music group image ১, যেকোন ব্লগার এই গ্রুপ এ join করতে পারবেন।

২, সঙ্গীত বিষয়ক যেকোন লেখা সদস্যরা পোস্ট করতে পারবেন যেমন
ক, কোন নতুন অ্যালবাম এর রিভিউ,
খ, কোন গান নিয়ে আলোচনা,
গ, গানের কথা ও স্বরলিপি নিয়ে আলোচনা,
ঘ, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি।  

এইসব প্রেম নিয়ে বেঁচে-বর্তে থাকা (কিস্তি-২)

লিখেছেন মাহাবুবুর রাহমান, ২৬ শে আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১২:৩৮

                       

আগের অংশ

আমরা বলি, তাইলে... রাসেল ভাই! সেঁজুতির লগে মাহবুব ভাইর প্রেম অইল ক্যামনে। তখন সে বলে, ‘আরে মিয়া শোনো না সেই কাহিনী, হুমায়ুন আজাদের আন্দোলনের সময় পুলিশ আমাগোরে কার্জন হলের দিকে ধাওয়া দিল। বাউন্ডারির মইদ্যে আটকাইয়া সমানে টিয়ার গ্যাস মারতাছে, আমাদের কারো কোনো হুশ নাই। এই অবস্থার মইদ্যে মাহবুব সেঁজুতির ঠিকই হুশ আছে। নাইলে তারা দুজন গিয়া একই জাগায় পলাইছে ক্যামনে। তো এমন সময় সেখানে গিয়াও একটা টিয়ার সেল পড়ে, ঠিক সেই সময় সেঁজুতি মাহবুবকে দেখতে পায়, মাহবুবকে দেখে সেঁজুতির চোখে জল আসে।’ আমরা বলি, রাসেল ভাই হুমায়ুন আজাদের আন্দোলন তো এই সেই দিনের ঘটনা। শুনে সে বিরক্ত হয়, বলে, ধুরো মিয়া, সেই দিনের ঘটনা বইলা কি আগেও আর ঘটতে পারে না। শুনে আমরা আবার ধন্দে পড়ে যাই। যেমন ধন্দে পড়ে যায় মাহবুব ভাইর ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা।

হামেদীর কথা শুনে ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা, অদিতি, নওরীন, মুনমুন,... এরা, সবাই মনে মনে ভাবে যে মাহবুব ভাই শুধুমাত্র তারই প্রেমে পড়েছে। ফলে তাদের মধ্যে স্বপ্নকাতরতা জন্ম নেয়। তারা সারারাত জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে থাকে এবং সকালবেলা ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে এই রোগ সব সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে সংক্রমিত হতে থাকে এবং এক সময় দেশের সমস্ত সুন্দরীরা দিনের বেলা ঘুমাতে থাকে। এতে দেশে মারাত্মক এক সমস্যা দেখা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফাঁকা হয়ে যায়। এবং মানুষের মনে একটা কুসংস্কার আছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কিছু হলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও তা-ই হয়। ঘটনা ঘটলও তাই। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও ফাঁকা হয়ে যায়। এরপর দেশের লোকজন দিন আর রাতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারার ক্ষমতা হারায়। জাতির এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি (তিনি বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, তার বুদ্ধির ওপর আমাদের আস্থা আছে) আবারও তার বুদ্ধির পরিচয় দেন। তিনি দিনকে রাত এবং রাতকে দিন বলে ঘোষণা করেন। এতে দেশে ছোটখাট আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। দেশের লোকজন সকালবেলা ঘুমিয়ে পড়া শুরু করল। এবং জাতি ঘুমকাতুরে হয়ে উঠল। তখন আবার রাষ্ট্রপ্রধান অফিস আদালত বন্ধ ঘোষণা করলেন। এর ফলে দেশের মানুষের নাকি শান্তিতে ঘুমানোর একটা সুব্যবস্থা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীও তো মানুষ, সুতরাং তারাও এই ঘুমরোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু ব্যারাকে ফেরা ছাড়া তাদের শান্তিতে ঘুমানোর কোনো উপায় নাই। আর আর্মি একবার ব্যারাক থেকে বের হলে নাকি আর সহজে ব্যারাকে ফিরতে পারে না। তাই অগত্যা ভিসিগণ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু মাহবুব ভাইর আর কোনো ব্যবস্থা হয় না।

