dhakauniversity group image ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের স্মৃতি ভরা মুহূর্তগুলি আবারো আড্ডার মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য আমাদের এই প্রয়াস “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপ ব্লগ” । সকলে মিলে আবার আড্ডায় মেতে উঠি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর স্মৃতি রোমান্থনে ।  

এইসব প্রেম নিয়ে বেঁচে-বর্তে থাকা

লিখেছেন মাহাবুবুর রাহমান, ২৬ শে আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১১:৩৬

                       

ক্যাম্পাসে আর কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানা যায় : ‘বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট-নিম্নচাপটি বরিশালের দিকে প্রবাহিত হয়ে এখন বামাবর্তে খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম বিভাগ হয়ে ঢাকা শহরের দিকে ধাবমান।’ এ সময় সরকারি ও বিরোধীদলের নেতা পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত এক জরুরী দেন-দরবারে মশগুল ছিলেন। নিম্নচাপের খবর শুনে, লোকে বলে, তাদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তারা দিশেহারা হয়ে যান এবং দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসেন। আর এভাবেই নাকি তাদের মধ্যকার সংলাপের পরিসমাপ্তি ঘটে। এতে পত্রিকার সংবাদমূল্য কমে যায় ফলে সংবাদপত্রের বিক্রি-বাট্টা কমে যায়। মাননীয় সম্পাদক সাহেব সমীপেষু এবং সংবাদ-কর্মীগণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হন আমাদের ঘনিষ্ঠ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। তারা ঘন ঘন নানা সম্প্রচার করতে থাকেন। তখন আমরা বুঝতে পারি আমরা কি এক ভয়াবহ অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছি। আমরা তথ্য পাওয়ার অধিকার হারাতে যাচ্ছি। কেননা অনেকদিন ধরে ক্যাম্পাসের আন্দোলন-সংগ্রাম, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রেম-পিরিতির কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ক্যাম্পাসের বিষয়ে কিছু জানতে পারি না। ফলে আমরা একসময়ের বিপ্লবী অথবা বামপন্থী আজিজুল রাসেল, তথা রাসেল ভাই ও অন্যান্যের শরণাপন্ন হই। যাদের মধ্যে বিবিসির মতো ‘নিরপেক্ষ’ তথ্য দেওয়ার একটা মুড আছে।

তখন সহসা সারাদেশে, বিশেষত ঢাকায় নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। দেশের সমস্ত প্রান্তের মেঘ কেন্দ্রাভিমুখে, ঢাকার শহরের দিকে প্রচণ্ডবেগে ধাবমান হতে থাকে। ঘনীভূত মেঘ র্যাংভগস ও অন্যান্য উঁচু ভবনে বাড়ি খেয়ে শহরে ওপর আছড়ে পড়ে। শুরু হয়ে যায় একটানা প্রবল বর্ষণ। আর ঘুর্ণিঝড়ে পুরানা পল্টন এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা করে আমাদের বুদ্ধিমান রাষ্ট্রপ্রধান দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এবং আমাদের দায়িত্বশীল সেনাবাহিনী ত্রাণ নিয়ে বৃষ্টিদুর্গত অঞ্চলে যান। আর এভাবে তারা জনগণের, জনগণ তাদের সান্নিধ্যে আসেন।

রাসেল ভাই বলে যে, “ক্যাম্পাসে আর কোনো আন্দোলন সংগ্রাম নাই। ফলে আমাদের হাতে আর কোনো কাজ-কর্ম থাকে না। আমরা বেকার হয়ে পড়ি। আমরা আর দৌড়-ঝাপ করি না; বউছি, কানামাছি, পলাপলি খেলি না। সরকারী ছাত্র সংগঠনের পোলাপানও আমাগোরে আর দৌড়ায় না। দৌড়াইবেই-বা কেন? অরা আমাগো লগে দৌড়াইয়া পারে না। হুমায়ুন আজাদের আন্দোলনের সময় অনেক দৌড়াইছে; আমাগোরে ধরতে পারে নাই। আমরা দৌড় দিতাম আর মনে মনে বলতাম, ‘ধর ব্যাটা, কত পারস ধর দেখি; আমাদের টিকিটাও ধরতে পারস কিনা।’ আমাগোরে তারা রীতিমত ধাওয়া করতো। আমরা খিইচ্যা পইড়্যা দৌড় দিতাম আর সুযোগ পেলে পিছনে ফিইর্যার তাকাইতাম। তাকাইয়া দেখতাম তাদের হাতে ইয়া বড় বড় লাঠি। ফলে আমরা আরেকটু ক্রিটিক্ল্ হয়ে যেতাম, আমরা টুপ করে বিভিন্ন ক্লাসে ঢুকে পড়তাম আর পাঠের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠতাম। কেননা আমাদের কারো কারো আবার সামনে অনার্স-মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু আমরা কেউ কেউ ওদের এত সিরিয়াস হওয়ার কারণ খুঁজে পাই না। আমরা কিছুটা বিরক্ত হই। ওদের মধ্যে যারা আমাদের ব্যক্তিগত ফ্রেন্ড আছে আমরা তাদের জিগাই, ‘অই, তোরা এমন কইরা দৌড়ান দেছ ক্যান!’ অরা হাসে, কয় না-দৌড়াইয়া কি উপায় আছে, মনে নাই চান্দু, শামসুন নাহারের সময় আমাগোরে কি দৌড়ানটাই না দিছো!”

