, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নুরুল্লাহকে প্রো-ভিসি এবং অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আব্দুর রহমানকে কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২০০৭ সালের আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৪ আগস্ট র্যাব সদস্যরা ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাড়াস্থ বাসভবন থেকে অধ্যাপক সোবহানকে গ্রেপ্তার করে। ২০০৮ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি মুক্তি পেয়েছেন (প্রথম আলো,২৫/০২/০৯)।এখানেও দেখা যাচ্ছে আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভের খল নায়করাই পুরষ্কৃত হয়েছে। এখন বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে যে শিক্ষকদের একটি বিশেষ গ্রুপ পরিকল্পনা অনুযায়ীই আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভোর সূচনা করেছিল। তৎকালীন সরকার কারফিউ জারি না করলে জান-মালের কি পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হত আমরা এখন আন্দাজ করতে পারি। যেখানে কয়েক মুহুর্তের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক ভাংচুর, স্টার কাবাব জ্বালিয়ে দেয়া, স্কয়ার বিল্ডিং ভাংচুর,বেশ কয়েকটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ও সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন (প্রথম আলো,২৫/০২/০৯)। একই সঙ্গে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফরহাদ হোসেন প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দীনকে নতুন ভিসি পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ছিলেন। অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. কামাল উদ্দীনকে প্রো-ভিসি এবং ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের প্রফেসর ড. আব্দুস সাত্তারকে ট্রেজারার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দীন ডীন থাকা অবস্হায় ৩০-৪০ টি কম্পিউটার চুরির ঘটনায় কোন পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ আছে। ধারনা করা হয় ডীনের যোগসাজসেই কম্পিউটারগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।
অপর দিকে সিলেটের কৃ্ষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পদেও একজন আওয়ামীপন্থী কৃ্ষিবিদ ময়মনসিংহ কৃ্ষিবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল আউয়ালকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
নিয়োগের চার মাসের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবু হোসেন সিদ্দীককে অব্যাহতি দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মেসবাহ উদ্দীন আহমদকে আগামী চার বছরের জন্য ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে (আরটিএনএন ২৪/০২/০৯)। এছাড়া একই প্রজ্ঞাপনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শওকত জাহাঙ্গীরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ও আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ড. আবু ইউসুফকে ভিসি পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। একইভাবে প্রো-ভিসি পদে নিয়োগ পেয়েছেন প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দীন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় আওয়ামিলীগের আগের টার্মের ভিসি প্রফেসর সালেহ উদ্দীন আহমেদকে । যিনি দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ন ।
চিকিৎষক, গবেষক ও মানুষ হিসেবে ক্লিন হলেও পদত্যাগ করতে হল মাত্র চার মাস আগে নিয়োগ পাওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলামকে। পদত্যাগ করেছেন দুই প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষ ও। কারণ হিসেবে জানা যায়, ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর ২০-২৫ জন নেতা কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে ভিসির সাথে দেখা করেন। ঐ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক নেতা পকেট থেকে ৩০ জনের একটি তালিকা বের করে অতিসত্তর তাদেরকে ওএসডি ও বদলি করার করার জন্য চাপ দেন। বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা করা হবে বলে ভিসি তাদেরকে জানান। কিন্তু স্বাচিপ নেতারা তাতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে চিৎকার চেচামেচি শুরু করেন এবং এই বলে শাসিয়ে আসেন যে তাদের কথা না শুনলে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে (যুগান্তর, ২৩/০৩/০৯)। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই পদত্যাগ করলেন।
এই গুনী ব্যক্তি পদত্যাগের প্রাক্কালে শুনিয়ে গেছেন কিছু অপ্রিয় সত্য কথা যাদের কোন গ্রুপ নেই তারা কোথায় যাবে। আমরা সাধারন মানুষ কি থাকব না। এক গ্রুপ ৫ বছর চালাবে । অপর গ্রুপ ৫ বছর চালাবে। বঙ্গবন্ধু কি এ সোনার বাংলা চেয়েছিলেন? বঙ্গবন্ধু কারো ব্যাক্তিগত সম্পত্তি নয়। তিনি আরও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী দিনবদলের কথা বলেছেন। এটা কি দিন বদল হচ্ছে? এটা দলীয় করণ হচ্ছে (যুগান্তর, ২৩/০৩/০৯)।
পাঠক আসুন দেখি কারা এবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এর ভিসি -প্রভিসি হলেন। ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক কান গলা বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. প্রাণ গোপাল দত্তকে। পাঠকের নিশ্চয় স্মরনে আছে উনি ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যাক্তিগত চিকিৎষক। প্রোভিসি দুজন হলে নিউরো মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এ কে এম আনিসুল হক ও শিশু বিভাগের প্রফেসর ডা. মু. শহিদল্লাহ এবং কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিশু বিভাগের প্রফেসর ডা. মু. মোয়াজ্জেম হোসেনকে। তারা বিভিন্ন সময় আওয়ামিলীগ সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন স্বাচিপ -এর হর্তাকর্তা ছিলেন। ডা. মু. মোয়াজ্জেম হোসেন এ গ্রুপ থেকে শিক্ষক সমিতির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছেন।
মাত্র কয়েক দিন আগেই শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি সরকার প্রশাসন দলীয়করণ করতে গিয়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল যে, তার পক্ষে সরকার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠকের উপরই ভার থাকল শিক্ষা-প্রশাসনের এ রদবদল কি নির্দলীয়করণ না দিন বদল না বাকশালীকরন!?
বিগত তত্তাবধায়ক সরকার সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগের একটা তুলনামূলক ভাল পদ্ধতি চালু করেছিল। কিন্তু আওয়ামী সরকার এটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে আগের সরকারের পথেই হাটতে শুরু করেছে। একজন শিক্ষক যদি কোন রাজনৈ্তিক আদর্শ লালন করে তাতে দোষের কিছু নেয়। কিন্তু যখন দেখা যায় একজন শিক্ষক কোন রাজনৈতিক দলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে শুরু করেন(শেখ হাসিনা গ্রেফতার হওয়ার পর ঢাবি শিক্ষকদের ক্লাশ বর্জন ও কালব্যাচ ধারন) তখন তিনি আর শিক্ষক থাকেননা, হয়ে যান রাজনৈ্তিক লিডার বা কর্মী, ছাত্রদের কাছে হারিয়ে ফেলেন গ্রহন যোগ্যতা, আচরন হতে শুরু করে এক পেশে, এমন কি শ্রেনীকক্ষেও আর শিক্ষক সুলভ আচরন করতে পারেন না।
প্রধানমন্ত্রী দিন বদল বলতে যদি এরকম (উপরে উল্লেখিত)বদলের কথাই বুঝিয়ে থাকেন তাহলে তরুণ প্রজন্ম হয়ত আবার নতুন করে ভাববে। এমনও বলতে পারে আলাদীনের চেরাগ যখন হাতে পাবেন তখনই ভোট চাইতে আসবেন, না হলে আমরাও আপনাকে বদল করে ফেলব।
লেখকঃ পিএইচডি গবেষক, ইটালী, [email protected]
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