রাসেল ভাই বলে যে, মাহবুব ভাইর আর প্রেম করা হয়ে ওঠে না। তখন রাসেল ভাই সেঁজুতির মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে এনে মাহবুব ভাইকে দেয় এবং ফোন করার জন্য প্ররোচিত করতে থাকে। মাহবুব ভাই বলে, ধুর, চারদিকে মোবাইলে প্রেমের থার্ডক্লাস সংলাপ শুনে শুনে এই জিনিসটার প্রতি আমার ঘৃণা ধরে গ্যাছে; এই জিনিসটা দিয়া সংলাপ করার প্রবৃত্তি হয় না। মাহবুব ভাই আর ফোন করে না। রাসেল ভাই তাকে আবারও তাগাদা দেয়, উস্কানি দেয়, ওই মিয়া, ফোন করো না ক্যান। মাহবুব ভাই বলে, প্লিজ রাসেল ভাই, আমি আমার ব্যক্তিত্বের কাছে পরাজিত, নতজানু। আজম স্যার বলে যে, ব্যক্তিত্ব নিয়া প্রেম করা যায় না। তখন রাসেল ভাই তাকে বুদ্ধি দেয়, ম্যাসেজ পাঠাও।

তখন নাকি মাহবুব ভাই ম্যাসেজ পাঠায়। ম্যাসেজ পেয়ে সেঁজুতি আপা তারে ফোন করে। ফোন পেয়ে মাহবুব ভাই কবিতার ঘোরে পড়ে যায়, সে কোনো কথা বলতে পারে না। কিন্তু এরপর কবিতার ঘোর ক্রমশ জ্বরের ঘোরে পরিণত হয়। তার সমস্ত শরীর লজ্জায়, অনুরাগে হলুদ হয়ে যায়। ডাক্তার বলে যে, বিলোরুবিনের মাত্রা আশঙ্কাজনক। শুনে সে সেঁজুতিকে ম্যাসেজ পাঠায়। কিন্তু ম্যাসেজ পায় তার স্বামী। সে মাহবুব ভাইকে ফোন করে। মাহবুব ভাই তার ছোটলোকিতে বিস্মিত, স্তম্ভিত হয়ে যায়। রাসেল ভাইকে বলে, রাসেল ভাই এইটা কি, একটা উচ্চ শিক্ষিত মেয়ের মোবাইল ফোন তার স্বামী চেক করে! মানুষের ব্যক্তিগত বলে কি কিছুই থাকবে না? এইসব স্বামীরা কি সব কিছুই হরণ করে নিবে? তখন রাসেল ভাই তার কাছে আসল ঘটনা জানতে চায়। মাহবুব ভাই বলে, ভদ্রলোক আমারে ফোন করে, জিজ্ঞাসাবাদ করে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একথা সেকথা জানতে চায়, আমি সব কিছু চেপে যাই। তখন সে আমারে জেল-হাজতের ভয় দেখায়, শুনে আমি হেসে উঠি, কিছু বলি না, শুধু মনে মনে বলি ন্যাংটার আবার বাটপারের ভয়। আমার হাসি শুনে সে বুঝতে পারে ডাল মে কুচ কালা হ্যায়, তাই একেবারে অফ মেরে যায়।

কিন্তু এরপর মাহবুব ভাইর মনে অনুশোচনা জাগে। সে ভাবে যে একটা নিষ্পাপ মেয়েরে ক্যাচালে ফালানো ঠিক হয় নাই। নিজের ওপর তার ঘোরতর বিতৃষ্ণা ও ঘৃণা জাগে। এসময় আজম স্যার তাকে বোঝায়, বলে, নীতিবোধ নিয়ে প্রেম করা যায় না।’ কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজনেরা, জুয়েলেরা ঘটনার ভিন্নতর বিশ্লেষণের দিকে যায়, বলে, বুঝছেন মাহবুব ভাই, মেয়েরা খুবই প্রাকটিক্ল্, এদের কাছে প্রেমের চেয়ে সংসারই বড়। দেখেন না মেয়েদেরকে নিরিবিলি একটু ভালোবাসার কথা, একটু প্রেমের কথা বলা যায় না, বললেই তারা বিয়ের কথা বলে।... শোনেন, সেঁজুতি আপায় নিজে তো কিছু কইতো পারে না, তাই স্বামীরে দিয়া থ্রেট করাইল।’ শুনে এইবার মাহবুব ভাই ‘অফ মেরে যায়’। হায়রে দুনিয়া, দুনিয়াতে কি স্বার্থহীন, স্বত্বহীন কিছুই থাকলো না?!