কিন্তু অগত্যা তারা অন্য খবর জানতে পায়। তারা জানতে পায় যে, তাদেরকে দৌড়িয়ে না-ধরতে পেরে সরকারী ছাত্র সংগঠনের নেতারা ক্লান্ত হয়ে যায়, তারা বিমর্ষ হয়ে মধুর ক্যান্টিনে ফিরে যায়, ধপ করে চেয়ারের ওপর বসে পড়ে, এবং বলে, অই অরুন, চা দ্যাও, চিনি দ্যাও, সিঙ্গারা-পুরি দ্যাও। বলে, অই হালার পো সিগ্রেট দে। তারা সিগারেট টানে, মনের অজান্তে তারা তাদের ক্ষণেকের ব্যর্থতার ইতিহাস ভুলে যায়।

হলের নেতারা হলে ফিরে আসে আর নতুন উদ্যমে বামপন্থী পোলাপানের রুমে তল্লাশি চালায়। কিন্তু তারা দ্বিতীয়বার ধোঁকা খায়। তারা তাদেরকে পায় না। তখন রাসেল ভাইরা জানতে পায়, যেসব নেতা তাদের মাথায় লাঠি ভাঙতে পারে নাই, ঠ্যাং ভাঙতে পারে নাই, পুলিশ বাহিনীতে আর তাদের চাকরি হয় না। কেননা কর্তৃপক্ষের ধারণা যে তারা এখনো যথেষ্ট প্রশিক্ষিত হয়ে ওঠেনি। সেই কারণে কেন্দ্রিয় নেতারা মধুর কেন্টিনে বসে, গোপনে বলে, ‘ছোটভাই খামটা এত পাতলা হলে কিভাবে হবে, তোমরা তো এখনো পুলিশের চরিত্র প্রাপ্ত হয়ে ওঠোনি; ...ঠিক আছে, ...নো টেনশন, ক্যারি অন।’ কিন্তু হলের কিছু নেতার আর টেনশন কমে না। টেনশনে তারা হলের কয়েকটি রুম দখল করে। তারা কারো কারো সিট দখল করে, হলে বছরের পর বছর অবস্থান করে এবং চাকরির প্রাকটিসসহ নানা ধরনের প্রাকটিস চালিয়ে যায়। এতে রাসেল ভাইরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে রাসেল ভাইদের নেতারা তাদের নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, প্রথমে সবার কুশল জিজ্ঞাসা করে। তারপর এই কথা সেই কথার পর সুযোগ বুঝে বলে ফ্যালে, ‘মিয়াভাই, আপনারা কি খেলার নিয়ম ভুলে গেছেন?’ তারা বলে, ‘ক্যান, কী হইছে?’ বামপন্থী নেতারা বলে, ‘বউছি খেলার নিয়ম তো এইটা না। বউ গিয়ে ঘরে পৌঁছলে তাকে তো আর ধরার নিয়ম নাই।’ বলেই তারা নরম করে হেসে ফেলে, মোলায়েম স্বরে বলে ‘বুঝেছি, আপনারা নিয়ম ভুলে গেছেন।’ তখন তারাও হেসে ফেলে এবং নিয়ম ভুলে যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা লজ্জাগ্রস্ত হয়। রাসেল ভাই এইসব কথা মাহবুব ভাই, মুজিবসহ অন্যদের বলে : ফলে দু’পক্ষের নেতাদের মধ্যে সুন্দর একটা মিচ্যুয়াল হয়। মাহবুব ভাই, এরা হলে সিট পায় এবং রাসেল ভাইর কথায় তাদের আস্থা জন্মে। এই আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে তারা নির্ভাবনায় থাকে। নির্ভাবনায় তারা হলের বিছানায় শোয়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তাদের হৃদয়ে ক্লান্তি-পরবর্তী সুন্দর একটা শান্তির আবহ ভর করে, বিরাজ করে এবং একসময় তারা নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। এভাবে ক্যাম্পাসে একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ঘটে। এতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়।

বামপন্থী ছাত্রনেতারা মনে করে যে, রাসেল ভাই ক্যাম্পাসে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ফলে তারা রাসেল ভাইকে গালি দেয়। তখন সে মাহবুব ভাইকে এসে বলে, ‘কি মিয়া, তোমরা বলে প্রতিক্রিয়াশীল, বুর্জোয়া লেখক হইছো?’ শুনে মাহবুব ভাইয়ের মন খারাপ হয়ে থাকে। কিন্তু এতে মন খারাপের কী আছে? আমরা বুঝতে পারি না। মোস্তফা হামেদীরা বলে, কি মাহবুব ভাই, আপনার নাকি মন খারাপ, ঘটনা কি? সে কিছু বলে না। হয়তো সেও কোনো কারণ খুঁজে পায় না। কিন্তু আমরা পাই, আমরা জানতে পাই, ক্যাম্পাসে আর কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই। ফলে তাদের হাতে কোনো কাজকর্ম থাকে না। তখন তারা কী করা যায় ভাবতে থাকে। কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পায় না। না পেয়ে তারা আবিষ্কার করে যে, তাদের বয়স বেড়ে যাচ্ছে, ক্যাম্পাসের সময় চলে যাচ্ছে অথচ এখনো কোনো প্রেম করাই হয় নাই। তখন তারা সিদ্ধান্তে আসে যে তাদের প্রেম করা দরকার। রাসেল ভাই সবাইকে, মাহবুব ভাইকে, তাগাদা দেয়, প্ররোচিত করে, বলে, ‘প্রেম কর মিয়া, প্রেম কর, দ্যাখ না তোমার দিকে মাইয়ারা কেমন উদাস নয়নে, চোরাচোখে তাকায়; তুমিও তাকাও, মিতার দিকে তাকাও, মৌসুমীর দিকে তাকাও, ...কণার দিকে তাকাও, নিতুর দিকে তাকাও... ; একদৃষ্টে তাকাইয়া থাকো, তাকাইয়া তাকাইয়া একেবারে কর্প্স্ বানাইয়া ফালাও; সুমন ভাই, মেহেদী ভাই আরো চেইতা যাউক, চেইতা-মেইতা একেবারে আগুন হইয়া যাউক।’ সে এইসব বলে আর হাসে আর মনে মনে নিজেও এক ধরনের প্রেম কিংবা যৌন সুখ বোধ করে; এরপর ভূমিকা ছাড়ে, বলে, ‘কোনদিন জানি অগো প্রেমিকেরা, বিপ্লবীরা সবাই মিইলা আমাগোরে ধইরা মাইর দেয়; ঘাড় ধইরা মধুর কেন্টিন থেইকা বাইর কইরা দেয়।’ মাহবুব ভাই রাসেল ভাইর কথা শুনে ঠোঁট চেপে হাসে, কোনো কথা বলে না। সে নাকি দুয়েকটি লঘু মুহূর্ত ছাড়া তাকাতে পারে না। আমরা তারে বলি, ক্যান ভাই, পারেন না ক্যান। তখন সে চুপ করে থাকে যেন আমাদের কথা শুনতে পায় নাই। তার গভীর কালো চোখ দুটি কয়েক হাজার মাইল দূরে, যেন গভীর অতীতে মেলে ধরে। আমরা বুঝতে পারি তার মধ্যে স্থান-কাল-পরিপার্শ্বজ্ঞান লুপ্ত হইছে। আমরা মনে মনে বলি, হালায় জীবনানন্দ-মার্কা ভাব ধরছে। তখন সে হয়তো আমাদের মনের কথা বুঝতে পারে, এবং তার মধ্যে আবার স্থান-কাল-পরিপার্শ্বজ্ঞান পরিস্ফুট হতে থাকে। সে আমাদের বলে অথবা আমাদের বলে না, নিজেকে নিজে শোনায়, আমার জীবনে কিছু সুদূরতা আছে, আমার হৃদয়ে কিছু গাঢ়তা আছে...। কিন্তু কী সেই সুদূরতা, কী সেই গাঢ়তা, আমরা তা জানতে পারি না। আমরা তার মুখ থেকে এর বেশি কোনো তথ্য পাই না। আমরা বুঝতে পারি, আমরা তথ্য প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কিন্তু বিবিসি আমাদের এই অমূলক উদ্বেগ বিদূরিত করে। কেননা তারা বলে যে, যে-কোনো মূল্যে লাদেনকে ধরা হবে। শুনে আমরা আরো সর্তক হই, উৎকর্ণ হই। তখন ভোয়া, সি.এন.এন কিংবা ফক্স নিউজ নিরপেক্ষ যুক্তি দিয়ে বোঝায়, সাদ্দামরে ক্ষমতাচ্যূত না-করলে লাদেনকে ধরা সহজ হবে না। আমরা বলি, তাই তো! কেননা নিরপেক্ষতার প্রতি আমাদের আস্থা আছে, এক ধরনের যৌন আকর্ষণ আছে। তাই আমরা ক্যাম্পাসের নিরপেক্ষ খবরা-খবর জানতে রাসেল ভাইর কাছে যাই।

