লেখকের অন্যান্য পোস্ট
দীর্ঘ প্রতিক্ষীত লক্ষীপুর-ভোলা ফেরি সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
লিখেছেন নোয়াখালী ওয়েব, ১১ ই মার্চ, ২০০৮ সকাল ১০:১২
লক্ষ্মীপুর-ভোলা রুটে মঙ্গলবার (১১ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি যোগাযোগ ব্যবস্থা উদ্বোধন হয়েছে। রুটটিতে ফেরি চালু হলে চট্টগ্রাম-খুলনার মধ্যে সময় দুরত্ব কমে যাবে ১২ ঘণ্টা; এক দিন কমছে বরিশাল ও চট্টগ্রামের মধ্যে। যোগাযোগ উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন এই রুটে ফেরি চলাচলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এই রুটে বিআইডব্লিউটিসি'র কিশোরী ও কেতকী নামের দুটি ফেরি পরীক্ষামূলক ভাবে চলাচল শুরু করেছে। ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ঘাটে এ ফেরি দুটি চলাচল করছে।
১৯৮৯ সনে তৎকালীন সরকার দেশের দ্বীপ ভোলার সঙ্গে বরিশালের সড়ক পথের পরিকল্পনা সম্প্রসারিত করে বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহা সড়ক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে ২০০১ সালে ভোলার ভেদুরিয়া থেকে বরিশালের লাহার হাট রুটে ফেরি চলাচল শুরুর মধ্যদিয়ে ভোলাকে দেশের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা হয়। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারের একাধিক সংস্থার জরিপ শেষে প্রধান উপদেষ্টা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেন। তার নির্দেশে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বিআইডব্লিউটিসি ওই দুটি ফেরি চালু করে।
৮টি বাস-ট্রাক ও ৪/৫টি মাইক্রোবাস ধারণক্ষম ফেরি দুটি ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে এবং মজু চৌধুরীর ঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টা ও দুপুর ২টায় আসা-যাওয়া করছে। বর্তমানে ফেরিতে ট্রাকের ভাড়া র্নিধারণ করা হয়েছে দেড় হাজার টাকা ও বাসের জন্য ১৯৫০ টাকা। এ ছাড়া যাত্রী ভাড়া ধরা হয়েছে ১২ টাকা। বিআইডব্লিউটিএ এর স্থানীয় পরিদর্শক মো. সিহাব উদ্দিন জানান, ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে একটি ফেরি আপডাউনে ২০ হাজার টাকার জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। যানবাহন ও যাত্রী ভাড়া থেকে পাওয়া যায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। তবে ভোলা বাস মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. সেলিম পাড়াপাড়ের ক্ষেত্রে বাস ভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, অভিযোগ, ট্রাকের ভাড়া দেড় হাজার কিন্তু বাসের ভাড়া এক হাজার ৯৫০ টাকা, সেই সঙ্গে জনপ্রতি যাত্রী ভাড়া দিতে হয় ১২ টাকা করে- তাই বাস ভাড়া কমানো ও যাত্রী ভাড়া বাদ দেয়া উচিত।
এই রুট দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার মাইল ফলকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে উল্লেখ করে ভোলা জেলা প্রশাসক মো. বেলায়েত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, "এই রুটে গাড়ি চলাচল শুরু হলে দেশের এক তৃতীয়াংশ জেলার পণ্য পরিবহনে ব্যয় অনেক হ্রাস পাবে। এতে ভোক্তারা সুবিধা পাবেন।" ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে আরো ফেরির ব্যবস্থা করার কথা এখনই অঞ্চলবাসীদের মধ্যে জোড়ালো হয়ে ওঠেছে। তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফেরির ব্যবস্থা করা এবং মেঘনা মোহনায় ড্রেজিং করলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সহজতর হবে। ইতিমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ এর একটি দল ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটের মেঘনা মোহনা সরেজমিনে পরিদর্শন করে সেখানে চারটি স্থানে ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এটি করা হলে মাত্র এক ঘণ্টায় ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে ফেরি চলাচল করতে পারবে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন এর চেয়ারম্যান এ এস এম আলী কবির বলেছেন, লক্ষ্মীপুর-ভোলা ফেরি যোগযোগ ব্যবস্থা দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় অর্থনৈতিক গতি সঞ্চারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জিডিপি বৃদ্ধিতেও এর ভূমিকা থাকবে। এই ফেরি চালুর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে মংলা বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের সঙ্গে খুলনা-বরিশাল বিভাগের দূরত্ব অনেকাংশে কমে আসবে। তিনি বলেন প্রথম উদ্যোগ নেওয়ার ১১ বছর পর লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে ফেরি চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। ১১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হবে। তবে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে এ পথে ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে।
