লেখকের অন্যান্য পোস্ট


notredamian group image যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততম এলাকায় একঝাঁক সবুজের সমারোহ। ভেতরে ঢুকলেই বাইরের কোলাহল মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়, মনে ভর করে অদ্ভুত এক অনাবিল প্রশান্তি। বোগেনভেলিয়ায় ঘেরা, সুনিবিড় সেই ক্যাম্পাসটি আমাদের, সকল নটরডেমিয়ানের। কুইজের জন্য ছুটতে ছুটতে সকালের ঘুমঘুম ভাব ত্যাগ, ফিজিক্স ল্যাবের গ্যাড়াকলে পড়ে ত্যানা হয়ে যাওয়া জীবন, কেমেস্ট্রী ল্যাবে এসি দাস স্যারের কটকটে ধমক, বায়োলজি ল্যাবে ভুঁইয়া স্যারের তিনপুরুষ ঝাঁকানো ঝাড়ি- সব ছাপিয়ে ক্লাস শেষে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার আনন্দ। টেরেন্স স্যারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যান্টিনে বসে আলুর চপে কামড় দেয়ার পাশাপাশি সিগারেটে দেয়া নতুন দুয়েক টান, ফাদার পিশোতোর বাচ্চাসুলভ আর কেয়ারিং ব্যবহার আর সর্বোপরি শান্ত ক্যাম্পাসের মন্ত্রমুগ্ধ হাতছানি।
এখানে আমরা এক হবো সবাই। আবার ফিরে যাবো ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে। তুলনা হবে, স্মৃতিচারণ হবে সেদিন এবং আজকের নটরডেমের। নস্টালজিয়ায় ডুবে ভেসে আমরা সিক্ত হবো নতুন করে...।
 

মোক্তার নামা : ১ (মোক্তার স্যারের প্রথম ক্লাস) (@ নটরডেমিয়ানস)

লিখেছেন বহুরূপী মহাজন, ২৩ শে জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:২৯

                       

কলেজে মোক্তার স্যারের খুবই সুনাম। ছেলে থেকে বুড়ো সবাই তার খ্যাতি সম্বন্ধে জ্ঞাত। সেদিন অনেকদিন পর আমার ছোট ভাইয়ের কাজে কলেজে গিয়েছিলাম। টয়লেটে দেখি কেউ একজন শ্লোগান লিখে রেখেছে: " মোক্তারের এক বিচি".....!!!

যারা মোক্তার স্যারের ক্লাস করেনি তারা খুবই দুর্ভাগ্যবান বলতে হবে। তাদের মোক্তার স্যারের কীর্তিকলাপ লোক-মুখেই শুনতে হয়। আমি কিন্তু খুবই ভাগ্যবান। কেননা কলেজে ভর্তির কিছুদিন পরই মোক্তার স্যার প্রথম আমাদের ক্লাশ নিতে আসেন। স্যারের খ্যাতির কথা জানার আগেই বাস্তবিক স্যারের সাক্ষাত পেয়েছিলাম।

সেদিন আমাদের কোন একটা ক্লাশে টিচার আসেনি। সবাই আমরা এদিক ওদিন ছুটাছুটি করছি, একটা দলে একজন আর একজনের ঘাড়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। আমি বই রাখার উচু বেঞ্চিতে একটু গা এলিয়ে দিয়েছি। এমন সময় হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বিশাল দর্শন মোক্তার স্যার ক্লাসে এসে উঠলেন। কিছুক্ষণ আগে আমাদের যে সহপাঠি আরেকজনের ঘাড়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল সে তখনও সেখানেই আছে।

স্যার হুংকার দিয়ে ওকে ডাকলেন: " এ্যাই বাদর, তুই ওখানে কি করছিসসসসস....। আমার কাছে আয়।"

ততক্ষণে আমার সে বন্ধুর জান শেষ হয়ে গেছে। স্যারের বজ্র নাদে সে মুর্দা লাশের মত ভেসে ভেসে স্যারের কাছে গেল। কোন বোধ নাই মনে হল।

আমি কিন্তু স্যারের উপস্হিতি টের পাওয়া মাত্র এক গড়ান দিয়ে নিচের বেঞ্চে চলে এসেছি এবং ততক্ষণে ভদ্র মানুষটির মত বসে আছি।

বন্ধুটি স্যারের কাছে যাওয়া মাত্র স্যার ডান হাতটা উচু করলেন....আমার বন্ধুটির চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা পানি বের হল, জানটাও যাই যাই করছে।

আমরা পরছি ইন্নালিল্লাহে....ওয়া ইন্নাইলাইহে রাজেউন......