রাসেল ভাই বলে, ‘আমরা তখন সিদ্ধান্ত লই যে আমাদের প্রেম করতে হইব’। তিনি এ ব্যাপারে আমাদের বিশদ বিস্তারিত করেন। আমরা জানতে পাই যে, ডিজুস ও অন্যান্য মোবাইল কোম্পানি রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কলরেট হ্রাস করে, এমনকি শর্তসাপেক্ষে ফ্রিও করে। এতে অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ পাওয়া যায়। আমরা সারারাত জাগি, কথা বলি, নানা তথ্য সংগ্রহ করি। টিনএজারদের ব্যক্তিগত তথ্য আমাদের হার্ডডিস্কে চলে আসে। আমরা সেসব শুনি, শুনে আমাদের মজা লাগে, আমরা সুখ ও লজ্জা মেশানো কণ্ঠে বলি, যাঃ পোলাপান কি দুষ্টু। এবং পোলাপানের এই দুষ্টুমির খবর আমাদের তথ্যমন্ত্রীরও কানে পৌঁছে যায়। শুনে তিনি বিষণœ হন, তিনি স্মৃতির ভারে আতুড় হয়ে পড়েন। কেননা তাদের সময় এই সব সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ফলে তার মধ্যে একটু লোভ জাগে, তিনি সাম্প্রতিক তথ্যসমূহ হস্তগত করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন এবং টেলিফোনে আড়িপেতে ছেলেমেয়েদের ইরোটিক কথাবার্তা শুনতে থাকেন। শুনে তিনিও মজা পান, তিনি তার জীবনে যৌবনের আগমনী বার্তা টের পান, তার মধ্যে মর্দানী শক্তি জাগরিত হয়, তিনি শাওয়ারের নিচে গিয়ে ঠাণ্ডা হন; মাথা ঠাণ্ডা করেন। তার ঠাণ্ডা মাথায় আরেকটি চিন্তা আসে। ভিন্ন ধরনের একটি ফ্লেবারের আশায় তিনি পার্বত্য অঞ্চলের দিকে আড়ি পাতেন। কিন্তু সেখানের অবাঙ্গালি ছেলেমেয়েদের কথা তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। ফলে তিনি একটি ভিন্ন ধরনের ফ্লেবার, ‘ফ্লেমিঙ্কো’ থেকে বঞ্চিত হন। তার মধ্যে বঞ্চনার গ্লানি জমা হতে থাকে। লোকজন বলে যে তার এই গ্লানি এক সময় ক্ষোভে পরিণত হয়, এবং সেই ক্ষোভ থেকে তিনি এসব অঞ্চলের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেন। কিন্তু তিনি একথা অস্বীকার করেন, অন্য কথা বলেন। ফলে আমরা জানতে পারি লাদেনের মতো সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি এলাকায় থাকে, পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে থাকে। কিন্তু মাহবুব ভাই কোথায় আত্মগোপন করে আছে! অনেকদিন পর্যন্ত আমরা তার দেখা পাই না। লাদেনের মতো তাকেও আমাদের রহস্যময় চরিত্রের লোক বলে মনে হয়। কেননা সেঁজুতির বিষয়ে আমরা তার কাছে কিছুই জানতে পারি না। এ বিষয়ে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলে তার মধ্যে এক ধরনের অনস্তিত্ববোধ দেখা দেয়, তার মাধ্যাকর্ষণশক্তি হ্রাস পেতে থাকে এবং আমরা ভয় পেতে থাকি যে যে-কোনো মুহূর্তে সে অন্যকোনো ব্রহ্মাণ্ডে চলে যেতে পারে। ফলে আমরা আর তাকে পীড়াপিড়ি করি না। আমরা রাসেল ভাইর শরণাপণœ হই।