এরপর মাহবুব ভাইর সব কিছু আউলায়া যায়। সে ক্যাম্পাসে যায় না। তখন ক্যাম্পাস ফাঁকা পড়ে থাকে। এই সুযোগে ক্যাম্পাসে এবাদ আসে, সব কিছু আরো আউলায়া দিতে, পিছে পিছে অদিতি ফাল্গুনি, রোমেল ভাই, এরা। সে এসে মধুর ক্যান্টিনে বসে, পৌরহিত্য, প্রজাপতিত্ব গ্রহণ করে। তার চারপাশে রোমেল ভাই, জহির, সাদ্দাম এরা। সে তার ভাবভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গিতে সবাইরে স্মরণ করাইয়া দিতে চায় যে, সে ধানমণ্ডির পোলা, পাকিস্তান আমলের ২২ ফ্যামিলির একজন। সুতরাং জাতির নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব তার উপর অর্পিত হইছে, তার উপর ওহী নাযিল হইছে। সে বলে, ঠিকাসে। বলে,... হইসে, ...খাইসে। তখন তার এইসব উচ্চারণভঙ্গি শুনে রোমেল ভাই বেদিশা হয়ে লাইব্রেরির দিকে দৌড় দেয়, সবাইরে ডাকে : এই রাসেল, মুজিব তোমরা সবাই আসো, ভাই এবাদুর তোমাদের আহ্বানিচ্ছে, তিনি বিপ্লবে ডাক দিছে, তার অনেক ট্যাকা আছে, লন্ডন, ফ্রান্সে বাড়ী আছে। শুনে আমরা বলি, এ আবার কোন বাদুর? চান্দি ছিলা, প্যান্ট ঢোলা। আমরা অধম, আমরা তারে চিনতে পারি নাই! তাই সে অন্তরে ব্যথিত হইছে, অনেক ব্যথা বুকে নিয়া নীরব হইয়া গ্যাছে, নীরবে ফ্রান্সে চইলা গ্যাছে।

