লেখকের অন্যান্য পোস্ট


dhakauniversity group image ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের স্মৃতি ভরা মুহূর্তগুলি আবারো আড্ডার মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য আমাদের এই প্রয়াস “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপ ব্লগ” । সকলে মিলে আবার আড্ডায় মেতে উঠি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর স্মৃতি রোমান্থনে ।  

নিঃসঙ্গ শেরপা'র চলে যাওয়া

লিখেছেন আজহার ফরহাদ, ২১ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৪:২২

                       

১.
খুব বেশিদিন হয়নি হুমায়ুন আজাদ গত হয়েছেন। বেঁচে থাকলে এই শিরোনামটাই হয়তো বেছে নিতেন। এবং কী করে শামসুর রাহমান এই ভুখন্ড ছেড়ে চলে গেলেন তার মর্মরচনা এমন করে কে করতো আর! বাংলা কবিতায় এত দীর্ঘ সময় ও শ্রম দেয়া মানুষটিকে আমাদের চিনিয়ে দেবার মতো কিছু বাকী নেই। সম্পন্ন ব্যক্তিকতা, নির্মেদ ভাষাবিন্যাস, বাকচাতুর্যহীন শব্দবন্ধনের বিপরীতে তিনি গেঁথেছেন বাংলা কবিতায় ইটের পর ইট। গলির মোড় হতে ফিরে এসে নগর জীবনের হল্লার মাঝখানে ক্লান্ত মানুষের, ছায়া-আবছায়ার ভেতর হারিয়ে যাওয়া নয়, প্রবলভাবে জেগে ওঠা- দ্বন্দ্ব ও স্ববিরোধিতার ছাপ রেখেও হয়ে ওঠা সাহসী নায়ক।

আশপাশের অনেকেই চলে গেছেন, কেউ কেউ রয়েছেন এখনো। পাকিস্তানের ফ্যায়জ আহমদ ফ্যায়জ, আহমদ ফারাজ; ভারতের কায়ফি আজমি, আলী সর্দার জাফরী- এদের সমসাময়িক কবি শামসুর রাহমান জনপ্রিয়তায়, কবিচিত্তের প্রসারতায় ছিলেন ঈর্ষণীয়। দেশের প্রধান কবি হিসেবে উল্লেখ না করেও বলা যায়, তার হাতে বাংলাদেশের কবিতা পরিণত হয়েছে।

শামসুর রাহমান নিজের শহর আর গলি থেকে বের করে নিতে চাননি মন। তার ভাবনাবিশ্বের আদলটাই এখানে। এক রহস্যময়তার ভেতর তিনি এ শহর আর শহরের মানুষদের বুঝতে চেয়েছেন। আজ যা একটি মৃত শহরে পরিণত হচ্ছে, পুরনো ঢাকা তার আপন আলোয় বিকশিত ছিল দীর্ঘকাল। গদ্যে পরিতোষ সেন আর পদ্যে শামসুর রাহমান একে দেখেছিলেন কাছ থেকে। সেসবই এখন স্মৃতি। একজন বেঁচে আছেন আরেকজন নেই। তবে শেষমেষ বলা যায় ঢাকা যার শিরা-উপশিরায়, তার কাছেই বেড়ে উঠেছে রূপ-পরম্পরা, স্মৃতির শহর তাই জেগে ওঠে কিংবদন্তির মতো। যে কিংবদন্তিতে এ শহর চিত্রকলার সৌন্দর্য্যে ধরা পড়ে। অপরূপ গালিচা বিছানো- ভোরের শীতল হাওয়ার ঝোঁকই তার কাব্যে আসেনি শুধু, এসেছে মরচে পড়া রাতের বাসিন্দারাও। যারা তার ভাষায় গেয়ে উঠতো মৃতের ক্বাসিদা। আবার এরাই জীবনকে বারবার ফিরিয়ে আনতে চাইতো-

... একদিন কী এক দুর্জ্ঞেয় হাহাকারে
দীর্ণ হয়ে বারান্দায় বাগানের প্রসন্নতা ছেড়ে
প্রতিধ্বনিময় মাথা নেড়ে নেড়ে, দেখলাম, তিনি
স্তব্ধ ক্রাচে ভর করে চলেছেন হেঁটে নীলিমায়।

( তিনি; নিরালোকে দিব্যরথ )



২.
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। কবিতাগুলোর ছিল স্বচ্ছ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে রচিত আসাদের শার্ট এ সময়ের বিখ্যাত কবিতার একটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত কবিতাগুলো নাড়া দিয়েছিলো মুক্তি চেতনাকে। ১৯৭২ সালে এসব কবিতা নিয়ে বেরোয় বন্দী শিবির থেকে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় বোরোয় বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় যা নূর হোসেনের আত্মদানকে উৎসর্গিত। নিজ ঐতিহ্যের পথচারী শামসুর রাহমান প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দেলনেই সক্রিয় ছিলেন।