আমরা রাসেল ভাইর কাছে জানতে পারি, সে এক নীরন্ধ্র নিঃসঙ্গতার মধ্যে জীবনপাত করতেছে। রাসেল ভাই বলে, ‘আমি হালারে যতই বলি প্রেম কর মিয়া, হালায় ততই এক আত্মঘাতী নিঃসঙ্গতার ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। প্রেম করবো কীভাবে, হালার মধ্যে অতি উচ্চমার্গের, অবাস্তব এক সৌন্দর্যবোধ কাজ করে।’ তার কথায় আমরা বুঝতে পারি যে মেয়েদের বিষয়ে তার মধ্যে ছুৎমার্গ আছে। ফলে আমরা ডিপার্টমেন্টে গিয়ে তার সাথে দেখা করি, সে আমাদের কে জানায় যে তার হেপাটাইটিস-বি হইছে। শুনে আমরা মজা পাই। এবং দিব্যচক্ষে তার সাহিত্য সম্ভাবনা দেখতে পাই। তখন মুজিব কিংবা মাহমুদ হাসান বলে যে, মাহবুব ভাই, ভালাই হইছে, আমরা আপনের নামে ক্যাম্পেইন করমু, টাকা উঠাইমু, আমাগো হাত খালি; আপনের নামও প্রচার অইবো...। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। হয়তো-বা এই কারণে ক্রমশ সে ক্লাশ করা, ক্যাম্পাসে আসা একেবারেই বন্ধ করে দেয়। ক্যাম্পাসে না আসার ফলে মেয়েদের বিষয়ে তার মন বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে। তার মনে হতে থাকে, এমন কি ক্যাম্পাসের মেয়েরাও মানসিকতায় দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর। এদের কোনো সাহিত্যবোধ-শিল্পবোধ-সৌন্দর্যবোধ নেই। এরা সব অতীব মাত্রায় প্র্যাকটিক্ল্, সংসারী এবং বিয়ের পর খুব দ্রুত মুটিয়ে যায়, পেটে ভাজ পড়ে। ফলে অনাগত দাম্পত্য-জীবনের কল্পনায় তার মন আরো বিবমিষায়, বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে। এবং রাসেল ভাই বলে যে, ‘সে আরো বেশি একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে বুঝে ফেলে তার দ্বারা প্রেম হবে না। সে দুর্বল হয়ে পড়ে, তার মন খারাপ হয়ে থাকে।’

মন খারাপ হয়ে থাকার কারণে তার কপাল খুলে যায়, কেননা এতে তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়ে যায়। ডাক্তার বলে : কবিদেরই রোগ বটে। শুনে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। সে বই নিয়ে ক্যাম্পাসে আসে এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্যকে যারা পরবর্তীকালে বৈধতা প্রদান করে তাদের একজন, মোহাম্মদ আজম স্যারের সাথে দেখা করে। আজম স্যার বলে, ‘কাজ-কাম না-থাকলে তো মানুষ কবিতাই লেখে, নাকি?’ শুনে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারের মতো মাহবুব ভাইয়ের মন খারাপ হয়। এতে করে আজম স্যার কবি হিসেবে মাহবুব ভাইকে স্বীকৃতি প্রদান করে। আবদেল মাননান বলে, ‘দেখছেন মিয়া, এইবার বুঝছেন তো কারবারটা কি হইছে? মাহবুব আজম স্যাররে বই উপঢৌকন দিয়া তার বইয়ের সার্টিফিকেট আদায় করছে।’ এবং সে ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, বলে, ‘হালার ঢাকা শহরটাই খানকির ছাওয়ালে ভইরা গ্যাছে, সব হালার ভাউরা কবি-বুদ্ধিজীবী, ঢাকার মায়রে-বাপ, চুতমারানি...।’ এই সব বলতে বলতে সে মধু থেকে উঠে চলে যায়। এবং আমরা পরে জানতে পারি সে ঢাকা ছেড়ে চলে গ্যাছে। সে আর ক্যাম্পাসে আসে না। ফলে রাসেল ভাই মাহবুব ভাইরে বলে, ‘কি মিয়া ক্যাম্পাসে আইও না ক্যান?’ তখন মাহবুব ভাই বলে, আসি না, আমার স্বাস্থ্য খারাপ, মন খারাপ, শরীল দুর্বল লাগে। শুনে হামেদী, মুজিবদের মন আর্দ্র হয়ে উঠে, তাদেরও মন খারাপ হয়। মাহমুদ হাসান বলে, ‘চলেন, মেলায় যাই, সুন্দরী মেয়েগোরে দেখলে মন ভালো হইবো।’ কিন্তু মেলায় সুন্দরী মেয়েদের দেখে তাদের মন আরো খারাপ হয়ে যায়। উপায়ন্তর না-পেয়ে তারা মাহবুব ভাইর কবিতার বই পড়ে। বই পড়ে জানতে পারে, মেয়েদের রূপ মন খারাপ করে দ্যায়। জেনে মুজিব উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, বলে, ভাই জটিল একটা কতা কইছেন। সে সঠিক মুল্যায়ন করতে চায়, আরো প্রশংসা করতে চায়। কিন্তু বেশি কিছু বলতে পারে না, প্রশংসার ভাষা সে হারিয়ে ফেলে। শেষে দিশামিশা না-পেয়ে বলে, মাহবুব ভাই টাকা দ্যান, আমনের বই কিনুম। তখন মাহবুব ভাই তারে টাকা দ্যায়। মুজিব বলে, আরো টাকা দ্যান, আমনের বই কিইন্যা অনিরে দিমু, মারিয়ারে দিমু, কুছুমরে দিমু; আমনের বই অগোরে দিয়া পড়ামু। শুনে মাহবুব ভাইর মন একহাত লম্বা হয়, তার হৃদয় আবেগে-আহ্লাদে ভরে যায় এবং সে মধুসূদনের মতো চোখ বন্ধ করে পকেটে হাত ঢুকায়। মুজিব বই কিনতে যায়। এই ফাঁকে হামেদীরা মাহবুব ভাইর কাছে মুজিবের নিকট-অতীতের কাণ্ডকীর্তি, কৃতিত্ব বয়ান করে। তিনি জানতে পান যে, মুজিব অনির লগে প্রেম করে আর অনি আরেকটা ছেলের লগে, এতে মুজিব মনে করে মারিয়া, ছন্দা, কুসুমসহ যত মেয়েকে তার পছন্দ, তারা সবাই তার প্রেমে পড়ছে; তাই সে তাদের পেলেই লাঁকা কিংবা পোস্টমডার্নিজম বুঝায়। কিন্তু মেয়েরা এসব বোঝে না। তাই রাসেল ভাই মাহবুব ভাইরে বুঝায়, একটা প্রেম কর না ক্যান মিয়া। কিন্তু তার উদাসিনতা আমাদের মনে সন্দেহ জাগায়, আমরা তাকে পেলেই নানা প্রশ্ন করতে থাকি। এভাবে একদিন হঠাৎ করে আমাদের মনে পড়ে যায় ‘সেঁজুতি’ কবিতার কথা। আমরা তাকে প্রশ্ন করি, মাহবুব ভাই সেঁজুতি ক্যাঠা, আপনে তারে নিয়া কবিতা লেখছেন ক্যান। তখন তিনি খুব ঠাণ্ডাভাবে আমাদেরকে কবিতার ইসথেটিকস বুঝায়, বলে, সেঁজুতি জাস্ট একটা নাম, তার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নাই, আবার থাকলেও থাকতে পারে, না-থাকলেও ক্ষতি নেই, অনেক সময় কবিতার প্রয়োজনে অনেক কিছ ব্যবহার করতে হয়, এর সাথে ব্যক্তি-কবির সম্পর্ক খোঁজা অনর্থক। কিন্তু আমরা তার কাছে ইসথেটিকস বুঝতে চাই না, আমরা সেঁজুতির বিষয়েই জানতে চাই। কিন্তু সেঁজুতির বিষয়ে আমরা তার কাছে কিছুই জানতে পারি না। আমরা আরও ক্লু খুঁজতে থাকি এবং মনোযোগের সাথে মাহবুব ভাইর বই পড়তে থাকি। আমাদের মনোযোগের কারণে আজম স্যারের কাছেও মাহবুব ভাই গুরুত্ব পায়, স্যার তারে বলে, ‘ঠিক আছে, কবিতা লেখছ ভালো কথা, আসো আমরা কবিতা নিয়ে বসি।’ তখন তারা আজম স্যারের রুমে নিয়মিত কবিতা পড়তে বসে, আলোচনা করে, তিরিশি কবিতাকে সাইজ করে। সাইজ-টাইজ করা শেষে সবাই বাসায় ফিরে, মাহবুব ভাইও হলে ফেরে। কিন্তু একদিন আর ফিরতে পারে না; বিধস্ত অবস্থায় রাতভর ঢাকা শহরে চক্কর খেতে থাকে এবং সকালে ক্যাম্পাসে ফেরত আসে। আমরা বুঝতে পারি তাকে দিয়া-ভুলায় পাইছে।