তখন বাড়ী থেকে মাহবুব ভাইকে চাপ দেয়, তুমিও বিদেশ চইলা যাও, সেখান গিয়া পড়ালেখা কর, দেশে থাকা নিরাপদ না, ক্যাম্পাসে কী কী কইরা বেড়াও...। কিন্তু মাহবুব ভাই রাজী হয় না। বাড়ী থেকে চাপ বাড়ে। টাকা-পয়সা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি আসে। তার ওপর আবার আরো নাকি নানাবিধ হুমকি আছে। তখন মাহবুব ভাই আজম স্যারের কাছে আসে, পরামর্শ চায়। আজম স্যার বলে, ভালোই তো, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড এক্সপেরিয়েন্স হবে, চলে যাও, দেশে থাকাও রিস্ক...। মুজিব বলে, মাহবুব ভাই, যান যান, অঙ্গে যদি ফিরিঙ্গি রোগ না-ই লাগাইতে পারলেন, তয় কবি হইবেন ক্যামনে। কিন্তু মাহবুব ভাই আরো পরামর্শের জন্য রাসেল ভাইকে ফোন করে। আর ঠিক তখনই জানতে পারে যে, রাসেল ভাই ও মাহমুদ হাসান প্রেম করার জন্য হাসানের দেশের বাড়ি খাগড়াছড়ি গ্যাছে। সেখানে টুম্পা পালের বাসা। তারা টুম্পা পালের বাসায় যায়। মানে রাসেল ভাই যায়, মাহমুদ হাসান যায় না। সে বাসার বাউন্ডারির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে এবং রাসেল ভাইকে ভিতরে পাঠায়। তখন রাসেল ভাই হাসানের ছেঁড়া সেই ঐতিহাসিক চটের ঝোলাটা নিয়ে বাউন্ডারির ভিতরে ঢোকে এবং দরজায় টোকা দেয়। তারপর দরজা টোকা দেয়ার পরে টুম্পার সহজ-সরল বাবা এসে দরজা খোলে। তখন রাসেল ভাই, পূর্বের শিখানো বুলি আওড়ায়। টুম্পার বাবার কর্মস্থল টেক্সটাইলের ম্যানেজার অমরেশ পালের ঠিকানাটা জানতে চায়। কিন্তু টুম্পার বাবা ম্যানেজার পোস্টে এই নামে কাউকে চিনতে পারে না। কিন্তু টুম্পার বাবা তার এই অজ্ঞতার পরিচয় দিতে লজ্জা পায়, তাই সে রাসেল ভাইর পরিচয় জিগায়। তখন রাসেল ভাই বলে যে, আমার নাম সজীব পাল, নারানগঞ্জ থেইকা আসছি। শুনে টুম্পার বাবা উৎসুক হন, আবেগী হন; কেননা তার বাড়ীও নারায়নগঞ্জ। রাসেল ভাই বিষয়টি বুঝতে পারে, এবং সুযোগ কাজে লাগায়, বলে যে, এত রাত্রে নারায়নগঞ্জ ফেরার কোনো উপায় নাই, ইতিমধ্যে লাস্ট-কার ছেড়ে দিয়েছে। তখন টুম্পার বাবা বলেন, ‘আহা এত টেনশনের কি আছে, তুমি বাবা আমার দেশের ছেলে, রাতে আমার বাসাই থাকো না।’ এই বলে তাকে পূর্ণ স্নেহের সাথে ড্রয়িং রুমে নিয়ে বসান এবং তিনি বাসার ভিতরে নিয়ে যান। ভিতরে গিয়ে রাসেল ভাই ওরফে সজীব পালের ঘটনা জানান। এই ফাঁকে, রাসেল ভাই ড্রয়িং টেবিলে ঝোলাটা রেখে রাজ্য জয়ের তৃপ্তিতে আয়েশ করে সোফার ওপর বসে এবং আচ্ছন্নভাবে ভিতরে শরবত বানানোর টুংটাং শব্দ শুনতে থাকে। তখন তার এক বেঘোর তৃষ্ণা জাগে, ফলে সে শরবতের আশায় আশায় বসে থাকে। কিন্তু এতক্ষণ মজা লওয়ার সুযোগ দেয়ার পর সহসা বিধি তার বামপাশে এসে দাঁড়ায়। কেননা শরবত নিয়ে স্বয়ং টুম্পা আসে এবং রাসেল ভাইকে দেখে বিস্ময়ে বলে, রাসেল ভাই। শুনে রাসেল ভাই চমকে ওঠে, তার প্রেতাত্মা শুকিয়ে যায়, সে ঝোলা রেখেই এবং শরবত না খেয়েই খিইচা-পইরা দৌড় মারে এবং এক দৌড়েই ঘরছাড়া এলাকাছাড়া হয়। তখন তার মনে পড়ে যে, ক্যাম্পাসে অনেক দিন দৌড়াদৌড়ি হয় না, একটা দৌড়াদৌড়ির ব্যবস্থা করলে কেমন হয়। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ে, দেশে এখন জরুরী অবস্থা সুতরাং তার পিপাসা পায় এবং টুম্পার বানানো শরবতের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু পাশে টুম্পা পাল-তো দূরের কথা মাহমুদ হাসানের টিকিটিও দেখতে পায় না। উচিৎ শিক্ষা পেয়ে আমাদের বোকা চেহারার রাসেল ভাই অগত্যা লংমার্চ করতে করতে ঢাকার দিকে রওয়ানা হয়। কেননা তখন তার লংমার্চ করে আর চিটাগাং সমুদ্র বন্দরে যাওয়ার পথ থাকে না। দেশে এখন জরুরী অবস্থা, একথা পাগলও যেমন বোঝে, বামপন্থীরাও বোঝে; আর রাসেল ভাই তো রাসেল ভাই-ই। অগত্যা সে ঢাকা এসে পৌঁছে।

ঢাকায় এসে সে আরো জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়। কেননা মাহবুব ভাই তার কাছে পরামর্শ চায়, সাহায্য চায়। তখন তারা তাদের করণীয় বুঝতে পারে না। কেননা তারা শিল্প-সংস্কৃতি করে; সুতরাং শামসুর রাহমানের জন্য তাদের শোকগ্রস্ত হওয়া দরকার। তাই তারা শোকগ্রস্ত হয়। তাই শামসুর রাহমান মারা যায়। তখন তারা কবির শোকে, প্রেমিকার শোকে কাতর হয়ে পড়ে। এরপর ভাঙা-মন নিয়ে তারা শামসুর রাহমানের কফিনে ফুল দিতে যায়। এবং তখন নাকি তাদের শোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি অর্জন করে।

