লেখকের অন্যান্য পোস্ট
মানুষ ও স্বাধীনতা
লিখেছেন জাগারণ, ২৬ শে জুন, ২০০৮ দুপুর ২:১৩
মানুষ যে সকল কাজ সম্পাদন করে, এ সৃষ্টি জগতের (Phenomenon) অন্যসব সৃষ্টির ন্যায় তাও এক সৃষ্টি। তার সংঘটন প্রক্রিয়া ও এজগতের অন্য সকল সৃষ্টির মতই পূর্ণাঙ্গ কারণ সংঘটিত হওয়ার উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। কারণ, মানুষও এসৃষ্টি জগতেরই অংশ স্বরূপ। এ জগতের অন্য সকল সৃষ্টির সাথেই তার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই তার সম্পাদিত ক্রিয়ায় সৃষ্টির অন্য সকল অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে মনে করা যাবে না। যেমন : মানুষের একমুঠো ভাত খাওয়ার কথাই চিন্তা করে দেখা যাক। এ সামান্য কাজের মধ্যে আমাদের হাত, মুখ, দৈহিক শক্তি, বুদ্ধি, ইচ্ছা সবই ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ভাতের অসি-ত্ব ও তা হাতের নাগালে থাকা, তা অর্জ নের ক্ষেত্রে কোন বাধা বিঘ্নের অস্তিত্ব না থাকাসহ স্থন-কাল সংক্রান্ত- অন্যান্য শর্তের উপস্থি'তির প্রয়োজন। ঐসব শর্ত বা কারণের একটিও যদি অনুপস্থি'ত থাকে তাহলে ঐ কাজ সাধ্যের বাইরে চলে যায়। আর ঐ সকল শর্ত বা (পূর্ণাঙ্গ কারণের উপস্থি'তি) কারণ সমূহের উপসি'তির ফলে সংশিষ্ট কাজটির সম্পাদন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পূর্বে যেমনটি আলোচিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কারণের উপসি'তির ফলে সংশ্লিষ্ট ক্রিয়ার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। তেমনি কোন ক্রিয়া মানুষের দ্বারা সম্পাদিত হওয়ার সময়, মানুষ যেহেতু পূর্ণাঙ্গ কারণের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত, তাই মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট ক্রিয়ার সম্পর্ক হচ্ছে `সম্ভাব্যতার' সম্পর্ক। (কারণ মানুষ একাই পূর্ণাঙ্গ কারণ নয়। বরং মানুষও ঐ ক্রিয়ার অন্যান্য অপূর্ণাঙ্গ কারণগুলোর মতই একটি আংশিক কারণ মাত্র।) কোন ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতা রয়েছে। ঐ ক্রিয়ার সাথে সামগ্রিক (পূর্ণাঙ্গ কারণ) কারণের সম্পর্ক হচ্ছে`অপরিহার্যতার' (অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ কারণ ঘটলেই এ ক্রিয়ার সংঘটিত হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে) সম্পর্ক।
কিন্তু মানুষ নিজে যেহেতু একটি অপূর্ণাঙ্গ বা আংশিক কারণ, তাই তার সাথে ক্রিয়ার সম্পর্ক অবশ্যই `অপরিহার্যতা মূলক' হবে না। মানুষের সহজ-সরল নিষ্পাপ উপলব্ধিও উপরোক্ত বিষয়টিকে সর্মথন করবে। কারণ, আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ সাধারণতঃ খাওয়া পান করা, যাওয়া আসাসহ ইত্যাদি কাজের সাথে সুস'তা, ব্যাধি, সুন্দর হওয়া বা কুশ্রী হওয়া, লম্বা হওয়া বা খাটো হওয়া ইত্যাদির মত বিষয়গুলোকে এক দৃষ্টিতে দেখে না। প্রথম শ্রেণীর কাজগুলো মানুষের ইচ্ছার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ঐসব কাজ করা বা না করার ব্যাপারে তার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। ঐ ধরণের কাজ সম্পাদনের ব্যাপারে মানুষ আদেশ, নিষেধ, প্রশংসা বা তিরস্কারের সম্মুখীন হয়। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর (সুন্দর বা কুশ্রী হওয়া, লম্বা বা খাটো হওয়া) কাজ বা বিষয়গুলোর ব্যাপারে মানুষের আদৌ কোন দায়িত্ব নেই। ইসলামের প্রাথমিক যুগে `আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের' মধ্যে মানুষের সম্পাদিত কাজের ব্যাপারে দু'টো বিখ্যাত মতাবলম্বি দলের অস্তিত্ব ছিল। তাদের একটি দলের বিশ্বাস অনুসারে মানুষের সম্পাদিত কাজসমূহ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মানুষ তার কাজকর্মের ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে পরাধীন। তাদের মতে মানুষের ইচ্ছা ও স্বাধীনতার কোন মূল্যই নেই। আর দ্বিতীয় দলটির মতে মানুষ তার কাজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং কাজের সাথে আল্লাহ্র ইচ্ছার আদৌ কোন সম্পর্ক নেই। তাদের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহ্ নির্ধারিত ভাগ্য সংক্রান্ত নিয়মনীতি থেকে মুক্ত। কিন্তু আহলে বাইতগণের শিক্ষানুযায়ী (যাদের শিক্ষা পবিত্র কুরআনের শিক্ষারই অনুরূপ) মানুষ তার কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন। তবে এক্ষেত্রে সে সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্বের অধিকারী নয়। বরং মহান আল্লাহ্ আপন স্বাধীনতার মাধ্যমে ঐ কাজটি সম্পাদন করতে চেয়েছেন। অর্থাৎ মানুষের কাজ নির্বাচন করার স্বাধীনতা অন্যান্য অপূর্ণাঙ্গ কারণসমূহের মতই একটি আংশিক কারণ মাত্র। তাই কারণের পূর্ণতা অর্জন মাত্রই তা বাস্তবায়নের `অপরিহার্যতা' আল্লাহ্ই প্রদান করেছেন এবং তা আল্লাহ্ ইচ্ছারই প্রতিফলন। তাই এর ফলে আল্লাহ্র এ ধরণের ইচ্ছা, `অপরিহার্য' ক্রিয়াস্বরূপ আর মানুষও ঐ ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন বটে। অর্থাৎ ঐ ক্রিয়া সম্পাদিত হওয়ার ক্ষেত্রে তার সামগ্রিক (পূর্ণাঙ্গ) কারণ সমূহের মোকাবিলায় ক্রিয়ার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। আর মানুষের কার্যনির্বাচন বা সম্পাদনের স্বাধীনতা তার কার্য সম্পাদনের অসংখ্য অসম্পূর্ণ কারণগুলোর মত একটি আংশিক কারণ মাত্র। তাই তার ঐ স্বাধীনতা (যা পূর্ণাঙ্গ কারণের একটি অংশ মাত্র) পেক্ষাপটে ঐ কাজটি ঐচ্ছিক ও সম্ভাব্য (অপরিহার্য নয়) একটি বিষয় মাত্র।
হযরত জাফর সাদিক (র.) বলেছেন : `মানুষ তার কাজে সম্পূর্ণ পরাধীনও নয় আবার সম্পূর্ণ সার্বভৌমও নয়। বরং এ ক্ষেত্রে মানুষ এ দু'য়ের মাঝামাঝিই অবস্থান করছে'।

- মন্তব্য লিখুন
- ১টি মন্তব্য
- ৪৭বার পঠিত
কোলাহল বলেছেন:
ক্রিটিক্যাল ব্যাপার।
আপনি এই পোস্টটে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না


