কিন্তু রাসেল ভাই আমাদেরকে ভিন্ন কথা শোনায়। সে আমাদেরকে বলে, ‘দীর্ঘ দিন সাধনার পর মাহবুব তার পরমাত্মার দেখা পেয়ে গ্যাছে।’ তখন আমরা আরো বিস্তারিত জানতে পাই, আমরা জানতে পাই যে, আজম স্যারের রুম থেকে মাহবুব ভাই হলে যাওয়ার পথে সেঁজুতির সাথে দেখা হয়। সেঁজুতি মাহবুব ভাইকে একা দেখতে পায় এবং রিক্সায় তুলে নেয়। আমরা এর বেশি আর কিছু জানতে পাই না। ফলে আমরা বুঝতে পারি কেন পোলাপান আজম স্যারের রুমে যায়। আমরা জানতে পাই মাহবুব ভাইরা স্যারের রুমে কবিতা পড়ে। মেহেদী ভাই পড়ে না, বসে থাকে, আর তারে কেবল ছাত্রীরা ফোন করে। তখন হামেদী, হাসানরা, মনে মনে ঈর্ষান্বিত হয়¬─ এর একটা বিহিত করা দরকার। তখন প্রেম নিয়ে সেখানে নানা ধরনের বাহাস হয়। আজম স্যার, রুবেল ভাই, এরা বলে, ‘প্রেম-ট্রেম বলে কিছু নাই, এসব ভুয়া, কাঁচা লোকের কাম।’ কিন্তু হামেদীরা এসব কথা মানতে পারে না। তারা বিমর্ষ হয়ে যায়, তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তারা স্যারদের সাথে যুক্তিতে পারে না। কিন্তু মাহবুব ভাই বরাবরের মতো কোনো কথা বলে না। গভীর মনোযোগের সাথে সব কথা শুনতে থাকে এবং মাঝে মাঝে ঠোঁট চেপে হাসে। ফলে তারা, হাসানেরা মর্মাহত হয়, তারা আরো উত্তেজিত হয়, মাহবুব ভাইরে বলে, আপনে চুপ কইরা আছেন, কিছু বলেন না ক্যান, ঠোঁট চাইপা হাসেন? তখন মাহবুব ভাই বলে, ‘আমি কি বলব, প্রেম থাকলেও থাকতে পারে আবার না-ও থাকতে পারে।’ শুনে তারা গুম মেরে বসে থাকে। অতপর করণীয় বুঝতে না-পেরে চেয়ার ছেঁড়ে উঠে দাঁড়ায়। ‘হালা, সুবিধাবাদী পাবলিক!’ মনে মনে তারা মাহবুব ভাইরে গালি মেরে রুম থেকে বের হয়। মধুর ক্যান্টিনে আসে, নিস্তেজভাবে চেয়ারে বসে, চুপ করে বসে থাকে, কতক্ষণ পর পুরি আনায়, আস্তে আস্তে দুয়েকটা পুরি মুখে ঢুকায়, আলগোছে দুই পাটির দাঁত একত্র করে, মোলায়েম করে পুরিতে চাপ দেয় আবার দুই পাটি আগলা করে। এতে করে এক সময় তাদের মুখে বলার মতো কথা জুগিয়ে যায়। তারা মাহবুব ভাইরে বলে, এইটা কেমন কথা কইলেন, ওই হালাগো প্রেমের বয়স নাই দেইখা এই কথা কয়, আপনে কন কিয়ের লাইগা। শুনে তিনি হাসেন, বিদ্রুপ ছোঁড়েন, তোমাদেরই কি বয়স আছে? শুনে তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং এক সময় বুঝতে পারে, তাদেরও বয়স চলে যাচ্ছে। সুতরাং তারা, তথাকথিক তরুণ লেখকেরা, রাসেল ভাইয়ের সাথে দৃঢ়ভাবে একমত হয় যে, খুব দ্রুত তাদের প্রেম করা দরকার। এভাবে তারা প্রেমের ফাঁদে পা দেয়। এবং আমরা জানতে পারি এক সময় আবদেল মাননানও রাসেল ভাইদের ফাঁদে পা দেয়।