শুনে তখন আমরা তাকে, সেঁজুতি কে হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে পড়ি। আমরা বুঝতে পারি যে, মজা লুটতে গিয়ে কোনো এক অসর্তক মুহূর্তে, বিশেষ-নির্বিশেষে আমরা সবাই মাহবুব ভাইর জালে আটকা পড়ি। আমাদের নীরস, নিষ্কর্ম জীবনে মাহবুব ভাই যে রহস্যময়তার সৃষ্টি করেছিল আমরা নিজেরাই সে রহস্যময়তার জালে জড়িয়ে যাই এবং আমাদের জীবনে অদৃষ্ট এক নারী, সেঁজুতির অস্তিত্ব টের পাই। আর এভাবেই আমরা মাহবুব ভাইর প্রেমিক সত্তার সাথে আমাদের সত্তার একাত্মতা অনুভব করি। আমরা গিয়ে মাহবুব ভাইকে ধরি, মাহবুব ভাই, চলেই যদি যাবেন আমাদের জীবনে আরেকটু রহস্যময়তা তৈরি করে যান, নইলে আমরা কীভাবে, কী নিয়ে বাঁচুম, দেশান্তরি হইলে সেঁজুতিরে নিয়াই হন। আমাদের সাথে রাসেল ভাইও একমত হয়। কিন্তু মাহবুব ভাইর আর হাতে বেশি সময় নাই। তার ওপর নানা ধরনের চাপ আছে।

তাই তারা, মুজিবেরা সব কিছু বন্দোবস্ত করার, টাকা তোলার কাজে নেমে পড়ে। আমরা তাদের সাথে যোগ দেই। তারা আজম স্যারের কাছে যায়, গিয়ে টাকা চায়, যাবতীয় বৃত্তান্ত বলে। বলে ‘টাকা দ্যান, প্রেম করুম, প্রেমিকারে নিয়া ভাগুম।’ শুনে স্যার বলে, তোমরা আমার সাউয়ার প্রেমিক হইছো, না, প্রেম কারে কয় বোঝো? যাইয়া দেখো তোমাগো বয়সী পোলাপান ফিলিস্তিনে, ইরাকে কেমন প্রেম করতাছে। ক্যামনে ট্যাংকের সামনে বুক পাইতা প্রেমিকার সাথে মিইশা যাইতাছে।’ শুনে আমাদের বুক হিম হয়ে যায়, গলা শুকিয়ে আসে ফলে রাসেল ভাইর টুম্পার বানানো শরবতের কথা মনে পড়ে যায়। আর আমাদের মনে পড়ে মাহমুদ হাসানের পরিণতির কথা।

রাসেল ভাই ঢাকা চলে আসে। কিন্তু মাহমুদ হাসান আর আসে না। সে টুম্পাদের বাসার বাউন্ডারির সামনে ঘুরঘুর করে। আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে টুম্পা পালের পূজার জন্য ফুল তোলার দৃশ্য দেখতে থাকে আর এভাবে টুম্পার সমস্ত ফুল, সমস্ত প্রেমাঞ্জলি গৌতম বুদ্ধের পদতলে নিবেদিত হতে থাকে। আর হাসান আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। ফলে এক বৌদ্ধ পূর্ণিমার জোছনাধরা রাতে, টুম্পাদের ঘনপল্লবে ঘেরা বাগানের মধ্যখানে একটা ফাঁকা জায়গা আছে; সেখানে সমস্ত জোছনা গাঢ় হয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে এক প্রবল ঘূর্ণির সৃষ্টি করে। যার ফলে সেখানে অনির্বাচ্য, অনির্বেয় এক জোছনা-প্রাবল্য তৈরি হয় এবং তা মাহমুদ হাসানকে টেনে নিয়ে যায় এবং সে অ-উপেক্ষণীয় এক নৃত্যযজ্ঞে মেতে ওঠে। তখন আমাদের ধুলিদীর্ণ পৃথিবী, হায় অধরে পিপাসা নিয়া, হৃদয়ে আকাক্সক্ষার বাসনা নিয়া, থরথর করে কাঁপতেছে, চারপাশের বৃক্ষরাজি তখন বাসরের আবেগ নিয়া, ভয় নিয়া, লজ্জা নিয়া মুখে কাপড় দিয়া একপাশে নিস্তেজ দাঁড়াইয়া থাকে। সেই সময় ধীরে ধীরে তার সমস্ত শরীরে প্যাড়প্যাড় করে জোছনা ধরে যায়, সে কয়েক বার বেকে চুরে ওঠে; অন্তরে, দেহে, ভূমিতে মোহনীয় মুদ্রা তুলে তুলে এক সময় মা বসুধার কোলে ঢলে পড়ে। তখন আহমদ ছফা বলে, আহারে, আবুল হাসানও এমন কইরা সুরাইয়ার পদতলে নিঃশেষিত হইছিল। একথা শুনে তসলিমা নাসরিন ক্ষেপে যায়, সে ছফা ভাইকে নারীবিদ্বেষী, প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী বলে গালি দেয়।