বিআইডব্লিওটিসি কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে তিনটি 'কে টাইপ' মাঝারী ধরনের ফেরি চলাচল করবে। কেতকী, কন্তুরী ও কিশোরী নামের ওই তিনটি ফেরী আরিচা এবং মাওয়া থেকে নেওয়া হয়েছে। ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট পর্যন্ত ফেরি চলাচল করবে। দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার। সময় লাগবে কমবেশি তিন ঘণ্টা। তবে মেঘনা নদীতে বঙ্গের চর এলাকায় ড্রেজিং করলে সময়ে অর্ধেকে নেমে আসবে। এ পথে ঢাকা থেকে ভোলা যেতে ৬ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুরের মতির হাট থেকে চালু হলে আরও ৮ কিলোমিটার দুরত্ব কমবে।
২০০১ সালের ১৯ জুলাই বরিশাল-ভোলা রুটে লাহারহাট-ভেদুরিয়া ফেরি চলাচল শুরু হয় সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে। এ পথে রাজধানী থেকে ভোলা যেতে ৮/৯ ঘণ্টা সময় লাগে। এ এস এম আলী কবির বলেন, "এ ফেরি যোগাযোগের মাধ্যমে দ্বীপ জেলা ভোলা মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ জেলা মূল ভূখন্ড থেকে এতদিন বিচ্ছিন্ন ছিল। এখন ন্যাশনাল হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে।" তিনি জানান, এর মাধ্যমে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
তিনি বলেন, এখন আরিচা বা মাওয়া ফেরিঘাট দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে হয়। আরিচা ফেরিঘাট ও সড়ক পথের ওপর যে চাপ আছে তাও কমে আসবে নতুন ফেরি যোগাযোগ স্থাপনের ফলে।
লক্ষ্মীপুর-ভোলা ফেরি যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে জলপথের অন্যতম দুর্গম ভৌগলিক প্রতিবন্ধকতা দূর হচ্ছে মন্তব্য করে আলী কবির বলেন, "১১ বছর আগে এর কাজ শুরু হয়েছিল। এরমধ্যে বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই, গবেষণা, হাইওয়ে নির্মাণ করা। এখন সেটা পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।" এই ফেরি যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিআইডব্লিওটিসির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, "সেবা ও পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং যোগাযোগে সময় কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের এ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। খুলনা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে দু'দিন সময় লাগে। এখন এ পথে একদিনেই যাওয়া যাবে।" বিআইডব্লিওটিসির চেয়ারম্যান আরও জানান, এ রুটে চলাচলের জন্য নতুন ফেরি সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে নতুন চারটি ফেরি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। উপকূলীয় এলাকায় চলাচল উপযোগী দুটি রো রো এবং দুটি কে টাইপ ফেরি কেনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "প্রতিদিন দশ হাজার মানুষ ভোলা থেকে উত্তাল মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও কালাবদর নদী পাড়ি দিয়ে বৃহত্তর নোয়াখালী ও বরিশালে যাতায়ত করে। ঝুঁকি নিয়ে তাদের চলাচল করতে হয়। এখন ঝুঁকি কমবে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ত্বরান্বিত হবে।"
বিআইডব্লিওটিসির কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক কারণেই এটি এতদিন বাস্তবায়িত হয়নি। দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত অবস্থায় আনার জন্য গত বছর এক আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে ভোলা-বরিশাল রুটে লাহারহাট-ভেদুরিয়া ফেরি ব্যবস্থাকে বিআইডব্লিওটিসির অধীনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিআইডব্লিওটিসির পরিচালক (কারিগরি) এম ওসমান বলেন, "বড় সমস্যা হচ্ছে অনেক এলাকায় নদীর গভীরতা কম। এ কারণে জোয়ার ধরে যেতে হচ্ছে। ঘুরে যেতে হয় বলে জ্বালানী বেশি লাগে। যাতায়ত এখন প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। পূর্ণ ভাটায় যাওয়া যায় না।" পরিচালক অর্থ জয়নাল আবেদিন তালুকদার জানান, লক্ষ্মীপুর-ভোলা ফেরি চলাচল চালু করতে খুব বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। বিদ্যমান জনবল ও কারিগরি প্রযুক্তি দিয়েই চালু করা হচ্ছে।
নতুন এ ফেরি যোগাযোগের স্থাপনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের সরাসরি যোগাযোগে সড়ক পথে ১৫০ কিলোমিটার দূরত্ব হ্রাস পাবে বলে বিআইডব্লিওটিসির কর্মকর্তা ধারণা করছেন।

- মন্তব্য লিখুন
- ০টি মন্তব্য
- ১১৯বার পঠিত
আপনি এই পোস্টটি কোন মন্তব্য করতে পারবেন না

