আবদেল মাননান দেখতে পায় যে, ঢাকা শহর মিডিয়বাজ, ভাড়াটে, পরগাছা, পশ্চিমা কবি-সাহিত্যিকে ভরে গেছে, এখানে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা হয় না, লালন চর্চা হয় না, ফলে সে ঢাকার বিষোদাগার করতে করতে কুষ্টিয়ার লালন আখড়ায় চলে যায়। সেখানে দীর্ঘদিন থাকে এবং একসময় লালনের ওপর একটি বই লেখে ফেলে। তখন তার মনে হতে থাকে যে, এইবার ঢাকা উঠা যায়। ফলে সে ঢাকা চলে আসে এবং সবাইকে তার বইয়ের বিষয়ে নছিহত করতে থাকে। রাসেল ভাইরাও তার সাথে যোগ দেয়, তাকে বুদ্ধি দেয়। বুদ্ধি পেয়ে সে ঢাকার প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। এতে মুজিব, হাসানরাও অনেকদিন পর ক্যাম্পাসে দৌড়াদৌড়ির একটা সুযোগ পেয়ে যায়। তার ফলে বিজনেস অডিটোরিয়ামে এই সব ক্রীড়াকর্মের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়। শুনে আমরাও যাই, গিয়ে দেখি আবদেল মাননান যাদের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী বলত সেই ফরহাদ মজহার, মুনতাসীর মামুনরা তার বইয়ের ওপর আলোচনা করতেছে। আমরা দিব্যচক্ষে দেখতে পাই যে, আবদেল মাননান জাতে উঠতেছে, অচিরেই সে ঢাকার বুদ্ধিজীবিদের কাতারে উঠে যাচ্ছে। এতে আমরা খুশি হই। কিন্তু আমাদের খুশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না, অচিরাৎ সেখানে বাঁশ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। আমরা দেখতে পাই যে সবাই আবদেল মাননানকে বাঁশ মারতেছে, এমনকি রাসেল ভাই, মুজিবরাও। মাহবুব ভাই বলে, কাজটা কি ঠিক হইলো? আজম স্যার বলে, আরে এখানকার সমালোচনাইতো হয় বাঁশ মারা না-হয় তেল মারা। শুনে আবদেল মাননান পুনরায় ঢাকা শহরকে গালি মেরে দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকা ছেড়ে চলে যায়।

এতে তাদের, মানে ফারুক হ'সেন, হামেদী, হাসান এদের কিংবা জুয়েল, হেলালদের উপকার হয়। তারা বাঁশ ও তেলের বিবিধ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হয়। তারা জানে বাঁশে গিট্টু থাকে পক্ষান্তরে তেল পিচলা। সুতরাং বাঁশের চেয়ে তেল ব্যবহারই নিরাপদ। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা রাসেল ভাই, মাহবুব ভাইকে তেল মারতে শুরু করে। কিন্তু হেলাল বলে, ‘মাহবুব ভাই, হালায় উপরে উপরে বোদাইর মতো ভাব নিয়া চললেও ভিতরে ভিতরে পুরা পাকনা, সে আমাগো তেল খায় না।’ সুতরাং তারা ভাবে তার চেয়ে বরং মেয়েদের তেল মারা অনেক সহজ ও লাভজনক, আর জায়গা মতো তেল মারতে পারলে কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু তেলের আবার একটি অসুবিধাজনক দিকও আছে, বিশেষত গৃহকর্তার পক্ষ থেকে, কেননা তেল পিচলা, ফলে চোরকে আটকে রাখা যায় না। সুতরাং হেলালদের বেলায়ও এই নিয়মের ব্যতয় ঘটেনি, তারা কোনো মেয়েকে বেশি দিন আটকে রাখতে পারে না। লেখক সঙ্ঘের আহ্বায়ক ফারুক হ’সেনও যে কারণে সংগঠনের পত্রিকায় অপর্ণার কবিতা ছাপিয়ে তাকে আটকে রাখতে পারে না।