কিন্তু স্যার সবাইকে অবাক করে দিয়ে বন্ধুটির কাধে হাত রেখে ভর দিয়ে ডায়াসে উঠলেন। তারপর সেই চিরাচরিত স্টাইলে মেরুদন্ড সোজা করে টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে বসলেন।

আমরা ততক্ষণে মেরুদন্ড সোজা করে ফেলেছি।

এরপর স্যার সবাইকে বললেন জানালাগুলো বন্ধ করে দিতে। আমরা আদেশ পালন করে সটান বসে আছি এরপর কি হয়।

এর পর কি হল......?.......খানিকক্ষণ পর বাইরে থেকে দেখা গেলো স্যার কথা বলছেন আর ক্লাসের সব ছাত্র হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে।

স্যার সেদিন আমাদের রাধা-কৃষ্নের গল্প বলেছিলেন। কৃষ্ন রাধার সাথে কি কি করেছিল, কিছু শ্লোক যেমন: "হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাদে, প্রতি অঙ্গ লাগি কাদে প্রতি অঙ্গ মোর" এবং এসবের মানে কি ইত্যাদি।

আরও বলেছিলেন শরৎ চন্দ্রের কথা। তার নাকি বাল্য কালে এক মেয়ে সঙ্গী ছিল এবং তাকে নিয়ে ত্যান্দর শরৎ চন্দ্র নাকি বিলে চলে যেত নৌকা করে।

কিন্তু স্যার আমাদের সেদিন এটুকুই বলেছিলেন। শরৎ চন্দ্র ওই মেয়েকে বিলে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে কি হতো সেটা স্যার আমাদের বলেননি।

শুধু এটুকু বলেছিলেন: "ওখানে গিয়ে ওরা কি করতো সেটা তোদের জানার দরকার নেই...."

এরপর স্যার প্রায় একবছর আমাদের ক্লাস নিয়ে ছিলেন। আমরা ছিলাম অন্যদের হিংসার পাত্র।

মোক্তার নামা তাই চলবে আশা করি।

বি: দ্র: বেশ কয়েক বছর পর আমার ছোট ভাই যখন কলেজে ভর্তি হয়েছে তখন ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি স্যারের ক্লাস পেয়েছিলাম কিনা।

আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম স্যার ওদের কিছু বলে কিনা। ও হেসে বলল ওদের ক্লাস নেয়না কিন্তু অন্য গ্রুপে নেয়। ও ওর বন্ধুদের কাছে কি নাকি শুনেছে আমাকে বলল না।

আমি মনে মনে হাসি, মোক্তার স্যার বদলাবেন না।

  • ১১ টি মন্তব্য
  • ১২৮বার পঠিত
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৩ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি
২৭ শে জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:২৯
comment by: সুখন বলেছেন: আমরা স্যারের ক্লাস করেছি পুরো এক বছর। ঠিকই বলেছেন স্যারের ক্লাস যারা করেনি তারা বুঝবে না তা কি মিস্ করেছে। আমরা সবাই ছিলাম স্যারের ফ্যান। মোক্তার স্যার দীর্ঘজীবী হোন।
৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:০৩
comment by: ধুসর গোধূলি বলেছেন:
মুক্তার স্যার তাইলে ঐ বিখ্যাত শ্লোকটা সবারেই শোনায় ;)