কিন্তু আমরা সরকারী সূত্রের বরাতে পত্রিকায় একটি ভিন্ন তথ্য পাই। আমরা জানতে পাই, মাহমুদ হাসান আদিবাসীদের হাতে নিহত হয়েছে। আমরা ভাবি, ‘উপজাতিগুলা এমনই শয়তান হয়। বাংলাদেশে থাকছ, আবার বাঙ্গালিগো লগে দিগদারী করছ। এদেশে, বিদেশে তদের কে আছে?’ কিন্তু আদিবাসী ছাত্রনেতারা, দীপায়ন দা’রা আমাদের ভিন্ন তথ্য জানায়। ফলে আমরা একই ঘটনার দুরকম তথ্য জেনে ধন্দে পড়ে যাই, এবং যে তথ্য আমাদের জন্য শুভকর আমরা সেটাকেই নিরপেক্ষ বলে ধরে নেই। ফলে আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এতে সরকার আরও বেশি করে সেখানে বাঙ্গালি পূনর্বাসন ও সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। আর টুম্পা পালদের জীবনে নেমে আসে নানা ভোগান্তি, দুর্ভোগ।

কিন্তু আমাদের জীবনে এখনো কোনো দুর্ভোগ নেমে আসেনি। তাই আমরা ভালোয় ভালোয় বাড়ীতে ফিরে আসি। তারপর একদিন পেটের ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি, চাকরি করি, কেরানিগিরি করি, আর মোটামুটি সচ্ছল জীবন-যাপন করি। এই করে আমাদের আর ক্যাম্পাসে যাওয়া হয়ে ওঠে না। কেননা আমাদের সন্তানরা ক্যাম্পাসে যাওয়া ধরছে। কেননা আমাদের অফিস আছে, আইন-আদালত আছে, সংসার আছে।

হঠাৎ একদিন মাহবুব ভাইর ‘একটি জ্বলন্ত প্রেমের কাহিনী’ নামে একটি গল্প কোথায় যেন পড়ি। পড়ে আমরা বুঝতে পারি, এইটা প্রেমের শক্তি মিন কইরা লেখা। তখন আমাদের ভিতর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আমরা মাহবুব ভাই খোঁজ-খবর নিতে শুরু করি। কিন্তু বিশেষ কোনো খবর আর পাওয়া যায় না। তখন আমরা ভাবি বেচারা তবে বিদেশেই থিতু হইছে। কিন্তু এরই মধ্যে একদিন হামেদী কি মাহমুদ হাসান, না মাহমুদ হাসান তো মারাই গ্যাছে, হামেদী আমাদের জানায় যে, মাহবুব ভাই বিদেশ পালানোর আগেই গ্রেফতার হয়। কিন্তু তাকে গ্রেফতারের কথা র্যােব কিংবা পুলিশ বাহিনী কেউই স্বীকার করে না। তারপর থেকে আর মাহবুব ভাইর কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। শুনে আমাদের মন ভারাতুর হয়, আমাদের স্মৃতিকাতরতা জন্মে। তখন আমরা আবার গল্পটি সংগ্রহ করে পড়ি। পড়ে আমরা প্রেম-শক্তির উৎস সন্ধান করি, স্ত্রীর সাথে মিলিত হই; কিন্তু বেশি দূর যেতে পারি না; কেননা আমাদের বয়স বেড়ে গেছে, সকালে অফিসে যেতে হবে।