ফলে রাসেল ভাইরা সাবধানী হয়ে যায়। তারা, মুজিবরা, দীর্ঘদিন প্রেম করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছাত্রদের কাছে যায়, বুদ্ধি চায়। তারা বলে, ‘প্রেম করতে হইলে টাকা লাগে, তোমাগো টাকা আছে? তোমরা তো হালার বই কিনো আর দুপুর বেলা একটা পুরি খাইয়া জীবন কাটাও।’ তারা বুদ্ধি দেয়, ‘বইয়ের পিছনে কম সময় দিতে হয়, মেয়েদের পিছনে সময় দিতে হয়, ঘুরতে হয়, গাছের আড়ালে অন্ধকারে বসতে হয় আর চোখ বন্ধ করে টাকা উড়াইতে হয়।’ শুনে তারা, রাসেল ভাইরা চিন্তিত হয়ে পড়ে, তারা দমে যায়। কিন্তু জাহিদ ভাই তাদের আশ্বস্ত করতে চায়। বলে, আরে এত চিন্তা কী, একটা ফ্লাট ভাড়া নেন, ঢাকায় একটা ফাঁকা বাসা থাকলে মাইয়ার অভাব আছে নাকি। মাহবুব ভাইরা বর্তমান প্রেমের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে তার কাছে বিস্তারিত জানতে পারে। জাহিদ ভাই আফসোস করে, হোটেলগুলাও এখন আর নিরাপদ না, হোটেলে রাইত কাটাইলে,মনে করেন যে ইকটু আদর-মোহব্বত-ভালোবাসা করলে,বেড়ালের মতো শাদা থাবা বুলিয়ে লোফালুফি করলে পরে দেখা যাইবো তা সিডিতে বাইর হইয়া গ্যাছে। এসব শুনে মাহবুব ভাই আঁৎকে ওঠে তার মধ্যে বর্তমান প্রেম সম্পর্কে একটা বিপদাশঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু রাসেল ভাই, আবারো সবাইরে, তারে উৎসাহ দেয় এবং বলে যে, প্রয়োজনে আমরা টাকা তুইলা প্রেম করুম। এবং শোনা যায়, এর ফলে কাজ হয়, একজন একজন করে তারা প্রেমে পড়তে শুরু করে। কিন্তু মাহবুব ভাইর আর প্রেম করা হয় না। ফলে, কিংবা অবস্থা বেগতিক দেখে মাহবুব ভাই আবারো ক্যাম্পাসে আসা বন্ধ করে দেয়। যদিও সে বলে যে, তার স্বাস্থ্য খারাপ, রোদে বের হওয়া নিষেধ। এই ফাঁকে হামেদী চান্স নিতে যায়, সে ডিপার্টমেন্টে বলে বেড়ায় যে, মাহবুব ভাই ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র এক সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ছে; জুনিয়র মেয়ের প্রেমে পড়ায় সে অন্তরে লজ্জিত হয়, তার ব্যক্তিত্বে এক ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়, তাই সে ক্যাম্পাসে আসে না। একথা শুনে ডিপার্টমেন্টের পোলাপানের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কে সেই মেয়ে, সবাই হামেদীকে ধরে। কিন্তু হামেদী মনে মনে ভাবে যে, মেয়েটির নাম বলে দিলে তবে তো তার লিস্ট থেকে মেয়েটি চলে যাবে। সে চালাকী করে মেয়েটির নাম না-বলে আরো রহস্যময়তা তৈরী করতে যায়। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের পোলাপান বলে যে, এই চালাকীর কারণেই তার কপাল পোড়ে। কেননা হামেদী নির্দিষ্ট কোনো মেয়ের নাম না- বলাতে ডিপার্টমেন্টের প্রত্যেক সুন্দরী মেয়েই মনে মনে ভাবে যে, মাহবুব ভাই শুধুমাত্র তার প্রেমেই পড়ছে, এটা ভাবতে ভাবতে একসময় তারাও স্বপ্নকাতর হয়ে পরে। অন্যদিকে ডিপার্টমেন্টের প্রেমিকরাও সন্দেহ করে যে, মাহবুব ভাই তার প্রেমিকাকেই পছন্দ করে। ফলে জসিম ভাই তার রুমে এসে উপস্থিত হয় এবং দেখে যে সে কবিতা লেখায় মগ্ন আছে। জসিম ভাই বলে, ‘ধুরো শালা, বাদ দে তোর কবিতা, আমি একটা মেয়েরে পছন্দ করি বইলা যে তুই করতে পারবি না তা-তো না। যা আমি মুনমুনের দাবী বাদ দিলাম, তুই প্রেম কর, পারলে আরো কিছু কর, আমার কোনো আপত্তি নাই। এই বার হইছে তো। তাইলে এখন থেইকা নিয়মিত ক্লাস কর, পড়ালেখা কর, পরীক্ষার ডেট পইরা গ্যাছে।’ এইসব কথা শুনে কিংবা রাসেল ভাইর কথা শুনে মাহবুব ভাই ক্যাম্পাসে আসে। রাসেল ভাই বলে যে, মাহবুব ভাইর ক্যাম্পাসে না-আসার কারণ, প্রেম না-করার কারণ তার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বলে, দেখছ হালায় কত চালাক, হালায় আমার কাছেও আসল কথা লুকিয়ে রাখে, হালায় ফার্স্ট ইয়ার থেকেই সেঁজুতির প্রেমের পড়ছে। তখন যতই কইতাম করো মিয়া, সেঁজুতির সাথে প্রেম করো, অসুবিধা কই, তোমার স্বপ্নকন্যার মতোই তো তার রূপ-রুচি-ম্যাচিউরিটি, কিন্তু ততই হালায় উদাসিন ভাব দেখাইতো, এমনকি সেঁজুতির দিকে ফিইরাও তাকাইতো না; যেন তার প্রতি কোনো আকর্ষণ নাই, কোনো মোহ নাই; কিন্তু এখন? এখন তারে নিয়া কবিতা লেখছ! আবার আমারে কয় কি জানো? কয় রাসেল ভাই জীবনে তো কত কিছু না-পেয়েও বেঁচে আছি, না-হয় তারেও নাই-বা পেলাম। কয়, সবচেয়ে বড় কথা কি জানেন রাসেল ভাই, পেয়ে গেলেই তো সবকিছু শেষ, জীবনে আর কিচ্ছু থাকে না, স্বপ্নময়তা থাকে না, হারালে তবুও খুঁজে খুঁজে বাকীটা-জীবন পার করে দেয়া যায়।’

কিন্তু মাহবুব ভাই এত কথা বলার মানুষ না, সংগঠনের পোলাপান আমাদেরকে বলে। একটা নিরীহ নিষ্পাপ ছেলেরে নিয়া রাসেল ভাই এইসব কথা বলে ক্যান? সংগঠনের ছেলে-মেয়েরা, বিশেষত মেয়েরা আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে। আমরা ধন্দে পড়ে যাই, আমরা উত্তর দিতে পারি না। তখন তারা উত্তর দেয়, আমাদের বলে, ইদানীং রাসেল ভাই কল্যাণী দি’র দিকে ড্যাবড্যাব কইরা চাইয়া থাকে আর সিগারেট টানে। কল্যাণী দি রাসেল ভাইর এক বছরের সিনিয়র, বুয়েটে পড়ে, মেধাবী ছাত্রী, কন, রাসেল ভাইর কি এইসব মানায়? আমাদের কাছে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এখন আবার ‘বিপ্লব ও ২৩টি পিঁপড়ে’ গল্প লেইখা আমাগো সমালোচনা করে। আবার নিজের পাগলামিরে লুকানের লাইগা মাহবুব ভাই-সেঁজুতি আপার নামে প্রচারণা চালায়।