সেদিন অনেক চেষ্টা করছিলাম মনে করতে, আপনি মনে করিয়ে দিলেন।
০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:৫৫
comment by: মাহবুব হক বলেছেন: মোক্তার স্যারের ক্লাস নিয়মিত পেতাম না। মাঝে মাঝে পেয়েছি। অনেক মজার মজার গল্প বলতেন। পুরানো দিনগুলো মনে করিয়ে দিলেন।
১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ২:৪৩
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: স্যারের ক্লাসেই শুধু শতভাগ উপস্থিতি ছিলো.. :)
২৩ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৪:৪৫
comment by: সাঈ৯০০৯ বলেছেন: He is a graet teacher.
২৭ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:২৭
comment by: কাল্পনিক বলেছেন: আমার দুলাভাই বলেছিলেন, যারা নটরডেমে মোক্তার স্যারের ক্লাস পায়নি, তাদের নটরডেম লাইফটাই বৃথা! আমি একদিন সাবস্টিটিউট ক্লাস করেই বুঝতে পেরেছি এর মানে!
২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:৩৫
comment by: নিজামুল হক বলেছেন: আমিও কাল্পনিক ভাইয়ের সাথে একমত। আমি গ্রুপ ৩ এ ছিলাম, রেগুলার ক্লাশ পাইনি, সাবস্টিটিউট ক্লাস করেছি ! স্যারকে মিস করি।
০১ লা অক্টোবর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:২২
comment by: কর্ণ বলেছেন: মোক্তার স্যারের ক্লাস পেয়েছিলাম । ব্যাপক মজা । কিন্তু পরে দেখলাম স্যারের সব কিছু বছরের পর বছর ধরে একই রকম, প্ল্যানড স্টান্টের মত । এমনকি স্যার কোন কথাটা বলে নিজেই কয় সেকেন্ড হাসবেন এটাও একেবারে পূর্বপরিকল্পিত । বিভিন্ন গ্রুপের ছেলেদের সাথে কথা বলে ব্যাপারটা আবিস্কার করেছিলাম ।

ওভারঅল ভালোই ।
২৪ শে অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ১২:৩২
comment by: ধুপছায়া_বুয়েট বলেছেন: মুখতার স্যার দীর্ঘজীবি হোন।নটরডেমের ছেলেদের ল্যাব করতে করতে ক্ষয়ে যাওয়া জীবনকে একটু পুনরজ্জীবিত করুন।
১৫ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:১৩
comment by: আকাশনীল বলেছেন: আরে মিয়া আমরা দেড় বছর পাইছি ওনারে
শেষ দিকে একঘেয়ে লাগতো ;)
১৮ ই নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:৫৪
comment by: ডগরোজ বলেছেন: ভাই মাফ চাই, মোক্তার স্যারের ভয়ানক গালি যে খেয়েছে, সেই জানে বিদঘুটে তিক্ত বেদনা। আমি সায়েন্স -২ এর ছাত্র। জানি স্যার কিভাবে অপমানিত হয়েছিলেন এক ছাত্রকে মা বাপ তুলে গালি দেয়ায়। এরপর আর কোন ক্লাশ স্যার আমাদের নেন নি।

আপনি এই পোস্টটে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না

 

notredamian group image

যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততম এলাকায় একঝাঁক সবুজের সমারোহ। ভেতরে ঢুকলেই বাইরের কোলাহল মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়, মনে ভর করে অদ্ভুত এক অনাবিল প্রশান্তি। বোগেনভেলিয়ায় ঘেরা, সুনিবিড় সেই ক্যাম্পাসটি আমাদের, সকল নটরডেমিয়ানের। কুইজের জন্য ছুটতে ছুটতে সকালের ঘুমঘুম ভাব ত্যাগ, ফিজিক্স ল্যাবের গ্যাড়াকলে পড়ে ত্যানা হয়ে যাওয়া জীবন, কেমেস্ট্রী ল্যাবে এসি দাস স্যারের কটকটে ধমক, বায়োলজি ল্যাবে ভুঁইয়া স্যারের তিনপুরুষ ঝাঁকানো ঝাড়ি- সব ছাপিয়ে ক্লাস শেষে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার আনন্দ। টেরেন্স স্যারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যান্টিনে বসে আলুর চপে কামড় দেয়ার পাশাপাশি সিগারেটে দেয়া নতুন দুয়েক টান, ফাদার পিশোতোর বাচ্চাসুলভ আর কেয়ারিং ব্যবহার আর সর্বোপরি শান্ত ক্যাম্পাসের মন্ত্রমুগ্ধ হাতছানি।
এখানে আমরা এক হবো সবাই। আবার ফিরে যাবো ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে। তুলনা হবে, স্মৃতিচারণ হবে সেদিন এবং আজকের নটরডেমের। নস্টালজিয়ায় ডুবে ভেসে আমরা সিক্ত হবো নতুন করে...।

পোস্ট আর্কাইভ

সর্বমোট হিট

 ২৭৪১

মোট সময় লেগেছে ০.১০৫৩ সেকেন্ড