রাজনৈতিক উচ্চকিত কবিতার প্রভাবে মাঝে মাঝে ঢেকে পড়ে তার কবি প্রতিভার নিঃসঙ্গ মানচিত্র, যেখানে দেখা মেলে অন্য এক কবির যার সূক্ষ্ম অনুভূতি, ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো বিঁধে শব্দে, ভাষায়। তাই সমগ্র কাব্যসম্ভারই তার চিত্তকে বুঝতে প্রয়োজন পড়ে। বিশ্বসচেতন এই গভীরগামী কবিকে নানাভাবে আমরা বুঝতে চাই, হয়তো সংগ্রামে নয়তো স্থাপত্যে। তার জীবনাবসানের আগেই তিনি চেনা জগতের ভেতর রেখেছিলেন সক্ষম বিচরণ, খুব কম প্রতিভাবানের ভাগ্যে যা জোটে। চিন্তায়, মেজাজে, রূপকল্পে বিশেষ করে উপমায় একেবারেই ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যায় তার কবিতার। মানুষের বোধগম্যতার ভেতর চালিয়েছেন তিনি শব্দ ও উপমার চাবুক। আবার তাতে মলম মেখেছেন দরদ ভরে। কখনো বিশ্রাম, কখনো উল্লাস, কখনো হৃদয়তাড়িত চিৎকার, কখনো স্বপ্নের কাঁধে চড়িয়েছেন জীবনের ভারসাম্য-

বিছানায় পা এলিয়ে দিলেন কবি
চপ্পল খসে পড়লো পা থেকে এবং তিনি
দেখতে পেলেন
টেবিলে রাখা গোলাপটিকে, যার রঙ এখন
খাসির কলজের মতো।
ঢুলুঢুলু চোখে তিনি দেখলেন একটা বুনো ঘোড়া ওর তরঙ্গিত
কেশর দিয়ে আদর করছে পূর্ণিমা চাঁদকে,
সে যেন চাঁদ আর আকাশের
ভারসাম্য রক্ষার জন্যে বড় যত্নপরায়ণ।

( শব্দের মৃগতৃষা; ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই )


আমরা বরাবরই তার কবিতাকে ভালোবেসেছি, আবার কবিতার চেয়ে মানুষটিকে বেশী পছন্দ করেছি। এরকম নানাবিধ দ্বন্দ্বে শামসুর রাহমান ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছেন জাতীয় চরিত্রে। তার কথা, উক্তি, কবিতা, অবস্থানগত মতাপার্থক্য এসব নিয়েইতো তিনি জাগর বাংলাদেশে- যাকে ভালো করে বাসবার স্বপ্ন দেখতেন তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এখন সেই স্বপ্নের ভেতর তার চুড়ান্ত অধিষ্ঠান। হয়তো আর তাকে নিয়ে আবেগমথিত বাক্য লিখতে যাবো না; সব আবেগ সঙ্গে নিয়ে গেছেন আর রেখে গেছেন কবিতার এক সুদূরপ্লাবি নগর, যার অনন্ত নাগরিক তিনি।

আমরা তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ ছিলাম। ঠিক যে মৃত্যু হলে মৃত্যুকে মনে হয় জীবনের অবসান। এমন অবসিত মৃত্যুকে আর কে বুঝতে পারে কবি ছাড়া! প্রখ্যাত উর্দু কবি গুলজার যেমন বলেছিলেন-

বুড়ো আঙুলে দিয়ে ভর উঁচু করে উঠে
উঠে চাঁদ ছোঁবার চেষ্টা করছিলেন তিনি
তো রাত গেলো নিভে আর সময় হলো গত
সে এক যে ছিলো কবি...।



দৈনিক যায়যায়দিন
১৯.০৮.২০০৬

  • ০ টি মন্তব্য
  • ২৬বার পঠিত
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৪ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি

আপনি এই পোস্টটে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না

 

dhakauniversity group image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের স্মৃতি ভরা মুহূর্তগুলি আবারো আড্ডার মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য আমাদের এই প্রয়াস “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপ ব্লগ” । সকলে মিলে আবার আড্ডায় মেতে উঠি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর স্মৃতি রোমান্থনে ।

পোস্ট আর্কাইভ

সর্বমোট হিট

 ১৬৯০৭

মোট সময় লেগেছে ০.১২৮৮ সেকেন্ড