কিন্তু আমরা সেঁজুতির কাছ থেকে এব্যাপারে সত্যমিথ্যা কিছুই জানতে পারি না। কেননা সেঁজুতিকে আমরা কখনো দেখি নাই। তাই আমাদের হৃদয়ে তাকে দেখার একটা সুপ্ত বাসনা ধীরে ধীরে জাগ্রত হতে থাকে। আমরা গিয়ে রাসেল ভাইকে ধরি, ‘রাসেল ভাই, আমরা সেঁজুতিরে দেখতে চাই, তার লগে আলাপন রটাইতে চাই।’ রাসেল ভাই বলে, ‘ধুর মিয়া, সেঁজুতিরে পাইবা কই, সে তো ব্লাকমেইল হইয়া গ্যাছে।’ তখন মুজিব রাসেল ভাইরে শুনিয়ে শুনিয়ে আমাদের বলে, রাসেল ভাইর বুড়া বয়সে ভীমরতি পাইছে, হালায় সিনিয়র মাইয়ার লগে প্রেম করতো চায়, বোঝোস না বুয়েটের মাইয়ার লগে প্রেম করতে পারলে আর কোনো চিন্তা নাই, বাকিটা জীবন বইয়া বইয়া খাওন যাইব; হালারপো, আজিজ, বহুত ধান্ধাবাজ হইছো।’ শুনে রাসেল ভাই চেইতা-মেইতা আগুন হয়, বলে, মাহবুব যে দুই বছরের সিনিয়র মাইয়ার লগে প্রেম করে, হেইডা? এসব শুনে নজরুল ভাই মাহবুব ভাইয়ের রুমে যায়, বলে, ‘তুই সেঁজুতিরে ভালোবাসলে আমাগোরে কইতি, আমাগোরে কোনোদিন কইছস? ক্যাম্পাসে কানাঘুষা শুনি। ...আমাগোরে না কইয়া ক্যাম্পাসে আসা ছাইড়া দিলি, হইলো? মাহবুব ভাই মুচকি হেসে বলে, কমরেড, ক্যাম্পাসে গ্যালে কি বিপ্লব হইবো? নজরুল ভাই সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করে, বলে, চল প্রপদে যাই, কাজ আছে, বন্যা-দুর্গত অঞ্চলে ত্রাণ নিয়া যাইতো হইবো।’

তখন তারা রুটি, শুকনা চিড়া, গুড় নিয়ে বন্যা-দুর্গত অঞ্চলে যায়। কিন্তু তারা আর ত্রাণ দিতে পারে না। আমজনতা বলে যে, জরুরি অবস্থায় শুধু মাত্র সেনাবাহিনীই জাতিকে ত্রাণ দিতে পারে, এই কথা নাকি সংবিধানে আছে। শুনে আমরা ধন্দে পড়ে যাই। তারা প্রমাণ দেখায়, বলে, দ্যাকছেন না মিয়া, আম্রিকাই নিজের হাতে আম্গোরে ত্রাণ না-দিয়া, সেনাবাহিনীরে দিয়া দিতাছে। শুনে আমরা চুপ করে থাকি, কী জানি, আমরা তো আর সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও-তো গুরুতর সাংবিধানিক বিষয়গুলাতে একমত হতে পারে না। তাই মুজিবও সেঁজুতির বিষয়ে রাসেল ভাইর সাথে একমত হতে পারে না।

রাসেল ভাই বলে, ডাকাইত কিসিমের এক লোক বিপ্লবের নামে সেঁজুতিরে ব্লাকমেইল করছে; ব্লাকমেইল কইরা বিয়া করছে। আমরা বলি, কাহিনীটা ক্লিয়ার করেন না, রাসেল ভাই। তিনি বলেন, কাহিনী আবার কি, সত্য ঘটনাই। সেঁজুতি একজন অগ্নিকন্যা, সাচ্চা বিপ্লবী, ইয়েটস্-রমণী। তারা তখন প্রথম প্রথম মাওবাদ শিখতাছে; বিপ্লবের নামে, কমরেড মাও-এর নামে জলঘাটে সাতবার আছাড় খাইতাছে, কলস ভাঙতাছে, আঁচল ভিজাইয়া ফালাইতাছে, বাসায় ফিরতে দেরি করতাছে; তো এমন নাজুক পরিস্থিতিতে─ লোকটা বসা ছিল গাছের ডালে, পাতার আড়ালে─ নাইমা আইসা কইল, কইন্যা তুমি মাওয়ের নামে কলস ভাঙছ, আঁচল ভিজাইয়া ফালাইছ, অক্ষণ ভিজা আঁচলখান আমারে ধরতে দ্যাও, নাইলে এই ভিজা আঁচল দেখাইয়া তোমারে ও তোমার সাঙ্গপাঙ্গ সবাইরে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ফাঁসাইয়া দিমু, বুঝতেই পারতাছ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা কী জিনিস। তো সেঁজুতি সহজ-সরল মেয়ে, সবাইরে বাঁচাইতে গিয়া লোকটারে তার আঁচলখান ধরতে দিল।

আমরা বলি, তাইলে... রাসেল ভাই! সেঁজুতির লগে মাহবুব ভাইর প্রেম অইল ক্যামনে। তখন সে বলে, ‘আরে মিয়া শোনো না সেই কাহিনী, হুমায়ুন আজাদের আন্দোলনের সময় পুলিশ আমাগোরে কার্জন হলের দিকে ধাওয়া দিল। বাউন্ডারির মইদ্যে আটকাইয়া সমানে টিয়ার গ্যাস মারতাছে, আমাদের কারো কোনো হুশ নাই। এই অবস্থার মইদ্যে মাহবুব সেঁজুতির ঠিকই হুশ আছে। নাইলে তারা দুজন গিয়া একই জাগায় পলাইছে ক্যামনে। তো এমন সময় সেখানে গিয়াও একটা টিয়ার সেল পড়ে, ঠিক সেই সময় সেঁজুতি মাহবুবকে দেখতে পায়, মাহবুবকে দেখে সেঁজুতির চোখে জল আসে।’ আমরা বলি, রাসেল ভাই হুমায়ুন আজাদের আন্দোলন তো এই সেই দিনের ঘটনা। শুনে সে বিরক্ত হয়, বলে, ধুরো মিয়া, সেই দিনের ঘটনা বইলা কি আগেও আর ঘটতে পারে না। শুনে আমরা আবার ধন্দে পড়ে যাই। যেমন ধন্দে পড়ে যায় মাহবুব ভাইর ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা।

হামেদীর কথা শুনে ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা, অদিতি, নওরীন, মুনমুন,... এরা, সবাই মনে মনে ভাবে যে মাহবুব ভাই শুধুমাত্

  • ০ টি মন্তব্য
  • ২৮বার পঠিত
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি

আপনি এই পোস্টটে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না

 

dhakauniversity group image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের স্মৃতি ভরা মুহূর্তগুলি আবারো আড্ডার মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য আমাদের এই প্রয়াস “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপ ব্লগ” । সকলে মিলে আবার আড্ডায় মেতে উঠি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর স্মৃতি রোমান্থনে ।

পোস্ট আর্কাইভ

সর্বমোট হিট

 ১৬৯১১

মোট সময় লেগেছে ০.১১৩৪ সেকেন্ড