তাই আমরা অফিসে রওয়ানা হই। কিন্তু কোনো এক ঘূর্ণিঘোরে ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছি। আমরা বুঝতে পারি এই ক্যাম্পাসের প্রতি আমাদের একটা সুপ্ত বাসনা আছে। কেননা এইখানে একদিন সেঁজুতি এসেছিল। আমাদের মনে পড়ে, তখন মাহবুব ভাই মধুর ক্যান্টিনের বাইরে চেয়ারে বসা ছিল। তখন ইকতিজা ভাই আসল, মাহবুব ভাইর সামনের চেয়ারে বসল, বলল, মাহবুব আমরাও চেষ্টা করছি সেঁজুতিরে নিয়া কবিতা লেখতে, আমরা পারি নাই, তুমি পারছ। তখন মাহবুব ভাই তাকে পুরী খাওয়াইল, চা খাওয়াইল; সে অনেক যত্ন কইরা, অন্তরে তৃপ্তি নিয়া খাইল; দুপুরে না-খাইয়া ছিল। তখন মাহবুব ভাই দেখে যে, তার পায়ের চারপাশে অসংখ্য পিঁপড়ে কিলবিল করে। মাহবুব ভাই বলে, আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে, কোনো আছে কি খবর?... তখন এই তানিম ভাই, তুহিন ভাই, সজীব ভাইরা, সেঁজুতির ছোটখাট প্রেমিকরা, বলে, সেঁজুতি ক্যাম্পাসে আসতাছে। শুনে মাহবুব ভাইর অন্তরে ঢেউ জাগে, উৎপীড়ন জাগে, দুকূল ভাইঙ্গা প্লাবিত করার ইচ্ছা জাগে, মনে লয় ক্যাম্পাসটারে লণ্ডভণ্ড কইরা ফালায়। কিন্তু তার আগেই ক্যাম্পাসে লণ্ডভণ্ড অবস্থা শুরু হয়ে যায়।

তখন মহাকাল স্তব্ধ হইছে কি হয় নাই, সেনাবাহিনীর ঘুম ভাঙছে কি ভাঙে নাই, এমন সময় তারা দেখে যে, এক প্রবল সুন্দরী অঙ্গে সর্বনাশা রূপ নিয়া, রূপের মোহ আর বিভ্রম ছড়াইয়া আসতেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলে যে, তখন তারা তাদের কর্তব্য ভুলে যায়, হাত তুলে স্যালুট দেয়ার বদলে, অসৈনিকসুলভ ইঙ্গিত করে। তা দেখে ছাত্ররা চেইতা যায়। ফলে ছাত্রদের সাথে তাদের বাহাস হয়। কিন্তু মেলেটারীরা নাকি মুখের চেয়ে হাতে বাহাস করতেই ওস্তাদ। আর একবার হাতে বাহাস শুরু হলে তা আর সহজ সমাধানে পৌঁছে না; বিশেষত যেখানে দুপক্ষেরই জনসংখ্যা বেশি। ফলে সমস্ত ক্যাম্পাস লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এতে অজ্ঞাতনামা অনেকের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলা হয়। অনেক ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। মাহবুব ভাই পালিয়ে থাকে। দেশ ছেঁড়ে পালানোর ধান্ধায় থাকে। আমরা তাকে আজম স্যারের কাছে নিয়ে যাই। তখন আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপ্রধান আবার জাতির সামনে আবির্ভূত হন। তিনি জাতিকে আশ্বস্ত করেন, ক্যাম্পাসের ঘটনায় আর কাউকে হয়রানি করা হবে না। শুনে আমরা আবার ক্যাম্পাসে যাই। গিয়ে মধুর ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়াই। হায় আল্লাহ! তখনকার আর কিচ্ছুই নাই, কিচ্ছুই চেনা যায় না! সহসা পাছায় লাঠির ঘা পড়ে; আমরা পেছন ফিরে তাকাই এবং ঠিকই চিনতে পারি : সবকিছু আগের মতোই আছে, এই যে এরা, সরকারের মাস্তান বাহিনী; বলে, শালা বুড়া বয়সে ভীমরতি পাইছে, আর্মির লগে ছাত্রগো গণ্ডগোল হইছে, ক্যাম্পাসে যে কাক-পক্ষীরও ঢোকা নিষেদ জানো না, হালা মাদারচোত মাইয়া মাইনষের দুদ টেপা দ্যাকতে আইছো, এই, হালার ল্যাওড়ারে ভ্যানে উঠা। তখন আমরা দুঃখে অথবা লজ্জায় কেঁদে ফেলি, বলি মা ধরণী ত্রিধা হও, আমাদের ন্যাও, এই পাপিষ্ঠদেরও ন্যাও।

তখন চরাচরে সন্ধ্যা নেমে আসে। আসে ঠাণ্ডা হাওয়া, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায় যে, এই বৃষ্টির কোনো কার্যকারণ নাই। ফলে আমরাও তখন কার্যকারণহীনতার ভিতর দিয়ে হাঁটি, মাথা না-তুলেই একবার আকাশের দিকে তাকাই, বলি, ‘মাহবুব ভাই, ক্যান আপনে হারায়া গ্যালেন!’ তখন মাহবুব ভাইকে আমাদের আপনার চেয়েও বেশি লাগে, আর বুকের ভিতর বিরাট একটি গর্ত লাগে; খালি, ফাঁকা গর্ত। দেখি সেই গর্তে একটি উজ্জ্বল তারা, আমরা বুঝতে পারি এই তারাটির নামই সেঁজুতি। ফলে আমরা তার কথা ভেবে ভেবে ঘরে ফিরে আসি। খাটের উপর বসে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকাই, তাকিয়ে সব অপমান-অনিদ্রা-অবসাদ ভুলে যাই। আমরা বলি, সেঁজুতি একটি তারা, সন্ধ্যাকাশের সবচাইতে উজ্জ্বল তারা। শুনে তারা আঁৎকে ওঠে, বলে, মাগো তোমার গায়ে কি জ্বর! কত্তবার না মানা করছি, জণ্ডিস লইয়া এত হাঁটাহাঁটি কইরো না।

কিন্তু কে শোনে কার কথা। চান্স পাইলেই আমরা অফিস-সংসার ফাঁকি দিয়া, হাঁটাহাঁটি শুরু করি। তারপর ঝুপ কইরা বৃষ্টি আমাদের পিছন থেইকা দৌড়ান দেয়। দৌড়ান খাইয়া আমরা ভো কইরা মধুর কেন্টিনের দিকে, ক্যাম্পাসের দিকে দৌড় দেই। কিন্তু চারুকলার সামনে রণ-রণাঙ্গিনী রুদ্রমূর্তিধারিনী পুলিশ বাহিনী আমাগোরে আটকাইয়া দেয়। আমরা শুনি গাড়ি ভাঙার আওয়াজ। আমরা শুনি, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। আমরা শুনি,শেখ হাসিনার চিকিৎসা চাই। কিন্তু তাদের, মাহবুব ভাইয়ের আর কোনো চিকিৎসা হয় না। তারে আর ক্যাম্পাসে পাওয়া যায় না। আমরা বলি, মাহবুব ভাই আপনে আর ক্যাম্পাসে আসনে না ক্যান? ...ও আপনের হেপাটাইটিস হইছে!

(এই গল্পটি কয়েকমাস আগে একটি ছোট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়; কিন্তু সেখানে লেখককের বিনা-অনুমতিতে, অজ্ঞাতে শেষ দুই অনুচ্ছেদের আগের অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ন বাদ দিয়ে দেয়া হয়। ফলে সামান্য পরিমার্জনসহ মূললেখাটি এখানে প্রকাশিত হল।)

  • ০ টি মন্তব্য
  • ২৯বার পঠিত
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি

আপনি এই পোস্টটে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না

 

music group image

১, যেকোন ব্লগার এই গ্রুপ এ join করতে পারবেন।

২, সঙ্গীত বিষয়ক যেকোন লেখা সদস্যরা পোস্ট করতে পারবেন যেমন
ক, কোন নতুন অ্যালবাম এর রিভিউ,
খ, কোন গান নিয়ে আলোচনা,
গ, গানের কথা ও স্বরলিপি নিয়ে আলোচনা,
ঘ, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি।

পোস্ট আর্কাইভ

সর্বমোট হিট

 ৩৬৪২

মোট সময় লেগেছে ০.০৫৭২ সেকেন্ড